পদ্মা সেতু : দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের ধর্মীয় উৎসবে বইবে জোয়ার
প্রকাশ : ২৫ জুন ২০২২, ০৭:৫৮
পদ্মা সেতু : দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের ধর্মীয় উৎসবে বইবে জোয়ার
মহিউদ্দিন রাসেল
প্রিন্ট অ-অ+

একটি সেতু, একটি ইতিহাস। সেটি পদ্মা সেতুর ইতিহাস। আর এই ইতিহাসের জন্ম দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সারা বিশ্বকে তাক লাগিয়ে বাঙালির দীর্ঘদিনের কাঙিক্ষত এই সেতু দেশের নিজস্ব অর্থায়নে নির্মাণ করেছেন তিনি। বাঙালির স্বপ্নের এই সেতু এখন প্রস্তুত, অপেক্ষা কেবল উদ্বোধনের। ২৫ জুন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এই সেতুর উদ্বোধন করবেন। তার পরদিনই খুলবে এর দ্বার। ফলে এখন কেবল অপেক্ষার প্রহর গুনছে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষ। স্বপ্নের এই সেতুর মাধ্যমে তাদের দীর্ঘদিনের যাতায়াত ভোগান্তি দূর হয়ে যোগাযোগের ক্ষেত্রে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে। যার প্রভাব পড়বে দক্ষিণাঞ্চলের কৃষি, শিল্পসহ সবকিছুতে। শুধু তাই নয়, স্বপ্নের এই সেতু এই অঞ্চলের মানুষের ধর্মীয় উৎসবেও এক নতুন মাত্রা যোগ করবে।



আগে পদ্মার ফেরিঘাটের নানা ভোগান্তির কারণে অনেকে ধর্মীয় উৎসবে বাড়ি না গিয়ে আমেজহীনভাবে উৎসব করলেও এবার বদলে যাবে এই চিত্র। ফলে বিভিন্ন ধর্মের মানুষের ধর্মীয় উৎসবে ক্ষেত্রে এখন বইবে জোয়ার।


ইসলাম ধর্মের বড় দুই ধর্মীয় উৎসব- ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আযহা,হিন্দু ধর্মের ধর্মীয় উৎসব দুর্গা পূজা, সরস্বতী পূজাসহ বিভিন্ন পূজা, খ্রিষ্টান ধর্মের বড় দিন, বৌদ্ধ ধর্মের বুদ্ধ পূর্ণিমাসহ ধর্মীয় উৎসবগুলোতে এখন বাড়তি মাত্রা যোগ করবে স্বপ্নের পদ্মা সেতু। দক্ষিণাঞ্চলের ২১ জেলার মানুষ এতোদিন নিজেদের এসব ধর্মীয় উৎসবগুলোতে অংশগ্রহণ করতে যাতায়াত ভোগান্তির মাধ্যমে এক মহা বিড়ম্বনায় পড়তেন। ফলে অনেকে গ্রামের বাড়িতে যেতেও আগ্রহ হারিয়ে ফেলতেন। কিন্তু বদলে গেছে দিন, স্বপ্ন হয়েছে পূরণ। হয়ে গেছে পদ্মা সেতু। যার ফলে যাতায়াত এখন হবে ভোগান্তিমুক্ত। যা ধর্মীয় উৎসবগুলোতে এক নতুন দিগন্ত বয়ে আনবে।



এ বিষয়ে বরিশালের বরগুনার জেলার বাসিন্দা ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আরবি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগের অধ্যাপক ড. কুতুবুল ইসলাম নোমানী বিবার্তাকে বলেন, মুসলমানের ধর্মীয় উৎসব প্রধানত ২ টা, ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আযহা। দক্ষিণাঞ্চলের আমরা যারা ঢাকায় বসবাস করি, তারা এই দুই ঈদে গ্রামের বাড়িতে যাওয়ার ব্যাপারে নিজেদের প্রচণ্ড আগ্রহ থাকলেও ফেরিকেন্দ্রিক সীমাহীন ভোগান্তির কারণে অনেকে আগ্রহ হারিয়ে ফেলে। এদিকে আবার যাদের শিশু আছে, বৃদ্ধ- মা-বাবা আছে, তাদের নিয়ে ফেরিতে করে আসা-যাওয়া করার ভোগান্তি আরো বেশি।


তিনি বলেন, ধর্মীয় উৎসব ঈদের সময় মাওয়া ঘাটে কি যে ভোগান্তি হয়, কেবল যারাই এ পথে হেঁটেছেন তারাই ভালোই বলতে পারবেন। এমনকি ভোগান্তিতে পড়ে মানুষ মারা যাওয়ার ঘটনাও ঘটেছে । এসব কারণে ঈদের সময় বাড়িতে যেতে হলে মানুষকে সর্বোচ্চ ঝুঁকি নিয়ে বাড়ি যেতে হয়েছে। কিন্তু এখন পদ্মা সেতু উদ্বোধনের পরে আমাদের আর এই মরণ ভোগান্তিটা আর থাকবে না। এটা আমাদের কাছে বড় পাওয়া।



পদ্মা সেতু হওয়ায় উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে এই অধ্যাপক বলেন,সামনে আমাদের কোরবানির ঈদ। তার আগে স্বপ্নের পদ্মা সেতু উদ্বোধন হতে যাওয়ায় মানুষ এবার নির্বিঘ্নে বাড়িতে পৌঁছাতে পারবে। দক্ষিণাঞ্চলের ২১ জেলার মানুষের জন্য এটা একটা সরকারের পক্ষ থেকে দেশ স্বাধীন হওয়ার পরে বড় একটা গিফট। এই গিফটের সুবিধা তো লিখে বা বর্ণনা করে শেষ করা যাবে না। আমাদের জন্য পদ্মা সেতু আবেগ,অনুভূতির জায়গা। আর আবেগ অনুভূতি তো ভাবে প্রকাশ করা যায় কিন্তু লিখে বা বলে বুঝানো যাবে না।


তিনি বলেন, ঈদ ছাড়া আমাদের আরো ধর্মীয় উৎসব আছে। যেমন গ্রামে বাৎসরিক মাহফিল হয়। আমাদের অঞ্চলের প্রতিটা থানা,উপজেলা, ইউনিয়ন এমনকি ওয়ার্ড পর্যায়ে বছরে একটা নির্দিষ্ট সময়ে ওয়াজ মাহফিল হয়। এই মাহফিলও আমাদের কাছে বড় উৎসব। এই উৎসবকে ঘিরে বাড়িতে মেহমান আসে। সেই সময় অনেক আনন্দঘন পরিবেশ তৈরি হয়। কিন্তু আমরা ঢাকা থেকে যেতে পারতাম না সময় ও ভোগান্তির জন্য। পদ্মা সেতু হওয়ায় এখন আর আমাদের এসব উৎসব মিস হবে না। বলতে পারেন, আমরা এখন অনেক আনন্দিত,উৎফুল্ল।


এদিকে পদ্মা সেতু হওয়ায় মুসলমানদের আরেক জমজমাট ধর্মীয় উৎসবে বিশ্ব ইজতেমায়ও প্রভাব পড়বে। টঙ্গীর তুরাগ নদীর তীরে প্রতি বছর অনুষ্ঠিত হওয়া এই সমাবেশে এমনিতেই জনতার ঢল নামে। তার উপর এবার ভোগান্তিমুক্ত যাতায়াত হওয়ায় এতে নতুন মাত্রা যুক্ত হবে। আগে যাতায়াত ভোগান্তির কারণে কিছু মানুষ আসতে অনীহা প্রকাশ করলেও এবার বদলে যাবে সেই চিত্র। সাধারণত প্রতিবছর শীতকালে এই সমাবেশের আয়োজন করা হয়ে থাকে, এজন্য ডিসেম্বর বা জানুয়ারি মাসকে বেছে নেয়া হয়।



অন্যদিকে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব দুর্গাপূজা। এ উপলক্ষে প্রতিবছর জাতীয় মন্দির ঢাকেশ্বরীতে ব্যাপক আয়োজন করা হয়। সারাদেশ থেকে লোকসমাগমও হয় এখানে। এছাড়া রমনা কালী মন্দিরেও এই ধর্মের মানুষদের বিভিন্ন ধর্মীয় অনুষ্ঠান উৎসাহ-উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে পালন করা হয়।স্বপ্নের পদ্মা সেতু হওয়ায় এই ধর্মের মানুষদের এই উৎসবেও বাড়তি মাত্রা যোগ হবে।


এ বিষয়ে শ্রীশ্রী রমনা কালীমন্দির ও শ্রী আনন্দময়ী আশ্রম পরিচালনা পরিষদের সভাপতি উৎপল সাহা বিবার্তাকে বলেন, স্বপ্নের পদ্মা সেতু হওয়ায় বিভিন্ন ধর্মের মানুষের ধর্মীয় উৎসবে জোয়ার বইবে। আগে ফেরি পারাপারসহ বিভিন্ন ভোগান্তির কারণে অনেকে নিজেদের প্রিয় ধর্মীয় অনুষ্ঠানকে জলাঞ্জলি দিতে হতো। এখন সেটা আর থাকবে না। এজন্য মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাই। তাঁর বিচক্ষণ নেতৃত্বে স্বপ্নের এই সেতু করা সম্ভব হয়েছে। যার মাধ্যমে এখন বিভিন্ন ধর্মের মানুষ নিজের উৎসব পালন করার ক্ষেত্রে যাতায়াত ভোগান্তিতে আর পড়বে না।


তিনি বলেন, দক্ষিণাঞ্চলের মানুষ আগে আমাদের ঢাকার বড় বড় মন্দিরগুলোতে ধর্মীয় উৎসবে আসার ইচ্ছে থাকলেও হয়তো তেমন আসতেন না ভোগান্তির কথা বিবেচনা করে। এখন সেটা আর নেই। তারা অনায়াসে ঢাকায় এসে নিজেদের ধর্মীয় উৎসব পালন করতে পারবে।



খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বী মানুষের বড় ধর্মীয় উৎসব যিশু খ্রিস্টের জন্মদিন উদযাপন বা বড়দিন পালন করা। সারা পৃথিবী জুড়েই ২৫ ডিসেম্বর তারিখে এই উৎসব পালিত হয়। এ ধর্মের মানুষরাও চায় তাদের বড় ধর্মীয় উৎসব যেখানে ধুমধামভাবে পালিত হয়, সেখানে যেতে। পদ্মা সেতু এক্ষেত্রে দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের এ উৎসব উদযাপনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।


এ বিষয়ে খ্রিস্টান ধর্মের বরিশাল গৌরনদী মিশনের ধর্মগুরু ফাদার মাইকেল মিলন দেউরি বিবার্তাকে বলেন, আমাদের মিশনের রোমান কাথলিক খ্রিস্টান ভাই-বোনেরা জীবিকার কারণে রাজধানী ঢাকাতে থাকছেন। তারা সারা বছরই সেখানে কাজ করছেন। কেউবা পড়ালেখা করছেন। খ্রিস্টানদের সবচেয়ে বড় দুটি ধর্মীয় উৎসব । বড়দিন ও ইস্টার সানডে উপলক্ষে তারা ঢাকা থেকে গ্রামে আসেন। এ সময় তাদের দীর্ঘ সময় লঞ্চ বা গাড়িতে বসে থাকতে হতো। নানান ভোগান্তি পোহাতে হতো। এখন পদ্মা সেতু চালুর পর সেটা দূর হবে। যাত্রা নির্বিঘ্ন হবে। বড়দিনে তাদের ভ্রমণটা সহজ হবে।



তিনি বলেন, পদ্মা সেতুর মাধ্যমে সকলে সহজে বড়দিনের আনন্দ ভাগাভাগি করে নিতে পারবে। এই সেতু দূরত্ব কমিয়ে আমাদের আনন্দকে বাড়িয়ে দিতে বিশেষ ভূমিকা পালন করবে বলে আমার বিশ্বাস।


বৌদ্ধ ধর্মের প্রধান ধর্মীয় উৎসব হলো বুদ্ধ পূর্ণিমা। অধিকাংশ রাষ্ট্রে এ দিনটি সরকারি ছুটির দিন হিসেবে পালিত হয়ে থাকে। এছাড়া এই ধর্মের মানুষের আষাঢ়ী পূর্ণিমা, মধু পূর্ণিমা,প্রবারণা পূর্ণিমা,মাঘী পূর্ণিমা,ফালগুনী পূর্ণিমা,আশ্বিনী পূর্ণিমাসহ আরো নানা উৎসব রয়েছে। এ উৎসবগুলোতেও এখন জোয়ার বইবে।



এ বিষয়ে বৌদ্ধ ধর্মের ধর্মীয় পণ্ডিত অধ্যাপক ড. তপন কান্তি বড়ুয়া বিবার্তাকে বলেন, প্রত্যেক মানুুষের কাছে নিজ ধর্ম আবেগের নাম, ভালোবাসার নাম। কাজেই নিজ ধর্মীয় উৎসবগুলোতে মানুষ আপনজনদের সাথে থাকতে চায়, ঘুরতে চায়। কিন্তু যাতায়াত ভোগান্তি অনেক সময় মানুষকে অনেক কঠিন সিদ্ধান্ত নিতেও বাধ্য করে। পদ্মা সেতু হওয়ায় আমি মনে করি, বৌদ্ধ ধর্মের মানুষরাও তাদের উৎসব পালনের ক্ষেত্রে ভিন্ন মাত্রা পাবেন।


বিবার্তা/রাসেল/রোমেল/এসবি

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

পদ্মা লাইফ টাওয়ার (লেভেল -১১)

১১৫, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ,

বাংলামোটর, ঢাকা- ১০০০

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2021 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com