বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব: একজন সফল রাজনৈতিক সহযোদ্ধা
প্রকাশ : ০৮ আগস্ট ২০২২, ০০:০০
বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব: একজন সফল রাজনৈতিক সহযোদ্ধা
সোহেল আহমদ
প্রিন্ট অ-অ+

বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব। বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে সবচেয়ে প্রভাবশালী এই মহিয়সী নারী ১৯৩০ সালের তৎকালীন গোপালগঞ্জ মহকুমার টুঙ্গীপাড়ায় জন্মগ্রহণ করেন। তার ডাকনাম রেণু। বাবা শেখ জহুরুল হক ও মায়ের নাম হোসনে আরা বেগম। এক ভাই, দুই বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন ছোট।


পাঁচ বছর বয়সে পৌঁছার আগেই পিতা-মাতাকে হারান বেগম ফজিলাতুন্নেছা। পরে বঙ্গবন্ধুর পরিবারে পালিত হন। বাল্যকালেই তাদের বিয়ে হয়। ‘শেখ মুজিব আমার পিতা’ গ্রন্থে বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা লিখেছেন, ‘আব্বার বয়স যখন দশ বছর তখন তার বিয়ে হয়। আমার মায়ের বয়স ছিলো মাত্র তিন বছর।’



এরপর থেকে বঙ্গবন্ধুর শেখ মুজিবুর রহমানের রাজনৈতিক জীবনের ঐতিহাসিক যুগসন্ধিক্ষণের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে পড়েন বঙ্গমাতা। আমৃত্যু পাশে থেকে অনুপ্রাণিত করে গেছেন। বাঙালি জাতির জন্য উৎসর্গ করে গেছেন নিজেকে। জাতির পিতা কারাবন্দি থাকার সময়ে রেখেছেন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। বঙ্গবন্ধুর অনুপস্থিতিতে আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগের পাশে থেকে সাহস ও অনুপ্রেরণা যুগিয়েছেন। বেগম মুজিবরে নিরন্তর অকৃত্রিম সঙ্গে বঙ্গবন্ধু আজকে শেখ মুজিব থেকে বঙ্গবন্ধু হয়েছেন, হয়েছেন জাতির পিতা ।



বঙ্গবন্ধু তাঁর ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ গ্রন্থের শুরুতে লিখেছেন, ‘আমার সহধর্মিণী এক দিন জেলগেটে বসে বলল, বসেই তো আছ, লেখ তোমার জীবন কাহিনী। ... আমার স্ত্রী যার ডাক নাম রেণু। আমাকে কয়েকটা খাতাও কিনে জেলগেটে জমা দিয়ে গিয়েছিল। জেল কর্তৃপক্ষ যথারীতি পরীক্ষা করে খাতা কয়টা আমাকে দিয়েছিল। রেণু আরো একদিন জেল গেটে বসে আমাকে অনুরোধ করেছিল। তাই আজ লিখতে শুরু করলাম।’


বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিবের জীবনী মূল্যায়ন করে আওয়ামী লীগ নেতারা বলছেন, বঙ্গবন্ধুর সারাজীবনের সংগ্রাম, সংকটে পাশে ছিলেন বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব। জীবনের প্রতিটি মুহূর্তে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুকে তিনি প্রশ্নাতীতভাবে সমর্থন দিয়েছেন। মনোবল, সাহস ও অপরিসীম প্রেরণা জুগিয়েছেন।


তারা বলছেন, বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করা হতে পারে, ফাঁসিতে ঝোলানো হতে পারে। এমন অবস্থায়ও স্ত্রী হিসেবে স্বামীকে রক্ষা করার বিষয়টি তিনি ভাবতেন না। তিনি ভাবতেন কীভাবে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন-আশা বাস্তবায়ন করা যায়। কোনো ভয়-ভীতি না পেয়ে মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়েও তিনি জাতির পিতাকে সঙ্গ দিয়েছেন।




বিশ্বস্ত সঙ্গী হিসেবে বঙ্গবন্ধুকে পথনির্দেশনা দিয়েছেন শেখ ফজিলাতুন্নেছা: আবদুর রহমান



জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের শক্তি সাহসের অনুপ্রেরণা ছিলেন শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব। তার মতো এতো সাহসী নারী আমি দেখিনি। বঙ্গমাতার জন্যই বঙ্গবন্ধু আজকে শেখ মুজিব থেকে বঙ্গবন্ধু হয়েছেন, জাতির পিতা হয়েছেন। বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন- আমার দুটি সম্পদ আছে, একটি হলো আত্মবিশ্বাস আর আরেকটি হলো শেখ ফজিলাতুন্নেছার মতো স্ত্রী। বঙ্গবন্ধুর আস্থা, বিশ্বাস ভালোবাসা তার প্রিয় সহধর্মিণীর প্রতি ছিলো এবং তার সহধর্মিণীও সারাজীবনের সংগ্রাম, সংকটে ও সকল সম্ভাবনায় বঙ্গবন্ধুর সাথে ছিলেন, পাশে ছিলেন। জীবনের প্রতিটি মুহূর্তে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুকে তিনি প্রশ্নহীনভাবে সমর্থন দিয়েছেন, মনোবল ও সাহস জুগিয়েছেন, অপরিসীম প্রেরণা জুগিয়েছেন।


শেখ ফজিলাতুন্নেছা স্মরণশক্তি অত্যন্ত প্রখর ছিলো। তিনি আন্দোলন চলাকালীন সময়ের প্রতিটি ঘটনা জেলখানায় সাক্ষাৎকারের সময় বঙ্গবন্ধুকে জানাতেন এবং প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও নির্দেশ নিয়ে আসতেন। আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগকে সে নির্দেশ জানাতেন।


বঙ্গবন্ধুর কারাগারে থাকা অবস্থায় বেগম মুজিব শত সংকট মোকাবেলা করে সংসার সামলে ছেলেমেয়েদের লালন-পালন করেছেন, তাদেরকে পড়াশোনা করিয়েছেন। বঙ্গবন্ধুকে সবসময় আপসহীন থেকে তাঁর রাজনৈতিক লক্ষ্যের দিকে এগিয়ে যেতে নিরন্তর উৎসাহ যুগিয়ে গেছেন।


বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব তীক্ষ্ণ বুদ্ধিমত্তার অধিকারী ছিলেন উল্লেখ করে তিনি বলেন, বস্তুত তিনি ছিলেন বঙ্গবন্ধুর বঙ্গবন্ধু হয়ে ওঠার পেছনের কারিগর। তাঁর ব্যক্তিত্বের প্রখরতা ও চিন্তার দূরদর্শিতা দিয়ে তিনি বিভিন্ন প্রতিকূল পরিস্থিতিতে একজন বিশ্বস্ত সঙ্গী হিসেবে বাঙালির মহানায়ক জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুকে পথনির্দেশনা দিয়ে গেছেন। মহীয়সী এই মমতাময়ী জননীর জন্মদিনে আমার কৃতজ্ঞ চিত্তের অশেষ শ্রদ্ধা।


আবদুর রহমান, সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ।




অসম সাহসী ছিলেন ফজিলাতুন্নেছা মুজিব: নাছিম



বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব একজন মহীয়সী নারী। জাতির পিতার সহধর্মিনী। প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা তার কোল জুড়েই আলোকিত হয়েছেন। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সহধর্মিনী হিসেবে সুখে, দুঃখে এমনকি মরণেও চির সাথী হিসেবে ছিলেন। তিনি শেখ মুজিবুর রহমানের রাজনৈতিক জীবনের একজন পরম ভক্ত ছিলেন। বঙ্গবন্ধুর চিন্তা চেতনার সাথে এক হয়ে কাজ করেছেন। দেশপ্রেমিক মানুষ ছিলেন। উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত না হলেও রাজনৈতিক দীক্ষায় তিনি পারদর্শী ছিলেন।


পাকিস্তানবিরোধী আন্দোলন, ঔপনিবেশিক শাসন বিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে প্রতিটি আন্দোলনে জাতির পিতাকে প্রতিটি পর্যায়ে প্রতিটি পদক্ষেপে নিবিড়ভাবে সমর্থন করেছেন, অনুসরণ করেছেন। তিনি সকল ক্ষেত্রেই অসম সাহসী ছিলেন।


তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের মানুষের কল্যাণে, জাতীয়তাবাদ, সংস্কৃতি ও ভাষার উপর যখন আঘাত এসেছে জাতির পিতা তা সমুন্নত রাখার জন্য প্রতিবাদ করেছেন। বঙ্গবন্ধুকে বারবার কারাগারে যেতে হয়েছে। তার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহের মামলা হয়েছে। জীবন-মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে সেই সময়ে জাতির পিতার পাশে তিনি স্ত্রী হিসেবে নয় বরং বাঙালি জাতিসত্তার অধিকার, সংগ্রাম বলিষ্ঠ করার জন্য জাতির পিতাকে সমর্থন দিয়েছেন, সহযোগিতা করেছেন।



বঙ্গবন্ধু যখন কারাগারে ছিলেন ছাত্রলীগ, আওয়ামী লীগ দিকশূন্য হয়ে পড়তো, হতাশায় পড়তো। তখন বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ নেতা-কর্মীদের দিকনির্দেশনা দিয়ে পাশে ছিলেন। নীরবে নিভৃতে থেকেই দল পরিচালনা করেছেন, সহযোগিতা করেছেন এবং সাহস যুগিয়েছেন। জাতির পিতা যখন কারাগারে থাকতেন তখন তিনি দেশের সার্বিক পরিবেশ সম্পর্কে তাকে জানাতেন, খবরাখবর পৌঁছে দিতেন। এছাড়া তিনি জাতির পিতার পরামর্শ দলের নেতা-কর্মীদের পৌঁছে দিতেন। এ কাজটি তিনি অত্যন্ত দক্ষতার সাথে করেছেন।



জাতির পিতা তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে মানুষকে স্বপ্ন, আকাঙ্ক্ষা দেখিয়েছিলেন। বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করা হতে পারে, ফাঁসিতে ঝুলাতে পারে। স্ত্রী হিসেবে স্বামীকে রক্ষা করার বিষয়টি তিনি ভাবতেন না, তিনি ভাবতেন কিভাবে ব্ঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন-আশা বাস্তবায়ন করা যায়। কোনো ভয়-ভীতি না পেয়ে মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়েও তিনি জাতির পিতাকে সঙ্গ দিয়েছেন। সততার সাথে দায়িত্ব পালন করেছেন।


বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব পারিবারিক, সামাজিক জীবনে দায়িত্বশীল নারী ছিলেন। উনার কমিটমেন্টে কোনো সংকোচ ছিলো না। উনাকে বিতর্কিত করার চেষ্টা করা হয়েছে। কিন্তু উনার কোনো ব্যাংক একাউন্ট ছিলো না। এমনকি বাসাতেও উনার জমানো কোনো টাকা, পয়সা পাওয়া যায়নি। মৃত্যুর পর ষড়যন্ত্রকারীরা তার চরিত্রহননের চেষ্টা করেছে। যে আগস্ট মাসে তার জন্মদিন সেই মাসেই তাকে হত্যা করেছে। তার বিদেহী আত্মার মাগফেরাত কামনা করি। আল্লাহ তাকে বেহেশত নসিব করুন।


কৃষিবিদ আ. ফ. ম. বাহাউদ্দিন নাছিম, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ।


বিবার্তা/সোহেল/রোমেল/এসবি

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

পদ্মা লাইফ টাওয়ার (লেভেল -১১)

১১৫, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ,

বাংলামোটর, ঢাকা- ১০০০

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2021 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com