প্রথম পর্ব
কাশ্মীর ভ্রমণ: ট্যুরিজমে এক ভিন্ন অভিজ্ঞতা
প্রকাশ : ৩০ অক্টোবর ২০২২, ১৬:৪৭
কাশ্মীর ভ্রমণ: ট্যুরিজমে এক ভিন্ন অভিজ্ঞতা
প্রফেসর ড. মো. নাসির উদ্দীন মিতুল
প্রিন্ট অ-অ+

৫০ বছরের জীবনে তাজমহল দেখিনি। একাডেমিক কাজে বহুবার দিল্লি, জয়পুর, হায়দ্রাবাদ, লক্ষ্ণৌ, বেঙ্গালুর, গোঁয়াসহ ভারতের অনেকগুলো প্রদেশ ভ্রমণে গেলেও তাজমহল দেখা হয়ে উঠেনি। এমনকি আগ্রার সন্নিকটে আলীগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়।


তাজমহলের দূরত্ব সেখান থেকে মাত্র ৮০ কিলোমিটার। বহুবার আলীগড়ে পড়াতে কিংবা প্রবন্ধ উপস্থাপনে গিয়েছি। অথচ তাজমহল দেখতে যাইনি। অনেকেই সেধেছিল। মাত্র ১ ঘণ্টার পথ। বিশ্ববিদ্যালয় ব্যবস্থা করে দিবে এমন সুযোগ পেয়েও রাজি হইনি। কারণ পূর্ব অভিজ্ঞতা ভালো ছিল না। ইতোপূর্বে ইউরোপ আমেরিকার অনেক বিখ্যাত জায়গা ভ্রমণে যতনা আনন্দ পেয়েছি, তার চেয়ে যাতনা পেয়েছি ঢেড় বেশি। মনে হতো ইস! এসময় যদি প্রিয়জন কাছে থাকতো? কতই না উপভোগ্য হতো এ ভ্রমণ! এ কারণেই প্রেমের তাজমহল একাকী দেখার ঝুঁকি নেইনি।


২০১৯ সালের পর আর দেশের বাইরে যাওয়া হয়নি। করোনা নিয়ন্ত্রণে এলে খানিক সময় বের করে তাই শ্রেফ ঘুরতে যাওয়ার প্ল্যান করি। প্ল্যানে প্রথমে দিল্লি, আগ্রা, জয়পুর ও সিমলা যাবো বলে মন স্থির করি। পরে বন্ধু মীর্জার পরামর্শে তা আংশিক পরিবর্তন হয়। কাশ্মীর ভ্রমণের ব্যাপারে সে আমাকে উৎসাহিত করে এবং ইন্ডিগোর গো-ফার্ষ্ট ফ্লাইটে আগাম রাউন্ড্ট্রিপ টিকেট কেটে ফেলে। খরচ, নিরাপত্তা, সামর্থ্য সব মিলিয়ে সে আমাকে আশ্বস্ত করে যে, কাশ্মীর গেলে ভ্রমণটা উপভোগ্য হবে। মীর্জা আমার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বন্ধু। পুরো নাম আমিনুল মীর্জা। জার্নালিজমের ছাত্র ছিল। এখন বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস) এর ব্যুরো প্রধান হিসেবে দিল্লিতে কর্মরত রয়েছে। অসাধারণ একজন ভালো মানুষ। আমিতো বলেই ফেলেছি, সাংবাদিকতার পাশাপাশি সে যদি ট্যুরিষ্ট গাইড হতো তাহলে আরো ভালো করতো। নিজ পেশার পাশাপাশি অনেকদিন ধরেই বাংলাদেশের অনেক মানুষকে সে সঠিক তথ্য উপাত্ত দিয়ে ভ্রমণে দারুণ সহায়তা করে আসছে।


৯ অক্টোবর ২০২২ তারিখে আমি, আমার স্ত্রী ও কন্যা যথারীতি ঢাকা থেকে ভিস্তারা এয়ারওয়েজে দিল্লির উদ্দেশ্যে সকাল ১০টায় যাত্রা শুরু করি। দু’দিন দিল্লিতে অবস্থানের পর ১১ তারিখ দুপুরে স্বপ্নের ভু-স্বর্গ দেখতে রওয়ানা হই। মাত্র ১ ঘন্টা ২০ মিনিটে আমরা দিল্লি থেকে কাশ্মীরের রাজধানী শ্রীনগর পোঁছে যাই। শ্রীনগর এয়ারপোর্টে পৌঁছে এক হাজার রুপি দিয়ে একটি প্রি-পেইড ট্যাক্সি নিয়ে সোজা রয়েল কনফোর্ট রেসিডেন্সি হোটেলে উঠি। উল্লেখ করা প্রয়োজন, অনলাইনে আমরা যে হোটেল বুকিং দিয়েছিলাম, সেখানে আমাদের থাকা হয়নি। কারণ ওটা ছিল ডাললেকের একটি অভিজাত হাউজবোট হোটেল। যা অনেকটা আমাদের দেশের বুড়িগঙ্গা নদীর ওপর লঞ্চ বা জাহাজের আদলে সাজানো বোট। প্রশ্ন থাকতে পারে, কেন থাকিনি সেখানে? উত্তরে বলবো, ডাললেকের অবস্থা অনেকটা আমাদের বুড়িগঙ্গার মত না হলেও পানিতে খানিক দুর্গন্ধ রয়েছে। রয়েছে মশার উৎপাত। ভারতজুড়ে এখন আর করোনার ভয় না থাকলেও রয়েছে ডেঙ্গুর ভয়। এটি একটি কারণ।


অন্যটি কারণটি হচ্ছে, আমি বরিশালের মানুষ। নদী-নৌকা দেখে বড় হয়েছি। তাই এসব এখন আর আমায় টানে না। ফেরদৌসের পরামর্শে পাঁচ হাজার রুপি/ডে দিয়ে হোটেল রয়েল কমফোর্ট রেসিডেন্সীতে উঠি। এটি ডাললেকের ১৪ নং গেইটে অবস্থিত। সাথেই লা-আজিজ নামে খুব ভাল মানের একটি খাবারের রেস্টুরেন্ট রয়েছে। দারুণ হোটেল। সময়টা একদম লাঞ্চ টাইম হওয়ায় লা-আজিজ রেস্তোরাঁয় সুস্বাদু বিরিয়ানি খেয়ে বেরিয়ে পড়ি। একে একে ডাললেকের সবক’টি পয়েন্টের নয়নাভিরাম সৌন্দর্য পরখ করি। মোঘল নিষাদ গার্ডেন, শালিমার গার্ডেন, কাশ্মীর বিশ্ববিদ্যালয়, হযরত-এ-বাল মসজিদ, সীকারা, হাউজবোট ঘুরে মার্কেটে কিছু টুকটাক কেনাকাটা করে ভীষণ ক্লান্ত হয়ে হোটেলে চলে আসি। স্বল্প সময়ে এতসব কিছু সম্ভব হয়েছে ফেরদৌসের চমৎকার গাইড আর ওর এ্যানোভা গাড়ীর বদৌলতে। ফেরদৌস আমাদের পূর্ব পরিচিত নন। প্রি-পেইড ট্যাক্সিটা ওর। পথেই আলাপ হয়। হিষ্ট্রিতে সবে কাশ্মীর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাস্টার্স শেষ করেছে। বয়স ২৬ বছর। মাস ছয়েক আগে তার সহপাঠিনীকে বিয়ে করে। ভালো ইংরেজী বলে। আলাপকালে আমার শিক্ষকতার পরিচয় পেয়ে একটু আগ বাড়িয়ে খায়-খাতির করে। কথাবার্তায় আচার আচরণে অমায়ীক তাই ওকে বিশ্বাস করি এবং পুরো কাশ্মীর ভ্রমণে তিনদিনের জন্য ওর গাড়ী বুকিং দিয়ে ফেলি। ভাড়া প্রতিদিন চার হাজার রুপি করে। তাতে আমরা যেখানেই যাই না কেন।


দিনের তাপমাত্রা মোটামুটি নরমাল থাকলেও সন্ধ্যায় কনকনে বাতাসে প্রচুর শীত নামে। এ পর্যন্ত তেমন চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হয়নি। মেয়ে আর মেয়ের মা তাই ঠিক এই মুহুর্তে রিলাক্সে ঘুমুচ্ছে। পরের দিন অর্থাৎ ১৩ই অক্টোবর সকালে পেহেলগাম যাত্রা করবো। ফেরদৌস আর ওর গাড়ি ঠিক ৭টায় এসে হাজির হবে। শুনেছি পেহেলগাম অনেক সুন্দর একটা জায়গা। অনেকেই বাংলাদেশ থেকে এখানে ভ্রমণে এসে নানান রকমের সমস্যায় পড়ে। তাই কাশ্মীর সফর নিয়ে নিজ অভিজ্ঞতার কথা লিখলে হয়তো আগাম একটা ধারণা পাওয়া যাবে যা পর্যটকদের ভ্রমণ সহায়ক হবে। এমন চিন্তা থেকেই এ কাহিনী লেখা।


পূর্ব প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী গাড়ি হাজির। কথা ছিল সাড়ে সাতটায় নাস্তা সেরেই বের হয়ে যাবো। তা আর হলো কই। ক্লান্তি, নরম বিছানা আর ডাললেকের কনকনে ঠাণ্ডা বাতাসে এত চমৎকার ঘুম হলো যে বেরুতে ঘণ্টাখানেক বিলম্ব হয়। সকাল ৮টায় পেহেলগামের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করি। জীবনে প্রথম এশিয়ার মিনি সুইজারল্যান্ড খ্যাত পেহেলগাম যাচ্ছি। সেখানে গিয়ে পেহেলগাম ভ্যালী, কাশ্মীর ভ্যালী, মিনি সুইজারল্যান্ড, ওয়াটার ফল, চন্দনওয়ারী, লিডার রিভার, বেতাব ভ্যালীসহ বেশ কয়েকটা দৃষ্টিনন্দন স্পট দেখবো বলে খুব এক্সাইটেড আছি।


যাত্রাকালেই মেয়ে রাস্তার দু'পাশের চিনর ট্রি, পাইন ট্রি, আর সেঞ্চুরি ট্রি’র বাহারী পাতা দেখে ‘ওয়াও আউ, সুন্দর, দারুন, চমৎকার’ বলা শুরু করলো মাত্র। আমরাও বেশ থ্রিল ফিল করছি। প্রথমে একটু ভালো লাগলেও পুরো কাশ্মীর ভ্রমণে একটি ব্যাপার চরম বিরক্তির কারণ হয়ে উঠে। তাহলো একটু পরপর খাকি পোশাক পড়া এক একজন ভদ্রলোক বাঁশি ফু দিয়ে গাড়ি থামিয়ে দিচ্ছে। প্রথম কয়েকবার ভেবেছি ট্রাফিক পুলিশ বুঝি। কিন্তু না। ড্রাইভারের পাশের সিটে বসেছি। তাকে জিজ্ঞেস করি, কি ব্যাপার? উত্তরে সে তাদের পূর্বাপর যা বর্ণনা দিলো তাতে কাশ্মীরের স্বাধীনতাকামী মানুষের ভারত সরকারের ওপর অসন্তোষের চিত্র ফুটে উঠে। এ অসন্তোষ বহু পুরনো হলেও ২০১৯ সালের পর তা যেনো দাবানল হয়ে হ্রদয়ে ঘুমরে কাঁদে।


‘এ্যামান্ডমেন্ট অব দি আর্টিকেল ৩৭০’ এর নামে ভারত সরকার জন্মু-কাশ্মীরকে মূলত একঘরে করে দেয়। অনেকগুলো অমানবিক বিষয় এই সংশোধনীতে থাকলেও মূলত তিনটি উল্লেখযোগ্য সংশোধনী জম্মু-কাশ্মির ও লাদাকবাসীর সমস্ত স্বাধীনতা খর্ব করে দেয়। তা হলো: ক). ঐ তিন এলাকার অধিবাসীগন কখনো অন্য এলাকার কারো কাছে জমি বিক্রি করতে পারবে না। তেমনি অন্য ষ্টেটের কেউ এখানে জমি ক্রয় করে বসতি স্থাপন করতে পারবে না। তবে নিজেরা নিজেদের মধ্যে জমি কেনাবেচা করতে পারবে।


খ). ভারতের অন্য এলাকার যে কেউ জন্মু-কাশ্মীরে চাকুরি করতে পারবে। কিন্তু কাশ্মীরের কেউ অন্য কোন ষ্টেটে চাকুরি করতে পারবে না।


গ). সামর্থ্য বা প্রয়োজন থাকলেও জম্মু-কাশ্মীরে ঘর-বাড়ী কিংবা পাকা স্থাপনা নির্মাণ করা যাবে না। তাছাড়াও শান্তিকামী কাশ্মীরবাসীকে অনেকসময় পাকিস্তানি অনুচর বা দালাল বলে সন্দেহ করা হয়। আরও দুঃখজনক হলো হাইওয়েতে প্রতি ২০ গজ দূরে-দূরে একজন করে সিআরপিএফ (সেন্ট্রাল রিজার্ভ পুলিশ ফোর্স) টহল দিচ্ছে।


ট্যুরিস্টদের কাছে মনে হতে পারে পুরো কাশ্মীর যেন এক ব্যাটেলফিল্ড। আতংক সর্বত্র। তারপরেও কাশ্মীর এক স্বপ্নের নাম। ভূ-স্বর্গ যার প্রতিশব্দ। যাহোক তম্ময় হয়ে যখন সেফ্রান অতিক্রম করছিলাম। তখন মনে পড়ে গেলো মোদিজি'র স্বাস্থ্যসেবা বিষয়ক পরামর্শের কথা। সুস্থ থাকার জন্য তিনি কোনো এক ভারতীয় টিভি চ্যানেলে ‘শিলাজীৎ’ খেতে বলেন। এই শিলাজীৎ ডায়াবেটিসের মহৌষধ। এখানেই কেবল তা পাওয়া যায়। তাছাড়া সেফ্রন তেল, সেফ্রন মধু, সেফ্রন জেলী এতটাই সুস্বাদু ও স্বাস্থ্যসম্মত যা আজকাল ডাক্তাররা প্রেস্কক্রিপশন দিয়ে রোগীকে খেতে বলেন। আরেক বিস্ময়ের বিস্ময় হলো জাফরান! মসলার রাজা হিসেবে যা কিনা গোটা বিশ্বে সমাদৃত। অতি মূল্যবান এ জাফরান বিরিয়ানিতে সামান্য একটু মিশালেই কেল্লা ফতেহ। পুরান ঢাকার বিখ্যাত হাজী’র বিরিয়ানিতে এর সংমিশ্রণ হয় কিনা জানি না, তবে লা-আজিজ হোটেলের মাটন বিরিয়ানিতে এর সংমিশ্রণের ফলে আমাদের সকলের ঘ্রাণেন্দ্রিয় ত্রাহি-ত্রাহি করে উঠে। রঙ দেখেই যেন মনটা জুড়িয়ে যায়। বাধ্য হয়ে তাই কয়েকগ্রাম কিনে আনি। দাম হাঁকাবে ৩০০ রুপি/গ্রাম। দর দাম করে ২৪০ রুপি করে কয়েক গ্রাম কিনেছি।


[পাহাড়, ঝর্ণা আর মেঘের খেলা দেখতে দেখতে মৃত্যুকেই যেন আরেকবার আলিঙ্গন করে এসেছি। এ্যাডভেঞ্চারের পুরোটা জানতে চোখ রাখুন আগামী পর্বে। পাঠের অনুরোধ রইলো]।


লেখক: প্রফেসর ড. মো. নাসির উদ্দীন মিতুল, ডিন, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়।


বিবার্তা/বিএম

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

পদ্মা লাইফ টাওয়ার (লেভেল -১১)

১১৫, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ,

বাংলামোটর, ঢাকা- ১০০০

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2021 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com