হাসপাতাল ভর্তি ডেঙ্গু রোগী
প্রকাশ : ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২২, ০৮:১২
হাসপাতাল ভর্তি ডেঙ্গু রোগী
এস এম রিয়াদ রহমান
প্রিন্ট অ-অ+

ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা প্রতিদিনই বাড়ছে। বাড়ছে মৃত্যুর সংখ্যাও। গত ২৪ ঘন্টায় ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু হয়েছে দুই জনের। এবং হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১৬৪ জন। এনিয়ে চলতি বছরে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে ৪২ জনের মৃত্যু হলো।


চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ১৬ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১০ হাজার ৩৯৬ জন। এর মধ্য সুস্থ হয়ে হাসপাতাল ছেড়েছেন নয় হাজার ৪৪ জন।


১৬ সেপ্টেম্বর, শুক্রবার সারা দেশের ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ্ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার অ্যান্ড কন্ট্রোল রুমের নিয়মিত প্রতিবেদনে জানানো হয়, গত ২৪ ঘন্টায় ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে দুই জনের মৃত্যু হয়েছে ও হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন নতুন ১৬৪ জন রোগী। এ নিয়ে বর্তমানে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৩৩৬ জন।


প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে নতুন ভর্তি হওয়া রোগীদের ১৩৮ জন ঢাকার বাসিন্দা। এছাড়া ঢাকার বাইরের হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ২৬ জন রোগী। বর্তমানে ঢাকার বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি আছেন ৯৮৩ জন। আর ঢাকার বাইরের হাসপাতালগুলোতে ভর্তি আছেন ৩৫৩ জন।



সম্প্রতি রাজধানীর মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ঘুরে দেখা যায়, নতুন ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। হাসপাতালের ডেঙ্গু ওয়ার্ডের সব বেডই ভর্তি। অনেকে সুস্থ হয়ে হাসপাতাল ছেড়ে বাড়ি ফিরছেন। আবার নতুন রোগীরা ভর্তি হচ্ছেন হাসপাতালে।


রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে ঘুরে দেখা যায়, অনেক রোগী জ্বর, ঠাণ্ডা উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে বহির্বিভাগে এসেছেন ডেঙ্গু পরীক্ষা করাতে। আবার ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে নতুন অনেক রোগী হাসপাতালে ভর্তি আছেন। এক শিশুকে দেখা গেল মশারীর ভেতর ঘুমাচ্ছে, গায়ে কম্বল জড়ানো। কথা হয় তার মা আমেনা বেগমের সাথে। স্বামী রাজধানীতে হকারি করেন। থাকেন মিরপুরে। তিনি বলেন, আমার একটিমাত্র ছেলে সুমন, বয়স ১০ মাস। ৫ দিন হলো হাসপাতালে ভর্তি। সুমন শুধু বুঁকের দুধ খায়। ডাক্তারা স্যালাইন দিয়েছেন, আরও দিতে হবে। কিন্তু সুমন খাইতে পারে না, তাই সুস্থ হতে সময় নিচ্ছে। এখন জ্বর নাই, শরীরটাও ভালো। ডাক্তার বলছেন আর কোনো সমস্যা নাই, দুইএক দিনের মধ্য বাড়ি যেতে পারব।


হাসপাতালে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে ভর্তি ছিলেন আগারগাঁওয়ের বাসিন্দা মো. রহমতুল্লাহ। দীর্ঘ আটদিন ডেঙ্গুর সাথে যুদ্ধ করে সুস্থ হয়েছেন। তার সাথে কথা বিবার্তার। তিনি বলেন, আল্লাহর কাছে শুকরিয়া, যে আমাকে সুস্থ করেছেন। ডেঙ্গু অনেক ভয়ানয় রোগ। আমি নিস্তেজ হয়ে গেছিলাম। প্রচণ্ড জ্বর, মাথাব্যথা ও শরীর ব্যাথা করত। আমার স্ত্রী টানা আট দিন আমার সাথে হাসপাতালে ছিল। প্রথম তিনদিনের কথা আমার তেমন মনে নেই। আমার কারণে পরিবারের সবার অনেক কষ্ট করতে হয়েছে। ৬ বছরের ছেলে বাসায় তার দাদির সাথে একা আছে। বাসায় যেতে পারব ভেবে ভালো লাগছে।


দায়িত্বরত চিকিৎসক শারমিন আক্তারের সাথে কথা হয় বিবার্তার। তিনি বলেন, ডেঙ্গু জ্বরের লক্ষণগুলো সাধারণত সংক্রমনের ৩-১৪ দিন পরে শুরু হয়। উচ্চ মাত্রার জ্বর, মাথাব্যথা, বমি, পেশি, জয়েন্টর ব্যথা ও ত্বকের ফুসকুড়ি ডেঙ্গু জ্বরের অন্যতম লক্ষণ। ডেঙ্গুর লক্ষণগুলো সাধারণত ২-৭ দিন স্থায়ী হয়। বেশিরভাগ রোগী এক সপ্তাহ পরে সুস্থ হয়ে ওঠে।


তিনি বলেন, সাধারণত ভাইরাস জ্বরে আক্রান্ত হলে বলা হয় ২-৩ দিন অপেক্ষা করার জন্য। কিন্তু তা ঠিক নয়, জ্বর আসার ২৪ ঘন্টার মধ্যেই ডাক্তারের পরামর্শ নেওয়া উচিত। আক্রান্ত রোগীদের তরল খাবার খেতে হবে। বিশেষ করে শিশুদের প্রচুর পরিমাণে তরল খাবার খাওয়াতে হবে। জটিল কিছু না হলে ওষুধ স্যালাইনের মাধ্যমে অনেকটা স্বাভাবিক অবস্থায় চলে আসে।


রাজধানীর মুগদা মেডিকেল হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডের ছোট দুইটি রুম। রুমের সবকটি বিছানাতে ডেঙ্গু রোগীতে ভর্তি। রোগীরা অনেকে সুস্থ হয়ে হাসপাতাল ছাড়লেও আবার নতুন রোগী ভর্তি হচ্ছেন। আজও ভর্তি হয়েছেন নতুন ৫ জন। সবমিলিয়ে ১৬ জন শিশু হাসপাতালে ভর্তি আছেন। ছোট রুমে রোগী বেশি থাকায় গরমে রোগীরা আরও অসুস্থ হয়ে পরছেন।



মো. সাদ হাসান চতুর্থ শ্রেণিতে পড়াশোনা করেন। থাকেন গোপীবাগে। ৫ দিন থেকে ভর্তি আছেন হাসপাতালের ডেঙ্গু ওয়ার্ডে। সাদের সাথে আছে তার মা। তার মা বিবার্তাকে বলেন, গত মঙ্গলবার সাদের জ্বর আসে। শুক্রবার শরীর বেশি খারাপ হলে শনিবার সকালে হাসপাতালে আসি। সাদের অবস্থা দেখে ডাক্তাররা হাসপাতালে ভর্তি করেন। এবং বলেন চার ব্যাগ রক্ত প্রস্তুত রাখতে। পরে রক্ত আর প্রয়োজন হয় নাই। টানা তিনদিন কিছু খেতে পারেনি, ঘুমাতে পারেনি, একেবারে নিস্তেজ হয়ে গিয়েছিল। তরল খাবার আর স্যালাইন চলেছে। এখন সাদের শরীর ভালো। আশা করছি দু একদিনের মধ্য বাসায় যেতে পারব।


তিনি অভিযোগ করে বলেন, এত ছোট রুমে অনেক রোগী ভর্তি। একে রোগীর চাপ তার সাথে অভিভাবকদের সাথে থাকতে হয়, এতে গরম বেশি।


সাদের স্কুলের সহপাঠীও একই দিনে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে মুগদা মেডিকেল হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডে ভর্তি হয়েছেন। সাদের পাশের বিছানায় বসে কার্টুন দেখছিল রিমা। কথা বলে জানা গেলো রিমা ও সাদ একই স্কুলে পড়াশোনা করেন। একই দিন ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হন এবং হাসপাতালে ভর্তি হন। কথা হয় তার সাথে। তিনি বিবার্তাকে বলেন, আমি যখন অসুস্থ ছিলাম তখন আমার অনেক কষ্ট হয়েছে। খেতে পারি নাই, ঘুমাতে পারি নাই। জ্বর, মাথাব্যাথা, শরীর ব্যাথা ব্যাথা করত। এখন আমার জ্বর নেই। ডাক্তাররা বলেছেন দু-এক দিনের মধ্যে বাসায় যেতে পারব।


সাদ ও রিমা আশংকামুক্ত হলেও তাদের পাশের বিছানায় জড়সড় হয়ে শুয়ে আছে ১১বছর বয়সী এক শিশু। কোনো সাড়া-শব্দ নেই। তার হাতে ক্যানলা লাগানো, স্যালাইন চলছে। তার পাশে দাঁড়িয়ে মাথা বুলিয়ে দিচ্ছিল তার নানী।


মো.সুজন হাসান ডেমরার একটি হাফেজিয়া মাদ্রসাতে পড়াশোনা করেন। সুজনের মা অনেক আগে মারা গেছেন। তার মা মারা যাওয়ার পর বাবা আর খোঁজ-খবর নেন না। নানীর সাথেই ডেমরা থাকেন। গতকাল রাতে শরীরের অবস্থার অবনতি হলে মুগদা হাসপাতালে নিয়ে আসেন এবং ডেঙ্গু ওয়ার্ডে ভর্তি করেন।


তার নানী জানান, সুজনের তিন-চরদিন আগে জ্বর আসে। তারপর নানা বড়ি খাওয়ান, তাতেও জ্বর কমে না। শরীরের অবস্থা আস্তে আস্তে খারাপের দিকে যায়। তাই গতকাল হাসপাতালে নিয়ে এসেছি। এখনও জ্বর কমছে না, আরো বাড়ছে। সুজন সবসময়ই কান্নাকাটি করছে। ডাক্তার দেখে গেছেন এবং স্যালাইন দিয়েছেন। তরল খাবার খাওয়ার কথা বলছেন। কিন্তু সুজন খেতে পারছে না।


মুগদা মেডিকেল হাসপাতালের শিশু বিভাগ থেকে লিফট ৯ এ ডেঙ্গু ওয়ার্ডে গিয়ে দেখা গেলো ৫০ জনের বেশি রোগী ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে ভর্তি আছেন। বেশিরভাগ রোগী মশারি ব্যবহার করছেন না। তাদের অভিযোগ মশারি টানালে ফ্যানের বাতাস লাগে না।


মো.গোলাপ হাসান রাজধানীর মুগদায় থাকেন। পেশায় মুদি দোকানদার। তার স্ত্রী ডেঙ্গুতে আক্রান্ত। গত রবিবার স্ত্রীর শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে মুগদা হাসপাতালের নিয়ে আসেন। ডাক্তাররা দেখে হাসপাতালে ভর্তি হতে বলেন। সেদিন থেকেই হাসপাতালের ডেঙ্গু ওয়ার্ডে ভর্তি। তিনি বিবার্তাকে বলেন, গত ৭ দিন থেকে হাসপাতালে ভর্তি আছি। গত শুক্রবার থেকে ওর ঠাণ্ডা ও জ্বর জ্বর লাগছিল। ভেবেছিলাম কমে যাবে। কিন্তু শনিবার রাতে জ্বর ও শরীরব্যাথা আরও বাড়তে থাকে। তারপর রবিবার সকালে হাসপাতালে এনেছি। এখন শরীরের অবস্থা আগের থেকে ভালো।


মুগদা মেডিকেল হাসপাতালের ডেঙ্গু ওয়ার্ডে দায়িত্বরত নার্স জাকিয়া জান্নাত সুমির সাথে কথা হয় বিবার্তার। তিনি বলেন, ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা আগের থেকে বেড়েছে। প্রতিদিন রাজধানীর বিভিন্ন স্থান থেকে রোগীরা আসছেন। আশংকাজনক হলে হাসপাতালে ভর্তি করা হচ্ছে। আর আশংকামুক্ত হলে বাসায় চিকিৎসা নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।



তিনি বলেন, প্রতিদিন জ্বর, ঠাণ্ডা-কাশির উপসর্গ নিয়ে অনেক রোগী আসে। তাদের ২০ জনের মধ্যে ১ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত। যাদের শারীরিক জটিলতা বেশি তাদের ভর্তি করা হচ্ছে। বাকীদের বাড়ি থেকে ডাক্তারের পরামর্শ নেয়ার কথা বলা হচ্ছে।


ডেঙ্গু ওয়ার্ডে দায়িত্বরত চিকিৎসক মো. সজিব হাসানের সাথে কথা হয় বিবার্তার। তিনি বলেন, প্রতিদিন আসছে নতুন রোগী। তাদের মধ্য অনেকের শারীরিক জটিলতা কম, আবার কারও বেশি। যাদের শারীরিক অবস্থা খারাপ, তাদের বেশিরভাগ হাসপাতালে আসতে দেরি করেছেন। ফলে রোগীর চাহিদা অনুযায়ী খাবার খেতে না পেয়ে কাবু হয়ে যায়। তখন রোগীর শারীরিক জটিলতা কাটতে সময় লাগে।


তিনি বলেন, তাই রোগীর শারীরিক অবস্থা আগে বুঝতে হবে। অবস্থার অবনতি হওয়ার আগেই রোগীকে ডাক্তারের কাছে নিতে হবে। ডাক্তারের পরামর্শ নিয়ে আপনি চাইলে বাসায় চিকিৎসা নিতে পারবেন।


বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সারা দেশে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা বাড়ছে, বাড়ছে মৃত্যুর সংখ্যা। তবে আক্রান্তের হার রাজধানীতেই বেশি। নগরের চারপাশে ময়লা-আবর্জনার স্তুপ, নোংরা ড্রেন পরিস্কার না করায় চলতি মৌসুমে মশার প্রজনন বেড়েছে। তাই এখনি সিটি করপোরেশনের উচিত সাধারণ মানুষদের সাথে নিয়ে ডেঙ্গুর মোকাবিলা করা। সকলকে সাথে নিয়ে সচেতনতামূলক কার্যক্রম চালানো। এবং ঝুঁকিপূর্ণ সকল জায়গা পরিস্কার রাখা ও এডিস মশা নিধনে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া।


এছাড়াও বর্তমানে দেশের যে আবহাওয়া, এটা ডেঙ্গু প্রজনণের উপযুক্ত মৌসুম। হঠাৎ বৃষ্টি আবার গরম। বাসা-বাড়ি ও আশপাশে পানি জমে এডিস মশার জন্ম হচ্ছে। এডিস মশার উৎসস্থল ধ্বংস করতে না পারলে সামনে আরও ভয়াবহ বিপদ আছে।


বিবার্তা/রিয়াদ/রোমেল/এমবি

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

পদ্মা লাইফ টাওয়ার (লেভেল -১১)

১১৫, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ,

বাংলামোটর, ঢাকা- ১০০০

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2021 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com