দেশের অর্থনৈতিক সংকট, করণীয়
প্রকাশ : ০৭ আগস্ট ২০২২, ২৩:৩৫
দেশের অর্থনৈতিক সংকট, করণীয়
এস এম রিয়াদ রহমান
প্রিন্ট অ-অ+

করোনায় ধকল শেষ হতে না হতেই রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে সারাবিশ্ব অর্থনৈতিক চাপের মধ্যে আছে। বিশ্ববাজারে কিছু পণ্যের সরবরাহে টান পড়ায় লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে পণ্যের দাম। বিশ্ববাজারে তেলের অতিমূল্যের প্রভাব দেশের আমদানি ব্যয় বাড়িয়ে দিয়েছে। সারাদেশে শিডিউল দিয়ে লোডশেডিং দেয়া হচ্ছে। সরকার অর্থনৈতিক চাপ সামলাতে জ্বালানির দাম বাড়িয়েছে। এতে দেশের অর্থনীতিতে ব্যাপক প্রভাব পড়বে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।


দেশের রফতানি আয় করোনা পরবর্তী সময়ে বাড়লেও তা আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি মেটানোর জন্য যথেষ্ট নয়। আবার রেমিট্যান্স আয় কমেছে। এর ফলে বৈদেশিক লেনদেনের ক্ষেত্রে ঘাটতি দেখা দিয়েছে। ২০০৮ সালে বিশ্বজুড়ে খাদ্যমূল্য বাড়ার প্রভাবে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বড় টানাপোড়েনে পড়েছিলো। প্রায় দেড় দশক ধরে স্থিতিশীল অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনের পরে এখন আবার অস্থিরতার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। দেশের এই সংকট মূলত বিশ্ব অর্থনীতির কারণেই। অর্থনীতিতে এ ধরনের সংকট হলেই হয়তো টেকসই প্রবৃদ্ধির ক্ষেত্রে কাঠামোগত মৌলিক যে সব প্রতিবন্ধকতাগুলো আছে, সেদিকে সবার নজর পড়ে। যেমন সামনে আমাদের উন্নয়ন ব্যয়ে সাশ্রয়ী হতে হবে এবং রাজস্ব আদায় অবশ্যই জোরদার করতে হবে।


দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক সংকট নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ ও সিপিডির গবেষণা পরিচালক ড. খোন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেমের সাথে কথা হয় বিবার্তার। তারা বলেন, দেশের এই সংকটময় মুহূর্তে জরুরি করণীয় হলো- মূল্যস্ফীতি স্বাভাবিক রাখা, রিজার্ভ বাড়ানো, এক্সপোর্ট বাড়ানো, রেমিট্যান্স বাড়ানোসহ জ্বালানির খরচ কমানো।


ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, অর্থনৈতিক সংকট সবসময় আছেই। এটা আমাদের বাংলাদেশে মহামারি করোনার আগ থেকে বিদ্যমান ছিলো। ব্যাংকিং সেক্টরে সমস্যা ছিলো, এক্সপোর্টে কোনো হিসাব নেই, টাকা পাচার হয়ে যাচ্ছে- এগুলাতো করাপশন, তার মধ্যে আবার করোনা এসেছে। তবে করোনা সংকট আমরা কাটিয়ে উঠেছিলাম। আমাদের সবকিছু স্লো ছিলো, কিন্তু থেমে যায় নাই। সবকিছু মিলিয়ে তা কাটিয়ে উঠেছিলাম। কিন্তু তারপর আবার রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে ধাক্কা লেগেছে। এই যে একটার পর একটা ধাক্কা এসে পড়ছে। অর্থাৎ বাংলায় যদি বলি ভঙ্গুরতা। সেটা মনে হয় বাংলাদেশের ইকনোমিতে ছিলো।


তিনি আরো বলেন, অনেক সময় আবার প্রাকৃতিক কারণে হতে পারে, দেশে কোনো কারণে দুর্যোগ হলে অর্থনীতিক অবস্থা খারাপ হতে পারে। আরেকটা হচ্ছে বহির্বিশ্বে নানা ধরনের সংকটের কারণে হয়। যা এখন চলমান। এটা কাটিয়ে উঠতে হলে আমাদের সবকিছু মোকাবিলা করতে হবে। ব্যাংকিং সেক্টর থেকে এককথায় সকল সেক্টরে।


এখন আবার তেলের দাম হঠাৎ ৫০ শতাংশ বাড়িয়ে দিয়েছে এটাও বড় একটা ধাক্কা বলে মনে করেন ড. সালেহউদ্দিন। একবারে এতোগুলা টাকা বাড়ানো মোটেও যৌক্তিক হয় নাই। এতে সাধারণ মানুষের মানিয়ে নিতে অসুবিধা হবে। এটা আস্তে ধীরে ধাপে ধাপে করতে পারতো। জ্বালানি খাতে দাম বাড়া মানে সব ক্ষেত্রেই দাম বেড়ে যাবে। ব্যাবসা-বাণিজ্য, কলকারখানা, মানুষের জীবনের সবকিছুতেই এর প্রভাব পরবে।


শ্রীলংকার মত ভঙ্গুর পরিস্থিতি বাংলাদেশের হবে না বলে মনে করেন ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ। তিনি বলেন, শ্রীলংকার ফরেন রিজার্ভ দ্রুত কমে গেছে। আমদানি ক্ষমতা কমে গেছে। সবচেয়ে বড় কথা তারা পর্যটন শিল্পের উপর নির্ভরশীল ছিলো। করোনা মহামারি তাদের অর্থনীতিকে ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্থ করেছে। কারণ তারা ঠিক সময়মত কোনকিছু অ্যাড্রেস করে নাই। তাই তাদের ধস নেমে গেছে। কিন্তু আমাদের ইকনোমিটা একটু বড়। অর্থনৈতিকভাবে আমরা সচ্ছল। তার সাথে আমাদের অর্থনীতিতে এক্সপোর্ট ছাড়াও সবকিছু বহুমুখী। আমাদের রেমিট্যান্স ভালো। অন্যদিকে শ্রীলংকার রেমিট্যান্স অনেক কম। আমারা কৃষিতে অনেক এগিয়ে। সবমিলিয়ে তাদের থেকে আমাদের অর্থনৈতিক অবস্থা অনেক ভালো।


তবে শ্রীলংকা থেকে আমাদের শিক্ষা নেয়ার আছে। তারা সময়মত দেশের সংকট ওভারকাম করতে পারেনি। কিন্তু আমাদের সবকিছু সময়মত ওভারকাম করতে হবে। সেই জন্য দরকার তাৎক্ষণিক যে পদক্ষেপ তা গ্রহণ করা। মধ্য মেয়াদি বা দীর্ঘ মেয়াদি পদক্ষেপও। দেশের এ সংকট চট করে চলে যাবে না বলে উল্লেখ্য করেন ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ।


তিনি আরো বলেন, এই মুহূর্তে জরুরি করণীয় হলো- মূল্যস্ফীতি, রিজার্ভ কমে যাচ্ছে, এক্সপোর্ট বাড়াতে হবে, রেমিট্যান্স বাড়াতে হবে, জ্বালানির খরচ কমাতে হবে।


আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ঋণ নিয়ে ড. আহমেদ বলেন, আইএমএফ থেকে লোন চাওয়ায় তারা সরকারকে কিছু শর্ত জুড়ে দিয়েছে। তার মধ্যে ব্যাংক ঋণ কমানো, দুর্নীতি কমানো, টাকা পাচার কমানো, এক্সপোর্ট বাড়ানো, ইনপুট কন্ট্রোল করা ইত্যাদি। দ্রুত সময়ের মধ্য কয়েটা জিনিস যদি কন্ট্রোল করা যায় তাহলে এ সংকট মোকাবেলা করা সম্ভব। শুধু বসে থাকলেন, নানারকম আশ্বাস দিলেন- আর মানুষকে বললেন, ধৈর্য্য ধরুন সংকট কেটে যাবে। এগুলো বললে কাজের কাজ হবে না। সঠিক সময়ে দ্রুত পরিস্থিতির জন্য পদক্ষেপ নিতে হবে।


ড.গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, আমাদের এই সংকট কাটিয়ে উঠতে সরকারের মধ্য মেয়াদি সংস্কারের উদ্যোগ দ্রুত নেয়া দরকার। এই সংকটটি মধ্য মেয়াদি একটি সংকট হিসেবে এসেছে। এটা স্বল্প মেয়াদি না। সুতরাং এখনো যে উদ্যোগগুলো নেয়া হচ্ছে তা মধ্য মেয়াদি নয়, স্বল্প মেয়াদি। সুতরাং মধ্য মেয়াদি সংকট থেকে বেড় হয়ে আসার জন্য যে সংস্কারগুলো করা দরকার সেগুলো করতে হবে।


বিদ্যুৎ খাতের সংস্কার করতে হবে বলে মনে করেন ড. গোলাম মোয়াজ্জেম । একই সাথে ব্যাংকিং খাতের সংস্কার, ফাইন্যান্স এন্ড ম্যানেজম্যান্টের সংস্কার করা অতি জরুরি দরকার।


বিবার্তা/রিয়াদ/রোমেল/এসএফ



সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

পদ্মা লাইফ টাওয়ার (লেভেল -১১)

১১৫, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ,

বাংলামোটর, ঢাকা- ১০০০

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2021 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com