পদ্মা সেতু: প্রযুক্তিশিল্পের নতুন সিলিকন ভ্যালি হবে দক্ষিণাঞ্চলে
প্রকাশ : ২৪ জুন ২০২২, ১৭:০৪
পদ্মা সেতু: প্রযুক্তিশিল্পের নতুন সিলিকন ভ্যালি হবে দক্ষিণাঞ্চলে
উজ্জ্বল এ গমেজ
প্রিন্ট অ-অ+

পদ্মা সেতু। দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের তিন কোটি মানুষের প্রায় দুই যুগের লালিত স্বপ্নের নাম। এ সেতু চালুর পর ওই জেলাগুলির মানুষের জন্য টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি শিল্প খাতে একটা নতুন জাগরণ ঘটবে বলে ধারণা করছেন বিশেষজ্ঞরা।


প্রযুক্তিবিদদের মতে, স্বপ্নের এই সেতু চালু হলেই দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষের ঢাকায় আসা-যাওয়া সহজ হবে। এর ফলে টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবসায়ীদের ঢাকাকেন্দ্রিক ব্যবসা ও কার্যক্রম ধীরে ধীরে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলেও বিস্তৃত হবে। তিন কোটি মানুষের ভাগ্য বদলে জেলাগুলিতে গড়ে উঠবে টেলিযোগাযোগ ও প্রযুক্তিখাতে সহযোগী নতুন ক্ষুদ্র শিল্প, ফাইবার অপটিক্যাল শিল্প, গার্মেন্টস শিল্প, মোবাইল ম্যানুফ্যাকচারিং কল-কারখানা, হাইটেক পার্ক, উদ্যোক্তা, ই-কমার্স, ফ্রিল্যান্সিং, আউসোর্সিং রোবটিক্স, আইওটিসহ ফিউচার টেকনোলজি সম্পর্কিত বিভিন্ন ধরনের শিক্ষা ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান। ফলে দক্ষিণাঞ্চল হয়ে উঠতে পারে আইসিটি বিনিয়োগকারীদের স্বর্গরাজ্য। একটি পরিকল্পিত ও ডায়নামিক ইকোসিস্টেম তৈরির মাধ্যমে ওই অঞ্চল হয়ে উঠতে পারে প্রযুক্তি শিল্পের নতুন সিলিকন ভ্যালি।


অর্থনীতি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, স্বপ্নে এই সেতু চালুর ফলে দেশের অর্থনীতিতে বড় প্রভাব পড়বে। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে ব্যবসা-বাণিজ্যে ব্যাপক প্রসার ঘটবে। মোংলা সমুদ্র বন্দর হবে ব্যবসা বাণিজ্যের নতুন হাব। ইতোমধ্যেই পদ্মা সেতুকে ঘিরে বিভিন্ন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন শুরু হয়েছে। জানা গেছে, পদ্মা সেতুকে ঘিরে ইতোমধ্যেই সেতু সংলগ্ন মুন্সীগঞ্জের লৌহজং, মাদারীপুরের শিবচরের কাঁঠালবাড়ী, চরজানাজাত ও শরীয়তপুরের জাজিরা এলাকায় শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে মহাপরিকল্পনা হাতে নেয়া হয়েছে। গড়ে উঠছে ছোট-বড় শিল্পকারখানা ও পর্যটন কেন্দ্র। পদ্মার চরাঞ্চলের জন্য বিভিন্ন পরিকল্পনার মধ্যে অলিম্পিক ভিলেজ, বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট সিটি, হাইটেক পার্ক, বিমানবন্দর রয়েছে। পদ্মা সেতু সংলগ্ন জাজিরার নাওডোবা এলাকায় প্রায় ২ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে ‘শেখ হাসিনা তাঁতপল্লী’ গড়ে তোলা হচ্ছে। এখানে আবাসন, শিক্ষা-চিকিৎসাসহ আধুনিক সব সুযোগ-সুবিধা থাকবে।



বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের পিছিয়ে পড়া খুলনা বিভাগে ২১টি জেলা খুলনা, বাগেরহাট, যশোর, সাতক্ষীরা, নড়াইল, কুষ্টিয়া, মেহেরপুর, চুয়াডাঙ্গা, ঝিনাইদহ ও মাগুরা; বরিশাল বিভাগের বরিশাল, পিরোজপুর, ভোলা, পটুয়াখালী, বরগুনা ও ঝালকাঠি এবং ঢাকা বিভাগের গোপালগঞ্জ, ফরিদপুর, মাদারীপুর, শরীয়তপুর ও রাজবাড়ীরসহ সারাদেশের মানুষের ভাগ্যের চাকা ঘুরিয়ে দেবে পদ্মা সেতু।


পদ্মা সেতুর কল্যাণে দক্ষিণাঞ্চলে তথ্যপ্রযুক্তিশিল্প বিকাশে কেমন পরিবর্তন আসবে জানতে চাইলে দেশের শীর্ষ ডিজিটাল মার্কেটার ও ফ্রিল্যান্সার মো. ইকরাম বলেন, স্বপ্নে পদ্মা সেতু চালু হলে দেশের দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের জন্য প্রযুক্তিখাতে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে যাবে। যেহেতু পদ্মাপাড়ের জেলাগুলোর সাথে উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা তৈরি হচ্ছে, আশা করছি, পদ্মার দুই পাড়ে গড়ে উঠবে বিশ্বমানের প্রযুক্তি আইটি ফরেনসিক ল্যাব ও স্মার্ট সিটি। তথ্যপ্রযুক্তিতে দক্ষ জনবল গড়ে তুলতে সফটওয়্যারভিত্তিক বিভিন্ন প্রশিক্ষণ কেন্দ্র। স্থানীয় জনশক্তিকে প্রশিক্ষিত করার মাধ্যমে আইটি খাতে বাড়বে দক্ষ জনশক্তি। হ্রাসকৃত ব্যয় ও দ্রুত যোগাযোগ ব্যবস্থার ফলে দক্ষিণাঞ্চল হয়ে উঠতে পারে আইসিটি বিনিয়োগকারীদের ভূ-স্বর্গ।


১২ বছরে ৫০ হাজারেরও বেশি আইটি প্রফেশনাল তৈরি করা দেশসেরা ফ্রিল্যান্সার প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান ক্রিয়েটিভ আইটির চেয়ারম্যান মনির হোসেন। তিনি বিবার্তাকে বলেন, পদ্মা সেতু দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলসহ সারাদেশের জন্য নতুন দিগন্তের সূচনা করতে যাচ্ছে। বহুমুখী পদ্মা সেতুর কারণে আইটি খাতে আসবে ইতিবাচক পরিবর্তন। কেননা, পদ্মা সেতুতে রাখা হয়েছে ফাইবার অপটিক্যাল। সেতুটির কল্যাণে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের গ্রামপর্যায় পর্যন্ত ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট পৌঁছে যাবে। ফলে আইটি খাতে ঘটবে বিপ্লব। বাড়বে আইটিকেন্দ্রিক কর্মসংস্থান, বৃদ্ধি পাবে রেমিটেন্স যোদ্ধার সংখ্যা, বিকশিত হবে অর্থনীতি। তথ্যপ্রযুক্তি যেহেতু সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে আসবে, পরবর্তী প্রজম্ম প্রথম থেকেই প্রস্তুত হতে পারবে চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের জন্য। যা ডিজিটাল বাংলাদেশের স্বপ্ন বাস্তবায়নে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখবে।


স্বপ্নের পদ্মা সেতু চালুর পর ই-কমার্স সেক্টরে কতটুকু পরিবর্তন আসবে জানতে চাইলে ই-কমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ই-ক্যাব) প্রতিষ্ঠাতা ও সাবেক সভাপতি রাজিব আহমেদ বিবার্তাকে বলেন, পদ্মা বহুমুখী সেতু সারাদেশের অর্থনীতির জন্য খুব বড় আশীর্বাদ হবে। এক-দুই বছরের মধ্যেই ই-কমার্স সেক্টরের জন্য এটি আরো বড় সুফল নিয়ে আসবে। দক্ষিণাঞ্চলের অনেকগুলো জেলার পণ্য আমরা অনেক দ্রুত এবং সহজে পাব। যেমন, বরিশাল, খুলনা জেলাগুলোর কিছু মিষ্টি আছে, যেগুলো খুব চাহিদা আছে। কিন্তু ফেরিতে আটকা পরে হয়ত নষ্ট হয়ে যেত। চাঁদপুরের মাছ যেমন ঢাকায় কয়েক ঘন্টায় চলে আসে তা দক্ষিণাঞ্চলের জেলাগুলোতেও হবে। একইসাথে ১ বছরের মধ্যেই ওই জেলাগুলোতে অনেক নতুন ই-কমার্স উদ্যোক্তা তৈরি হবে। ফলে নতুন অনেক কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে।



সুফলগুলি দ্রুত আসার জন্য কয়েকটি পদক্ষেপের কথা জানিয়েছেন এই ই-কমার্স গবেষক। তার মতে, এর সুফল ভোগ করার জন্য কিছু পদক্ষেপ নেয়া উচিৎ। লজিস্টিক বা কুরিয়ার সার্ভিসগুলো ওই জেলাগুলোর বিভিন্ন উপজেলায় যেন জরুরি ভিত্তিতে নতুন শাখা চালু করে। সেই সাথে দক্ষিণাঞ্চলের জেলাগুলোতে অন্তত উপজেলা পর্যায়ে ফাইবার অপটিক ক্যাবেলের ইন্টারনেটের সংযোগ বাড়াতে সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, আইএসপি কোম্পানিগুলোর এক সাথে কাজ করতে হবে। পদ্মা সেতু চালু হলে বাংলাদেশের সব প্রান্তেই ই-কমার্সের যে কোনো প্রডাক্টের ডেলিভারি কয়েক ঘন্টার মধ্যে সম্ভব হবে। তাই ই-কমার্সের প্রসারে শেষ সম্ভবনার দুয়ারটি খুলে গেল পদ্মা সেতুর কল্যাণে।


দেশে শিশু-কিশোরদের মধ্যে মহাকাশবিজ্ঞান বিষয়ক শিক্ষার আগ্রহ তৈরি করতে, মহাকাশ গবেষণা যন্ত্রপাতি নিয়ে রকেট টেকনোলজির দক্ষতা বৃদ্ধি, গ্রাউন্ড স্টেশনের বিভিন্ন কার্যক্রম সম্পর্কে সচেতনতা বাড়াতে পরিকল্পিতভাবে কাজ করছেন বাংলাদেশ ইনোভেশন ফোরাম ও স্পেস ইনোভেশন ক্যাম্পে প্রতিষ্ঠাতা আরিফুল হাসান অপু।


পদ্মা সেতু চালুর পর দেশের মহাকাশবিজ্ঞান, রোবটিক্স, রকেট টেকনোলজি সায়েন্স সেক্টরে কতটুকু পরিবর্তন আসবে? এমন প্রশ্নে তিনি বিবার্তাকে বলেন, পদ্মা সেতু চালুর পর দক্ষিণাঞ্চলের সাথে একটা স্মার্ট যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে উঠবে। আমি যেহেতু দীর্ঘ দিন ধরে সারাদেশের শিশু-কিশোর, তরুণ-তরুণীদের রোবটিক্স, মহাকাশবিজ্ঞান ও রকেট টেকনোলজি বিষয়ক শিক্ষা, ওয়ার্কশপ, সেমিনার, কর্মশালা নিয়ে কাজ করছি, এখানে একটা বড় প্রভাব পড়বে। আমি দেখেছি, দক্ষিণাঞ্চলের জেলাগুলো থেকে অসংখ্য মেধাবী, আগ্রহী সম্ভাবনাময় খুদে বিজ্ঞানীরা শুধু ঢাকায় আসতে সময় বেশি লাগার জন্য সেমিনার, কর্মশালায় যোগ দিতে কষ্ট হয়ে যেত। পদ্মা সেতুর কল্যাণে সেই সমস্যা আর থাকবে না। একই সাথে যোগাযোগের সুবিধার কারণে দক্ষিণাঞ্চলে রোবটিক্স, আইটিসহ ফিউচার টেকনোলজি রিলেটেড অনেক শিক্ষা ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠবে বলে আমি মনে করি।


ডিজিটাল বাংলাদেশ বিনির্মাণের নেপথ্যে কাজ করছেন সারাদেশে দুই হাজারেরও বেশি ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট ব্যবসায়ী। পদ্মা সেতু চালুর পর দক্ষিণাঞ্চলের টেলিযোগাযোগ ও প্রযুক্তিশিল্পের বিকাশের সম্ভাবনা নিয়ে বিবার্তার সাথে কথা বলেন ইন্টারনেট সার্ভিস প্রোভাইডার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (আইএসপিএবি) এর সভাপতি এবং অপটিম্যাক্স কমিউনিকেশন লিমিটেডের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. ইমদাদুল হক। তিনি বলেন, এই সেতু চালু হলে দক্ষিণাঞ্চলে টেলিকম ও তথ্যপ্রযুক্তিশিল্প বিকাশে একটা বড় ধরনের পরিবর্তন আসবে। বিশেষ করে পদ্মার ওপারের মানুষেরা আগে ১২-১৪ ঘণ্টায় ঢাকায় আসতেন। এখন তারা ৩ থেকে ৪ ঘণ্টায় চলে আসতে পারবেন। কেউ যদি মনে করেন যে সকালে ওপার থেকে এসে অফিস করবেন, সেটাও সম্ভব। আগে পদ্মার ওপারে ইন্টারেটের কানেক্টিভিটির জন্য নির্ভর ছিলাম বিদ্যুৎ টাওয়ারের উপরে। পদ্মা সেতুতে ফাইবার অপটিক্যাল ক্যাবল সংযোগ ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। এর ফলে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের গ্রামপর্যায় পর্যন্ত ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট কানেক্টিভিটি পৌঁছে যাবে। আমাদের ইন্টারনেট সার্ভিস সেক্টরে কাজ করার জন্য প্রয়োজনের তুলনায় জনবল অনেক কম। পদ্মা সেতু চালু হলে অনেক মানুষ ঢাকায় কাজ করার জন্য উৎসাহিত হবে।



তিনি আরো বলেন, আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ইন্টারনেট সেক্টরে পেনিটেশন বাড়বে। এখন সারাদেশ পেনিটেশন মাত্র ৭%। পদ্মা সেতুকে কেন্দ্র করে আমাদের টার্গেট শুধু দক্ষিণাঞ্চলেই আগামী ১ বছরের মধ্যে দক্ষিণাঞ্চলে ১০% পেনিটেশন বাড়ানো। সাথে ওই এলাকায় বিভিন্ন তথ্যপ্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান, গবেষণা কেন্দ্র, ম্যানুফ্যাকচারিং কল-কারখানা গড়ে উঠবে।


বর্তমানে বাংলাদেশে বিপিও শিল্পখাতে সারাদেশে ২২৫টির বেশি সদস্য কোম্পানি রয়েছে। এসব কোম্পানিতে ৬৫ হাজারেরও বেশি কর্মকর্তা-কর্মাচারী কাজ করছেন। পদ্মা সেতু চালুর পর দক্ষিণাঞ্চলে ২১টি জেলার মানুষের জন্য তথ্যপ্রযুক্তিশিল্পে কেমন পরিবর্তন নিয়ে আসবে? জানতে চাইলে দেশের তথ্যপ্রযুক্তি শিল্পের বিজনেস প্রসেস আউটসোর্সিং (বিপিও) খাতের অন্যতম শীর্ষ বাণিজ্যিক সংগঠন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব কন্টাক্ট সেন্টার অ্যান্ড আউটসোর্সিংয়ের (বাক্কো) সাধারণ সম্পাদক এবং ফিফোটেকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা তৌহিদ হোসেন বিবার্তাকে বলেন, স্বপ্নের পদ্মা সেতু উদ্বোধনের মাধ্যমে দক্ষিণাঞ্চলের সবগুলো জেলার সাথে যোগাযোগ ও প্রযুক্তি খাতের কানেক্টিভিটি নিরবিচ্ছিন্ন হবে। আর এই নিরবিচ্ছিন্ন কানেক্টিভিটির মাধ্যমে দক্ষিণাঞ্চলে গড়ে উঠতে পারে আরেকটি নতুন স্মার্টসিটি, আইটি হাব। প্রযুক্তি ব্যবসায়ীদের জন্য সিলিকন ভ্যালি। এছাড়াও পদ্মার দুই পাড়ে গড়ে উঠতে পারে প্রফেশনাল ফ্রিলান্সার, আউটসোর্সিং, ই-কমার্স, হ্যান্ডসেট তৈরির নতুন ম্যানুফেকচারিং কল-কারখানা, ফাইবার শিল্প, এমনকি প্রযুক্তিখাতের সহযোগী ক্ষুদ্র শিল্প কারখানা।


পদ্মা বহুমুখী সেতু দক্ষিণাঞ্চলে টেলিকমিউনিকেশন ও তথ্যপ্রযুক্তিশিল্প বিকাশে ব্যাপক ভূমিকা পালন করবে বলে জানিয়েছেন রবি আজিয়াটা লিমিটেডের চিফ রেগুলেটরি অ্যাফেয়ার্স অফিসার শাহেদ আলম। তিনি বিবার্তাকে বলেন, পদ্মা সেতু চালু হলে সমগ্র দেশের সঙ্গে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি হবে। পদ্মা সেতু জাতীয় উন্নয়নে ব্যাপক ভূমিকা রাখবে। বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়বে। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে অর্থনৈতিক অঞ্চল, হাইটেক পার্ক ও বেসরকারি শিল্প শহর গড়ে ওঠার পাশাপাশি টেলিযোগাযোগ খাতেরও প্রসার হবে।


টেলিযোগাযোগ ও প্রযুক্তিখাতের গ্রাহক অধিকার নিয়ে সোচ্চার সংগঠন বাংলাদেশ মুঠোফোন গ্রাহক অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মহিউদ্দিন আহমেদ বিবার্তাকে বলেন, পদ্মা সেতু উদ্বোধনের মাধ্যমে দক্ষিণাঞ্চলের সাথে যোগাযোগ ও প্রযুক্তি খাতের কানেক্টিভিটি নিরবিচ্ছিন্ন হবে। আর এই নিরবিচ্ছিন্ন কানেক্টিভিটির মাধ্যমে দক্ষিণাঞ্চলে গড়ে উঠতে পারে বাংলাদেশ আরেকটি সিলিকন ভ্যালি। প্রযুক্তি খাতের বেসরকারি উদ্যোক্তা, এমনকি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলির হেডকোয়ার্টার গড়ে উঠেছে রাজধানীভিত্তিক। দক্ষিণাঞ্চলের শিক্ষার্থী, চিকিৎসক প্রযুক্তিবিদ বা আধুনিক কৃষি কাজে নিয়োজিত ব্যক্তিবর্গ শিল্প মালিকরা তাদের উৎপাদিত পণ্য নিয়ে আসতে হয় ঢাকায়। যাতায়াত ও পণ্য আনা-নেওয়ার ঝুঁকি এবং সময়ের কারণে দক্ষিণাঞ্চলের জনগণের জন্য এখনো প্রযুক্তিখাতে ইকোসিস্টেম গড়ে উঠতে পারেনি। যেমনি ভাবে ১৯৬৯ সালের ১৭ মে ইন্টারনেটভিত্তিক শিল্পবিপ্লব শুরু হলেও বাংলাদেশ সেই শিল্পবিপ্লবের সুফল বাংলাদেশ পেয়েছে অনেক পরে। ঠিক একইভাবে যোগাযোগের নিরবিচ্ছিন্ন মাধ্যম না থাকায় ডিজিটাল বাংলাদেশের শতভাগ সুফল থেকে বঞ্চিত হয়েছে দক্ষিণাঞ্চলের মানুষ।


পদ্মা সেতু উদ্বোধনের মাধ্যমে দক্ষিণাঞ্চলে তথ্যপ্রযুক্তিশিল্পে নতুন যুগের সূচনা হবে জানিয়ে সংগঠনটির সভাপতি বলেন, ই-কমার্স, কৃষি খাতে প্রযুক্তির ব্যবহার, চিকিৎসা, গবেষণা, ফ্রিল্যান্সিং, রোবটিক্স ও আইওটি শিল্পে নতুন বিপ্লব শুরু হবে। পদ্মায় দুই পাড়ে গড়ে উঠবে অগ্রসরমান প্রযুক্তি (অ্যাডভান্স টেকনোলজি)। আবার সেই প্রযুক্তি ব্যবহারে দক্ষ জনবল গড়ে তুলতে প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, সফটওয়্যার ফিনিশিং স্কুল, মর্ডানাইজেশন অব রুবেল অ্যান্ড আরবান লাইভস, স্মার্ট সিটি, আইটি ফরেনসিক ল্যাবের মতো প্রকল্প।


মেধাবী তরুণ-তরণীদের প্রযুক্তিনির্ভর কর্মসংস্থানের সুযোগ করে দিতে ২০১৮ সালে সারাদেশে ২৮টি হাই-টেক পার্ক স্থাপনের পরিকল্পনা হাতে নেয় তথ্য ও প্রযুক্তি বিভাগের অধীনে বাংলাদেশ হাই-টেক পার্ক কর্তৃপক্ষ। চলতি বছরের শুরুতেও ‘জেলা পর্যায়ে আইটি/হাই-টেক পার্ক স্থাপন (১২টি জেলায়)’ শীর্ষক প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। ইতোমধ্যে দেশের বিভিন্ন জেলায় হাই-টেক পার্কের কার্যক্রম চালু হয়েছে। তরুণ-তরুণীদের প্রযুক্তিনির্ভর কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। এবছরও বিভিন্ন জেলায় আইটি/হাই-টেক পার্কের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়েছে। স্বপ্নের পদ্মা সেতুর সুফল ও প্রযুক্তিশিল্প বিকাশের এর ভূমিকা নিয়ে বিবার্তার সাথে কথা বলেন বাংলাদেশ হাই-টেক পার্ক কর্তৃপক্ষের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ডা. বিকর্ণ কুমার ঘোষ।



তিনি বলেন, পদ্মা সেতু চালু হলে আইসিটি ডিভিশনের ক্যাপাসিটি আরো বাড়বে। দেশের মানুষের কাছে পৌঁছানোর ক্ষমতা এবং মানুষকে আইসিটি সেবা দেয়ার সুযোগ আরো বেড়ে যাবে। আইটি/হাই-টেক পার্কের প্রকল্পের অধীনে ইতোমধ্যেই পদ্মার ওপারে একটা বড় প্রকল্প স্থাপনের জন্য অনুমোদন দেয়া হয়েছে। সেটি হলো, শেখ হাসিনা ফন্টিয়ার টেকনোলজি। এটা প্রধানমন্ত্রীর স্বপ্নে একটা প্রকল্প। এই প্রকল্পের সাথে হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়, অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়, ম্যাসাচুসেট্‌স ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির (এমআইটি) মতো পৃথিবীর বড় বড় প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে সংযোগ থাকবে। এসব বিখ্যাত বিশ্ববিদ্যালয়ের রিসোর্স ও টিচার্সদের সাথে কোলাবরশনের মাধ্যমে এই প্রতিষ্ঠানের শিক্ষা কার্যক্রম পরিচাললিত হবে। এ লক্ষে ইতোমধ্যেই এমআইটির সাথে একটা চুক্তি হয়েছে। তারা এখানে টেকনোলজির ন্যানো ল্যাব তৈরি করবে। এছাড়াও জাপানও এখানে একটা আইটি ইউনিভার্সিটি করতে চায়। এভাবে জাপানসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের সাথে এক্সচেঞ্জ প্রোগ্রাম শুরু হবে। দেশে একটা বড় ধরনের পরিবর্তন হতে যাচ্ছে এই পদ্মা সেতুর মাধ্যমে।


পদ্মা বহুমুখী সেতু চালুর পর দক্ষিণাঞ্চলে টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তিশিল্প বিকাশে কেমন প্রভাব ফেলতে পারে এমন প্রশ্নে ডাক ও টেলিযোগাযোগমন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার বিবার্তাকে বলেন, স্বপ্নের পদ্মা বহুমুখী সেতু চালুর মাধ্যমে সারাদেশে ডিজিটাল কানেক্টিভিতে বড় ধরনের বিপ্লব ঘটবে। আমরা কুয়াকাটাতে একটা ল্যান্ডিং স্টেশন করেছি। এই স্টেশন থেকে বঙ্গবন্ধু সেতু দিয়ে সারাদেশে ইন্টারনেট কানেক্ট করতে হয়। এখন পদ্মা সেতু হওয়ার ফলে ইন্টারনেট ব্যান্ডউইথ কানেক্টিভিটির দূরত্বটা কমে যাবে। সেসাথে ল্যাটেন্সিটাও কমে যাবে। ডাইরেক্টলি ইন্টারনেট কানেক্ট করা যাবে। এর ফলে আমরা ইন্টারনেটের যে গতিটা পেতাম, সেই গতি আরো বহুগুণ বেড়ে যাবে। এতদিন কুয়াকাটা থেকে সরাসরি দক্ষিণ বঙ্গের যে সম্প্রসারণটা দরকার ছিল, সেটা দূরত্বের কারণে সুবিধা হচ্ছিল না। এখন আমাদের জন্য একটা বড় সুযোগ তৈরি হবে।


তথ্যপ্রযুক্তিশিল্প বিকাশে দক্ষিণাঞ্চলের জেলাগুলির জন্য প্রস্তাবিত হাইটেক পার্কগুলি বিশেষ ভূমিকা রাখবে উল্লেখ করে টেলিযোগাযোগমন্ত্রী বলেন, যদি ডিজিটাল টেকনোলজির বিকাশের কথা বলি, যেমন ঢাকার আশপাশে কানেক্টেট জায়গাগুলিতে হাইটেকপার্কগুলি স্থাপন করা হচ্ছে। সারাদেশে জেলা পর্যায়ে করার পরিকল্পনা রয়েছে। দক্ষিণবঙ্গের জন্য যেসব হাইটেক পার্কগুলি প্রস্তাব করা হয়েছে, সেগুলোর ক্ষেত্রে ডিজিটাল টেকনোলজি ডিভাইসেস এবং সফটওয়্যার উন্নয়ন কেন্দ্রগুলো ব্যাপকভাবে প্রসারিত হবে। দক্ষিণাঞ্চলের জনগণ যে টেলিকমিউনিকেশন ও ইন্টারনেট সেবা পেত কিন্তু এর সাথে যেসব ফিজিক্যাল ফেসিলিটিসগুলি দরকার সেগুলি পেত না। এখন সেগুলো পাবে। আরেকটি বিষয় হলো, আমরা এখন দেশের মধ্যেই মাল্টিপল কানেকশন, রিডানডেন্সি ও ক্রস কানেক্টিভিটি করছি। এ জায়গাগুলোর ক্ষেত্রে পদ্মা সেতু ব্যাপকভাবে সহায়তা করবে। যেমন, আমি ঢাকা থেকে যে কানেক্টিভিটি করছি, সেটাকে আবার চট্টগ্রাম থেকে ডাইরেক্ট কানেক্ট করে ফেলতে পারব। স্বপ্নের পদ্ম সেতু শুধু তথ্যপ্রযুক্তি ও টেলিকমিউনিকেশন শিল্প বিকাশে প্রভাব ফেলবে না, এটা আমাদের জীবনের প্রতিটা ক্ষেত্রে সুদূরপ্রসারি প্রভাব বিস্তার করবে।


পদ্মা বহুমুখী সেতু প্রকল্প সূত্রে জানা যায়, স্বপ্নের পদ্মা বহুমুখী সেতুর কার্যক্রম শুরু হয় ১৯৯৮ সালে। তখন থেকেই পদ্মা সেতুর প্রাক-সম্ভাব্যতা যাচাই শুরু হয়। ১৯৯৯ সালে প্রাক-সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের মাধ্যমে পদ্মা সেতু নির্মাণের পরিকল্পনা শুরু হয়। এটি চলে ২০০০ সাল পর্যন্ত। ২০০১ সালে জাপানিদের সাহায্যে সম্ভাব্যতা যাচাই হয়। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার সরকারের প্রথম মেয়াদের শেষের দিকে ৪ জুলাই ২০০১ তারিখে মাওয়া প্রান্তে সেতুর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। সময়ের পালাবদলে পরে ২০০৪ সালে আন্তর্জাতিক সহায়তা সংস্থা জাইকার সুপারিশ মেনে মাওয়া-জাজিরার মধ্যে পদ্মা সেতু নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। ২০০৮ সালে পদ্মা সেতুর নকশা প্রণয়নে পরামর্শক প্রতিষ্ঠান চূড়ান্ত হয়। মহাজোট সরকার শপথ নিয়েই তাদের নিয়োগ দেয়। ৬ দশমিক ১৫ কিলোমিটার সেতু করার চূড়ান্ত নকশা করা হয়। নানান বাধা-বিপত্তি পেরিয়ে পদ্মা সেতুর সফলভাবে নির্মাণ কাজ সম্পন্ন হয় ২০২২ সালের মে মাসের শেষের দিকে। আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন হচ্ছে আগামীকাল ২৫ জুন।


বিবার্তা/গমেজ/রোমেল/জেএইচ


সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

পদ্মা লাইফ টাওয়ার (লেভেল -১১)

১১৫, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ,

বাংলামোটর, ঢাকা- ১০০০

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2021 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com