পদ্মা সেতু, চাহিদা বাড়বে যশোরের ফুল, রেণুপোনা ও সবজির
প্রকাশ : ২৪ জুন ২০২২, ২২:০৬
পদ্মা সেতু, চাহিদা বাড়বে যশোরের ফুল, রেণুপোনা ও সবজির
মো. নয়ন হোসেন, শার্শা উপজেলা প্রতিনিধি, যশোর
প্রিন্ট অ-অ+

আশা-আকাঙ্খা পূরণের একেবারে সন্নিকটে বাংলাদেশের গর্ব ও স্বপ্নের পদ্মা সেতুর উপর দিয়ে যান চলাচলের। আর মাত্র কয়েক ঘন্টা পরেই ইতিহাসের পাতায় যুক্ত হবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বৃহৎ অবদান পদ্মা সেতু। পদ্মা সেতু একটা স্বপ্ন, প্রতিটি বাঙালির গর্বের ধন। ২৫ জুন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকেই এই সেতুর শুভ উদ্বোধন করবেন।


পদ্মা সেতু চালু হলে রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশের সঙ্গে দক্ষিণাঞ্চলের ২১ জেলার সরাসরি যোগাযোগ ব্যবস্থা স্থাপন হবে। যশোরের সাধারণ জনগণ এবং ব্যবসায়ীরা একটু বেশিই উচ্ছ্বসিত। কারণ বেনাপোল বন্দর দিয়ে বাড়বে আমদানী-রপ্তানি বাণিজ্য, দীর্ঘ সময় এবং ভোগান্তির ফেরি পারাপার সেতুর কল্যাণে ৬ মিনিটেই হয়ে যাবে। তাই কাঁচামাল ও পঁচনশীল পণ্য নিয়ে সঠিক সময়ে গন্তব্যে পৌঁছানো সম্ভব হবে। ফলে নতুন আশা বুনছেন- গদখালীর ফুল চাষীরা, যশোরের রেণুপোনা ব্যবসায়ী, সবজি ব্যবসায়ী, যশোরের খুচরা ও পাইকারী পোশাক ব্যবসায়ীরা।



বেনাপোল বন্দরের সুবিধা


পদ্মা সেতু চালু হলে ঢাকা থেকে দেশের সর্ববৃহৎ স্থল বন্দর বেনাপোলে পাঁচ-ছয় ঘণ্টায় পৌঁছানো যাবে। ফলে এই বন্দর দিয়ে আমদানি-রপ্তানি বাড়বে। পদ্মা সেতু এশিয়ান হাইওয়েতে যুক্ত থাকায় বিবিআইএন চুক্তির আওতায় বাংলাদেশ, ভুটান, ভারত ও নেপালের মধ্যে যাত্রী, ব্যক্তিগত এবং পণ্যবাহী যান চালু হলে বেনাপোল বন্দরের গুরুত্ব আরও বেড়ে যাবে। এছাড়াও নানা ধরণের সুযোগ সুবিধা বাড়বে বলে জানান বন্দরের ব্যবসায়ীরা ।



গদখালীর ফুল চাষীদের সুবিধা


বাংলাদেশে ফুল উৎপাদনের জন্য বিখ্যাত যশোরের ঝিকরগাছা উপজেলার গদখালী। দেশের প্রায় ৭০-৮০ ভাগ ফুলই গদখালীতে উৎপাদিত হয়। উপজেলার প্রায় ৩০-৪০ টি গ্রাম জুড়ে চাষীরা ফুল চাষ করে। বাংলাদেশ ফুল রপ্তানি করে যে রেমিটেন্স অর্জন করে, তার প্রায় সবটুকুই আসে গদখালীর ফুল চাষীদের কল্যাণে। কিন্তু করোনা মহামারির পর এখনো ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি ফুল ব্যবসায়ীরা। জানা যায়, পরিবহন ব্যবস্থার কারণে অনেক সময় ফুল পঁচে বড় ধরনের ক্ষতির সম্মুখীন হন চাষী ও ব্যবসায়ীরা। পদ্মা সেতু চালুর খবরে উচ্ছ্বসিত এ অঞ্চলের ফুল চাষীরা। তারা বলছেন, এখন আর ফেরিঘাটে আটকা পড়ে ফুল নষ্ট হবে না। সকালে ফুল তুলে সেই ফুল ঢাকা-চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় পাঠাতে পারবেন। ভালো ফুল পাঠাতে পারলে ভারো দামও পাবেন এমনটাই আশা তাদের।


এই বিষয়ে গদখালীর ফুল চাষী আল-আমিন হোসেন বিবার্তাকে বলেন, পদ্মা সেতু চালু হলে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলার পাইকারি ক্রেতারা গদখালী হাট থেকে ফুল কিনতে আসবে। এতে ফুলের চাহিদা বাড়বে এবং দাম ভালো পাওয়া যাবে।



গদখালী শরীফপুরের ফুলচাষী স্বাধীন আহম্মেদ বিবার্তা প্রতিনিধিকে বলেন, পদ্মা সেতুর কারণে গদখালীর ফুল চাষী ও ব্যবসায়ীদের অর্থনৈতিক পরিবর্তন আসবে। গত কয়েক বছর ফুলের চাহিদা কম থাকায় এখানকার ফুল চাষীরা লাভবান হতে পারছে না। আশাকরি পদ্মাসেতু চালু হলে ফুল পাঠাতে সময়, অর্থ দুইই বাঁচবে। ফুল সতেজ ও টাটকা থাকতে পৌঁছালে পাইকারি ব্যবসায়ীরাও লাভবান হতে পারবে।


গদখালীর ফুলচাষি ও বাংলাদেশ ফ্লাওয়ার সোসাইটির সভাপতি আব্দুর রহিম বিবার্তাকে মুঠোফোনে বলেন, যশোরের ১৫'শ হেক্টর জমিতে ৬ হাজার ফুল চাষী বিভিন্ন ধরনের ফুল চাষ করেন। দেশের চাহিদার শতকরা ৬০ থেকে ৭০ ভাগ ফুল যশোর থেকে সরবরাহ করা হয়ে থাকে। কিন্তু নিজস্ব কোনো পরিবহন ব্যবস্থা না থাকায় অনেক সময় ঘাটে (দৌলতদিয়া) যানজটের কারণে অনেক ফুল নষ্ট হয়ে যায়। যার ফলে এখানকার অধিকাংশ ফুল চাষী ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পদ্মা সেতুর ফলে এই সমস্যাটা ফুল চাষী ও ব্যবসায়ীরা কাটিয়ে উঠতে পারবেন। এবং স্বল্প সময়ের মধ্যে গদখালীর ফুল রাজধানীসহ সারা দেশে পৌঁছে যাবে।



যশোরের চাঁচড়ার মৎস্যপল্লীর সুবিধা


যশোরের চাঁচড়া মৎস্যপল্লীতে দেশে মোট চাহিদার ৫০ শতাংশ রেণুপোনা উৎপাদন হয়। সংশ্লিষ্টদের সাথে কথা বলে জানা যায়, এখানে প্রতিদিন প্রায় ৩০ লাখ টাকার পোনা বেঁচাকেনা হয়। প্রায় শতাধিকের বেশী চাষীর প্রতি সপ্তাহে অন্তত ১০ প্রজাতির চার থেকে পাঁচ হাজার কেজি রেণুপোনা উৎপাদন করেন। মৎস্যপল্লীর অধিকাংশ ব্যবসায়ী চাষী জানান, পদ্মা সেতু চালু হলে ব্যবসার পরিধিতে আমুল পরিবর্তন আসবে। ফলে লাভবান হবেন মৎস্যচাষী, ব্যবসায়ী, শ্রমিকসহ সবাই। কমে যাবে ফেরিঘাটে আটকে থাকার ভোগান্তি, রক্ষা মিলবে সিন্ডকেট আর চাঁদাবাজির হাত থেকে। বাড়বে সরকারের রাজস্বও। তাই সেতু উদ্বোধনের প্রহর গুনছেন যশোর অঞ্চলের প্রায় পাঁচ হাজার মৎস্যচাষি।


পদ্মা সেতুর ফলে কী ধরণের সুবিধা আসতে পারে এই সম্পর্কে আশিকুর রহমার নামের এক রেণুপোনা ব্যবসায়ী বিবার্তাকে বলেন, পদ্মাসেতু চালু হলে চাঁচড়া মৎস্যপল্লীতে বাইরের ব্যবসায়ীরা আসবে এবং তাতে করে চাহিদা বাড়বে। অন্যদিকে বৃদ্ধি পাবে মাছের পরিমাণ। বাহিরের জেলা থেকে এই জেলায় অর্থাৎ বরগুনা বরিশালের পোনা মাছ সহজে আসবে, আবার যশোরের বিভিন্ন পোনা মাছ খুলনাসহ ঢাকা, বরিশাল, চট্টগ্রামেও যাবে।


মামুন হোসেন নামে এক রেণু ব্যবসায়ী বিবার্তাকে জানান, যশোরে দেশের মোট চাহিদার প্রায় অর্ধেক রেণু বা মাছের পোণা উৎপাদন হয়। যাতায়াত ব্যবস্থা ভালো হলে অবশ্যই বাইরের জেলা থেকে খুচরা ও পাইকারি ব্যবসায়ীরা আসবে। এতে আমাদের যশোরের পোনা মাছের চাহিদা বাইরের জেলাগুলোতে বাড়বে।



এই বিষষে জানতে চাইলে যশোর জেলা মৎস্য হ্যাচারি মালিক সমিতির সভাপতি ফিরোজ খান যশোরে মৎস্য খাতেও ব্যাপক পরিবর্তন হবে জানিয়ে তিনি এই প্রতিনিধিকে বলেন, দেশের মোট চাহিদার ৫০-৬০ শতাংশর বেশি রেণুপোনা যশোরে উৎপাদন হয়। যাতায়াত ব্যবস্থার কারণে ২০-৩০ শতাংশ পোনা মারা যেত। পদ্মা সেতু চালু হলে আমরা স্বল্প সময়ে পোনা নির্দিষ্ট স্থানে পৌঁছাতে পারব। আমরা যারা দীর্ঘদিন ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছি তারা ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে পারব।


তিনি আরো বলেন, অনেক সময় যশোর থেকে রেনুপোনা ঢাকায় নিতে ফেরিঘাটে জ্যামে আটকে থাকতে হতো। এতে পানি গরম হওয়ার ফলে পোনা মারা যেত। এমন বিড়ম্বনায় বেশির ভাগ ব্যবসায়ীই পড়েছেন। এজন্য যশোরের পোনার মান ভালো হলেও অন্য জেলার ব্যবসায়ীরা নিতে আসতে চান না। পদ্মাসেতু চালু হলে এই সমস্যা থাকবে না। কয়েক ঘন্টায় পদ্মা সেতু পাড়ি দিয়ে নির্দিষ্ট সময় ও স্থানে সহজে রেনুপোনা সরবরাহ করতে পারব। ফলে খরচও কমবে, একই সাথে ব্যবসার পরিধিও বাড়বে।



যশোরের কৃষি বিপণন সুবিধা


যশোর জেলার সদর উপজেলার বারিনগরের হাটটি দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সবচেয়ে বড় সবজির পাইকারির হাট। পদ্মাসেতু উদ্বোধনের খবরে এখানকার পাইকারী ব্যবসায়ীরা দারুণ খুশি। এই বাজার থেকে অনেক চাষী ও ব্যাবসায়ীরা ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলাতে ভালো দামে বিক্রির আশা নিয়ে সবজি পাঠান। কিন্তু ফেরি ঘাটে দীর্ঘ জ্যাম আর ফেরিপার হতে বেশি সময় লাগার কারণে অধিকাংশ সময় সবজি পঁচে যায় অথবা এর মান নষ্ট হয়ে যায়। পদ্মাসেতু চালু হলে ৪ ঘন্টায় সবজি নিয়ে ঢাকায় পৌঁছানো যাবে। সবজিও ভালো থাকলে দামও ভালো পাওয় যাবে।


মিকাইল নামের একজন সবজি ব্যবসায়ী বিবার্তাকে জানান, সবজি ঢাকায় পাঠানোর সময় চিন্তায় থাকি সময়মতো ট্রাকের ফেরিঘাট পার হওয়া নিয়ে। কারণ সময়মতো ফেরি পার হতে না পারলে সঠিক সময়ে ঢাকার আড়তে সবজি পৌঁছাবে না। এতে সবজির মান কমে যাবে। দামও কম হবে। তবে পদ্মা সেতু চালু হলে আমাদের আর এ সমস্যা থাকবে না। সময়মতো সবজি পাঠাতে পারব।


বিবার্তা/রোমেল/জেএইচ


সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

পদ্মা লাইফ টাওয়ার (লেভেল -১১)

১১৫, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ,

বাংলামোটর, ঢাকা- ১০০০

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2021 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com