নির্ধারিত তালিকা নেই, গণপরিবহনে অতিরিক্ত ভাড়া আদায়
প্রকাশ : ১০ আগস্ট ২০২২, ১৯:৪৬
নির্ধারিত তালিকা নেই, গণপরিবহনে অতিরিক্ত ভাড়া আদায়
মো.তাওহিদুল ইসলাম
প্রিন্ট অ-অ+

গণপরিবহনে ভাড়া নৈরাজ্য কিছুতেই থামছে না। জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির পরপরই বেড়েছে গণপরিহনের ভাড়াও। তবে ভাড়া বৃদ্ধির প্রজ্ঞাপনের পরও বুধবার পর্যন্ত পরিবহনে ভাড়ার তালিকা দেয়া হয়নি। ফলে যাত্রীদের কাছ থেকে মর্জিমাফিক ভাড়া আদায় করা হচ্ছে। কিন্তু বিআরটিএ'র স্পষ্ট নির্দেশনা ছিলো নতুন ভাড়ার তালিকা রাখতে হবে বাসে।


৫ আগস্ট, শুক্রবার বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির ঘোষণা দেয়া হয়েছে। ডিজেল লিটারে ৩৪ টাকা, অকটেন লিটারে ৪৬ টাকা আর পেট্রল লিটারে ৪৪ টাকা বাড়ানো হয়েছে। দাম বৃদ্ধির ফলে ডিজেল ও কেরোসিন ১১৪ টাকা, অকটেন ১৩৫ টাকা আর প্রতি লিটার পেট্রলের দাম ১৩০ টাকা।


জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির পরপরই ৬ আগস্ট, শনিবার রাত সাড়ে ৯টার দিকে বাস ভাড়া বাড়ানোর ঘোষণা দেন বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) চেয়ারম্যান নূর মোহাম্মদ মজুমদার। ৭ আগস্ট, রবিবার প্রজ্ঞাপন জারি করে সরকার।



দূরপাল্লার বাসের ভাড়া আগে ছিল কিলোমিটার প্রতি ১ টাকা ৮০ পয়সা, যা বাড়িয়ে করা হয়েছে ২ টাকা ২০ পয়সা। ঢাকা ও চট্টগ্রাম মহানগরীতে আগে প্রতি কিলোমিটারে বড় বাসের ভাড়া ছিল ২ টাকা ১৫ পয়সা, তা করা হয়েছে ২ টাকা ৫০ পয়সা। মিনি বাসে ২ টাকা ৫ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ২ টাকা ৪০ পয়সা করা হয়েছে।


এছাড়া চট্টগ্রাম ও ঢাকা মহানগরীতে বড় বাসে সর্বনিম্ন ভাড়া ১০ টাকা এবং মিনি বাসে ৮ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। কিন্তু সরেজমিনে দেখা যায়, রাজধানীর শাহবাগ থেকে জিগাতলা বাস স্ট্যান্ডের দূরত্ব ২ দশমিক ৮ কিলোমিটার। এখানে ভাড়া হওয়ার কথা সাত টাকা। কিন্তু সর্বনিম্ন ভাড়া অনুযায়ী ১০ টাকা হলেও নেয়া হচ্ছে ১৫ টাকা।


৯ আগস্ট, মঙ্গলবার ও ১০ আগস্ট বুধবার সরজমিনে দেখা যায়, মালঞ্চ, তরঙ্গ প্লাস ও মিডলাইন বাসে শাহবাগ থেকে জিগাতলা বাস স্ট্যান্ড পর্যন্ত ভাড়া নিচ্ছে ১৫ টাকা করে। এ নিয়ে যাত্রীদের সঙ্গে কন্ডাকটরকে প্রতিনিয়তই বাকবিতণ্ডায় লিপ্ত হতে দেখা যাচ্ছে। কোথাও কোথাও বিষয়টি হাতাহাতির পর্যায়ে চলে যাওয়ারও অভিযোগ পাওয়া গেছে।


জিগাতলা সীমান্ত স্কয়ারের সামনে মালঞ্চ পরিবহনের চেকার রবিউলের সাথে কথা হয়। তিনি বিবার্তাকে বলেন, আমাদের বাসে তিন কিলোমিটার পর পর চেকপোস্ট বসানো। এক চেকপোস্ট থেকে আরেক চেকপোস্টের ভাড়া ১৫ টাকা। চেকপোস্ট বসানো বা ওয়েবিলে আমাদের কোনো হাত নাই। এটা মালিকরা ইচ্ছা মতো বসাইছে। আমরা চাকরি করি মাত্র। প্রতিদিনই ভাড়া নিয়ে যাত্রীদের সাথে ঝগড়া করতে হয় আমাদের।



একই লাইনের তরঙ্গ প্লাস বাসের কন্ডাকটর হারুন বিবার্তাকে বলেন, আমরা এক চেকে নতুন ভাড়া অনুযায়ী ১৫ টাকা নেই। পাঁচ টাকা বেশি নিচ্ছেন কেনো জানতে চাইলে তিনি বলেন, আগে থেকেই গাড়ির ভাড়া বেশি ছিল। এখন আবার নতুন করে ভাড়া বাড়াইছে। এ নিয়ে যাত্রীদের সাথে কথা বলতে বলতে আমার গলা ভাইঙা গেছে।


দেখা যায়, রাজধানীর মৌচাক মার্কেট থেকে বাংলামোটর পর্যন্ত লাব্বাইক, লাভলী ও স্বাধীন পরিবহন ভাড়া নিচ্ছে ১৫ টাকা করে। অথচ মৌচাক থেকে বাংলামোটরের দূরত্ব দুই দশমিক দুই কিলোমিটার। সর্বোনিম্ন ভাড়া অনুযায়ী ভাড়া হওয়ার কথা ১০ টাকা। কিন্তু নিচ্ছে ১৫ টাকা। নিউ ইস্কাটনে লাভলী বাসের চেকার আউয়াল বিবার্তাকে বলেন, নিউ ইস্কাটন থেকে বৌদ্ধমন্দির চেকপোস্ট পর্যন্ত ১৫ টাকা ভাড়া। এখানের দূরত্ব চার দশমিক সাত কিলোমিটার। এই পথের ভাড়া হওয়ার কথা ১১ টাকা ৭৫ পয়সা কিন্তু নিচ্ছে ১৫ টাকা।


শেওড়াপাড়া থেকে ফার্মগেটের দূরত্ব ছয় দশমিক পাঁচ কিলোমিটার। নতুন নির্ধারিত ভাড়া অনুযায়ী এই রুটের ভাড়া হওয়ার কথা ১৬ টাকা ২৫ পয়সা। কিন্তু নিচ্ছে ২৫ টাকা। আগে এই রুটের ভাড়া ছিলো ১৫ টাকা। তেলের দাম বৃদ্ধি করার পরে নির্ধারিত ভাড়ার থেকে ১০ টাকা করে বেশি নিচ্ছে এই লাইনের বাসগুলো।


গুলিস্তান থেকে শাহবাগের দূরত্ব দুই দশমিক আট কিলোমিটার। এই রুটের ভাড়া রাখে ১৫ টাকা। অথচ এখানে ১০ টাকারও কম ভাড়া হয়। শ্যামলী থেকে বাংলামোটর পর্যন্ত প্রতিদিন আসা-যাওয়া করেন সামিরা। তিনি বিবার্তাকে বলেন, আমার অফিস বাংলামোটর। আগে প্রতিদিন শ্যামলী থেকে ওয়েলকাম পরিবহনে বাংলামোটর এসে ১৫ টাকা ভাড়া দিতাম। ৯ আগস্ট, মঙ্গলবার সেখানে ভাড়া নিয়েছে ২৫ টাকা। এসব তো বাধ্য হয়ে মেনে নিতে হয় আমাদের।



তেলের দামের অজুহাতে কন্ডাকটররা রাজধানীর অধিকাংশ রুটেই ভাড়া নিচ্ছে ইচ্ছা মতো। এছাড়াও নতুন নির্ধারিত ভাড়ার তালিকা এখনো বাসে দেয়া হয়নি। এই সুযোগে যাত্রীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করছে বাস মালিকরা।


শিক্ষার্থীরা অভিযোগ করেন, মিরপুর ও ফার্মগেট রুটের অধিকাংশ বাসে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে রাখছে না হাফ ভাড়া। তবে এই অভিযোগ অস্বীকার করে বাস চালক কন্ডাকটররা বলছে ছুটির দিন ছাড়া সবদিন হাফ ভাড়া নেয়া হয়।


বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির মহাসচিব খন্দকার এনায়েতুল্লাহ বিবার্তাকে বলেন, ঢাকার মধ্যে কিছু কিছু জায়গায় ভাড়া নিয়ে অনিয়ম হচ্ছে, এটা স্বীকার করি। ভাড়ার সমন্বয় করতে আমরা টিম নিয়ে কাজ করছি।


যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরী বিবার্তাকে বলেন, সারা বাংলাদেশে পরিবহনের ভাড়া নিয়ে নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি চলছে। রাজধানীতে সব থেকে বেশি নৈরাজ্য হচ্ছে। সরকারকে এই নৈরাজ্যে বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে আহবান জানাচ্ছি। এই নৈরাজ্য না থামানো গেলে সাধারণ জনগণ ক্ষতিরমুখে পড়বে।


বিবার্তা/তাওহিদ/রোমেল/জেএইচ


সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

পদ্মা লাইফ টাওয়ার (লেভেল -১১)

১১৫, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ,

বাংলামোটর, ঢাকা- ১০০০

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2021 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com