মোবাইলের জন্য একযুগ আত্মগোপনে, অতঃপর…
প্রকাশ : ২৪ মে ২০২২, ২২:০৫
মোবাইলের জন্য একযুগ আত্মগোপনে, অতঃপর…
মো. তাওহিদুল ইসলাম
প্রিন্ট অ-অ+

১২ বছর আগে অফিসে যাওয়ার পথে জুয়া খেলা দেখতে দাঁড়িয়েছিল মো. সুমন মিয়া (১৭) নামের এক কিশোর। তার পকেটে ১৫ টাকা। কিন্তু ওই সময় সুমন জুয়া খেলে ১০০ টাকা হেরে যায়। তার কাছে টাকা না থাকায় জুয়াড়িরা জোরপূর্বক তার মোবাইল রেখে দেয়। মোবাইলটি ছিল MY PHONE ব্র্যান্ডের। সুমন মোবাইল খোয়ানোর ভয়ে আর বাসায় ফিরেনি। সময়টা ২০১০ সালে ৩১ আগস্ট। আজ থেকে এক যুগ আগের ঘটনা। ১৭ বছরের সুমনের বয়স এখন ৩০। হয়েছেন ছেলের বাবাও।


ওইদিন সকাল আটটায় বাসা থেকে বের হওয়ার পরে আর বাসায় ফেরনি। সুমন তখন ডায়মন্ড প্যাকেজিং নামে এক গার্মেন্টসে কাজ করতো। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, পরবর্তীতে সুমনের বাবা মো. মোজাফ্ফর (৫২) ছেলের নিখোঁজের বিষয়ে ২০১০ সালের অক্টোবর মাসে ঢাকার পল্লবী থানায় জিডি করেন। যার নাম্বার নং-৩৬২।


মো. মোজাফ্ফর বিশ্বস্থ সূত্রে জানতে পারেন, অফিসে যাওয়ার পথে তার ছেলেকে মার্ক ডিজাইন গার্মেন্টসের সামনে থেকে অপহরণ করা হয়েছে। এরপর তিনি বাদী হয়ে ঢাকার পল্লবী থানায় একটি অপহরণ মামলা করেন, মামলা নং ৯০, তারিখ- ২৯/১০/২০১০, দন্ডবিধি- ৩৬৪।


পল্লবী থানায় মামলা রুজু হওয়ার পর এসআই মো. হাবিবুর রহমান তদন্তভার গ্রহণ করেন। তিনি ভিকটিমকে উদ্ধারের চেষ্টা করেন। পরবর্তীতে ২০১০ সালের ৩০ অক্টোবর মামলাটির তদন্তভার গ্রহণ করেন মহানগর ডিবি পুলিশ মানব পাচার প্রতিরোধ টিমের ডিবি উত্তরের পুলিশ পরিদর্শক আয়নাল হক। তিনি ভিকটিমের ব্যবহৃত মোবাইল ফোনটি উদ্ধার করেন।


মোবাইলের সূত্র ধরে মামলার এজহারভুক্ত আসামি সুলাইমান ও পারভেজকে গ্রেফতার করে পুলিশ রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ শেষে আদালতে সোপর্দ করেন। এরপর তদন্তকারী কর্মকর্তার অন্যত্র বদলি হওয়ায় পর্যায়ক্রমে এসআই মো. আব্দুল কাদের মিয়া, এসআই মো. মনিরুল ইসলাম মামলাটি তদন্ত করে ভিকটিমকে উদ্ধারের চেষ্টা করেন। পরবর্তীতে পুলিশ হেডকোয়ার্টার এর আদেশে মামলাটির তদন্তভার সিআইডির ওপর অর্পণ করা হয়।


সিআইডি ২০১২ সালের ২৫ এপ্রিল মামলাটির তদন্তভার গ্রহণ করে মিরপুর ইউনিট, সিআইডি পুলিশ পরিদর্শক শেখ মতিয়ারকে তদন্তকারী অফিসার নিয়োগ করেন। তিনি তদন্ত শেষে এজাহারভুক্ত আসামিদের বিরুদ্ধে অপহণের অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় পল্লবী থানায় চূড়ান্ত রিপোর্ট দাখিল করেন। পরে বাদীর না-রাজি আবেদনের প্রেক্ষিতে বিজ্ঞ আদালত মামলাটি পুনরায় ডিবির হাতে ন্যাস্ত করেন।


এরপর পল্লবী জোনাল টিম ডিবি (পশ্চিম), ডিএমপির পুলিশ পরিদর্শক মো. আবু আজিফ তদন্ত করে জানতে পারেন ভিকটিমের ব্যবহৃত মোবাইল ফোনটি আসামি মো. সুলায়মান এডিসি ক্যাম্পের কাঁচা বাজারের জুয়ার বোর্ড থেকে ক্রয় করেন। তিনি তদন্ত শেষে ভিকটিম উদ্ধারসহ জড়িত আসামি শনাক্ত না হওয়ায় পল্লবী থানার চূড়ান্ত রিপোর্ট দাখিল করেন। এবারও বাদীর না-রাজির প্রেক্ষিতে আদালতের নির্দেশে মামলার তদন্তভার পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনে (পিবিআই) ন্যস্ত হয়।


পিবিআই-এর পুলিশ পরিদর্শক মোহাম্মদ তরিকুল ইসলাম ২০১৯ সালের ৩ সেপ্টেম্বর মামলাটির তদন্তভার গ্রহণ করেন এবং তদন্তের একপর্যায়ে জানতে পারেন যে, মামলার ভিকটিম নিখোঁজ হওয়ার ১১ দিন পর বাদীর মোবাইলে সন্ধ্যা আনুমানিক সাড়ে ৬টায় সুমন কল করে। ভিকটিমের অবস্থান সম্পর্কে জানতে চাইলে কোন উত্তর না দিয়েই ফোনটি রেখে দেয়। এরপর থেকে মোবাইল নম্বরটি বন্ধ ছিল।


তদন্তকালে পুলিশ পরিদর্শক মোহাম্মদ তরিকুল ইসলাম ওই মোবাইল নাম্বারের মালিক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে সেনিটারি ইন্সপেক্টর আব্দুল হাইকে (৪৫) শনাক্ত করেন। আব্দুল হাই তদন্তকারী কর্মকর্তাকে জানান, মোবাইল সিমটি তার নামে থাকলেও তিনি ব্যবহার করতেন না। তদন্তকালে প্রাপ্ত তথ্যাদি পর্যালোচনায় প্রয়োজনীয় তথ্য প্রমাণের অভাবে ভিকটিমের অবস্থান নিরূপণসহ তাকে উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। তবে ভবিষ্যতে ভিকটিমের কোনো তথ্য পাওয়া গেলে মামলাটি পুনরুজ্জীবিত করা হবে উল্লেখ করে পল্লবী থানার চূড়ান্ত রিপোর্ট দাখিল করেন। যার নং-১০, ০৯/০৩/২০২২ খ্রিঃ দন্ডবিধি ধারা-৩৬৪।



এরপর পিবিআই ঢাকা মেট্রো (উত্তর) এর বিশেষ পুলিশ সুপার মো. জাহাঙ্গীর আলম (বিপিএম-সেবা) তদারকিতে চলতি বছরের ২৩ মে ভিকটিমের বিষয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়ায় পুলিশ পরিদর্শক মোহাম্মদ তরিকুল ইসলাম বিজ্ঞ আদালতে মামলাটি পুনরুজ্জীবিত করার আবেদন করেন। আদালতের নির্দেশে পুনরায় মামলাটির তদন্তভার গ্রহণ করে তদন্তকারী অফিসারের নেতৃত্বে একটি বিশেষ দল তথ্য-প্রযুক্তির সহায়তায় ভিকটিম সুমনকে সোমবার, ২৩ মে সন্ধা সাড়ে ৭টায় ঢাকার কদমতলী থানাধীন মদিনাবাগ থেকে উদ্ধার করেন।


এ বিষয়ে পিবিআই ঢাকা মেট্রোর (উত্তর) বিশেষ পুলিশ সুপার জাহাঙ্গীর আলম বিবার্তাকে বলেন, সুমন ২০১০ সালে হারায়। এখন তার বয়স ৩০। ওই সময় তিনি নিজের উপার্জনের টাকায় একটি ফোন কিনেন। ওই ফোন জুয়াড়িরা জোর করে নিয়ে যায়। ফোন হারিয়েছে, পরিবারকে কী বলবে- এই ভয়ে মূলত সুমন এতটা বছর নিখোঁজ ছিল। তবে এর নেপথ্যে অন্য কোনো কারণ নাই।


তিনি জানান, এই দীর্ঘ সময়ের মধ্যে সুমন বিয়ে করেছেন এবং তার একটি সন্তানও আছে। তার গ্রামের বাড়ি মাদারীপুর জেলার শিবচর থানার নলগোড়া গ্রামে। এই মামলার তদন্ত কর্মকর্তা মোহাম্মদ তরিকুল ইসলাম বিবার্তাকে বলেন, ভিকটিম সুমনকে গতকাল উদ্ধার করি। আমরা তিন বছর আগে এই মামলার তদন্তের দায়িত্ব পাই। এই তিন বছর ধরেই মামলায় লেগে ছিলাম। সর্বশেষ আমরা মামলার তদন্ত রিপোর্ট আদালতে দিয়েছিলাম এই বলে যে, ভিকটিম সুমনকে আর পাওয়া যাচ্ছেই না। তারপরও আমরা লেগেই থাকি। এরপর একটা ফোন নাম্বার পাই এবং নাম্বারের সূত্র ধরে কাজ শুরু করি। এক পর্যায় ভিকটিমকে শনাক্ত করতে সক্ষম হই।


মামলার বিষয়ে তিনি বলেন, ভিকটিম আদালতে জবানবন্দি দিয়েছে যে, আমাকে কেউ অপহারণ করেনি। আমি নিজে থেকেই মোবাইল হারানোর ভয়ে আত্মগোপনে চলে গেছিলাম।


ভিকটিম মো. সুমন মিয়া ও তদন্তকারী কর্মকর্তার সাথে কথা বলে জানা যায়, সুমনরা দুই ভাই, এক বোন। সে সবার ছোট। ২/৩ মাস লেখাপড়া বন্ধ থাকার পর এই ঘটনার পূর্বে দেড়-দুই মাস ধরে ডায়মন্ড প্যাকেজিং নামে একটি গার্মেন্টসে হেলপার হিসাবে কাজ করত। ঘটনার দিন অফিসে যাওয়ার সময় মিরপুর-১১ নম্বর বাজারের চার রাস্তার মোড়ে তিন তাসের জুয়া খেলা হচ্ছিল। সেখানে সে দাঁড়িয়ে অনেক্ষণ জুয়া খেলা দেখে। জুয়া খেলায় ১০০ টাকা ধরে হেরে যায়। তার কাছে টাকা না থাকায় জুয়াড়িরা জোরপূর্বক মোবাইল রেখে দেয়।


জুয়া খেলার একজন তাকে বলে ৫০০ টাকা নিয়ে আয় তোকে মোবাইলটি দিয়ে দেই। এরপর তার বোনের দেবর বেয়াই আজমের নিকট থেকে ৫০০ টাকা নিয়ে সেখানে যায়। কিন্তু জুয়াড়িদের কাউকে পায় না। এক মুরুব্বি বলে, ওরা খারাপ লোক- মোবাইল তো নিছেই তোমার ৫০০ টাকাও নিয়ে যাবে। পরে সুমন সেখান থেকে চলে যায়। এরপর টিপু নামের একজন আমাকে শুধু থাকা ও খাওয়ার চুক্তিতে হোটেলের কাজে লাগিয়ে দেয়।


ঘটনার কয়েকদিন পরে সে শাহবাগ থানার সামনের ফোনের দোকান থেকে বাবার নাম্বারে কল দিলে তার বাবা কান্নাকাটি করে বলে ‘তোমার আম্মু অনেক কান্নাকাটি করছে, তুমি কোথায় আছ বল আমি গিয়ে নিয়ে আসব।’ তখন সে তার অবস্থান না জানিয়েই ফোন কেটে দেয়।


এক সময় সুমন ইউসুফ টেকনিক্যাল স্কুলের শিক্ষার্থীদের আনা নেয়ার কাজ করত। ইউসুফ টেকনিক্যাল স্কুলের জোনাকী নামের একটি মেয়ের সাথে তার ভাল সম্পর্ক ছিল। সেই সুবাদে তাদের বাসায় যেত। জোনাকীদের বাসায় যাতায়াতের সুবাদে তার মা জোসনার সাথে ভালো সম্পর্ক হয়। সে বলে তার ওখানে চলে আসার জন্য। সুমন তখন কামরাঙ্গীরচরে তাদের বাসায় বসবাস শুরু করেন। সেটা ২০১৭ সালের কথা। এরমধ্যে জোনাকীর মা জোসনার সাথে তার প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। জোসনার স্বামী বকুল মোল্লা সন্দেহ শুরু করলে সে তাদের বাসা ছেড়ে চলে যায়। একমাস পর শনির আখড়ায় বাসা ভাড়া নিয়ে জোসনাকে ভাগিয়ে এনে তার সাথে ১ সপ্তাহ থাকে সুমন। এক সপ্তাহ পর জোসনার বড় বোন রোজী তাকে বুঝিয়ে রোজীর বাসায় নিয়ে যায়। এরপর দেড় মাস পর আবার জোসনাকে নিয়ে আসে। এক বছরের ভিতর জোসনাকে ৪/৫ বার নিয়ে এলে জোসনার স্বামী তাকে তালাক দেয়। পরবর্তীতে অনুমানিক ৩ বছর পূর্বে লালবাগ কাজী অফিসে জোসনার বড় বোন রোজীর উপস্থিতিতে জোসনাকে বিয়ে করে সুমন। এর মধ্যে ২০২২ সালের জানুয়ারি মাসের ৩ তারিখ তাদের একটি ছেলে হয়। তার নাম হাবিবুল্লাহ।


সুমনের স্ত্রী তাকে বারবার পরিবারের সাথে যোগাযোগ করতে বলে। সে বলে, সাহস পায় না। সে তার বাবার মোবাইল নম্বরটি দিলে তিনি ভিন্ন পরিচয়ে তার বাবার সাথে কথা বলে ঘটনার আদ্যেপান্ত জানিয়ে দেন।


ভিকটিমের বাবা মুজাফফার মিয়া বিবার্তাকে বলেন, আমার ছেলে যখন নিখোঁজ হয় তখন রমজান মাস। সকালে বের হয়ে রাতেও যখন ফিরেনি ছেলে তখন আমরা খোঁজাখুজি করি। মিরপুরের সকল জায়গায় খুঁজছি। তারপর পল্লবী থানায় জিডি করি। ছেলেকে খুঁজতে ফকিরের কাছেও গেছি।


তিনি বলেন, আমি কখনই আশা ছাড়িনি ছেলের। আমার ছেলের জন্য আমার মোবাইলের সিম সব সময় সচল রাখছি। তিনি আরো বলেন, আমার ছেলেকে পাওয়ায় আমি অনেক সন্তুষ্ট। ছেলে হারিয়ে ওর মা স্ট্রোক করেছে। ছেলের বউ ও সন্তানসহ আমি ওদেরকে গ্রহণ করব।


বিবার্তা/তাওহিদ/রোমেল/জেএইচ


সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

পদ্মা লাইফ টাওয়ার (লেভেল -১১)

১১৫, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ,

বাংলামোটর, ঢাকা- ১০০০

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2021 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com