বঙ্গবন্ধুকন্যার নেতৃত্বে আমাদের অর্থনৈতিক মুক্তির সংগ্রাম চলমান
প্রকাশ : ১৬ ডিসেম্বর ২০২২, ১২:৪০
বঙ্গবন্ধুকন্যার নেতৃত্বে আমাদের অর্থনৈতিক মুক্তির সংগ্রাম চলমান
গুলশাহানা ঊর্মি
প্রিন্ট অ-অ+

১৬ ডিসেম্বর, মহান বিজয় দিবস। আমাদের জীবনে একটা গোলাপ ফোটানো দিন। পরাধীনতা ও দাসত্বের শৃঙ্খল ভেঙে মুক্ত বিহঙ্গের মত ডানা মেলে ওড়ার দিন। মাতৃজঠর থেকে ভূমিষ্ঠ শিশু যেমন চিৎকার করে জানান দেয় তার আগমন, ঠিক তেমনি ১৬ ডিসেম্বর বাঙালির আত্মচিৎকারে বিশ্ব জেনেছিল পৃথিবীর বুকে জন্ম নিল একটি স্বাধীন পতাকা, মানচিত্র ও দেশ।


বিশ্বনেতাদের পারস্পরিক বোঝাপড়া, মতবিনিময়, আলাপচারিতা, আপস-মীমাংসা কিংবা গোলটেবিল বৈঠকে বসে ভাগ-বাটোয়ারার মাধ্যমে বাংলাদেশ নামক স্বাধীন দেশটির জন্ম হয়নি। এক সাগর রক্ত, ত্রিশ লাখ প্রাণ, সম্ভ্রমহারা দুই লাখ মা-বোনের আর্তনাদ আর আমাদের পূর্ববর্তী প্রজন্মের একজীবনের ত্যাগ-তিতিক্ষা-আন্দোলন-সংগ্রামের বিনিময়ে অর্জিত হয়েছে আমাদের স্বাধীনতা।



সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি, জাতির পিতার বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অবিসংবাদিত নেতৃত্বে বাঙালি জাতি দীর্ঘ ২৩ বছর পাকিস্তানি শাসকদের নিপীড়ন এবং বঞ্চনার বিরুদ্ধে ৯ মাস জীবনপণ লড়াই করে তবেই আমরা অর্জন করেছি আমাদের মহান স্বাধীনতা। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব তার রাজনৈতিক জীবনে ৪ হাজার ৬৮২ দিন কারাভোগ করেছেন। এর মধ্যে স্কুলের ছাত্র অবস্থায় ব্রিটিশ আমলে সাত দিন কারা ভোগ করেন। বাকি ৪ হাজার ৬৭৫ দিন তিনি কারাভোগ করেন পাকিস্তান সরকারের আমলে। ব্যক্তিগত সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য, পরিবার সবকিছুকে পাশ কাটিয়ে জাতির পিতার একমাত্র লক্ষ্য ছিলো বাঙালি জাতির মুক্তি। যে মুক্তি অর্থ শুধু রাজনৈতিক মুক্তি কিংবা একটি স্বাধীন দেশই না; তাঁর লক্ষ্য ছিলো ক্ষুধা-দারিদ্র্যমুক্ত একটি উন্নত সমৃদ্ধ স্বপ্নের ‘সোনার বাংলা’।



স্বাধীনতার পর আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন বঙ্গবন্ধু সরকার মাত্র সাড়ে তিন বছরের মাথায় যখন যুদ্ধে প্রায় ধ্বংসস্তুপে পরিণত হওয়া দেশকে পুনর্গঠন করে অর্থনীতির চাকা সচল করার সংগ্রামে নিবেদিত ছিল, ঠিক তখনই স্বাধীনতাবিরোধী চক্র আন্তর্জাতিক শক্তির সহায়তায় ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা করে। স্তব্ধ-স্থবির হয়ে যায় দেশ, থেমে যায় উন্নয়নের চাকা।


বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের ২১ বছর পর ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে জয়ী হয়ে রাষ্ট্র ক্ষমতায় আসে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ, দেশ পরিচালনার দায়িত্ব হাতে তুলে নেন জাতির পিতার সুযোগ্যকন্যা শেখ হাসিনা। বঙ্গবন্ধুকন্যার নেতৃত্বে ’৭৫ সালে হোঁচট খাওয়ার পর আবারও চলতে শুরু করে উন্নয়নের চাকা। অর্থনৈতিক অচলাবস্থা কাটিয়ে ওঠে বিশেষ করে কৃষিতে প্রবৃদ্ধি অর্জন, মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, বিদ্যুৎ উৎপাদন উল্লেখযোগ্য। এছাড়াও দেশের দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সুরক্ষাকল্পে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ‘সেইফটি নেট’কার্যক্রম শুরু করেন। গ্রহণ করা হয় ‘একটি বাড়ি একটি খামার’ এর মতো দারিদ্র বিমোচনে যুগান্তকারী কর্মসূচি। বয়স্কভাতা ও বিধবাভাতার মত কর্মসূচিগুলোর সূচনাও ঘটে এ সময়ে। তথ্য প্রযুক্তিখাতে আমদানিশুল্ক কমিয়ে তথ্য প্রযুক্তিকে জনগণের কাছে সহজলভ্য করে তোলে, ‘ডিজিটাল যুগ’ এ প্রবেশের সূচনা হয় মূলত এর মাধ্যমেই। রাজনৈতিক ক্ষেত্রে ভারতের সাথে ‘গঙ্গার পানি বন্টন চুক্তি’, ‘পার্বত্য চট্টগ্রামের শান্তি চুক্তি’, ২১শে ফেব্রুয়ারিকে ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ এর স্বীকৃতি, জাতিসংঘে নিরাপত্তা পরিষদে নির্বাচন বিশ্ব আঙিনায় বাংলাদেশকে মর্যাদা ও গুরুত্বের সাথে নতুনভাবে উপস্থাপন করে।


২০০১ সালের নির্বাচনে দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্রের কাছে হেরে যায় বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ। দেশে শুরু হয় খুন, ধর্ষণ, হামলা, লুটপাট, সহিংসতা, সংখ্যালঘু নির্যাতন ও অগ্নিসংযোগের মহোৎসব। রাজাকার মন্ত্রিসভায় স্থান পায় আর রাজাকারের গাড়িতে উড়ে ৩০ লাখ শহিদের রক্ত ভেজা পতাকা। যুদ্ধ করে স্বাধীন একটি জাতির জন্য এর চেয়ে লজ্জার আর কী হতে পারে। দুর্নীতি, চুরি আর লুটপাটের ফলে লাভজনক প্রতিষ্ঠানগুলো মুখ থুবড়ে পড়ে, হাজার হাজার কোটি টাকা বিদেশে পাচার হয়ে যায়, বিশ্ব দুর্নীতিতে চ্যাম্পিয়নের খাতায় নাম ওঠে। জন্ম হয় ‘বাংলা ভাই’ এর মতো সাম্প্রদায়িক জঙ্গিগোষ্ঠীর। সারাদেশে একসাথে চলে সিরিজ বোমা হামলা, পরিচালিত হয় ইতিহাসের নির্মম-বর্রোচিত গ্রেনেড হামলা। ২০০৭ সালে জারি করা হয় জরুরী অবস্থা, স্থগিত হয়ে যায় সংবিধানে বর্ণিত মৌলিক অধিকারগুলো। দেশকে এ অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য জনগণের ভোটে নিরঙ্কুশ বিজয় অর্জন করে ২০০৮ সালে আবারও সরকার পরিচালনার দায়িত্ব পায় বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ।


২০০৯ সালের জানুয়ারিতে সরকার গঠনের পর নতুন উদ্যমে যাত্রা শুরু করে বাংলাদেশ। টানা তিন মেয়দে ১৪ বছর ধরে নিরলসভাবে সরকার পরিচালনা করছেন বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা। ২০০৮ সালের নির্বাচনী ইশতেহার অনুযায়ী ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ গঠনের প্রয়াশে নতুন আঙ্গিকে কাজ শুরু হয়। জাতির পিতার রক্ত-আদর্শের উত্তরসূরি, তাঁর সুযোগ্যকন্যা ও বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সভাপতি দেশরত্নশেখ হাসিনা’র নেতৃত্বে একযুগের অধিক মেয়াদে পরিচালিত হচ্ছে দেশ। ইতোমধ্যে আমরা স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণ করতে পেরেছি। স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণের ফলে বহির্বিশ্বে বাংলাদেশ একটি প্রত্যয়ী ও মর্যাদাশীল দেশ হিসেবে জায়গা করে নিয়েছে। অর্থনৈতিক বিভিন্ন সূচকে আমাদের অগ্রগতি বিস্ময়কর। ’ডিজিটাল বাংলাদেশ’ এর সুবিধা আজ শহর থেকে প্রান্তিক গ্রাম পর্যায়ে বিস্তৃত হয়েছে। প্রত্যন্ত গ্রাম পর্যন্ত ব্রডব্যান্ড সুবিধা পৌঁছে গেছে। ‘বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট’এর সুবিধা কাজে লাগিয়ে তথ্যপ্রযুক্তিখাতে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন সূচিত হয়েছে। সারাদেশে একশত বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল, দুই ডজনের বেশি হাইটেক পার্ক এবং আইটি ভিলেজ নির্মাণের কাজ এগিয়ে চলছে। এসব বাস্তবায়ন হলে কর্মসংস্থান তৈরিসহ আমাদের অর্থনীতিতে আরও গতি সঞ্চার হবে। দ্রুত গতিতে এগিয়ে যাচ্ছে বেশ কয়েকটি মেগা প্রকল্প। প্রকল্পগুলোর হলো- মেট্রোরেল প্রকল্প, (যার একাংশ শীঘ্রই উদ্বোধন হবে), পারমানবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের কাজ দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে, কর্ণফুলী নদীর তলদেশে ট্যানেল নির্মাণের কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে, মহাশূন্যে বঙ্গবন্ধু-১ স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ করা হয়েছে, ইতোমধ্যে সবচেয়ে বড় অবকাঠামো পদ্মা সেতু চালু হয়েছে, পদ্মা সেতুর উপর দিয়ে রেল চলাচলের জন্য রেললাইন স্থাপনের কাজ চলছে।


অর্থনৈতিক বিভিন্ন সূচকে আমাদের অবস্থান-
* দারিদ্র্যের হার ২০.৫ শতাংশ এবং অতি দারিদ্র্যের হার ১০.৫ শতাংশ।
* মাথা পিছু আয় ২৮২৪ ডলার।
* জিডিপি’র আকার ৪৬৫ বিলিয়ন ডলার।
* বাজেটের আকার ৬,৭৮,০৬৪ কোটি টাকা।
* রাজস্ব আয়ের পরিমাণ ৩, ২৮,৬০০ কোটি টাকা।
* বাংলাদেশ বিশ্বের ৩১ তম বৃহত্তর অর্থনীতির দেশ।
* শতভাগ বিদ্যুতায়ন হয়েছে।
* খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ।
* গড় আয়ু ৭২ বছর ৮ মাস।
* সাক্ষরতার হার ৭৫ শতাংশের বেশি।


আমাদের জাতীয় জীবনের সবক্ষেত্রে এবং গর্ব করার মত সকল অর্জনের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। স্বাধীনতার পর মাত্র সাড়ে তিনবছরে তাঁর গৃহীত বিভিন্ন পদক্ষেপ ও পরিকল্পনার উপরেই দাঁড়িয়ে রচিত হচ্ছে আমাদের উন্নত-সমৃদ্ধ আধুনিক বাংলাদেশ আর সেই বাংলাদেশ গড়ার সংগ্রামের নেতৃত্ব দিচ্ছেন তাঁর সুযোগ্যকন্যা শেখ হাসিনা।


শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আজ আমরা ঐক্যবদ্ধ। আমাদের অর্থনৈতিক মুক্তির সংগ্রামের ভীত রচনা করেছিলেন তিনি। সেই ভীতের উপর দাঁড়িয়ে পুরো জাতি একাত্ব হয়ে লড়াই করে যাচ্ছি আমাদের অর্থনৈতিক মুক্তির জন্য। শেখ হাসিনার অপরিসীম সাহসিকতা, দৃঢ়তা ও আত্মত্যাগের ফলেই বাংলাদেশ আজ বিশ্বের বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে সক্ষম হয়েছে। আমরা বিশ্বাস করি সেদিন বেশি দূরে না যেদিন আমরা তার নেতৃত্বে উন্নত বিশ্বের কাতারে মাথা উঁচু করে দাঁড়াব, ইনশাল্লাহ।


‘বিজয় দিবস’ এ আসুন আমরা অঙ্গীকার করি আমরা ঐক্যবদ্ধ থাকব দেশের স্বার্থে, দেশের অর্থনৈতিক মুক্তির স্বার্থে।


লেখক: প্রধানমন্ত্রীর সহকারী প্রেস সচিব


বিবার্তা/কেআর

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

পদ্মা লাইফ টাওয়ার (লেভেল -১১)

১১৫, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ,

বাংলামোটর, ঢাকা- ১০০০

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2021 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com