মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর আগ্রহের ৭ কলেজের হযবরল অবস্থা!
প্রকাশ : ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২১, ২০:১২
মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর আগ্রহের ৭ কলেজের হযবরল অবস্থা!
মহিউদ্দিন রাসেল
প্রিন্ট অ-অ+

অধিভুক্তি হওয়ার পর থেকে সমস্যা যেন লেগেই আছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) অধিভুক্ত সরকারি সাত কলেজের। সময় মতো পরীক্ষা গ্রহণ না করা, ফল প্রকাশে বিলম্ব, প্রকাশিত ফলাফলে শিক্ষার্থীদের তীব্র অসন্তোষসহ নানা কারণে সাত কলেজের শিক্ষার্থীরা রাস্তায় নেমেছে বহুবার। এদিকে এসব কলেজের অধিভুক্তি নিয়ে নিজেদের সমস্যার কথা জানিয়ে অধিভুক্তি বাতিল চেয়ে আন্দোলন করেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও।


বারবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন দুই পক্ষকে ভিন্ন ভিন্ন আশ্বাস দিয়ে আন্দোলন বন্ধ করেছে। সম্প্রতি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী সাত কলেজের চলমান পরীক্ষা স্থগিত করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। কিন্তু হঠাৎ করে চলমান পরীক্ষা স্থগিতের ঘটনায় ক্ষুব্ধ হয়ে সাত কলেজের শিক্ষার্থীরা ফের রাস্তায় নেমেছে। পরে শিক্ষা মন্ত্রী ডা. দীপু মনির সাথে বৈঠক করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাত কলেজের চলমান স্থগিত পরীক্ষা চালুর ঘোষণা দেয়। এরপরে শিক্ষার্থীরা আন্দোলন বন্ধ করে।


বারবার অধিভুক্তির বিভিন্ন সঙ্কটকে কেন্দ্র করে আন্দোলন হওয়ায় উদ্ভূত সঙ্কট সমাধানে কমিটি গঠন করেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. আখতারুজ্জামান। কমিটি সঙ্কট সমাধানে তাদের সুপারিশ সংবলিত প্রতিবেদন জমা দিলে বিশ্ববিদ্যালয়ের সিণ্ডিকেটে এই সুপারিশ গৃহীত হয়। কিন্তু এরপর ১ বছর পেরিয়ে গেলেও কমিটির সুপারিশ প্রো-ভাইস চ্যান্সেলরের নেতৃত্বে সংশ্লিষ্ট ডিনগণকে অন্তর্ভূক্ত করে একটি স্থায়ী পরিচালনা পরিষদ গঠন করা হচ্ছিলো না! অবশেষে চলতি বছরের ৪ জানুয়ারি প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর (শিক্ষা) অধ্যাপক ড. এ এস এম মাকসুদ কামালকে সাত কলেজের শুধু পরীক্ষা সংক্রান্ত বিষয়ে দায়িত্ব দেয়া হয়। কমিটির সুপারিশ না মেনে সাত কলেজের বাকী কার্যক্রম উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো.আখতারুজ্জামানের হাতে রাখা হয়।



এর বাইরে কমিটির কিছু সুপারিশ বাস্তবায়িত হলেও অধিকাংশ সুপারিশ এখনো অধরাই থেকে গেছে! এসবের জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. আখতারুজ্জামানের স্বেচ্ছাচারিতাকে দায়ী করেছেন সংশ্লিষ্ট মহল।


জানা যায়, রাজধানীর সরকারি কলেজগুলোর শিক্ষার মান বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশনায় প্রাথমিক পদক্ষেপ হিসেবে ঢাকা শহরের ঢাকা কলেজ, ইডেন মহিলা কলেজ, বেগম বদরুন্নেসা সরকারি মহিলা কলেজ, সরকারি তিতুমীর কলেজ, কবি নজরুল সরকারি কলেজ, সরকারি শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলেজ এবং সরকারি বাঙলা কলেজকে ২০১৭ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধিভুক্ত করা হয়।


কিন্তু নানা সমস্যার কারণে কলেজগুলো শুরুতেই মুখ থুবড়ে পড়তে থাকে। বিশেষ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধিভুক্তির পর থেকেই সাত কলেজের শিক্ষার্থীরা নিজেদেরকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী হিসেবে পরিচয় দেয়া, বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোগ্রাম সম্বলিত পরিচয়পত্র ব্যবহার করা এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য পরিবহনসহ প্রদেয় সকল সুযোগ-সুবিধা ব্যবহারে উৎসাহী হয়ে ওঠে। সাত কলেজের শিক্ষার্থীদের এই ধরনের আচরণে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে অসন্তোষ দেখা দেয়। ফলে তারা সাত কলেজের অধিভুক্তি বাতিলের দাবি তোলে এবং একপর্যায়ে আন্দোলনের পথ বেছে নেয়।



অন্যদিকে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশে অভ্যস্ত শিক্ষার্থীরা আকস্মিকভাবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে চলে আসায় বিভিন্ন পরীক্ষায় ব্যাপকহারে অকৃতকার্য হতে থাকে। ফলে বিক্ষুদ্ধ হয়ে আন্দোলনের পথ বেছে নেয় এবং রাস্তায় নেমে আসে। ফলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও সাত কলেজ ক্যাম্পাসে বিরূপ পরিস্থিতি তৈরী হয়। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর ড. মুহাম্মদ সামাদ-কে আহবায়ক ২০১৯ সালের ২৪ জুলাই ১১ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করেন।


সূত্র জানায়, কমিটি সাত কলেজ সংশ্লিষ্ট ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভাগীয় চেয়ারম্যান, ইনস্টিটিউটের পরিচালক, পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক, অধিভুক্ত সাত কলেজের অধ্যক্ষ ও শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধি এবং তৎকালীন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) নেতৃবৃন্দের মতামত ও সুপারিশ গ্রহণ করে।


প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর ড. মুহাম্মদ সামাদের এই কমিটি ৯টি সভা করে সমস্যা সমাধানকল্পে ১৯টি সুপারিশ দিয়ে গত বছরের (২০২০ সালের) ৭ জানুয়ারি উপাচার্যের নিকট প্রতিবেদন জমা দেয়। প্রতিবেদনটি ২৮ জানুয়ারির সিন্ডিকেট সভায় গৃহীত হলেও উপাচার্য অধ্যাপক আখতারুজ্জামান সুপারিশ অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে গড়িমসি করতে থাকেন। এই গড়িমসির প্রধান কারণ হলো আর্থিক ও প্রশাসনিক ক্ষমতা নিজের হাতে ধরে রেখে সাত কলেজের জন্য ইউজিসি কর্তৃক মঞ্জুরিকৃত বিভিন্ন পদে তার নিজ এলাকা বরিশাল অঞ্চলের লোক নিয়োগ দেয়া। বিশেষ করে পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক দফতরের স্থায়ী ও অস্থায়ী বর্তমান লোকবলের ৯০ শতাংশ বরিশাল অঞ্চলের বলে জানা যায়।



সূত্র আরো জানায়, এক নম্বর সুপারিশে প্রো-ভাইস চ্যান্সেলরের নেতৃত্বে সংশ্লিষ্ট ডিনগণকে অন্তর্ভূক্ত করে একটি স্থায়ী পরিচালনা পরিষদ গঠনের কথা বলা হয় এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক অফিসের সাথে কলেজগুলোর নগদ লেনদেন বন্ধ করে ব্যাংক চেক-এর মাধ্যমে সকল আর্থিক লেনদেন সম্পন্ন করার সুপারিশ করা হয়। এ সবের সঙ্গে কমিটি একাডেমিক বিষয়, পরীক্ষা, শিক্ষক প্রশিক্ষণ, আর্থিক ব্যবস্থাপনা, অবকাঠামো উন্নয়ন, লাইব্রেরি ও কলেজগুলোতে বৈজ্ঞানিক যন্ত্রপাতি সরবরাহের বিষয়ে আরো ১৭টি সুপারিশ দেয়া হয়। প্রতিবেদনটি ২৮ জানুয়ারীর সিন্ডিকেট সভায় গৃহীত হলেও পরের বছর অর্থাৎ ৪ জানুয়ারি ২০২১ তারিখে উপাচার্য অধ্যাপক আখতারুজ্জামান সরকারি সাত কলেজের শুধু পরীক্ষা সংক্রান্ত কার্যক্রম পরিচালনার জন্যে প্রধান সমন্বয়কারির দায়িত্ব প্রো-উপাচার্য (শিক্ষা) ওপর অর্পণ করে অবশিষ্ট সকল দায়িত্ব নিজের কাছে কুক্ষিগত করে রেখেছেন। উপাচার্যের স্বেচ্ছাচারিতা, সমন্বয়হীনতা ও পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক অফিসের নগদ লেনদেনসহ নানা কারণে ঢাবি অধিভুক্ত প্রধানমন্ত্রীর সাত কলেজে হযবরল অবস্থা তৈরি হয়েছে।


এ বিষয়ে জানতে চাইলে সাত কলেজের সঙ্কট সমাধানে গঠিত কমিটির আহ্বায়ক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ সামাদ বিবার্তাকে বলেন, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সাত কলেজের শিক্ষার মান উন্নয়নের জন্য আগ্রহ করে কলেজগুলোকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত করেছেন। কাজেই গঠিত কমিটির সবার ঐকান্তিক সহযোগিতায় আমরা সাত কলেজের সঙ্কট সমাধানে সুশৃঙ্খল, সুসংগঠিত ও সুনির্দিষ্ট প্রতিবেদন সুপারিশসহ জমা দিয়েছি।


কমিটির সুপারিশ সিন্ডিকেট সভায় গৃহীত হলেও প্রায় এক বছর আটকে ছিল বিষয়টিকে কিভাবে দেখছেন জানতে চাইলে অধ্যাপক সামাদ বলেন, প্রতিবেদনটি কেন ১ বছর আটকে ছিল তা বলতে পারবো না। এ বিষয়ে উপাচার্যকে জিজ্ঞেস করার এখতিয়ার আমার নেই।



তিনি আরো বলেন, কমিটি সাত কলেজ সংশ্লিষ্ট ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভাগীয় চেয়ারম্যান, ইনস্টিটিউটের পরিচালক, পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক, অধিভুক্ত সাত কলেজের অধ্যক্ষ ও শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধি এবং তৎকালীন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) নেতৃবৃন্দের মতামত ও সুপারিশ গ্রহণ করে অত্যন্ত যত্নের সাথে প্রতিবেদনটি তৈরি করেছে। কাজেই প্রতিবেদনের সুপারিশ বাস্তবায়ন হলে সাত কলেজের সঙ্কট কেটে যাবে বলে আমাদের আশাবাদ।


এ বিষয়ে জানতে চাইলে সাত কলেজের পরীক্ষা সংক্রান্ত কার্যক্রম পরিচালনার জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রধান সমন্বয়কারী ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রো-উপাচার্য (শিক্ষা) অধ্যাপক ড. এ এস এম মাকসুদ বিবার্তাকে বলেন, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সাত কলেজের শিক্ষার মান উন্নয়নের জন্য কলেজগুলোকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত করেছেন। কাজেই আমাকে যতটুকু দায়িত্ব দেয়া হয়েছে সে অনুযায়ী আমি সাত কলেজের শিক্ষার মান উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে চাই।



সার্বিক বিষয়ে জানতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. আখতারুজ্জামান একাধিকবার ফোন দিলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। পরে একবার তিনি ফোন রিসিভ করলেও কিছু জিজ্ঞেস করার আগে মিটিংয়ে ব্যস্ত আছেন বলে ফোন রেখে দেন।


বিবার্তা/রাসেল/জাই

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

ময়মনসিংহ রোড, শাহবাগ, ঢাকা-১০০০

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2021 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com