শুভ পঞ্চাশ প্রিয় জন্মভূমি!
প্রকাশ : ২৬ মার্চ ২০২১, ১৯:৫১
শুভ পঞ্চাশ প্রিয় জন্মভূমি!
আনামিকা রায়
প্রিন্ট অ-অ+

যে গ্রামে আমার শৈশব-কৈশোর কেটেছে সেখানে এত দিবসটিবস নিয়ে মাতামাতি ছিলো না তখন! মানুষের পেটে তিনবেলা ভাতই জুটতো না আবার দিবস নিয়ে বাড়াবাড়ি! তবে আমাদের বাড়িতে এসব জাতীয় দিবসগুলোর গুরুত্ব ছিলো বেশ তখন। খুব আড়ম্বর করে পালন করতে না পারলেও আনুষ্ঠানিকতার কমতি ছিলো না একটুও। আমাদের বীর মুক্তিযোদ্ধা বাবা বেশ শক্ত করেই দেশপ্রেমের বীজ বপন করেছিলেন আমাদের হৃদয়ে।


আমি এমনিতেই খুব ঘুম পাগল মানুষ। বেলা দ্বিপ্রহরের আগে ঘুমদেবতা আমার নয়নযুগল ত্যাগ করতে চান না কিছুতেই! কিন্ত স্বাধীনতা বা বিজয় দিবসে বাড়ির সকলের আগেই উঠে পরতাম আমি। তারপর চেচামেচি করে সকলের ঘুম ভাঙাতাম পতাকা টাঙানো জন্যে।


আমাদের একটা জাতীয় পতাকা ছিলো মুক্তিযুদ্ধের সময়কার। পতাকার লাল বৃত্তের ঠিক মাঝখানটায় বাংলাদেশের মানচিত্র আঁকা। বাবা যখন যুদ্ধ থেকে বাড়ি ফিরে এসেছিলেন তখন নাকি তাঁর সঙ্গে ওটা ছিলো। বহুবছর আমার মা ওই পতাকাটা অতি যত্নে তাঁর ট্রাংকে আগলে রেখেছিলেন। (যদিও আমরা আমার মার সেই অমূল্য রত্ন হারিয়ে ফেলেছি।)


যাইহোক, আমার শৈশবের দিনগুলোতে আমরা খুব ভক্তিভরে ওই ঐতিহাসিক পতাকা টাঙানাতাম। যখন পতাকাটা একটু একটু করে উপরে দিকে মাথা তুলতো আমরা তখন গলা ছেড়ে গান করতাম "আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি/ চিরদিন তোমার আকাশ তোমার বাতাস আমার প্রাণে, ওমা আমার প্রাণে বাঁজায় বাঁশি।" জাতীয় সংগীতের এক পর্যায়ে আমার দু'চোখ জলে ভরে যেত। পতাকাটা যখন আকাশে মাথা উঁচু করে পত পত করে উঠতো তখন গর্বে আমার মন পুলকিত হয়ে যেত। এই পতাকার জন্যে আমার বাবার ত্যাগ আমাকে অহংকারী করে তুলতো বারংবার।


আমাদের আনুষ্ঠানিকতার দ্বিতীয় পর্বে থাকতো কোন এক মুক্তিযোদ্ধাকে সংবর্ধনা দেওয়া। আমার বাবা চাকরির কারণে ওসব সময়ে আমাদের সাথে থাকতে পারতেন না তাই তাঁকে কখনোই আমরা সংবর্ধনা দিতে পারিনি বলে বেশ আপসোস আছে এখনো। আমাদের গ্রামে এক মামা ছিলো- নাম সুবাস সরকার। ওনি মুক্তিযুদ্ধের একজন সম্মুখ যোদ্ধা ছিলেন। আমি আর আমার ছোটদাদা তাঁকে বহুবার শ্রদ্ধা জানিয়েছি।


একবারের ঘটনা আমার খুব মনে পড়ে। আমার মধুমতি পাড়ের ছোট গ্রামটায় কীসব নিয়ে যেন গ্রামের লোকের মধ্যে খুব ঝগড়া হলো! সমস্ত গ্রামের বড়রা দুই অংশে বিভক্ত হয়ে গেলো। কেউ কারো সঙ্গে কথা বলে না, কারো বাড়ি যান না। সেই প্রভাব আমাদের ছোটদের উপরও পড়লো। আমাদের উপর কড়া হুকুম বেদলীয় কারো বাড়ি যাওয়া যাবে না, কারো সঙ্গে কথা বলা যাবে না। আমরা যথাযথভাবে আমাদের উপর অর্পিত অন্যায় নিষেধাজ্ঞা নেমে চলতে লাগলাম। কিন্তু বিপত্তি বাধলো স্বাধীনতা দিবসে এসে। আমার বীর মুক্তিযোদ্ধা বাবা চাকরির সুবাদে চট্টগ্রামে আর আমাদের গ্রামের অন্য বীর মুক্তিযোদ্ধা আমাদের বিপক্ষদলে পড়ে গেছেন দুর্ভাগ্যবশত! কিন্তু আমি নাছোড়বান্দা মেয়ে, মামাকে সংবর্ধনা দিবোই। আমি সকাল সকাল আমার নিজে হাতে লাগানো গাছ থেকে ফুল তুলে মালা বানিয়েছি মামাকে পড়াবো বলে। অপুকে জমানো টাকা দিয়ে উপহার আনিয়েছি বাজার থেকে। এইবার যাব মামার কাছে। এমন সময় বিপত্তি! বাড়ির অনেকেই যেতে দিতে রাজী নন পাছে সমালোচনা করেন অন্যরা এই ভয়ে। এমন সময় আমার মা বেশ শক্ত অবস্থান নিলেন আমার পক্ষে। অপুকে ডেকে বললেন তুই ওকে নিয়ে যা কারো কথা শুনতে হবে না।


আমি স্বাধীনতা দিবসে স্বাধীন চিত্তে অপুর সাইকেলের পিছনে বসে উপহার-মালা নিয়ে সবাইকে দেখাতে দেখাতে গেলাম মামার কাছে। মামার গলায় আমার গাঁথা মালা পড়িয়ে দিয়ে তাকে প্রণাম করে ধন্যবাদ দিলাম এই সুন্দর দেশটা আমাদের উপহার দেওয়ার জন্য। আমি সেদিন মামার চোখে জল দেখেছিলাম, আনন্দের জল, কৃতজ্ঞতার জল। আমার চোখেও ছিলো কৃতজ্ঞতার জল এই দেশটাকে আমাদের করে দেবার জন্য তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞতা।


আমার ওইদিনের জেদের কাছে সবাই পরাজিত হয়েছিলো। তাছাড়া ওটা হবারই ছিলো, কেননা আমি মনে করি মুক্তিযোদ্ধোরা কোন দলের, কোন মানুষের দখলে থাকতে পারেন না কখনও। তাঁরা আমার আপনার সকলের। তাঁরা জীবন বাজী রেখে এই স্বাধীন ভূখন্ড এনেছিলেন নিজের জন্যে নয়, আমাদের সকলের জন্যে।


আমার এই বড় হয়ে ওঠার সময়টাতে এসে প্রতিদিনই নতুন নতুন সব অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হচ্ছি। এখনকার জেনারেশনের কাছে তো মুক্তিযোদ্ধা একটা গালির নাম। এই প্রগতিশীল তরুণ প্রজন্ম কিছুতেই স্বীকার করে রাজি নয় তাঁদের ত্যাগের কথা, তাঁদের মর্যাদার কথা।


একটা ঘটনার কথা বেশ মনে পড়ে আমার। বলা যায় আমাকে যন্ত্রণা দেয় প্রতিনিয়ত। একদিন রাজধানীর একটা বাসে এক অসুস্থ বৃদ্ধলোক আমার পাশে জড়সড় হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। বাসের অনিয়ন্ত্রিত গতি আর আচমকা ধাক্কা তাঁকে প্রায়ই আমার গায়ে উপর ফেলে দিচ্ছলো। অগত্যা আমার কেবলই পাশে বসে থাকা এই প্রজন্মের এক সুঠামদেহি তরুণকে অনুরোধ করলাম ওই বৃদ্ধকে জাগয়াটা ছেড়ে দিতে। আমার কথা শুনে বৃদ্ধ বেশ গর্ব নিয়ে বললেন," বাবা আমি একজন আহত মুক্তিযোদ্ধা। পায়ে গুলি লেগেছিলো এখনও ঠিক মত হাঁটতে পারি না। আমাকে যদি একটু বসতে দাও আমার দাঁড়িয়ে থাকতে কষ্ট হচ্ছে।" আমার বেশ মনে আছে ওই ভদ্রলোক সিট থেকে তো ওঠলেনই না বরং চোখভরা ঘৃণা নিয়ে ওই বৃদ্ধের দিকে তাকিয়ে রইলেন। লজ্জায়, অপমানে আমি মাথা নিচু করে ওই বৃদ্ধের হাত ধরে ক্ষমা চাইলাম। ওনি আমার মাথায় হাত দিয়ে বললেন " মা তুমি কেন ক্ষমা চাইছো। ক্ষমাতো আমাদের চাওয়া উচিত। এই অপমান আমার সয়ে গিয়েছে এখন। আমি কিছু মনে করি না আর।" আমি মনে মনে বললাম, অপমান আপনার নয়, এটা আমার, আমাদের সকলের যারা আমাদের বীর সন্তানের মান রাখতে জানিনি, শিখিনি। ক্ষমা করবেন না আমাদের প্লিজ!


আজ স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছরে এসে চাওয়া-পাওয়ার হিসেব মেলাতে গিয়ে আমার কেবলই ব্যর্থতার কথা মনে হয়। দেশ হয়তো এগিয়েছে অনেক। এগিয়ে যাচ্ছে, যাবেই। তরতর করে মাথা তুলছে উন্নয়নের আকাশ পানে কিন্তু সেই সাথে সমগতিতে ভূমিতে পতিত হচ্ছে আমাদের নৈতিকতা, মূল্যবোধ।


এই ৫০শে এসেও আমার জন্মভূমির বদনখানি মলিন হয়ে যাচ্ছে বারংবার। সন্তানের আর্তনাদে কেঁপে ওঠছে মায়ের বুক। স্বাধীনতার এই সুবর্ণ জয়ন্তীতে এসে আমার একটাই প্রার্থনা সমস্ত হিংসা বিদ্বেষ ভুলে এসো সকলে মানবিক হয়ে ওঠি। দেশমায়ের মুখটা উজ্জ্বল করতে না পারি, কোন আঘাত যেন না দেই। শুভ পঞ্চাশ প্রিয় জন্মভূমি!


বিবার্তা/আবদাল

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

ময়মনসিংহ রোড, শাহবাগ, ঢাকা-১০০০

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2021 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com