বিরুদ্ধবাদীরা ভেবেছিলো
প্রকাশ : ০৮ মার্চ ২০২১, ২২:৩৭
বিরুদ্ধবাদীরা ভেবেছিলো
শরদিন্দু ভট্টাচার্য্য টুটুল
প্রিন্ট অ-অ+

আমাদের মহাকাব্যিক মুক্তিযুদ্ধের মহান নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বিভন্ন সময়ের বক্তব্য, কথা এবং জীবনযাপন নিয়ে গবেষকরা প্রতিনিয়ত গবেষনা করে যাচ্ছেন। গবেষকরা বঙ্গবন্ধুর কর্মজীবনের বিভিন্ন বিষয় আশয় নিয়ে গবেষনা করে নতুন নতুন ইতিবাচক তথ্য উপাত্ত আমাদেরকে দিয়ে যাচ্ছেন। গবেষকদের কাছ থেকে প্রাপ্ত তথ্য উপাত্ত পেয়ে আমরা বাঙ্গালীরা আমাদের মহাকাব্যিক মহান মুক্তিযুদ্ধের বিভিন্ন বিষয়ে জেনে আমাদের জ্ঞান ভান্ডার সমৃদ্ধ করছি।


একটা সময় ছিল বিরুদ্ধবাদীরা আমাদের মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে নেতিবাচক ও বিকৃত ইতিহাস আমাদের সামনে উপস্থাপন করে আমাদেরকে বিভ্রান্ত করার প্রয়াস চালিয়ে যাচ্ছিল। এই সময়টা ছিল ১৯৭৫এর পরবর্তী সময় থেকে ১৯৯৫ সাল পর্যন্ত। বিরুদ্ধবাদীরা ভেবেছিল বন্দুকের নলের সামনে দেশের জনগনকে জিম্মি করে রেখে, তারা যা ইচ্ছে তা করতে পারবে। তখন বিরুদ্ধবাদীরা বঙ্গবন্ধুর নাম নেয়ার উপর এমন সব অলিখিত বিধি নিষেধ আরোপ করে, যা দেখে দেশের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তির লোকজন ভয়াবহ আতংকের মাঝে জীবনযাপন করতে বাধ্য হয়েছিল। কিন্তু বিরুদ্ধবাদীরা এ কথা বুঝেনি মেঘরাশি সূর্য্যরে কিরণকে তার ছায়া দিয়ে ঢেকে রাখতে যতই চেষ্টা করুক না কেন, তাতে সূর্য্যরে আলোকরাশি নিভে যায় না। মেঘ সরে গেলেই সূর্য্যরে অয়ন রেখা পৃথিবীকে তার আলো দ্বারা আলোকিত করে তুলে। ঠিক তেমনি করে বিরুদ্ধবাদী দক্ষিনপন্থী আমাদের স্বাধীনতার বিরুদ্ধ শক্তির লোকজনও বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক কর্মজীবনে যে অবদান নিজের জীবন বাজী রেখে এদেশের মানুষের জন্য রেখে গেছেন, তা তারা মুছে ফেলতে পারেনি।


মেঘরাশি যতই সূর্য্যরে আলোকে ঢেকে রাখার চেষ্টা করুক না কেন, তাতে কিন্তু সূর্য্যরে আলো বিলোপ কিংবা মিথ্যে হয়ে যায় না। ঠিক সেই ভাবেই বিরুদ্ধবাদীদের জঘন্য মিথ্যাচার আমাদের হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙ্গালী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অবদানকে খাটো করতে পারে নি। এদেশের মাটিতেই বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার দেশের প্রচলিত আইনে হয়েছে। বিচারে দোষিদের সাজা হয়েছে। পলাতক আসামি ছাড়া অনেকের সাজা মৃত্যুদন্ড কার্যকর হয়েছে। যারা বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করেছিল কিংবা যারা বঙ্গবন্ধুকে হত্যার জন্য পর্দার আড়ালে থেকে কলকাঠি নেড়েছিল, তারা কোনোদিন স্বপ্নেও ভাবেনি বাংলার মাটিতে বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার হবে এবং তাদের সাজা মৃত্যুদন্ড কার্যকর হবে। বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারীরা এবং তাদের সহযোগীরা ভুলে গিয়েছিল পাপ বাপকেও ছাড়ে না। পাপ যে বাপকে ছাড়ে না এ কথা তারাই ভুলে যায়, যারা সারা জীবন পাপের মধ্যে বসবাস করে থাকে।


আমরা যদি আমাদের মহাকাব্যিক মহান মুক্তিযুদ্ধের বিভিন্ন বিষয় আশয় নিয়ে তাত্তি¡ক বিচার বিশ্লেষন করতে যাই, তাহলে দেখতে পাবো বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষনের মধ্যেই আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের ঘোষণা রয়েছে। বঙ্গবন্ধু বলেছেন এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম। এই যে মুক্তির সংগ্রামের কথা বঙ্গবন্ধু বলেছেন, তাতে কোন মুক্তির কথা রয়েছে তা আমরা একটু চিন্তা ভাবনা করলেই বুঝে নিতে পারবো। এই মুক্তির সংগ্রাম হচ্ছে সেই সব মানুষের মুক্তি সংগ্রাম, যারা ক্রমাগত ভাবে ১৯৪৭ এর পর থেকে পাকিস্তানি শাসকদের দ্বারা প্রতিনিয়ত ভাবে শোষন ও পীড়নের স্বীকার হয়ে আসছে। এই মুক্তির সংগ্রাম কথাটা দিয়ে বঙ্গবন্ধু এদেশের মানুষের ভৌগলিক মুক্তির কথাই শুধু বুঝান নাই, এই মুক্তি সংগ্রাম দিয়ে এদেশের দরিদ্র মেহনতি মানুষের এবং মধ্যবিত্ত ও নিম্ন মধ্যবিত্ত শ্রেণীর অর্থনৈতিক মুক্তির কথাই বঙ্গবন্ধু বুঝিয়েছেন। যার পরবর্তীতে আমরা দেখেছি বঙ্গবন্ধু এদেশের মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তির সংগ্রামকে এগিয়ে নেওয়ার জন্য বাকশাল গঠন করেছেন। যদিও বিশ্ব সাম্রাজ্যবাদী শক্তির এদেশীয় কিছু সংখ্যক দালাল, দক্ষিণপন্থী প্রতিবিপ্লবীরা এবং তাদরে সঙ্গে থাকা অতিবিপ্লবীরা এক হয়ে বঙ্গবন্ধুর বাকশালের বিরোধীতা করে আসছিল। অতিবিপ্লবীরা আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধকে বলত দুই কুকুরের লড়াই। তারা মুক্তিযুদ্ধের বিরোধীতাকারী দালালদের দৃষ্টিভঙ্গি নিয়েই আমাদের মুক্তিযুদ্ধের বিচার বিশ্লেষণ করতো। অথচ এই অতিবিপ্লবীরা মুখে মুখে সাধারণ মানুষের অর্থাৎ দরিদ্র জনগোষ্ঠীর মুক্তির কথা বললেও তাদের কর্মকান্ড কখনো সাধারন মানুষের পক্ষ শক্তির পক্ষে ছিলনা। তাদের কথাবার্তা আর প্রতিক্রীয়াশীল দক্ষিনপন্থীদের কথাবার্তা ও কর্মকান্ড এক রকমই ছিল। এই অতিবিপ্লবীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আছে তারা শ্রেণী শত্রæ খতমের নামে বিভিন্ন জায়গায় অনেক দেশপ্রেমিক নেতাদের হত্যা করেছে। এমন অভিযোগও আছে অতিবিপ্লবীরা কল-কারখানায় এবং পার্টের গুদামে আগুন দিয়েছে তাদের বিপ্লবের অভিপ্রায়ে।


অনেকেই বলে থাকেন তাদের বিশ্বাস ছিল জনগন দ্বারা মানুষের মুক্তির সংগ্রামকে সামনের দিকে এগিয়ে নেয়া যাবেনা। বন্দুকের নলের মাধ্যমেই মানুষের মুক্তি সংগ্রামকে এগিয়ে নিতে হবে। এই শ্রেণীর লোকরা অর্থাৎ অতিবিপ্লবীরা জনগনই ক্ষমতার উৎস তা বিশ্বাস করতো না। তারা মনে করতো বন্দুকের নলই ক্ষমতার উৎস। এই রাজনীতি করতে গিয়ে অনেক মেধাবী তরুণ প্রাণ মৃত্যু মুখে পতিত হয়েছে। তারা নিজেরা যেমন মরেছে। তেমনি করে অন্যকেও মেরেছে। আবার নিজেরা নিজেরা কাটাকাটি মারামারি করে প্রাণ দিয়েছে। কিন্তু তারা তাদের লক্ষ্যে পৌঁছতে পারেনি। অতিবিপ্লবীরা তাদের লক্ষ্যে পৌঁছতে পারেনি তাদের ভুল রাজনীতির জন্য। যে কোনো কাজই করতে হয় নিয়মতান্ত্রিক ভাবে। নিয়মের বাইরে গেলেই বিপত্তি দেখা দেয়। যা আমরা দেখেছি স্বাধীনতার পরবর্তী সময়ে বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রে বিশ্বাসী জাসদের রাজনীতিতে।


বঙ্গবন্ধু তাঁর ৭ই মার্চের ভাষনে বলেছেন এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম। বঙ্গবন্ধু বুঝেছিলেন এই দেশের মানুষের জীবন যাপন সহজ করতে হলে এবং এদেশের মানুষের দারিদ্রতা দূর করতে হলে প্রথমই যে কাজটি করতে হবে, তাহল আমাদের দেশমাতৃকাকে স্বাধীন রাষ্ট্রে পরিনত করতে হবে। বঙ্গবন্ধু তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে বুঝেছেন যে, পশ্চিম পাকিস্তানিরা আমাদের দেশকে শোষনের ক্ষেত্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে চায়। তারা অর্থাৎ পশ্চিম পাকিস্তানিরা কখনো চাইবে না এদেশের মানুষেরা সুখে শান্তিতে থাকুক। তারা চাইবে আমার এই দেশ থেকে কি ভাবে মূল্যবান সম্পদ পশ্চিম পাকিস্তানে পাচার করে নেয়া যায় এবং পশ্চিম পাকিস্তানকে সম্পদশালী করা যায়। বঙ্গবন্ধু দেখেছেন এদেশের মানুষ বিভিন্ন সময় জনগন দ্বারা নির্বাচিত হয়েও ক্ষমতায় থাকতে পারেনি বা যেতে পারেনি। ১৯৫৪ ইংরেজিতে বাঙ্গালী জয় লাভ করেছে। কিন্তু কি পেয়েছে। ১৯৭১ সালে দেশের মানুষ সাধারন নির্বাচনে জয়লাভ করেও ষড়যন্ত্র মূলক ভাবে বাঙ্গালীদেরকে ক্ষমতা দেয়া হয়নি।


বঙ্গবন্ধু বুঝতে পেরেছেন পশ্চিম পাকিস্তানিরা কখনো এদেশের মানুষকে ক্ষমতার স্বাদ দেবে না। তাই তাদের কাছে ন্যায্য কিছু আশা করে পাওয়া যাবে না। তারা এদেশের মানুষকে মানুষ বলেই গন্য করে না। আমরা দেখেছি পশ্চিম পাকিস্তানিরা একের পর এক ষড়যন্ত্র এদেশের মানুষের বিরুদ্ধে করে গেছে। তারা অর্থাৎ পশ্চিম পাকিস্তানিরা হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙ্গালী আমাদের মহাকাব্যিক মুক্তি সংগ্রামের ঘোষক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যা করার জন্য মিথ্যা ভাবে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা করেছিল। যাতে মৃত্যুদন্ডের রায় দিয়ে বঙ্গবন্ধুসহ অন্যান্য বাঙ্গালী নেতাদেরকে হত্যা করা যায়। কিন্তু জনতার আন্দোলনের মুখে পাকিস্তানিরা ভেসে যায়। পশ্চিম পাকিস্তানিরা মিথ্যা এবং তাদের মনগড়া ভাবে সাজানো ষড়যন্ত্র মূলক মামলা তুলে নিতে বাধ্য হয়। যে মামলাটিকে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা বলা হয়ে থাকে। আমরা এমন এক ভাগ্যবান জাতি যে, আমরা বঙ্গবন্ধুর মতো একজন সাহসী এবং নির্লোভী নেতা পেয়েছিলাম। যিনি এদেশের মানুষকে নিজের সন্তানের চেয়েও বেশি ভালোবাসতেন। বঙ্গবন্ধু কোনোদিন ভাবতে পারেননি বাঙ্গালী তাকে হত্যা করতে পারে। কিন্তু বিরুদ্ধবাদী দক্ষিনপন্থী প্রতিক্রীয়াশীলরা তাদের একাত্তরের পরাজয়ের কথা ভুলে যেতে পারেনি। বিরুদ্ধবাদী আমাদের মুক্তি সংগ্রামের বিপক্ষ শক্তির লোকজন তাদের একাত্তরের পরাজয়ের প্রতিশোধ নেবার জন্য অস্থির হয়ে থাকে। এই বিরুদ্ধবাদীরা তাদের একাত্তরের প্রতিশোধ নেবার জন্য বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করেছে। বলা হয়ে থাকে বঙ্গবন্ধু হত্যার পেছনে আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রকারীরাও জড়িত ছিল। এছাড়া পর্দার অন্তরালে থেকে অনেকেই বঙ্গবন্ধু হত্যার পিছনে কলকাঠি নেড়ে জড়িত থেকেছেন। আজ দেশের জনগণ পর্দার অন্তরালে থেকে যারা কলকাঠি নেড়ে বঙ্গবন্ধু হত্যায় জড়িত ছিলেন, তাদেরকেও বিচারের আওতায় আনার জন্য দাবি তুলছেন। আজ জনগনের মনে প্রশ্ন জেগেছে, আর প্রশ্নটা হল যারা পর্দার অন্তরালে থেকে বঙ্গবন্ধু হত্যার ক্ষেত্র প্রস্তুত করতে কাজ করেছে, তাদেরকে কেন বিচারের আওতায় নিয়ে আসা হবেনা।


আমরা যদি সামগ্রীকভাবে বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক জীবন বিচার বিশ্লেষণ করি, তাহলে দেখবো আমাদের মহান নেতা হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙ্গালী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান জন্মগত ভাবেই ছিলেন গরিব মানুষের বন্ধু এবং তিনি ছিলেন ভয়হীন চীত্তের অধিকারী। আমি জানি আমার মতো একজন সাধারণ মানের লেখকের পক্ষে বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষনের বিচার বিশ্লেষন করা সম্ভব নয়। তবে এইটুকু বুঝতে পারি বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষনের মধ্যেই আমাদের স্বাধীনতার বীজ রোপন করা ছিল। বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষনে দেশের মানুষ জাগ্রত হয়েছিল এই জন্য যে, মানুষ বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষনে তাদের অন্তরের কথার প্রতিধ্বনি শুনতে পেয়েছে।


তাই বলছিলাম, আমাদেরকে ধরে নিতে হবে এবং স্বীকার করে নিতে হবে বাঙ্গালীর মুক্তির ইতিহাস লিখতে গেলে যে বিষয়টার ওপর জোর দিতে হবে, তা হল বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষন। আমার মনে হয় বাঙ্গালীর অর্থনৈতিক মুক্তির আন্দোলন থেকে শুরু করে সকল আন্দোলনেরই প্রেরণা হবে বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষন। এ ব্যাপারে মনে হয় না কেউ বিতর্ক উপস্থাপন করবেন।


লেখক: আইনজীবী, কবি ও গল্পকার।


বিবার্তা/এসএ

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

ময়মনসিংহ রোড, শাহবাগ, ঢাকা-১০০০

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2021 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com