১৫ বছর বয়সেই ইথিক্যাল হ্যাকার তৃণবের স্বপ্নজয়ের গল্প
প্রকাশ : ২১ সেপ্টেম্বর ২০২২, ১৩:৩২
১৫ বছর বয়সেই ইথিক্যাল হ্যাকার তৃণবের স্বপ্নজয়ের গল্প
উজ্জ্বল এ গমেজ
প্রিন্ট অ-অ+

ছোটবেলা থেকেই আমার কম্পিউটারের প্রতি ভীষণ আগ্রহ ছিল। তখনও জানতাম না কম্পিউটার কী, এর ভেতরে কী আছে, এটার কাজইবা কী। শুধু কম্পিউটার দেখলেই ঘাটাঘাটি করতে ইচ্ছে করত। যন্ত্রটা আমাকে খুব টানতো। সময়-সুযোগ পেলেই এটা নিয়ে ঘাটাঘাটি করতাম। ভাবতাম বড় হয়ে পড়াশোনা করে কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ার হবো। যখন প্রোগ্রামিং শেখা শুরু করি। তখন মনে হলো সফটওয়্যার ডেভেলপার হব। সময় বয়ে চলে। হ্যাকিংয়ে প্রশিক্ষণ নেয়ার পর এখন স্বপ্ন শুধু একজন দেশসেরা হ্যাকার হওয়ার। দেশসহ সারা বিশ্বের সাইবার সিকিউরিটি নিয়ে কাজ করার।


এভাবেই নিজের জীবনের গল্প বলছিলো স্কুলপড়ুয়া কিশোর সাইবার সিকিউরিটি বিশেষজ্ঞ তানজিম শাহ কবির। তার এই হ্যাকার হয়ে ওঠার পেছনে রয়েছে নানা ঘটনা।


নোয়াখালী সদরে এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্ম তানজিম শাহ কবিরের। ডাকনাম তৃণব। বাবা হুমায়ুন কবির দীর্ঘ দিন ধরে সৌদি আরবের একটা কোম্পানিতে হেড অব অ্যাকাউন্টটেন্ট ছিলেন। বর্তমানে ব্যবসা করছেন। মা নিগার সুলতানা একটা প্রাইমারি স্কুলে শিক্ষকতা করছেন। ছোট ভাই তাহমিদ শাহ কবির, বাবা-মাকে নিয়ে থাকে নোয়াখালীর মাইজদীতে।


তখন তৃণব পড়তো পুলিশ কেজি স্কুলের চতুর্থ শ্রেণিতে। শিশু মনে ছিল এক পৃথিবী কৌতূহল। কম্পিউটার দেখলেই ঘাটাঘাটি করতে ইচ্ছে হতো তার। তখন বিদেশে থাকা বাবার সাথে কম্পিউটার শেখার বিষয়ে কথা বলে। বাবা পড়াশোনায় মনোযোগী হওয়ার পরমার্শ দেন। কিন্তু বন্ধুদের কম্পিউটার দেখলেই বসে যেতো শেখার জন্য। পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ার সময় বাবার ল্যাপটপটা হয়ে যায় তার মনের সব কৌতূহল মেটানোর হাতিয়ার। স্কুল থেকে বাড়িতে ফিরে একটু সময় পেলেই সেটি নিয়ে বসে যেতো। ঘাটাঘাটি করতো। এর ২-৩ বছর পর শিক্ষিকা মায়ের ল্যাপটপটাও হয়ে ওঠে তার পথ চলার অংশীদার।


তৃণব বলে, ইন্টারনেট, গুগল, ইউটিউব ছিল আমার কম্পিউটার শেখার প্রাথমিক শিক্ষাগুরু। দিনের মধ্যে একটু সময় পেলেই বসে যেতাম ল্যাপটপ নিয়ে। গুগলে মনের সব কৌতূহল, প্রশ্নগুলো সার্চ করতাম। পড়াশোনা করতাম। সে বিষয়ে আবার ইউটিউবে টিউটোরিয়াল দেখতাম। এভাবে কেটে যায় এক বছর। পঞ্চম শ্রেণি পাস করে উঠি যষ্ঠ শ্রেণিতে। ভর্তি হই নোয়াখালী জিলা স্কুলে। গুগল, ইউটিউবের কল্যাণে ইতোমধ্যেই কম্পিউটার প্রোগ্রামিংয়ের বিষয়ে জানতে পারি। তখন জানার আগ্রহটা আরও বেড়ে গেল। প্রতিদিন একটু একটু করে জানার ও শেখার চেষ্টা করেছি। নিজের অদম্য চেষ্টায় পাইথন, সি প্রোগ্রামিংয়ের অনেকটাই শিখেছি। সেই সাথে নিজে থেকেই কম্পিউটার চালানো এবং বিভিন্ন ছোটখাটো নানা কাজ করার চেষ্টাও করেছি। যেমন, বিভিন্ন প্রযুক্তির ডিভাইস খুলে আবার ঠিকঠাক মত সংযুক্ত করে ফেলতে পারতাম। ছোট ছোট সাফল্যে ধীরে ধীরে নিজের ওপর আত্মবিশ্বাস বাড়তে থাকে।



ছোট ছোট সাফল্যে বাড়তে থাকে আত্মবিশ্বাস


সপ্তম শ্রেণিতে উঠলে স্কুলের শেখ রাসেল ডিজিটাল ল্যাবের পক্ষ থেকে কম্পিউটার প্রোগ্রামিং বিষয়ে প্রশিক্ষণ নেয়ার সুযোগ পায় তৃণব। ক্লাসের যেসব স্টুডেন্টের কম্পিউটার প্রোগ্রামিং সম্পর্কে ধারণা ছিল শুধু তাদেরকে নিয়ে এই প্রোগ্রামিং কোর্স করানো হয়। এরই মধ্যে দেশে চলে আসে বৈশ্বিক মহামারি করোনা। তখন কোর্সের কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। এদের মধ্যে যারা ভালো করেছে এমন ৭-৮ জন স্টুডেন্টকে নোয়াখালী শিক্ষা অধিদপ্তরের জেলা শিক্ষা অফিস থেকে অনলাইনে ক্লাস করানো হয়। ওই দলের ভাগ্যবানদের মধ্যে একজন ছিলো তৃণব।


তৃণব বলে, শেখ রাসেল ডিজিটাল ল্যাবের পক্ষ থেকে আয়োজিত কোর্স থেকে সি প্রগ্রামিং শিখেছি। এরপর বিরামহীন চেষ্টা ও অধ্যবসায়ে নিজে নিজে ইউটিউব, গুগলে সার্চ করে সেগুলো আরও বিস্তারিত জেনেছি। ইউটিউব থেকে প্রোগ্রামিংয়ের বিভিন্ন কোর্স সংগ্রহ করে তার থেকে শেখার চেষ্টা করেছি। এরপর আবার করোনার সময় নোয়াখালী শিক্ষা অধিদপ্তরের জেলা শিক্ষা অফিস থেকে নেয়া অনলাইন ক্লাসগুলি অনেক সহায়ক ভূমিকা রেখেছে। প্রোগ্রামিং গুরুমুখি বিদ্যা। কিন্তু করোনার জন্য কোনো মেন্টরের কাছে যেতে পারতাম না। পরিস্থিতির কারণে যেকোনো প্রোগ্রামিং নিয়ে কাজ করার সময় যখন আটকে যেতাম, তখন অনলাইন জাজ প্লাটফর্মে অ্যাপ্লাই করতাম। কীভাবে প্রবলেম সলভ করা যায় সে বিষয়ে প্র্যাকটিস করতাম। এভাবে প্রোগ্রামিং শিখেছি।


কম্পিউটার প্রোগ্রামিং নিয়ে চর্চা করতে করতে একটা সময়ে এসে শেখাটা যেন নেশায় পরিণত হয়ে যায় তৃণবের। দিনের মধ্যে সময় পেলেই ল্যাপটপ নিয়ে কাজ করতো। দক্ষ ব্যবসায়ী বাবা ও শিক্ষিকা মা ছেলের মনের অবস্থা বুঝতে পেরে ছেলের পড়াশোনায় মনোযোগী হওয়ার পরামর্শ দেন। কে শোনে কার কথা। তৃণব নিজের মতো করে শেখার নেশায় শুধু কাজ করে যেতো। পাশাপাশি পড়াশোনাটাও চালিয়ে গেছে স্বপ্নবাজ এই কিশোর।


কম্পিউটার প্রোগ্রামিং নিয়ে ঘাটাঘাটি করতে করতে জানতে পারে ইথিক্যাল হ্যাকিংয়ে বিষয়ে। তৃণব বলে, যখন কম্পিউটার প্রোগ্রামিং শিখেছি, তখন সারা দেশের অনেক প্রোগ্রামারের সাথে পরিচয় হয়। সামাজিক যোগাযাগমাধ্যমে বিভিন্ন গ্রুপে যুক্ত হয়েছি। তখন কয়েকজন বড় ভাইকে দেখেছি কম্পিউটার প্রোগ্রামিং নিয়ে কাজ করার পাশাপাশি সাইবার সিকিউরিটি নিয়ে কাজ করছেন। তখন বিষয়টা ভালো করে বুঝতাম না। শুধু এটুকু বুঝতাম সাইবার সিকিউরিটি মানে কাউকে বা প্রতিষ্ঠানকে হ্যাক করা। পরে ওই ভাইদের সাথে যোগাযোগ করে, কথা বলে বুঝতে পারি সাইবার সিকিউরিটি মানে ভার্চুয়াল জগতে ওয়েবসাইটের নিরাপত্তার কাজ করা। তখন আমার আগ্রহ জন্মে সাইবার সিকিউরিটি নিয়ে কিছু করার। কেননা এতে কিছু হলেও নিজেকে সিকিউর করতে পারব, সেই সাথে দেশের মানুষকেও সিকিউর করতে পারব। ওই ভাইদের পরামর্শ অনুসারে গুগলে দিনরাত সাইবার সিকিউরিটি বিষয়ে আর্টিকেল পড়ে ও ইউটিউবে ভিডিও দেখে বিস্তারিত ধারণা লাভ করি। এভাবে চলে ৬-৭ মাস। সাইবার সিকিউরিটি নিয়ে মোটামুটি একটা পরিষ্কার ধারণা হয়ে যায়।