জাতির পিতা ও প্রধানমন্ত্রীর প্রতি অবমাননা ড. রহমত উল্লাহর: নতুন তথ্য পেলো ঢাবি!
প্রকাশ : ০৫ ডিসেম্বর ২০২২, ১১:৪৬
জাতির পিতা ও প্রধানমন্ত্রীর প্রতি অবমাননা ড. রহমত উল্লাহর: নতুন তথ্য পেলো ঢাবি!
ঢাবি প্রতিনিধি
প্রিন্ট অ-অ+

খুনি মোশতাককে শ্রদ্ধা নিবেদন করার দায়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক অধ্যাপক ড. রহমত উল্লাহকে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অব্যাহতি দেয়া হয়েছে। তবে এবার বিতর্কিত এ শিক্ষকের বিরুদ্ধে আরেক চাঞ্চল্যকর তথ্য পেয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের “ইনস্টিটিউশনাল কোয়ালিটি অ্যাসিউরেন্স সেল (আইকিউএসি)”-এর পরিচালক থাকাকালীন তার অফিস ও সভাকক্ষে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর ছবি টাঙাননি, যা আইনত শাস্তিযোগ্য অপরাধ। তার এমন কর্মকাণ্ড খুনি মোশতাকের প্রতি ড. রহমত উল্লাহর শ্রদ্ধা প্রদর্শনের ধারাবাহিকতার প্রমাণ বলে মনে করছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের সংশ্লিষ্ট মহল।



জানা যায়, ড. রহমত ২০১৭ সালের ১৯ ডিসেম্বর থেকে চলতি বছরের ২০ এপ্রিল পর্যন্ত আইকিউএসির পরিচালকের দায়িত্ব পালন করেন। কিন্তু এ দায়িত্ব পালনকালে তার অফিসসহ আইকিউএসির কোথাও জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর ছবি টাঙ্গাননি। অথচ ২০১১ সালের ৭ জুলাই মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে সংবিধানের অনুচ্ছেদ (৪ক) উল্লেখ করে জাতির পিতার প্রতিকৃতি সংরক্ষণ ও প্রদর্শন করার বিধান জারি করা হয়েছে। যেখানে উল্লেখ আছে, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতিকৃতি রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, স্পিকার ও প্রধান বিচারপতির কার্যালয় এবং সকল সরকারি ও আধা-সরকারি অফিস, স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান, সংবিধিবদ্ধ সরকারি কর্তৃপক্ষের প্রধান ও শাখা কার্যালয়, সরকারি ও বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, বিদেশে অবস্থিত বাংলাদেশের দূতাবাস ও মিশনসমূহে সংরক্ষণ ও প্রদর্শন করিতে হইবে। সংবিধানের এই বিধি অনুযায়ী ড. রহমতের ছবি না টাঙানোর ঘটনা স্পষ্টতঃ বিধির লঙ্ঘন।



এদিকে অধ্যাপক ড. রহমতের ৫ বছ‌রের বে‌শি সময় দায়িত্ব পালনকালে আউকিউএসির অফিসে বঙ্গবন্ধু ও প্রধানমন্ত্রীর ছবি না টাঙানোর কারণে নতুন নিয়োগপ্রাপ্ত পরিচালক অধ্যাপক ড. সাবিতা রিজওয়ানা রহমান এখানে ছবি না পেয়ে ক্ষুব্ধ হয়েছেন। পরে তিনি গত ২৫শে জুলাই, ২০২২ তারিখে অনুষ্ঠিত এক সভায় বিষয়টি উত্থাপন করেন এবং কারণ দর্শানোর জন্য সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন।


এ বিষয়ে জানতে চাইলে অধ্যাপক ড. সাবিতা রিজওয়ানা রহমান বিবার্তাকে বলেন, এ বিষয়ে আপনি আউকিউএসির অফিসের কর্মকর্তাদের সাথে কথা বললে এ বিষ‌য়ে জান‌তে পারবেন।


পরে এই প্রতিবেদক আইকিউএসির অফিসে যান। সেখানে গিয়ে এ বিষয়ে প্রথ‌মে তার কথা হয় আউকিউএসির অফিসের একাউন্টস অফিসার মো. আল-আমিনের সাথে। তিনি বিবার্তাকে বলেন, এটা সত্যি যে, আগে আউকিউএসির অফিসে বঙ্গবন্ধু ও প্রধানমন্ত্রীর ছবি ছিল না। পরে টাঙানো হয়েছে।


একই বিষয়ে জানতে চাইলে আইকিউএসি অফিসের সিনিয়র এডমিন অফিসার শওকত ওসমান বিবার্তাকে বলেন, আগে আমরা সেন্টার অব এক্সিলেন্স ইন টিচিং এন্ড লার্নিং এ ছিলাম। সেন্টার অব এক্সিলেন্স ইন টিচিং এন্ড লার্নিং, আইকিউএসি-এর সঙ্গে একীভূত করা হলে আমরা এখানে (আইকিউএসি-তে) চলে আসি। তবে এখানে এসে অফিসে বঙ্গবন্ধু ও প্রধানমন্ত্রীর ছবি পাইনি। পরে বর্তমান ডিরেক্টরের নির্দেশনা অনুযায়ী ছবিগুলো আমরা লাগিয়েছি।


অভিযোগের বিষয়ে অবগত করে এ বিষয়ে মন্তব্য জানতে চাইলে অভিযুক্ত শিক্ষক অধ্যাপক ড. রহমত উল্লাহ বিবার্তাকে বলেন, "এ বিষয়ে আমাকে প্রশ্ন করো না। আমার মন্তব্য তোমাদের কিসের জন্য দরকার? যারা ছিলেন তাদের জিজ্ঞেস করো। তোমাদের সাথে কথা বলতে আমার ইয়ে হয়!"


এদিকে অভিযুক্ত এই শিক্ষক চলতি বছরের ১৭ এপ্রিল (রবিবার) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্রে (টিএসসি) মুজিবনগর দিবসের আলোচনা সভায় জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের খুনি খন্দকার মোশতাক আহমেদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেছেন। এই দিনের সভায় অধ্যাপক রহমত ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধকালীন প্রবাসী সরকারের অন্য মন্ত্রীদের পাশাপাশি তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী খুনি মোশতাকের অবদানের কথা উল্লেখ করে তার প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। এসময় অনুষ্ঠানে উপস্থিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ সামাদ তাৎক্ষণিকভাবে ওই বক্তব্যের প্রতিবাদ করেন এবং তা এক্সপাঞ্জ করার দাবি জানান। পরে উপাচার্য আখতারুজ্জামান ওই বক্তব্যের অংশটুকু এক্সপাঞ্জ করেন।


পরে এই ঘটনায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ সারা দেশজুড়ে সমালোচনার ঝড় ওঠে। এ নিয়ে সর্বপ্রথম বিবার্তা২৪ডটনেটসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমে সংবাদও প্রকাশিত হয়। ঢাবি শিক্ষক সমিতি, নীল দল, ছাত্রলীগ, মুক্তিযুদ্ধ মঞ্চসহ বিভিন্ন মহল থেকেও প্রতিবাদ আসে। ঘটনার দায়ে ড. রহমতকে সকল একাডেমিক ও প্রশাসনিক দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেয়া হয়। পরে অব্যাহতিপ্রাপ্ত ওই শিক্ষক উদ্দেশ্য প্রণোদিতভাবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ সামাদ, বিবার্তার সম্পাদক বাণী ইয়াসমিন হাসি এবং প্রতিবেদক মহিউদ্দিন রাসেল বরাবর আইনি নোটিশ পাঠান। সেই নোটিশের উপযুক্ত জবাবও দেয়া হয়েছে। তবুও এই তিনজনের বিরুদ্ধে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের বিভিন্ন ধারায় মামলার আবেদন করেছেন তিনি। ২২ আগস্ট (সোমবার) ঢাকা সাইবার ট্রাইব্যুনালে তিনি মামলার আরজি নিয়ে গেলে বিচারক আসসামছ জগলুল হোসেন বাদীর জবানবন্দি নিয়ে আদেশের জন্য অপেক্ষমান রাখেন। পরে আবেদনটি খারিজ করে দেয়া হয়। বর্তমানে অধ্যাপক ড. রহমতের বিষয়টি ঢাবি প্রশাসনের তদন্তের মধ্যে প্রক্রিয়াধীন আছে। এছাড়া ঢা‌বি সি‌ন্ডি‌কেট কর্তৃক অব‌্যাহ‌তি প্রদা‌নের আ‌দেশ চ‌্যা‌লেঞ্জ ক‌রে ড. রহম‌তের দা‌য়েরকৃত এক‌টি মামলা হাই‌কো‌র্টে বিচারাধীন র‌য়ে‌ছে।


এদিকে অধ্যাপক রহমতের বিরুদ্ধে অভিযোগ এখানেই শেষ নয়। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন অনুষদের ডিন থাকা অবস্থায় বঙ্গবন্ধুর নিজ বিভাগে ঠাঁই পাইনি তাঁর জন্মদিনের অনুষ্ঠান। ২০১৮ সালের ১৭ ই মার্চ আইন অনুষদের চত্বরে বঙ্গবন্ধুর জন্মদিন পালনের অনুমতি না মেলার অভিযোগ করেছেন ছাত্রলীগ নেতারা। এ নিয়ে গণমাধ্যমেও সংবাদ প্রকাশিত হয়। এর আগে একই বছরের ৬ মার্চও ‘বঙ্গবন্ধু আইন বিভাগের ছাত্র থাকাকালীন সময়ে সংগ্রহকৃত সকল তথ্য ও উপাত্তের অনুলিপি হস্তান্তর ও ১৩ দফা প্রস্তাবনা’ বাস্তবায়নের জন্য সংবাদ সম্মেলন করতে বিভাগের সামনের চত্বর ব্যবহারের অনুমতি চেয়েও পাননি বলে অভিযোগ ছাত্রলীগ নেতাদের। এসময়ও ডিন ছিলেন ড. রহমত।


এসব ঘটনার বিষয়ে ঢাবির আইন অনুষদ ছাত্রলীগের তৎকালীন সভাপতি শরীফুল হাসান শুভ বিবার্তাকে বলেন, ড. রহমত উল্লাহ স্যার বিভিন্ন সময়ে বঙ্গবন্ধু কেন্দ্রীক বিভিন্ন কর্মসূচিতে আমাদের অসহযোগিতা করেছেন। বঙ্গবন্ধুর জন্মদিন উপলক্ষ্যে অনুষদ ছাত্রলীগের পক্ষ থেকে অনুষদ চত্বরে অনুষ্ঠান করার অনুমতির জন্য অনুষদের ডিনের কাছে গিয়ে তাকে (ড. মো. রহমত উল্লাহ) কর্মসূচিতে অতিথি থাকার আমন্ত্রণ জানানোর পাশাপাশি চত্বরে অনুষ্ঠান আয়োজনের অনুমতি চাওয়া হয়। কিন্তু আমরা যাতে এই প্রোগ্রাম আয়োজন না করতে পারি, সেজন্য তিনি নতুন নানা নিয়মনীতি তৈরি করেন। এরপরেও সব নিয়ম মেনে আবেদন করলেও তিনি অনুমতি না দেওয়ায় অনুষদের সীমানা প্রাচীরের বাইরে ফুটপাতে অনুষ্ঠান আয়োজন করতে হয়েছিল।


তিনি বলেন, বঙ্গবন্ধু আইন বিভাগের ছাত্র থাকাকালীন সময়ে সংগ্রহকৃত সকল তথ্য ও উপাত্তের অনুলিপি হস্তান্তর ও ১৩ দফা প্রস্তাবনা’ বাস্তবায়নের জন্য সংবাদ সম্মেলন করতে গেলেও তিনি অনুমতি দেননি। পরে রাস্তার পাশে তাবু টাঙিয়ে বিভিন্ন দাবি আদায়ে আমরা সংবাদ সম্মেলন করি। শুধু তাই নয়, বঙ্গবন্ধুর জন্মদিন ঘিরে মিলাদ মাহফিল টাও রাস্তায় টাবু টাঙিয়ে আমাদের করতে হয়েছে! বঙ্গবন্ধুর স্মৃতি বিজরিত আইন অনুষদে তাঁকে নিয়ে প্রোগ্রাম আয়োজনে ড. রহমত কোনদিনই আমাদের সহযোগিতা করেননি।


বিবার্তায়,পূর্বে প্রকাশিত প্রতিবেদনের লিংক সংযুক্ত হলো,


https://www.bbarta24.net/special-report/195670(খুনি মোশতাককে শ্রদ্ধা, অব্যাহতিপ্রাপ্ত সেই শিক্ষককে শোক দিবসে আমন্ত্রণ!)


https://www.bbarta24.net/special-report/182108(খুনি মোশতাকের প্রতি ঢাবি শিক্ষক সমিতির সভাপতির শ্রদ্ধা!)


বিবার্তা/এসবি

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

পদ্মা লাইফ টাওয়ার (লেভেল -১১)

১১৫, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ,

বাংলামোটর, ঢাকা- ১০০০

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2021 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com