শিরোনাম
নিয়মবহির্ভূতভাবে যুব সংহতির ১১ নেতাকে অব্যাহতি!
প্রকাশ : ১৯ আগস্ট ২০২১, ১০:৩৫
নিয়মবহির্ভূতভাবে যুব সংহতির ১১ নেতাকে অব্যাহতি!
জাহিদ বিপ্লব
প্রিন্ট অ-অ+

জাতীয় যুব সংহতির কেন্দ্রীয় কমিটি থেকে নিয়মবহির্ভূত, খোড়া অজুহাত ও ব্যক্তিস্বার্থে ১১ জনকে অব্যাহতি দেয়ায় অভিযোগ করেছেন সংগঠনটির নেতাকর্মীরা। বর্তমান কমিটির আহবায়ক ও সদস্য সচিব বলছেন নিষ্ক্রিয়তার জন্য এদের বাদ দেয়া হয়েছে। অথচ বিবার্তার অনুসন্ধানে দেখা গেছে অব্যাহতিপ্রাপ্ত বেশির ভাগ নেতাই নিজ নিজ এলাকায় সক্রিয় রয়েছেন।


উত্তরবঙ্গের একমাত্র নির্বাচিত উপজেলা চেয়ারম্যানও রয়েছেন বাদ পড়াদের তালিকায়। সন্তান প্রসবের সময় স্ত্রীর পাশে না থেকে সংগঠনের সভায় অংশ নিয়েছেন, এমন একজনকেও অব্যাহতি দেয়া হয়েছে কেন্দ্রীয় কমিটি থেকে। তিনি বর্তমানে সভাপতি হিসেবে একটি জেলায় দায়িত্ব পালন করছেন। বাদ দেয়া হয়েছে একাধিকবার কারা-নির্যাতিত নেতাকেও।


প্রায় ৮ মাস অতিবাহিত হলেও বর্তমান কমিটির শীর্ষনেতারা কোনো জেলাতেই সাংগঠনিক সফর করেননি বলে জানা গেছে। করতে পারেননি কোনো সাধারণ সভা। লালমনিরহাট, ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও নারায়ণগঞ্জ জেলার কমিটি ঘোষণা করলেও তা ঢাকায় বসেই অনুমোদন দেয়া হয়েছে বলেও জানা গেছে।


নিষ্ক্রিয়তার অভিযোগের জবাবে যুব সংহতির বেশ কয়েকজন নেতা বলেন, বর্তমান কমিটির আহবায়ক ও সদস্য সচিবই নিষ্ক্রিয়। তারা সংগঠনের কাকরাইল কার্যালয়ে আসেন না। যেদিন চেয়ারম্যান ও মহাসচিব আসেন সেদিনই তারা তাদের চেহারা দেখাতে আসেন। নেতারা আরো বলেন, তারা তো আমাদের কোনো দায়িত্ব বা নির্দেশই দেননি। তাহলে তারা কি করে বুঝলো আমরা নিষ্ক্রিয়। সংগঠনের ১১ নেতাকে বাদ দেয়ায় বর্তমান কমিটির অনেক সিনিয়র নেতাও বিবার্তার কাছে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন।


সংগঠনের একাধিক নেতা বলেন, যিনি জেলা সভাপতির দায়িত্বে আছেন, তিনি কিভাবে নিষ্ক্রিয় থাকে? একজন জনপ্রতিনিধি প্রতিদিনই বিভিন্ন কর্মকান্ডে শরিক হচ্ছেন, তাহলে তিনি কিভাবে নিষ্ক্রিয় থাকতে পারেন। কুয়েত শাখার সভাপতিও নাকি নিষ্ক্রিয়? তিনি প্রতিনিয়ত সংগঠনের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করে চলছেন, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নিয়মিত সংগঠনের প্রচারণা চালাচ্ছেন, তাকেও বাদ দেয়া হয়েছে।


২০ জানুয়ারি ২১ দিনের মধ্যে কেন্দ্রীয় পূর্ণাঙ্গ আহ্বায়ক কমিটি গঠন করে কেন্দ্রীয় দফতরে জমা এবং ৬ মাসের মধ্যে জেলা, মহানগর, উপজেলা, থানা এবং পৌরসভা সম্মেলন সম্পন্ন করে কেন্দ্রীয় সম্মেলন করার শর্তে জাতীয় যুব সংহতির কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক কমিটির অনুমোদন দেন জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান গোলাম মোহাম্মদ কাদের। এতে আহবায়ক করা হয় প্রয়াত এরশাদের ভাতিজা হুসেইন মকবুল শাহরিয়ার আসিফকে এবং সদস্য সচিব করা হয় আহাদ ইউ চৌধুরী শাহীনকে। ২১ দিনের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ আহবায়ক করার কথা থাকলেও তারা দেন ১৬ মার্চ।


১৪ আগষ্ট নিষ্ক্রিয়তার অভিযোগে জাতীয় যুব সংহতির কেন্দ্রীয় কমিটি থেকে অব্যাহতি দেয়া হয় ১১ জনকে। অব্যাহতি প্রাপ্তরা হলেন- যুগ্ম-আহবায়ক জুলফিকার হোসেন, এমদাদুল হক রূপম, কেন্দ্রীয় সদস্য মিয়া আলমগীর, ফেরদৌস করিম মনির, আলফাজ উদ্দিন ডিপজল, হানিফ হোসেন বাবু, ফজলুল হক, শাহরুখ আল হোসেন, মোখলেছুর রহমান বস্তু, আমিনুল ইসলাম ও অ্যাডভোকেট মুজিবুর রহমান। আর যাদের অন্তর্ভূক্ত করা হয়েছে তারা হলেন- যুগ্ম-আহবায়ক শফিকুল ইসলাম দুলাল, নেওয়াজ আলী ভূঁইয়া, নাসিম উদ্দিন বায়েজিদ, ফরিদ উদ্দিন, হাবিবুল্লাহ বাবু, ইউসুফ আলী লস্কর, গোলাম মোস্তফা, আরিফুল ইসলাম রুবেল, রাকিবুল ইসলাম সুজম, শাহ আনোয়ারুল অনু ও মো. সুজন মিয়া।


এসব অভিযোগের জবাবে জাতীয় যুব সংহতির সদস্য সচিব আহাদ চৌধুরী বলেন, যাদেরকে বাদ দেয়া হয়েছে তারা দলীয় কর্মকাণ্ডে সক্রিয় নন। তারা ফোন করেও আমাদের সাথে যোগাযোগ করে না। সংগঠনের প্রয়োজনে তাদের অব্যাহতি দিয়ে নতুনদের নেয়া হয়েছে। গঠনতন্ত্র মোতাবেক তাদের বাদ দেয়া হয়েছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, প্রয়োজনের ক্ষেত্রে গঠনতন্ত্র কিছু না।



এ বিষয়ে সংগঠনের সদস্য দফতর জিয়াউর রহমান বিপুল বিবার্তাকে বলেন, সংগঠনকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে গেছে। ৩০টি বছর সংগঠনের সাথে পথ চলেছি। তারপরও নাকি বর্তমান কমিটির বিশ্বস্ত হতে পারিনি। এ কমিটি বিতর্কিত হওয়ার পরও আমরা আন্তরিকভাবে কাজ করার চেষ্টা করেছি। যাকে কেন্দ্রীয় আহবায়ক করা হয়েছে তিনি সবাইকে চিনেন না। তাকে আমরা প্রেসিডেন্টের ভাতিজা হিসেবে চিনি। তিনি যেহেতু আমাদের চিনেন না, তাই মূল্যায়ণ করেন না। বিপুল অভিযোগ করে বলেন, সদস্য সচিবের অনুরোধে দফতরের দায়িত্ব নিয়েছিলাম। কিন্তু যখনই অফিসিয়ালি দায়িত্ব চাইলাম তখনই শুনলাম তারা একজন বিশ্বস্ত মানুষ চাচ্ছে। সম্মান দিতে না পারলে অসম্মান করার অধিকার তাদের নেই।


কমিটি থেকে অব্যাহতি পাওয়া আবু হানিফ বাবু বিবার্তাকে বলেন, এই সংগঠনে সময় দিতে গিয়ে তিনবার চাকরি হারিয়েছি। যেখানে পল্লীবন্ধুর সভা হয়েছে ছুটে গিয়েছি। সকাল ১০টায় আমার কন্যা সন্তানের প্রসবের সময় বনানীতে পার্টির সভা। আমি আমার স্ত্রীর কাছে না থেকে বনানীর সভায় সময় দিয়েছি। জীবনের ৩০টি বছর এই পার্টির জন্য দিনরাত পরিশ্রম করেছি। আমি বরগুনা জেলার সভাপতি। আমি নাকি নিষ্ক্রিয়! আমাকে বাদ দিয়ে জেলার রাজনীতিতে আমার সম্মান ক্ষুন্ন করা হয়েছে। কেনো যে আহাদ ভাই (যুব সংহতির সদস্য সচিব) এমন একটি কাজ করলো বুঝতে পারলাম না।


সংগঠনের যুগ্ম-আহবায়ক মিজানুর রহমান মিজান বলেন, তারা আমাদের কারো সাথে আলাপ না করেই এ ধরণের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। এটা তো কোনো অফিস বা এনজিও নয়, বৃহৎ রাজনৈতিক সংগঠন। জুলফিকার একজন নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি। তাকে না জানিয়ে তাকে অব্যাহতি দেয়া হলো! বরগুনা জেলা সভাপতি আবু হানিফকে বাদ দেয়া হলো এমনকি কুয়েত শাখার সভাপতিকেও অব্যাহতি দেয়া হলো। তারা কি নিষ্ক্রিয়? প্রতিনিয়ত তারা সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছেন। তাদের নিষ্ক্রিয় বলার সুযোগ নেই।


কমিটির অপর যুগ্ম-আহবায়ক দ্বীন ইসলাম সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে এ বিষয়ে লিখেছেন, আমাদের সাথে এসব বিষয়ে আলোচনার প্রয়োজন মনে করেননি। সব কিছুই হুটহাট। বর্তমান কমিটির আরেক যুগ্ম-আহবায়ক মুশফিকুর রহমানও কমিটি থেকে ১১ কেন্দ্রীয় নেতাকে অব্যাহতির বিষয়ে কিছু জানেন না বলে বিবার্তাকে জানান। কমিটি থেকে বাদ পড়া আলফাজ উদ্দিন ডিপজলকে কমিটি থেকে অব্যাহতি দেয়া হয়েছে বলে তিনি জানেনই না বলে জানান।


যুব সংহতির বর্তমান যুগ্ম-আহবায়ক হেলাল উদ্দিন বলেন, জাতীয় যুব সংহতির কমিটি গঠনতন্ত্র মোতাবেক হয়নি। গঠনতন্ত্রে তিনজন যুগ্ম-আহবায়ক থাকার কথা থাকলেও করা হয়েছে ১৫ জনকে। তবে দলের চেয়ারম্যান সংগঠনের স্বার্থে যেকোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।


জাতীয় যুব সংহতির আহবায়ক আসিফ শাহরিয়ারের কাছে এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বিবার্তাকে বলেন, জুলফিকারের কাছে কোনো রাজনৈতিক সহযোগিতা পাইনি। মহাসচিব যখন রংপুর গেলেন, তখনও তিনি আসার প্রয়োজন মনে করেননি। জাপার সাবেক মহাসচিবের ছবি ফেসবুকে আপলোড দেয়ার অপরাধে একজনকে অব্যাহতি দেয়া হয়েছে এমন অভিযোগ অস্বীকার করে তিনি বলেন, বিষয়টি অবান্তর। সাবেক মহাসচিবের ব্যক্তিগত কর্মকর্তাও কমিটিতে আছেন, তাকে তো অব্যাহতি দেয়া হয়নি। আর যেহেতু যুগ্ম-আহবায়ক কয়েকজনকে অব্যাহতি দেয়া হবে তাই তাদের নিয়ে কোনো সভা করা হয়নি। আসিফ অভিযোগ করে বলেন, যাদের সুপারিশ এই কমিটিতে রাখা হয়নি তারাই সমালোচনা করছেন। ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুব সংহতিতে অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব রয়েছে বলে স্বীকার করেন তিনি।


আহবায়ক আসিফ শাহরিয়ারের অভিযোগের জবাবে সদ্য অব্যাহতি পাওয়া যুগ্ম-আহবায়ক ও সেতাবগঞ্জ উপজেলা চেয়ারম্যান জুলফিকার হোসেন বিবার্তাকে বলেন, উনারা বলছেন- যোগাযোগ রক্ষা করিনি, ফোন করিনি। তাদের ফোন না দিলে অব্যাহতি দিতে হবে? তারা আমাদের কি সাংগঠনিক দায়িত্ব দিয়েছে? আমরা কি নিজ জেলায় কাজ করছি না! উনারা কোনো দায়িত্ব দেয়ার পর সেটা বাস্তবায়ণ না করলে বলতে পারতো আমি নিষ্ক্রিয়। আর তারা সারাদেশে সংগঠনকে শক্তিশালী করার জন্য কি করেছেন? কি দিক-নির্দেশনা দিয়েছেন? আমি মনে করি সংগঠনকে চাঙ্গা করতে হলে তৃণমূলকে শক্তিশালী করতে হবে। ঢাকায় এসে হাজিরা দিতে হবে, ফোন দিয়ে খোঁজ নিতে হবে, আর তা না হলে অব্যাহতি দেয়া ঠিক না। আত্মসম্মান বোধ আমাদেরও আছে। আমি জনপ্রতিনিধি। তাছাড়া আমি ব্যর্থ হলে আমাকে শোকজ করতে পারতেন। তা না করে ফেসবুকের মাধ্যমে অব্যাহতি দিয়ে দিলেন।


জাতীয় যুব সংহতি থেকে ১১ জনকে অব্যাহতিসহ সার্বিক বিযয়ে জাতীয় পার্টির মহাসচিব জিয়াউদ্দিন আহমেদ বাবলু বিবার্তাকে বলেন, রাজনীতি চলমান প্রক্রিয়া। বহু ঘাট পেরিয়ে লক্ষ্যে পৌঁছাতে হয়। আমিও ছাত্রনেতা থেকে সরকারের মন্ত্রী পর্যন্ত হয়েছি। বৃহৎ একটি সংগঠনের মহাসচিব। রাজপথে স্থবির হয়ে পড়লে নেতৃত্ব বসে থাকে না। তারপরও যদি কারো প্রতি অবিচার হয়ে থাকে তা সংশোধন করার সুযোগ রয়েছে। আমাকেও তো বাদ দেয়া হয়েছিলো, তখনও তো আমি কাজ করে গেছি। তিনি আরো বলেন, সংগঠনকে আরো গতিশীল করার জন্য আমাদের কাছে তারা ১১ জনকে বাদ দিয়ে নতুন ১১ জনকে অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব দিয়েছেন। তবে বর্তমান নেতৃবৃন্দ সংগঠনের সিনিয়র নেতাদের সাথে ১১ জনকে অব্যাহতি দেয়ার বিষয়ে আগে আলোচনা করেছিলো কি-না তা আমার জানা নেই বলে জানান জাপা মহাসচিব।


বিবার্তা/এনকে

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

এফ হক টাওয়ার (লেভেল-৮)

১০৭, বীর উত্তম সি আর দত্ত রোড, ঢাকা- ১২০৫

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2024 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com