লক্ষ্যের দ্বারপ্রান্তে ঢাবি চারুকলার সহকারী অধ্যাপক ড. সীমা ইসলাম
প্রকাশ : ২৮ জুন ২০২২, ১১:৪৪
লক্ষ্যের দ্বারপ্রান্তে ঢাবি চারুকলার সহকারী অধ্যাপক ড. সীমা ইসলাম
উজ্জ্বল এ গমেজ
প্রিন্ট অ-অ+

‘যদি লক্ষ্য থাকে অটুট, বিশ্বাস হৃদয়ে, হবেই হবে দেখা, দেখা হবে বিজয়ে…’। কেউ যদি লক্ষ্য ঠিক রাখতে পারেন, তার স্বপ্নপূরণ একদিন হবেই। চারুকলা অনুষদের গ্রাফিক ডিজাইন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ড. সীমা ইসলাম সেটিই প্রমাণ করে দেখালেন আরও একবার। শৈশবে রাজনীতি করার স্বপ্ন দেখতেন। সময়ের পালাবদলে হয়েছেনে দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রনেতা। ক্যাম্পাসে অধিকার আদায়ের আন্দোলনে পা ভাঙ্গা, শারীরিকভাবে নির্যাতনের শিকার হয়ে অসংখ্যবার হয়েছেন সংবাদ শিরোনাম। এখন তিনি চারুকলা অনুষদের গ্রাফিক ডিজাইন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক।


অদম্য আত্মপ্রত্যয়ী কিশোরী সীমার সহকারী অধ্যাপক ড. সীমা ইসলাম হয়ে ওঠার গল্পের পেছনে রয়েছে অনেক গল্প। জীবনের বাঁকে বাঁকে রয়েছে নানান চড়াই-উৎরাইয়ের দুঃখগাঁথা।


টাঙ্গাইলের নাগরপুর উপজেলার ধুবড়িয়া গ্রামে জন্ম সীমা ইসলামের। সরকারি চাকুরে বাবার বদলির কারণে শৈশব ও কৈশোর কাটে জামালপুরের সরিষাবাড়ী থানার সাতপোরায়। বাবা নুরুল ইসলাম ছিলেন পাটশিল্পের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা। মা হাছনা বেগম শিক্ষিত, মার্জিত, আদর্শ গৃহকর্তী। দুই ভাই ও দুই বোনোর মধ্যে সীমা তৃতীয়।



বড় বোন রোকসানা ইসলাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইসলামিক স্টাডিজে মাস্টার্স সম্পন্ন করে শাহজালাল ইসলামি ব্যাংকে কর্মরত আছেন। বড় ভাই মনিরুল ইসলাম অ্যাপ্লাইড কেমিস্ট্রিতে অনার্স ও মাস্টার্স সম্পন্ন করেছেন ঢাবি থেকে। চাকরি করছেন একটা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে। ছোট ভাই মুনজরুল ইসলাম ঢাকা কলেজে ইতিহাস বিভাগ থেকে অনার্স ও মাস্টার্স করেছেন। মাস্টার্সে মেধা তালিকায় ছিলেন চতুর্থ। এখন তিনি ঢাবিতে চাকরি করছেন।


ছোটবেলা থেকেই সীমা ছিলেন বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী। একাধারে তিনি ছিলেন মেধাবী ছাত্রী, ক্লাস ক্যাপ্টেন, নৃত্যশিল্পী, চিত্রশিল্পী, গায়িকা, খেলোয়ার, লেখক ও কবি। কথায় কথায় সীমা হারিয়ে যান শৈশবের দিনগুলিতে। তিনি বলেন, ছোটবেলা থেকেই আমার নাচ, গান, খেলাধুলা ও নতুন কিছু শেখার প্রতি ভীষণ ঝোঁক ছিল। থানা, জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ে ব্যাটমিন্টন, ভলিবল খেলায় পুরস্কার জিতেছি। একইভাবে নাচ, গান করেও বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় পুরস্কার পেয়েছি। এসব নানান কিছু করেও ক্লাস ওয়ান থেকে নিয়মিত ভালো রেজাল্ট করেছি। স্কুলের শিক্ষকরা আমাকে খুব আদর করতেন।


বিজ্ঞান বিভাগে সরিষাবাড়ি সরকারি পাইলট উচ্চ মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয় থেকে এসএসসি এবং সরিষাবাড়ী মাহমুদা সালাম মহিলা কলেজ থেকে এইচএসসি প্রথম বিভাগে পাস করেন সীমা ইসলাম।


ছোটবেলা থেকেই সীমা ছিলেন বাবা ও বড় ভাইয়ের ভক্ত। ‘বাবা ছিলেন বঙ্গবন্ধুর একনিষ্ঠ ভক্ত। বঙ্গবন্ধুকে হৃদয়ে ধারণ ও লালন করতেন। শৈশবে বাবা যখন গল্প করতেন, তখন সব সময় জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর জীবনাদর্শ, নীতি, মূল্যবোধ ও তাঁর বিভিন্ন গুণের কথা বলতেন। তাঁর কালজয়ী ও ঐতিহাসিক ভাষণগুলোর কথা বলতেন এবং সেগুলোর ভিডিও দেখাতেন। বিষয়গুলো আমার মনে দোলা দিত। মনে মনে ভাবতাম, বড় হয়ে বঙ্গবন্ধুর আদর্শ সৈনিক হব। বঙ্গবন্ধুর আদর্শ জীবনে-কাজে বাস্তবায়ন করব।’


১৯৯৭ সাল। সীমার পরিবারে নেমে আসে দুঃখের কালো ছাঁয়া। তারা চার ভাই-বোনই স্কুল-কলেজে পড়াশোনা করছিলেন। সীমা বলেন, হঠাৎ করেই পরিবারের একমাত্র ‍উপার্জনক্ষম বাবার গলায় ক্যান্সার ধরা পড়ে। শুরু হয় চিকিৎসা। অন্যদিকে চার ভাই-বোনের পড়াশোনাসহ পরিবারের সকলের ভরণ-পোষণের খরচ সামলাতে সংসারে শুরু হয় টানাপোড়েন। তখন পরিবারের হাল ধরেন বড় ভাই মনিরুল ইসলাম। তখন তিনি ঢাবির অনার্সের চতুর্থ বর্ষের ছাত্র। থাকতেন ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ হলে। পড়াশোনার পাশাপাশি টিউশনি করতেন। সেটা দিয়ে নিজে চলতেন ও পরিবারকে সাহায্য করতেন।