রাজধানীর থানাগুলো যেন অঘোষিত ডাম্পিং স্টেশন!
প্রকাশ : ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২২, ০৮:২৩
রাজধানীর থানাগুলো যেন অঘোষিত ডাম্পিং স্টেশন!
এস এম রিয়াদ রহমান
প্রিন্ট অ-অ+

রাজধানীর শাহবাগ থানা। গেটের ভেতরে ঢুকতেই কিছু বস্তা চোখে পড়ে, যা দিয়ে ডানপাশ ঘেরাও দেওয়া। আরেকটু সামনে যেতেই বাম দিকে ডিউটি অফিসারের কক্ষের সামনে পরিত্যক্ত কিছু মোটরসাইকেল, অনেক রিকশা ও গাড়ি চোখে পড়ে। বেশিরভাগ মোটরসাইকেল, রিকশা ও গাড়ির অবস্থা নাজুক। মরিচা পড়ে ও ধুলার আস্তর জমে এগুলো ভাস্কর্যে পরিণত হয়েছে। আর এসব ভাস্কর্যের কারিগর শাহবাগ থানা! এ যেন অঘোষিত ডাম্পিং স্টেশন।


বিভিন্ন মামলায় জব্দ করা যানবাহনগুলো থানায় জব্দ আছে। বছরের পর বছর এসব গাড়ির স্থান থানাতেই। আইনি প্রক্রিয়া শেষ না হওয়ায় এসব গাড়ি থানার হেফাজতে অযত্ন-অবহেলায় নষ্ট হচ্ছে।


শুধু শাহবাগ থানা নয়, রাজধানীর মোহাম্মদপুর, আদাবর, ধানমন্ডি, লালবাগ, রমনাসহ বেশ কয়েকটি থানা ঘুরে দেখা যায়, এসব থানায় আটক বা জব্দ গাড়ির চাপে থানার ভেতরে ফাঁকা অংশ, সামনের সড়ক কথিত ডাম্পিং স্টেশনে পরিণত হয়েছে।



গাড়ির লাইন্সেস না থাকা, দুর্ঘটনা, অবৈধভাবে মালামাল বহন করাসহ নানা ধরনের অভিযোগে পুলিশ মোটরসাইকেল, সিএনজি, প্রাইভেটকার, বাস ও ট্রাকসহ বিভিন্ন গাড়ি আটক করে। লাইসেন্স নেই এমন বাহন যেমন সাইকেল, রিকশা, ভ্যানও নিস্তার পায়নি পুলিশের হাত থেকে।



রাজধানীতে কোনো থানায় ডাম্পিং স্টেশন না থাকায় এসব গাড়ি আটক করে থানার ভেতর কিংবা সামনের রাস্তার ওপর রাখা হয়। মামলার আলামত হিসেবে এসব গাড়ি জব্দ করা হলেও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে দিনের পর দিন খোলা আকাশের নিচে থেকে নষ্ট হচ্ছে।


রাজধানীর মোহাম্মদপুর থানার সামনের সড়কে একটি বাস দেখা যায়। বাসটি দুর্ঘটনার কারণে আটক করার পর থেকেই থানার সামনে। সড়কের উল্টো পাশে আরও দুটি গাড়ি রাখা। তার নিচে ময়লা-আবর্জনায় ভরে গেছে। থানার ভেতরে ঢুকতেই বামদিকে দেখা যায় ভবনের সামনে শত শত মোটরসাইকেল সারি করে রাখা। রক্ষণাবেক্ষণের অভাব-অযত্নে এর বেশিরভাগই এখন চলাচলের অযোগ্য। বেশিরভাগ মোটরসাইকেলের ব্যাটারি, হর্ন, লুকিংগ্লাস, ফুয়েল কাভার নেই। থানার একেবারে ভেতরের অংশ ঘুরেও একই চিত্র দেখা যায়, শুধু জব্দ গাড়ির দঙ্গল।



শাহবাগ থানা হেফাজতে থাকা আটক জব্দ গাড়ি— থানার ভেতরে, সামনে-পেছনেও আনাচ-কানাচের বিভিন্ন স্থানে দেখা যায়। কোথাও কোনো ফাঁকা জায়গা নেই। নতুন একটি কাভার্ড ভ্যান শাহবাগ থানার উল্টো সড়কে জাতীয় জাদুঘরের সামনে রাখা। তার নিচে ময়লা-আবর্জনায় ভরে গেছে। জাতীয় গ্রন্থগারের ফটকের সামনে আরেকটি পিকআপ অনেকদিন থেকে রাখায় জং ধরে গেছে। নিচে ময়লা ও আবর্জনার মাঝে গাছের সবুজ চারা গজিয়েছে।



শাহবাগ থানার ডানপাশে— কথিত ডাম্পিং স্টেশনে গিয়ে দেখা যায়, ট্রাকের উপর প্রাইভেটকার, পিকাপসহ অনেক গাড়ি রাখা। অনেক গাড়ি বিভিন্ন লতাপাতায় ঢেকে গেছে। কোনো গাড়ির ব্যাটারি নেই। কোনোটার চাকা নেই। এসবের মধ্যে অনেক গাড়ি মরিচা ধরে অকেজো হয়ে গেছে। কোনোটির সিট নেই, আবার কোনোটির দরজা ভাঙা, অনেক গাড়ির যন্ত্রপাতি মাটির সাথে মিশে যাচ্ছে। নিরাপত্তাবেষ্টনী না থাকায় কেউ কেউ ছবি তুলছেন, অনেকেই টিকটক করছেন। ভেতরের জঙ্গলে পোকামাকড়ের বসতি। অদৃশ্য কারণে ডাম্পিং এরিয়াতে মানুষের পায়ের ছাপও স্পষ্ট।



শাহবাগ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা নুর মোহাম্মদ বিবার্তাকে বলেন, আটক গাড়ির আলামত বুঝে গাড়ি রাখা হয় যে, এটা কোথায় রাখা যাবে বা রাখতে হবে। যেসব গাড়ি আটক করা হয় তার বেশিরভাগেরই কাগজপত্র নেই, ফিটনেসবিহীন। তাই অনেকেই আর গাড়ি নিতে আসে না। তাই বাধ্য হয়ে ডাম্পিং স্টেশনে রাখা হয়।



তিনি বলেন, আবার যারা কোর্টের মাধ্যমে থানায় যোগাযোগ করে, তাদের গাড়ি থানার ভেতরে বা আশেপাশে রাখা হয়। কারণ আটককৃত গাড়ি ডাম্পিংয়ে রাখলে ক্ষতি হয়। তাই কোর্টের মাধ্যমে যারা আবেদন করে গাড়ি নিয়ে যেতে চায়, আমরা সেগুলো রক্ষণাবেক্ষণ ও তদন্ত করে দিয়ে দিই। আর আলামত যদি কঠিন হয় তাহলে কোর্টের মাধ্যমে আবেদন করে নিতে হয়।


ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ রমনা ট্রাফিক বিভাগের ডিসি মো. জয়নুল আবেদীন বিবার্তাকে বলেন, রাস্তায় যেসব গাড়ির কাগজপত্র নেই, ফিটনেসবিহীন, সেসব গাড়িকে জরিমানা করা হয়। যা কোর্টের মাধ্যমে জরিমানা দিয়ে ডাম্পিং থেকে ছাড়িয়ে নিতে হয়। রমনা ডিভিশনের আটককৃত গাড়ি পুলিশ লাইনস-এ রাখা হয়। যেখানে জায়গা যখন ফাঁকা থাকে সেখানেই গাড়ি রাখা হয়। একটা গাড়ি ডাম্পিং করা আছে ডিসি অফিসের সামনে। আমি অফিসারদের বললাম, মালিকের সাথে যোগাযোগ করেন। যা জরিমানা হয়েছে তা দিয়ে গাড়ি নিয়ে যাক। গাড়িটিতে একটি সংবাদমাধ্যমের লোগো লাগানো। আর ছয় মাস থাকলে হয়তো গাড়িটি বসে (নষ্ট হবে) যাবে।



তিনি বলেন, গতকাল আমাদের ডিসিএমডি-কে একটি চিঠি দিয়েছি যে, আমার অফিসের মধ্যে কিছু সরকারি গাড়ি যেগুলো অকেজো হয়ে গেছে, সেগুলোর বিষয়ে। তারা অবশেষে নিলামের প্রক্রিয়া গ্রহণ করেছে। যে গাড়িটি নিলামযোগ্য সেটি কোর্টের মাধ্যমে ডিসপোজাল করা হয় বেসিক সিদ্ধান্ত হচ্ছে এটা। কোর্ট আইনগতভাবে যেটা ডিসপোজাল দেয়, সেটাই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হিসেবে গণ্য হয়।


জয়নুল আবেদীন বলেন, কোর্টের মালখানায়ও জায়গা নেই। আবার সিদ্ধান্তহীনতার কারণে অনেক গাড়ি এভাবেই দীর্ঘদিন পরে থাকে। এটা আসলে একক সিদ্ধান্ত না, কোর্টের মাধ্যমে হয়। আবার অনেক সময় মালিকরা ঠিকমতো মামলা চালায় না। কাগজপত্রের ঠিক থাকে না, সময় চলে যায়— তাই এসব গাড়ি কোর্ট ডাম্পিংয়ে দেয়। এছাড়াও আরো বিভিন্ন জটিলতার কারণে এগুলো হয়। তবে এগুলো যদি আদালতের মাধ্যমে দ্রুত সিদ্ধান্ত হয়ে যায়, সেক্ষেত্রে আমার মনে হয়, এতে উভয় পক্ষ সুবিধা পেতে পারে।



এ বিষয়ে পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক নুরুল হুদা বিবার্তাকে বলেন, আটককৃত গাড়ি মামলার আলামত অনুসারে বিচার প্রক্রিয়া হয়, তার আগে ছাড়ানো যাবে না। কোন মামলা অনুসারে হবে অথবা জামিনে কোনো কিছু হবে। জামিন হলে তা আদালতের অর্ডার নিয়ে নিলাম হয়ে যাবে। আর মামলার বাদী বা আলামত যেভাবে যেটা চায়, কোর্ট সেভাবে সেটা করবে। গাড়িগুলো আটকে থাকে মামলা সংক্রান্ত বিষয়ে অথবা তদন্ত সংক্রান্ত ব্যাপারে। মামলার আলামত অনুযায়ী আদালত যে সিদ্ধান্ত দেয়, তাই চূড়ান্ত হয়।



ডাম্পিং স্টেশন বলতে কোনো জিনিস নেই বলে জানান নুরুল হুদা। তিনি বলেন, ডাম্প করে রাখা হয় না। এটাকে বাউন্ডিং বলে। আগে গরুর গাড়ি রাখা হতো। যখন থেকে গাড়ির প্রচলন শুরু হয়, তখন থেকে গাড়ি রাখা হয়। গাড়ি রাখার নির্দিষ্ট জায়গা নেই তারপরও যেখানে জায়গা আছে সেখানেই রাখতে হবে। এতে কিছু করার নেই। যাদের গাড়ি আটক আছে তাদের নিজেদের উচিত আদালতের মাধ্যমে গাড়ি ছাড়িয়ে নেওয়া। তা না হলে আদালতের মাধ্যমে বাধ্য করা।



অপরাধ বিশেষজ্ঞ ও পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক ড. এম এনামুল হক বিবার্তাকে বলেন, পুলিশ কর্মকর্তার গাড়ি আটক করে হেফাজতে রাখার কথা। থানা ক্যাম্পাস তাদের বসার জায়গায় নেই তো গাড়ি রাখবে কোথায়। আগে যে থানায় নয়-দশটা লোক ছিল এখন সেখানে একশজন লোক। আমরা যখন চাকরি করেছি তখন একটা সার্কেলে থাকত ইন্সপেক্টর, থানাতে থাকত ওসি। এখন সার্কেলেই হয়ে যাচ্ছে এসপি। সুতরাং এটার কথা কেউ বলতে পারবে না যে গাড়ি কোথায় রাখবে।


তিনি বলেন, গাড়ির কাগজপত্র না থাকা বা আটক করার মতো অপরাধ করেছে তাই আটক করেছে, রাখার দায়িত্ব কর্তৃপক্ষের। যে ধরছে, সে তো মোটরগাড়ির ধারা অনুযায়ী ধরছে— কিন্তু ধারায় গাড়ি রাখার কোনো জায়গার কথা বলা নেই। বলা নেই বলে আবার রাস্তায় রেখে দেবে তা-ও হতে পারে না। এতে রাস্তায় যানজট বেড়ে যাবে। সুতরাং আটককৃত গাড়ি থানার ভেতরেই রাখতে হচ্ছে, কোনো উপায় নেই।


এম এনামুল হক আরও বলেন, অনেক পরিবারেই একের অধিক গাড়ি আছে। আজকাল তো টাকা-পয়সার অভাব নেই অনেকেরই। গরিবরা আরও গরিব আর বড়লোকরা আরও বড়লোক। একেক বাড়িতে তিনটা-চারটা করে গাড়ি। সরকারের এখনই দেখা উচিত, প্রতি পরিবারে একটার বেশি গাড়ি যাতে না থাকে। বাইরের বিভিন্ন দেশে সময় করা আছে, কোন সময়ে সাধারণ গাড়ি চলবে, কোন সময়ে স্কুল-অফিসের গাড়ি চলবে, এসব। এখন আমাদের দেশেও এ ধরনের বিষয়গুলো দেখার সময় হয়েছে।


বিবার্তা/রিয়াদ/রোমেল/এসবি

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

পদ্মা লাইফ টাওয়ার (লেভেল -১১)

১১৫, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ,

বাংলামোটর, ঢাকা- ১০০০

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2021 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com