মধুর আমার মায়ের হাসি...
প্রকাশ : ১৩ মে ২০১৮, ১২:৪৫
মধুর আমার মায়ের হাসি...
বিবার্তা ডেস্ক
প্রিন্ট অ-অ+

একটা চাদঁ ছাড়া রাত আধাঁর কালো, মায়ের মমতা ছাড়া কে থাকে ভালো ... সঙ্গীতশিল্পী কুমার বিশ্বজিৎ এর এই গানের প্রতিটি কথা আসলেই সত্যি মায়ের মমতা ছাড়া কেউ ভালো থাকে না। ত্রি-ভূবনের সবচেয়ে মধুরতম শব্দ 'মা'। মা উচ্চারণের সাথে সাথে হৃদয়ের অতল গহীনে যে আবেগ ও অনুভূতি রচিত হয়, তাতে অনাবিল সুখের প্রশান্তি নেমে আসে।


মধুর আমার মায়ের হাসি চাঁদের মুখে ঝরে... সত্যিই তাই, মায়ের হাসির থেকে মধুরতা আর পবিত্রতা অন্যকিছুতে নেই। খুব ছোট শব্দ ‘মা’ এর মধ্যেই যে পৃথিবীর সব সুখ-শান্তি লুকিয়ে আছে, এই শব্দের পরিধিও অনেক বিশাল। আমরা জন্ম থেকেই কোনো না কোনো আশ্রয় খুঁজি। আর জন্ম থেকেই যার কোলে সবচেয়ে বড় আশ্রয় পেয়ে আসছি, সে আমাদের মা। আমাদের গর্ভধারিণী, জননী আমাদের কাছে পুরো একটা পৃথিবী।




আজ রবিবার (১৩ মে) ‘বিশ্ব মা দিবস’। বিশ্বের সকল মাকে উৎসর্গ করা দিন আজ। প্রতিবছর মে মাসের দ্বিতীয় রবিবার এই দিবসটি যথাযথ মর্যাদায় পালিত হয়।


মা দিবসের উদ্দেশ্য, প্রতিটি মাকে যথাযথ সম্মান দেয়া। শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা দেয়া। যিনি জন্ম দিয়েছেন, লালন-পালন করেছেন ‘সেই মা অনেক ক্ষেত্রেই অবহেলিত। ঘরে-বাইরে সর্বেক্ষত্রে মায়ের অধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষেই দেশে দেশে মা দিবস পালন করা হয়।


সত্যিই... ‘মা’ শব্দটায় আছে মাত্র একটি অক্ষর, কিন্তু তার ব্যাপকতা পরিমাপ করা অসম্ভব। একজন মানুষের জন্মের আগে থেকে মৃত্যু পর্যন্ত পুরোটা সময়ে তার মায়ের প্রভাব বিরাজমান।


তবে মা দিবস মানে এই নয় যে, শুধু এই একটি দিনেই মাকে সব সম্মান, ভালোবাসা দেবো, কোনো একটা উপহার দিয়ে তাকে খুশি করব। আর বাকি ৩৬৪ দিন তাকে ভুলে থাকব।


ইউরোপ-আমেরিকায় ঘটা করে পালন করা হয় মা দিবস। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ভিন্ন ভিন্ন তারিখে যেমন ফেব্রুয়ারির দ্বিতীয় রোববার নরওয়েতে, মার্চের চতুর্থ রোববার আয়ারল্যান্ড, নাইজেরিয়া ও যুক্তরাজ্যে এবং বাংলাদেশে মে মাসের দ্বিতীয় রোববার দিবসটি পালন করা হয়।




পৃথিবীর অনেক মানুষেরই জীবনের শ্রেষ্ঠ অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করেন তাদের 'মা'। এই মা কখনো তাদের জীবনে হাজির হয়েছেন আবেগের আশ্রয় ভূমিকায়, আবার কখনো হয়ে উঠেছেন সংগ্রাম, আত্মত্যাগ, অধ্যবসায় ও সাফল্যের চাবিকাঠি।


কীভাবে এলো মা দিবস
মাকে নিয়ে কেন দিবস পালন আর কেনই বা প্রতিবছর মে মাসের দ্বিতীয় রোববার আন্তর্জাতিক মা দিবস পালন করি আমরা। বর্তমানে প্রচলিত মা দিবসের সূচনা ১৯০৮ সালে। শতাব্দীর শেষদিকে যুক্তরাষ্ট্রের ফিলাডেলফিয়ার এক স্কুল শিক্ষিকা অ্যানা জারভিস সেখানকার পারিবারিক বিচ্ছিন্নতা দেখে মর্মাহত হয়ে মায়ের জন্য বিশেষ দিন পালনের মাধ্যমে সচেতনতা সৃষ্টি করার কথা ভাবেন। তাঁর সে ভাবনা বাস্তবায়নের আগেই ১৯০৫ সালের ৯ মে তিনি মারা যান। তার মৃত্যুর পর মেয়ে অ্যানা এম জারভিস মায়ের শেষ ইচ্ছা পূরণের উদ্দেশে কাজ শুরু করেন। বন্ধুবান্ধবকে নিয়ে ১৯০৮ সালে তার মা ফিলাডেলফিয়ার যে গির্জায় উপাসনা করতেন, সেখানে সব মাকে নিয়ে একটি অনুষ্ঠানের মাধ্যমে মা দিবসের সূচনা করেন। ১৯০৭ সাল থেকে মার্কিন স্কুল শিক্ষিকা আন্না জারভিস তাঁর প্রাণ-প্রিয়তমা মা অ্যান মারিয়া বিভেশ জারভিস এর মৃত্যু বার্ষিকীর দিনটি মা দিবস হিসেবে পালিত হয়ে আসছে। ১৯১৪ সালে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট উড্রো উইলসন এই দিনটিকে জাতীয় মা দিবস হিসাবে মর্যাদা দেন এবং ১৯৬২ সাল থেকে এই দিনটি আন্তর্জাতিক মা দিবস হিসেবে স্বীকৃতি পায়।



যুগ যুগ ধরে মা


এক ব্যক্তি জিজ্ঞাসা করল ‘ইয়া রসুলুল্লাহ! আমি সর্বাগ্রে কার সঙ্গে সদাচরণ করব? রসুল (সা.) বলেন, তোমার মায়ের সঙ্গে। লোকটি প্রশ্ন করল, তারপর? উত্তর এলো তোমার মা। লোকটি আবার জানতে চাইল অতঃপর কে? রসুল (সা.) এবারও জবাব দিলেন তোমার মা। ওই লোক চতুর্থবার একই প্রশ্ন করলে রসুল (সা.) বলেন, তোমার পিতা।’ (বোখারি ও মুসলিম)


ইসলামে মায়ের মর্যাদা কতটা মহিমান্বিত করা হয়েছে উপরোক্ত হাদিসটি তারই নজির। আল্লাহ তার রহমতের সুধা দিয়ে প্রতিটি মাকে সৃষ্টি করেছেন। মা শব্দটি মানুষ মাত্রেরই প্রিয়। তাদের বানিয়েছেন করুণার আধার হিসেবে। সন্তানের প্রতি মায়ের ভালোবাসা, করুণা মমত্ববোধ আল্লাহর অশেষ কুদরতেরই নিদর্শন। এটি শুধু মানুষ নয় প্রাণিজগতের সব প্রাণীর জন্যও এক সাধারণ সত্যি। এ জন্য আল্লাহ এবং রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পর মায়ের হক বেশি। একাধিক হাদিসে এ বিষয়টি স্পষ্ট করা হয়েছে।


মনীষীদের জীবনেও মা ছিল তাদের প্রধান অনুপ্রেরণা


মাকে নিয়ে নেপোলিয়ন বোনাপোর্টের সেই উক্তি কে না জানে, ‘আমাকে একজন ভাল মা দাও, আমি তোমাকে একটি ভাল জাতি উপহার দেবো।’


আব্রাহাম লিংকন বলেছিলেন, `আমি যা কিছু পেয়েছি, যা কিছু হয়েছি অথবা যা হতে আশা করি তার জন্য আমি আমার মায়ের কাছে ঋণী।` তাঁর মতে, ’যার মা আছে, সে কখনই গরীব নয়।’


জর্জ ওয়াশিংটন তাঁর মাকে নিয়ে বলেন,‘ আমার দেখা সবচেয়ে সুন্দরী মহিলা আমার মা। মায়ের কাছে আমি চির-ঋণী। আমার জীবনের সমস্ত অর্জন তারই কাছ থেকে পাওয়া নৈতিকতা, বুদ্ধিমত্তা আর শারীরিক শিক্ষার ফল।’


মহিমান্বিতদের জীবনে মা মানেই সফলতার সর্বপ্রথম সিঁড়িটা। তারপর শুধুই সামনের দিকে ওঠা।




মা’কে নিয়ে সাহিত্য


রুশ সাহিত্য এবং বিশ্ব সাহিত্যের সেরা বই ম্যাক্সিম গোর্কির ‘মা’। এক সাধারণ মা থেকে বিপ্লবী মা হয়ে ওঠার গল্প আছে এতে। মাকে নিয় আমাদের উপমহাদেশে মানিক বন্দোপাধ্যয়ের শ্রেষ্ঠ রচনা ‘জননী’। আমাদের দেশে রয়েছে শওকত ওসমানের শ্রেষ্ঠ রচনা ‘জননী’। ৭০ দশকের নকশাল বাড়ি আন্দোলনের সশস্ত্র বিপ্লবের পটভূমিতে লেখা মহাশ্বেতা দেবীর ‘হাজার চুরাশীর মা’। এছাড়া মাকে নিয়ে বিশেষ কবিতা, গান, চলচ্চিত্রও কম সৃষ্টি হয়নি যুগ যুগ ধরে।


আমাদের জীবনে মা, অতি সাধারণ মা


জন্মের পর থেকে মায়ের গন্ধে মেখে বড় হয়ে ওঠা, আদর-আবদারের যাবতীয় ভরসা মা। খুব খেয়াল করলেই তাঁর ত্যাগী, পরিশ্রমী মুখের আড়ালে সতেজ আর ঝলমলে একটা মুখ দেখতে পায় সন্তানেরা। স্বামী-সন্তান-সংসার আর কখনোবা নিজের কর্মস্থল- এই জীবনযুদ্ধে আমার মনে হয় প্রতিটা মা’ই জয়ী।


সন্তান জন্মের আগে ভীষণ কষ্ট অথচ স্বপ্ন নিয়ে জেগে থাকে একটি শিশুর মুখ দেখবে বলে। তাকে বড় করে তুলতে নিজের সবটুকুকে দমিয়ে রাখেন, খুব কষ্ট হলে লুকিয়ে চোখের পানি ফেলেন। একজন মা তাঁর সন্তানের বাড়ি ফেরার অপেক্ষা করে কথার ডালি সাজিয়ে, সন্তানের চিন্তায়-অসুখে নিজের ঘুম হারাম করেন, আঁচলের কোনায় বেধে রাখা জমানো টাকাটা থাকে তাঁর প্রিয় সন্তানের জন্য রেখে দেয়।


সংসারের বাইরেও মাকে কাজে নামতে হয়। সে ছোট-বড় যে কাজই হোক। তবে, যখন দেখি তপ্ত রোদের মাঝে মা তাঁর শিশুকে পাশে বসিয়ে আপনমনে হাত চালিয়ে কাজ করে চলেছেন, ঘেমে ভিজে যাচ্ছে তাঁর কোমল কিন্তু কঠোর মুখটি, তখন অদ্ভুত এক শ্রদ্ধা চলে আসে। মনে হয় এই খেটে খাওয়া মা তাঁর ওই সন্তানের জন্য কঠিন কাজে নামতে দ্বিধা করেনি।


মা দিবস কেন প্রয়োজন


যে মা এতকিছু করে, সেই মায়েরও বয়স হয়, সেও একসময় ভেঙে পড়ে। সন্তানের মনে রাখতে হবে মা যেন কখনো বোঝা হয়না। সন্তান যদি কোনোদিন মায়ের কাছে বোঝা না হয়, তাহলে মা কেন বোঝা হয় সন্তানের কাছে?


এসব কিছু থেকে বেরিয়ে আসার জন্য মা দিবসের দরকার আছে। যদিও আমরা মাকে প্রতিদিনই ভালোবাসি। অন্যদিন খুব একটা না ভাবলেও অন্তত একটা দিন মায়ের কথা, তাঁর সুখ-দুঃখ, চাওয়া-পাওয়ার কথা আমরা ভাবতে পারি। এইদিন থেকেই নতুন ভাবে মায়ের জন্য আলাদা কিছু করতে পারি। তাঁর পরিশ্রমের হালটা একটু ধরতে পারি, তাঁর ত্যাগগুলোকে নিজের মধ্যে একটু করে ধারণ করতে শুরু করি।


বিশেষ এই দিনে তার হাতে তুলে দিতে পারি তাঁর পছন্দের বিশেষ কোনো উপহার, তাঁর জন্য বিশেষ কোনো আয়োজন, তাকে চমকে দিয়ে কোথায় ঘুরতে নিয়ে যাওয়া, তাকে একটু আনুষ্ঠানিকভাবেই হাত ধরে ‘ভালোবাসি’ কথাটা বলেই ফেলি।


‘আমি ও মা’ শীর্ষক ছড়াপাঠ ও ছড়াগানের বিশেষ অনুষ্ঠান আয়োজন করেছে ম্যাক্সপোজার লিমিটেড। সন্ধ্যা ৬টায় জাতীয় জাদুঘরের সুফিয়া কামাল মিলনায়তনে এই অনুষ্ঠান হবে।


বিবার্তা/শারমিন

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

৪৬, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ

কারওয়ান বাজার (৬ষ্ঠ তলা), ঢাকা-১২১৫

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: bbartanational@gmail.com, info@bbarta24.net

© 2016 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com