নড়াইলে শিক্ষক লাঞ্চিতের প্রতিবাদে শাহবাগে সমাবেশ
প্রকাশ : ২৭ জুন ২০২২, ২১:১২
নড়াইলে শিক্ষক লাঞ্চিতের প্রতিবাদে শাহবাগে সমাবেশ
ঢাবি প্রতিনিধি
প্রিন্ট অ-অ+

নড়াইলের সদর উপজেলার মির্জাপুর ইউনাইটেড কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ স্বপন কুমার বিশ্বাসকে ধর্ম অবমাননার অভিযোগে জুতার মালা পরিয়ে হেনস্থা ও নির্যাতকদের বিচারের দাবিতে সমাবেশ করেছে নিপীড়নের বিরুদ্ধে শাহবাগ।


সোমবার (২৭ জুন) বিকাল সাড়ে ৪টায় শাহবাগে তারা এই সমাবেশ করেন। এসময় নিপীড়নের বিরুদ্ধে শাহবাগ কর্তৃক আয়োজিত এই সমাবেশে সংহতি আন্দোলন করেন বাংলাদেশ ছাত্র ঐক্য পরিষদ, বাংলাদেশ শিক্ষক ঐক্য পরিষদ, মাইনরিটি রাইটস ফোরাম বাংলাদেশ ও বাংলাদেশ কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি (বাকবিশিস) ।


নিপীড়নের বিরুদ্ধে শাহবাগ’ ব্যানারের এই কর্মসূচিতে মাইনরিটি রাইটস ফোরাম বাংলাদেশ, বাংলাদেশ ছাত্র ঐক্য পরিষদ, বাংলাদেশ শিক্ষক ঐক্য পরিষদ, বাংলাদেশ কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি (বাকবিশিস) সংহতি জানিয়ে উপস্থিত ছিলেন।


এসময় নিপীড়নের বিরুদ্ধে শাহবাগ ও গনজাগরণ মঞ্চের অন্যতম সংগঠক আকরামুল হকের সভাপতিত্বে বক্তব্য রাখেন গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক ও সাবেক চেয়ারম্যান ড. কাবেরি গায়েন, ড. রোবায়েত ফেরদৌস ও সহযোগী অধ্যাপক ড. আব্দুর রাজ্জাক খান।


এছাড়াও সমাবেশে লেখক, গবেষক ও অন্যতম সংগঠক রবিন আহসান, মাইনরিটি রাইটস ফোরাম বাংলাদেশের নেতা ও আব্দু রব কলেজের শিক্ষক অমুল্য কুমার বুদ্ধ, ছাত্র ঐক্য পরিষদের নেতা কাজল দাস, শিক্ষক ঐক্য পরিষদের নেতা রনজিত দেব ও প্রমুখ।


ড. কাবেরি গায়েন বলেন, 'আমরা এ নিয়ে এমন ঘটনাকে কেন্দ্র করে অনেকবার এখানে দাঁড়িয়েছি। এদেশে আমরা একটি প্রতিষ্ঠানের প্রধান শিক্ষকে তাঁরই প্রাক্তন ছাত্র দ্বারা হেনস্তার শিকার হতে দেখেছি। সমল কান্তির ঘটনায় আমরা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সকলে ক্ষমা চেয়েছি বটে কিন্তু যেই সংসদ তাঁকে থাপ্পর মেরেছিলো তাকে জবাবদিহিতায় আনতে দেখিনি। সম্প্রতি ঘটে যাওয়া হৃদয় মন্ডলকেও এরকম ঘটনার শিকার হয়েছেন যা সকলের জানা। কিন্তু স্বপন কুমার বিশ্বাসকে কোন অপরাধে জুতার মালা পরিয়ে তাঁকে নির্যাতন করা হচ্ছে তার সত্যতা এখনও জানিনা।


তিনি বলেন, 'ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি নামে আছে কিন্তু কোনো যৌক্তিক কাজে তাদের দেখা যায় না। একেকজন শিক্ষক একেকরকমভাবে নির্যাতন ও হেনস্তার শিকার হচ্ছে কিন্তু শিক্ষক মহলের কোনো দায়সারা নেই এখন পর্যন্ত। অথচ শিক্ষক লাঞ্ছনা এখন শিক্ষক হত্যায় উপনিত হয়ে যাচ্ছে বলে মনে করেন তিনি। শিক্ষকদের প্রতি এই নিপীড়ন ও হত্যাযজ্ঞকে আমরা উৎসবে পরিণত হয়ে যাচ্ছে। যেখানে এই যৌক্তিক প্রতিবাদ সমাবেশে হাজার হাজার মানুষ থাকার কথা, হাজার হাজার শিক্ষক থাকার কথা কিন্তু দুঃখের বিষয় হলে গুটিকয়েক শিক্ষক ছাড়া এখানে তেমন কাউকে দেখা যাচ্ছে না। পরিবর্তনের বিজ্ঞান পড়ায় আমরা। সে হিসেবে আমরা পরিবর্তনের কথা খোলামেলা বলতে না পারি তাহলে আমরাও সেসব ভয়ংকর অবস্থার জন্য অপেক্ষা করার আশংকা করা যায়। তিনি শিক্ষক, শিক্ষা ও শিক্ষার্থীদের রক্ষা করার জন্য সরকারকে আহ্বান করেন এবং স্বপন কুমারকে নির্যাতনের প্রতিবাদ জানান।


অধ্যাপক রোবায়েত ফেরদৌস নলেন, 'এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। ধারাবাহিকভাবে বিজ্ঞান শিক্ষক হৃদয় মন্ডলের, ড. অভিজিৎকে হত্যা এবং হুমায়ুন আজাদকে বইলেখার জন্য মেরে ফেলার মত ঘটনা ঘটে আসছে। এসব ঘটনাগুলো সমন্বয় করে বাংলাদেশকে একটা থিওলজিকেল রাষ্ট্রে পরিণত করার চেষ্টা। এখানে কেবল এক ধর্মের মানুষ এখানে বাস করবে। দূর্গা পূজার সময় পুরো বাংলাদেশ জুড়ে অসংখ্য পূজা মন্ডপে-মন্দিরে সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। আজকের এই ঘটনা দেশের সব শিক্ষক সমাজ থেকে শুরু করে সর্বমহলে একসঙ্গে ফুঁসে ওঠার কথা ছিলো। সেই সংক্ষুব্ধ অবস্থা আমরা দেখছি না। কারণ হলো যে পুলিশের পোষাক পরে তার ভেতরেও ধর্মান্ধতা।


তিনি বলেন, 'এসব সত্যকে অস্বীকৃতির রাজনীতি সংখ্যালঘু ধর্মের মানুষদের নিরাপত্তার ঝুঁকি অনেকটা বাড়িয়ে দেয়। ঘটনার সত্যতাকে স্বীকার করতে হবে। আফগানিস্তানের মত অবস্থা আমাদের ঘাড়ে চেপে আসছে। যেখানে একুশ শতকে এসে একটা মেয়ে স্কুলে যেতে পারবে কিনা তা নিয়ে সংশয় রয়ে যাচ্ছে। আস্তেধীরে এদেশ ধর্মান্ধতা পরিণত হচ্ছে। তখন এখানে গান, চারুকলা, কবিতা, শিল্প-সাহিত্য সব হারিয়ে যাচ্ছে। আমরা প্রত্যেকে নিজ নিজ জায়গা থেকে এমন বিচ্ছিন্ন ঘটনার প্রতিবাদ করাকে ধর্ম মন করতে হবে।


সমাবেশে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ড. আব্দুর রাজ্জাক খান বলেন, ‘অনেকদিন যাবৎ আমার একটা প্রশ্ন মনে আসে, একাত্তরের মধ্য দিয়ে আমরা যে বাংলাদেশটা পেয়েছি, সেটাতো আর বাংলাদেশ নেই। বাংলাস্তান হয়ে গিয়েছে। পাকিস্তানের মতোই একটি সাম্প্রদায়িক মৌলবাদী রাষ্ট্রে পরিণত হয়ে গিয়েছে। একজন শিক্ষকের গলায় জুতোর মালা পরানোর খবরটা দেখার পর আমি খুব হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়ি। মনে হয়েছে এটি আমাকে পরানো হয়েছে। কিন্তু দুঃখের বিষয় আমাদের বিভাগের আমরা শুধু ৩ জন শিক্ষক এখানে এসেছি। কিন্তু কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো শিক্ষক সমিতি, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক ফেডারেশন তারা কোনো বিবৃতি দেয়নি। এতে বোঝা যায় যে তারা এটি পাশ কাটাতে চায়। তারা দলান্ধ, তারা দলের বিরুদ্ধে কিছু করতে পারবেন না, একশন নিতে পারবেন না। আমি এই ঘটনার তীব্র নিন্দা এবং ধিক্কার জানাই। সেই সাথে নড়াইলের ডিসি, এসপি এবং অফিসার ইনচার্জ, থানা, এবং যে সমস্ত পুলিশ সদস্যরা সেখানে ছিলেন তাদের বিচার বিভাগীয় তদন্তের সাপেক্ষে শাস্তি পেতে হবে।’


নিপীড়নের বিরুদ্ধে শাহবাগ-এর সংগঠক লেখক ও গবেষক রবিন আহসান বিষয়টির ব্যখ্যা দিয়ে বলেন, নড়াইলে একজন শিক্ষককে জুতার মালা পরিয়ে পুলিশি পাহারায় বের করা হয়েছে। তারা খুবই গর্বের কাজ করেছে! বাহ! এরকম ঘটনা অনেক ঘটেছে কিন্তু নড়াইলের ঘটনা আমাদের বেশি চিন্তিত করেছে। আমাদের শিক্ষকদের নিরাপত্তার দিতে পারে না পুলিশ। এটি শুধু একটি শিক্ষকের গলায় জুতার মালা নয়, এটি বাংলাদেশের গলায় জুতার মালা।’


সকলকে প্রতিবাদের আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আপনারা ঘর থেকে নামেন, প্রতিবাদে নামেন। না হয় সবাইকে একদিন ন্যাংটা করে নামাবে তারা। আজকে ছাত্র-শিক্ষক-মানুষ চুপচাপ। এমন হতভাগ্য বাংলাদেশ আমি কখনো দেখিনি।’


তিনি আরো বলেন, এত সব ঘটনা শুধু হিন্দু শিক্ষকদের উপর কেন হচ্ছে? আমি বলতে চাই তারা বাংলাদেশ থেকে হিন্দু বিতাড়নের উদ্যোগ নিয়েছে কিনা। সরকার কোথায়? পদ্মাসেতু নিয়ে থাকলে হবে না? পদ্মাসেতুর নিচ দিয়ে আমাদের বাংলাদেশকে ভাসিয়ে দিয়েন না। বাংলাদেশকে রক্ষা করুন।’


বিবার্তা/সাইদুল/এমএইচ

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

পদ্মা লাইফ টাওয়ার (লেভেল -১১)

১১৫, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ,

বাংলামোটর, ঢাকা- ১০০০

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2021 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com