টেন্ডার কারসাজি, সরকারের ক্ষতি ৩৩ কোটি ৪৯ লাখ টাকা
প্রকাশ : ০৯ আগস্ট ২০২২, ১৭:১১
টেন্ডার কারসাজি, সরকারের ক্ষতি ৩৩ কোটি ৪৯ লাখ টাকা
বিবার্তা প্রতিবেদক
প্রিন্ট অ-অ+

সর্বনিম্ন দরদাতাকে না দিয়ে সিন্ডিকেট তৃতীয় সর্বনিম্ন দরদাতা ঠিকাদারকে কাজ দিয়েছে। এরফলে সরকারের ৩৩ কোটি ৪৯ লাখ ৩৫ হাজার টাকা ক্ষতি হয়েছে। আর এই সিন্ডিকেটের সাথে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ এবং সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের সব পর্যায়ের কর্মকর্তারা জড়িত বলে অভিযোগ উঠেছে।


অভিযোগকারী ব্যক্তি বলছেন, এশিয়ান ট্রাফিক টেকনোলজিস লিমিটেড (এটিটি) সর্বনিম্ন দরদাতা ঠিকাদার হওয়ার পরও তারা কাজ পাচ্ছে না। কারণ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা টাকার বিনিময়ে তৃতীয় সর্বনিম্ন দরদাতা ঠিকাদারকে কাজ দিচ্ছে। এর ফলে এশিয়ান ট্রাফিক টেকনোলজিস লিমিটেড কাজ না পেলেও ক্ষতি হচ্ছে সরকারের।


তৃতীয় সর্বনিম্ন দরদাতাকে কাজ পাইয়ে দেয়ার অভিযোগে গত ২৭ জুলাই সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ এবং সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের একটি চিঠি দিয়েছে এশিয়ান ট্রাফিক টেকনোলজিস লিমিটেড। ওই চিঠির কপি সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী, প্রধান প্রকৌশলী, সওজ, সড়ক ভবন, তেজগাঁও, ঢাকা, অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী, সওজ, ঢাকা জোন, এলেনবাড়ী, তেজগাঁও, ঢাকা এবং তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী, সওজ, নারায়ণগঞ্জ সড়ক সার্কেল, এলেনবাড়ী, তেজগাঁও, ঢাকায় দেয়া হয়েছে।


সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ এবং সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের দেয়া আবেদনপত্রের একটি কপি বিবার্তার এই প্রতিবেদকের হাতে রয়েছে।


অনুসন্ধানে দেখা গেছে, সর্বনিম্ন দরদাতা না হয়েও ঠিকাদারদের কাজ পাইয়ে দিতে মন্ত্রণালয়ে ১০ থেকে ১২ জনের একটি সংঘবদ্ধ চক্র কাজ করছেন। তাদের সঙ্গে মন্ত্রণালয়ের সকল পর্যায়ের কর্মকর্তাদের যোগসাজশ রয়েছে। এই চক্রটি উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে লিয়াজো করে কাজ বের করে আনেন। এরমধ্যে দিয়ে তারাও হাতিয়ে নেন লাখ লাখ টাকা।


চিঠি থেকে জানা গেছে, এশিয়ান ট্রাফিক টেকনোলজিস লিমিটেড অভিযোগ করেছে যে, এটিটি ২০০৩ সাল থেকে বিভিন্ন মহাসড়ক ও সেতুতে ইলেকট্রনিক এবং কম্পিউটারাইজড টোল কালেকশন সিস্টেম সরবরাহ করে আসছে। পাশাপাশি কম্পিউটারাইজড পদ্ধতিতে টোল আদায় কার্যক্রম পরিচালনা করছে। এরই ধারাবাহিকতায় তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী, সওজ, নারায়ণগঞ্জ সড়ক সার্কেল, এলেনবাড়ী, তেজগাঁও, ঢাকা কর্তৃক ঢাকা-চট্টগ্রাম জাতীয় মহাসড়কের ২৫তম কি.মি., গোমতী সেতুর ৪২তম এবং ৪৩তম কিলোমিটারে মেঘনা সেতুর একটি রিয়েল-টাইম ওয়েব-ভিত্তিক টোল কালেকশন সিস্টেম সরবরাহ, ইনস্টলেশন, কমিশনিং, পরিচালনা এবং রক্ষণাবেক্ষণের (২০২১-২২) কাজের জন্য দরপত্র আহবান করা হলে তারা গত ১৩ এপ্রিলে দাখিল করা হয়।


‘ওপেনিং মেমো অনুযায়ী এশিয়ান ট্রাফিক টেকনোলজিস লিমিটেড সর্বনিম্ন (৩৩ কোটি ৯৮ লাখ ৩৬ হাজার ৪৬৬ টাকা ৩০ পয়সা) দরদাতা হিসেবে গণ্য হয়। কিন্তু শুধুমাত্র ওয়েবভিত্তিক অভিজ্ঞতা না থাকার অযুহাতে এটিটিকে নন-রেসপনসিভ করে তৃতীয় সর্বনিম্ন (৬৭ কোটি ৪৭ লাখ ৭১ হাজার ৪৬৬ টাকা ৩০ পয়সা) দরদাতা ইউডিসি কনস্ট্রাকশন লিমিটেডের অনুকুলে ইভালুয়েশন রিপোর্ট প্রস্তুত করা হয় এবং অনুমোদনের জন্য সুপারিশও করা হয়।’


এবিষয়ে এশিয়ান ট্রাফিক টেকনোলজিস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ইঞ্জিনিয়ার মেহবুব কবির বিবার্তাকে বলেন, তৃতীয় সর্বনিম্ন দরদাতা ঠিকাদারকে কাজ দিয়েছে, বাংলাদেশে প্রথম কোম্পানি এশিয়ান ট্রাফিক টেকনোলজিস লিমিটেডকে দেয়নি। আর এসব করেছেন সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ এবং সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের নিচু থেকে উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তারা। তারা সবাই এর সঙ্গে জড়িত। মন্ত্রী অসুস্থ হওয়ার পর থেকে তারা এসব কর্মকাণ্ড শুরু করেছেন। আর এর ফলে সরকারের প্রায় ৩৪ কোটি টাকা ক্ষতি হয়েছে।


এটিটির আবেদনপত্রে বলা হয়েছে, চট্টগ্রাম পোর্ট এক্সেস সড়কের ও রুস্তুম টোল প্লাজার জন্য আহবানকৃত পৃথক দুটি দরপত্রে ইউডিসি কনস্ট্রাকশন লিমিটেড সর্বনিম্ন দরদাতা হতে না পেরে ওয়েব ভিত্তিকের অভিজ্ঞতা নেই। এই মর্মে সর্বনিম্ন দরদাতার বিরুদ্ধে অভিযোগ করলে গত ১৩ মার্চ (প্রধান প্রকৌশলী, সওজ, সড়ক ভবন, ঢাকা কর্তৃক ইস্যুকৃত পত্র স্বারক নং- ৩৫.০১.০০০০.০০১.৩৪.০০৩.২২-৫০৪) ব্যাখ্যা দেয়া হয়।


পরবর্তীতে ইউডিসি কনস্ট্রাকশন লিমিটেড সিপিটিইউ বরাবর অভিযোগ দায়ের করলে সিপিটিইউ এর রিভিউ প্যানেল অভিযোগ খারিজ করে দেন। আর প্রধান প্রকৌশলী, সওজ এর পত্রে বলা হয়, ওয়েব-ভিত্তিক রিয়েল টাইম টোল কালেকশন সিস্টেম, কম্পিউটারাইজড টোল কালেকশন সিস্টেম, পদ্ধতিতে টোল আদায়ের অভিজ্ঞতা সম্পন্ন সার্ভিস প্রোভাইডারদের পক্ষে আলোচ্য ওয়েব ভিত্তিক রিয়েল টাইম টোল কালেকশন সিস্টেম পদ্ধতিতে টোল আদায় সম্ভবপর হবে।


এটিটির চিঠিতে আরো বলা হয়েছে, তৃতীয় সর্বনিম্ন দরদাতা ইউডিসি কনস্ট্রাকশন লিমিটেড ( ৬৭ কোটি ৪৭ লাখ ৭১ হাজার ৪৬৬ টা ৩০ পয়সা), চতুর্থ সর্বনিম্ন দরদাতা শামীম এন্টারপ্রাইজ (প্রা.) লিমিডেট (৬৮ কোটি ৩১ লাখ ৪১ হাজার ৪৬৬ টাকা ৩০ পয়সা), পঞ্চম সর্বনিম্ন দরদাতা এম এম বিল্ডার্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ার লিমিটেড ( ৬৯ কোটি ৯৩ লাখ ৪১ হাজার ৪৬৬ টাকা ৩০ পয়সা) এবং ষষ্ঠ সর্বনিম্ন দরদাতা রাগনাম রিসোর্স লিমিটেড (৭২ কোটি ১৯ লাখ ৩১ হাজার ৪৬৬ টাকা ৩০ পয়সা) যোগসাজস করে দরপত্রে অংশগ্রহণ করে দর দাখিল করে। যা তাদের দাখিলকৃত দর পর্যালোচনা করলে স্পষ্ট হবে। ইতোপূর্বে তারা চট্টগ্রাম পোর্ট এক্সেস সড়কের ও রুস্তুম টোল প্লাজার জন্য আহবাননকৃত পৃথক দুটি দরপত্রেও যোগসাজস করে অংশগ্রহণ করে। সেটাও তাদের দাখিলকৃত দর পর্যালোচনা করলে স্পষ্ট হবে।


এই অসাধু সিন্ডিকেট ঠিকাদারদের কবল থেকে দেশকে এবং সর্বনিম্ন দরদাতা ঠিকাদারকে কাজ দিয়ে সরকারের ৩৩ কোটি ৪৯ লাখ ৩৫ হাজার টাকা ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা করার জন্য চিঠিতে উল্লেখ করে এশিয়ান ট্রাফিক টেকনোলজিস লিমিটেড।


এবিষয়ে জানতে চাইলে সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর প্রধান প্রকৌশলী এ. কে. এম. মনির হোসেন পাঠান বিবার্তাকে বলেন, অভিযোগ যে কেউ করতেই পারেন। টেন্ডার হয়, কেউ এক টাকার টেন্ডার দেন আবার কেউ ২০০ টাকার টেন্ডার দেন। আর যারা অভিযোগ করেছেন তারা নন-রেসপনসিভ। সেই বিবেচনায় তারা কাজ পায়নি।


বিবার্তা/কিরণ/রোমেল/এসএফ


সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

পদ্মা লাইফ টাওয়ার (লেভেল -১১)

১১৫, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ,

বাংলামোটর, ঢাকা- ১০০০

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2021 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com