ইউপি নির্বাচন: নৌকা পেলেন রাজাকার পুত্র!
প্রকাশ : ১৩ অক্টোবর ২০২১, ১০:৫০
ইউপি নির্বাচন: নৌকা পেলেন রাজাকার পুত্র!
সোহেল আহমদ
প্রিন্ট অ-অ+

নড়াইলের সদর উপজেলার ১২নং বিছালী ইউনিয়নে চেয়ারম্যান পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতার জন্য আওয়ামী লীগের দলীয় মনোনয়ন দেয়া হয় সাবেক চেয়ারম্যান মো. ইমারুল গাজীকে। কিন্তু এর দু’দিন পরই প্রার্থী পরিবর্তন করে এক রাজাকার পুত্রকে নৌকা প্রতীকের মনোনয়ন দেয়ার অভিযোগ উঠেছে।


জানা গেছে, মো. ইমারুল গাজীকে গত ৯ অক্টোবর দ্বিতীয় ধাপের ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে নৌকা প্রতীকে প্রতিদ্বন্দ্বিতার জন্য মনোনয়ন দেয়া হয়। এরপর সোমবার (১১ অক্টোবর) রাতে আওয়ামী লীগের দফতর সম্পাদক ব্যারিস্টার বিপ্লব বড়ুয়া স্বাক্ষরিত কাগজে প্রার্থী বদল করে রাজাকার পুত্র এসএম আনিসুল ইসলামকে নতুন করে দলীয় মনোনয়ন দেয়ার বিষয়টি জানানো হয়। এ ঘটনায় হতবাক তৃণমূল আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা। আওয়ামী লীগকে বাঁচাতে যোগ্য ব্যক্তিকে মনোনয়ন দেয়ার দাবি তাদের।


রাজাকার পুত্রকে মনোনয়ন দেয়ার ঘটনায় আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতারা বলছেন, নির্বাচনে দলের প্রার্থী দেয়া হলে পক্ষে-বিপক্ষে অভিযোগ আসে। এগুলো পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। রাজাকার পরিবারের সদস্যকে নৌকা প্রতীক দেয়া হয়েছে এমন অভিযোগের সত্যতা পেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে।



কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের দফতর সূত্রে জানা গেছে, মঙ্গলবার (১২ অক্টোবর) দুপুরে রাজাকার পুত্রকে মনোনয়ন দেয়ার বিষয়টি তথ্য প্রমাণসহ আওয়ামী লীগের মনোনয়ন বোর্ডের নজরে এনেছেন ইউনিয়নের বাসিন্দারা। বিবার্তার হাতে এসেছে এসব কাগজপত্র।


জানা গেছে, ১২নং বিছালী ইউনিয়নে চেয়ারম্যান পদে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন দেয়ার ক্ষেত্রে স্থানীয় ‘এমপির লোক’ বিষয়টি বিবেচনায় নেয়া হয়েছে। এছাড়া কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের দুই নেতার যোগসাজশে রাজাকার পুত্র আনিসুলকে মনোনয়ন দেয়া হয়েছে। মনোনয়ন পাইয়ে দিতে অর্ধ কোটি টাকার লেনদেনের অভিযোগও উঠেছে।


আওয়ামী লীগ সভাপতির কার্যালয়ে জমা দেয়া কাগজপত্র ঘেঁটে দেখা গেছে, ‘রাজাকার ও দালাল অভিযোগে গ্রেফতারকৃতদের তালিকা’ শিরোনামের একটি বইয়ের রাজাকার তালিকার ১২৬ নম্বরে রয়েছে চেয়ারম্যান প্রার্থী আনিসুল ইসলামের পিতা মৃত কোবাদ হোসেনের নাম।



এছাড়াও নড়াইলের সাবেক জেলা কমান্ডার ও বাগডাঙ্গা মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্পের যুদ্ধকালীন কমান্ডার স্বাক্ষরিত বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা সংসদের একটি প্যাডে রাজাকার তালিকার ১ নম্বরে রয়েছে কোবাদ হোসেনের নাম। সেখানে কোবাদ হোসেনের ব্যাপারে লেখা রয়েছে- তিনি মুক্তিযুদ্ধকালীন সশস্ত্র রাজাকার ছিলেন এবং মানতবতাবিরোধী কাজে জড়িত ছিলেন। যার কারণে ১৯৭২ সালে রাজাকার/দালাল আইনে বন্দি হয়ে কোবাদ হোসেন হাজতেও ছিলেন।


সূত্রে জানা গেছে, এলাকায় সংখ্যালঘু নির্যাতন ও ভূমি দখলসহ বর্তমান চেয়ারম্যান আনিসুল ইসলামের নামে একাধিক মামলা রয়েছে। তার বিরুদ্ধে সাবেক সেনাবাহিনী প্রধানের ছোট ভাই পরিচয়ে যশোরের অভয়নগরের ব্যবসায়ী সুমন হোসেনের দুই কোটি ২৬ লাখ টাকা প্রতারণার মাধ্যমে আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে। এ নিয়ে গেলো বছরের অক্টোবরে যশোর ক্যান্টনমেন্টের ডিটাচমেন্ট কমাণ্ডোর কাছে অভিযোগও দিয়েছেন সুমন। এছাড়াও আনিসুল ইসলামের বিরুদ্ধে আরো কয়েক কোটি টাকা আত্মসাতেরও অভিযোগ রয়েছে।


বিছালী ইউনিয়নের টিআর, কাবিখা, বিধবা ভাতা ও বয়স্ক ভাতার টাকা আনিসুল ইসলাম আত্মসাৎ করছেন এমনটি জানিয়ে ২০১৮ সালের জুলাইয়ে নড়াইল জেলা প্রশাসক বরাবরে অভিযোগ দিয়েছেন ১২নং বিছালী ইউনিয়নের ৯ ইউপি সদস্য। এদিকে গত ৩০ সেপ্টেম্বর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের ৯টি ওয়ার্ডের সভাপতি-সম্পাদক তৃণমূলের প্রার্থী বাছাইয়ে বসেন। বৈঠকে রাজাকার পুত্র আনিসুল ইসলামকে নৌকা প্রতীক বরাদ্দ দিলে ইউনিয়ন আওয়ামী লীগ তার দায়ভার নেবে না এবং ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের কোনো নেতা-কর্মী আনিসুল ইসলামের সাথে থাকবে না বলে ঐক্যমত্যে পৌঁছান ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের নেতারা।



বৈঠকে উপস্থিত থাকা ১২নং বিছালী ইউনিয়ন ৩নং ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সুকুমার বিশ্বাস বিবার্তাকে বলেন, আওয়ামী লীগ থেকে ইমারুল গাজীকে চেয়ারম্যান পদে নির্বাচন করার জন্য মনোনয়ন দেয়া হয়েছিলো। সে আওয়ামী লীগের সঠিক লোক। পরে রাজাকারের ছেলে আনিসকে মনোনয়ন দেয়া হয়েছে। এখবর শুনে আমরা হতবাক হয়েছি। যোগ্য লোককে মনোনয়ন দেয়ার জন্য প্রধানমন্ত্রীর কাছে দাবি জানাই।


এ বিষয়ে জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক (খুলনা বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত) বিএম মোজাম্মেল হক বিবার্তাকে বলেন, যারা দলের সদস্য আছে তারা নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার জন্য মনোনয়ন নেয়। দল থেকে নির্বাচনের জন্য কাকে মনোনয়ন দেয়া হবে এটা বোর্ড দেখে। এসব ক্ষেত্রে অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগ আসে। এগুলো পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে হয়।


তিনি বলেন, দলের মধ্যে প্রতিযোগিতা, প্রতিদ্বন্দ্বিতা আছে। কখনো কখনো প্রতিহিংসাও হয়। কে রাজাকার পরিবার আর কে রাজাকার পরিবারের সদস্য নয়, এটা জানতে হলে তদন্ত করতে হয়। এ বিষয়ে অভিযোগ এসেছে এবং ইতোমধ্যে তদন্তও হচ্ছে। যেটা সঠিক হবে, সভানেত্রী সেই সিদ্ধান্তই দিবেন।


অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে এসএম আনিসুল ইসলাম বিবার্তাকে বলেন, আমি সব জায়গায় খোঁজ-খবর নিয়েছি। যেসব কাগজ জমা দেয়া হয়েছে, এসব কাগজ ভুয়া। আপনি পরীক্ষা করে দেখেন।


নড়াইল সদরের ১২নং বিছালী ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান মো. ইমারুল গাজী বিবার্তাকে বলেন, আমাকে দলের মনোনয়ন দেয়া হয়েছিলো। আমি চিঠির অপেক্ষায় বসে আছি। হঠাৎ করে গতকাল (সোমবার) দেখলাম আমার নাম চেঞ্জ। আসলে বিষয়টা কি হচ্ছে কিছুই বুঝতে পারছি না।


বিবার্তা/সোহেল/গমেজ/জহির

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

পদ্মা লাইফ টাওয়ার (লেভেল -১১)

১১৫, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ,

বাংলামোটর, ঢাকা- ১০০০

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2021 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com