ব্যক্তিস্বার্থে দেয়া অমর্যাদাকর ও অসত্য বক্তব্য সংসদ থেকে এক্সপাঞ্জ হোক
প্রকাশ : ০৯ জুলাই ২০২২, ১৭:৪৪
ব্যক্তিস্বার্থে দেয়া অমর্যাদাকর ও অসত্য বক্তব্য সংসদ থেকে এক্সপাঞ্জ হোক
ড. মোহাম্মদ বাহাউদ্দিন
প্রিন্ট অ-অ+

(১)
মাননীয় সংসদ সদস্য কাজী ফিরোজ রশীদকে একজন সজ্জন মানুষ হিসেবেই জানতাম। অবশ্য আমার এ জানাই হয়ত শেষ কথা নয়। দু’য়েকদিন তাঁর সাথে দেখা ও কথা হয়েছে। বেশ ক’বছর আগে টিকাটুলিতে রামকৃষ্ণ মিশনের একটি অনুষ্ঠানে আমি প্রধান আলোচক আর তিনি প্রধান অতিথি ছিলেন। ফার্মেসি অনুষদের প্রফেসর সীতেশ চন্দ্র বাছার (বর্তমানে ডিন) তাঁর নতুন গাড়িতে করে সূর্যসেন হল থেকে আমাকে ঐ অনুষ্ঠানে নিয়ে গিয়েছিলেন। ফিরোজ রশীদ সাহেবের পাশাপাশি বসে অনেক বিষয়ে কথাবার্তা হয়েছিল; তিনি ঐ সভায় প্রদত্ত আমার বক্তব্য শুনে উচ্চসিত প্রশংসা করেছিলেন। আরেকদিন উপাচার্য অফিসের সোফায় তাঁকে দীর্ঘক্ষণ বসে থাকতে দেখেছিলাম; সালাম বিনিময় ও কিছু কথাবার্তাও হয়েছিল। তাঁর রাজনৈতিক জীবনের নানা উত্থান-পতনের ঘটনাপ্রবাহ সম্বন্ধে কমবেশি আমরা অবগত।


(২)
আরেফিন স্যার গোটা দেশে পরিচিত একজন শিক্ষক। তাঁর সরাসরি শিক্ষার্থী ছাড়াও বিপুল সংখ্যক মানুষের কাছে তিনি একজন প্রিয় ও শ্রদ্ধেয় শিক্ষক হিসেবে সমাদৃত। শিক্ষক রাজনীতিতেও তিনি ছিলেন সক্রিয় । মুক্তিযুদ্ধের পক্ষ-শক্তি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নীল দলের আহ্বায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। দেশে বিএনপি-জামাত জোট সরকার আর বিশ্ববিদ্যালয়ে সাদা দল ক্ষমতায় থাকাকালীন প্রতিকূল সময়ে তিনি শিক্ষক সমিতির নির্বাচিত সভাপতি ছিলেন; শিক্ষকদের মধ্যে তাঁর গ্রহণযোগ্যতা ও জনপ্রিয়তা ছিল। ওয়ান ইলেভেনের দুঃসময়ে তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ে গড়ে ওঠা ছাত্র-শিক্ষকদের আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছেন। দেশে গণতন্ত্রের পুনঃপ্রবর্তন, জননেত্রী শেখ হাসিনার মুক্তি ও নির্বাচিত গণতান্ত্রিক সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের দাবিতে সেনা-সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিরুদ্ধে গৃহীত সকল কর্মসূচি প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে আরেফিন স্যার বিশেষ ভূমিকা রেখেছেন। ২০০৮-এর ২৯ ডিসেম্বর জাতীয় নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসা আওয়ামী লীগ সরকার তাঁকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য পদে নিয়োগ দেন। পরবর্তী সাড়ে আট বছর ধরে তিনিই ছিলেন এ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য।


(৩)
ক’দিন আগে মহান জাতীয় সংসদে কাজী ফিরোজ রশীদ এমপি তাঁর বক্তব্যে আরেফিন স্যার সম্বন্ধে কিছু কথা বলেছেন, যা সম্পূর্ণ অনভিপ্রেত ও দুঃখজনক। একটি দৈনিক পত্রিকায় দেয়া আরেফিন স্যারের এক সাক্ষাৎকার উদ্ধৃত করে তিনি বলেন, ‘ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার আমরা বানাচ্ছি, মানুষ বানাচ্ছি কতটুকু? দায়িত্ব তো উনিও এড়াতে পারেন না, উনি তো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দীর্ঘদিন ভাইস-চ্যান্সেলর ছিলেন; যার কোনো পাবলিকেশন্স ছিলো না, রিসার্চও ছিলোনা, কোনো কিছু নাই, ডক্টরেট ডিগ্রি নাই, কিচ্ছু নাই মাননীয় স্পীকার! ভাইস-চ্যান্সেলর কেন, রাজনৈতিক বিবেচনায়, সমস্যাটা ঐখানেই, শিক্ষকরা এখন রাজনীতিতে জড়িত হয়ে পড়েছে, রাজনীতি ছাড়া তাদের প্রমোশন হয় না, যারা যখন ক্ষমতায় আসবে সেই দলের শিক্ষকরা তখন সুযোগ-সুবিধা পাবে; তাদের ছত্রছায়ায় একশ্রেণির ছাত্ররা রাতারাতি মাস্তান হয়ে যায়!


(৪)
এমপি মহোদয়ের এই বক্তব্যে মোটাদাগে ৩টি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমত আরেফিন স্যার সম্বন্ধে যা বলেছেন সেটি স্যারের প্রতি তাঁর নিতান্তই বিদ্বেষ-প্রসূত। পুরনো ঢাকার একটি প্রাইভেট মেডিকেল কলেজে গভর্নিং বডির একটি পদের জন্য তাঁর এই বিদ্বেষ― এই তথ্যটি আমরা জানি। এলাকাবাসীর আপত্তি ও নানা অভিযোগ থাকায় তাঁকে এই পদে না দিয়ে ডা. ইকবাল আরসালানকে সেই পদটি দিয়েছিলেন বলে আরেফিন স্যার নিজে আমাকে বলেছেন। এটিই তাঁর অপরাধ! এই অপরাধে মহান জাতীয় সংসদে একজন সদস্য দু’দিন তাঁর বিরুদ্ধে বিষোদগার করলেন! অসত্য তথ্যের উপর ভর করে ব্যক্তি-আক্রোশ চরিতার্থ করার এরচেয়ে হীন দৃষ্টান্ত আর কী হতে পারে! এমপি মহোদয়ের জানা উচিত ছিল যে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কোনো শিক্ষকের পদোন্নতির ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট সংখ্যক প্রকাশিত প্রবন্ধ লাগে। আরেফিন স্যার প্রভাষক থেকে সহকারী অধ্যাপক, তারপর সহযোগী অধ্যাপক এবং পরবর্তীতে অধ্যাপক পদে উন্নীত হন। সকল ক্ষেত্রেই পদোন্নতির শর্ত পূরণ করে তাঁকে এসব অর্জন করতে হয়েছে; কোনোরূপ রাজনৈতিক বিবেচনা কারো ক্ষেত্রেই নির্ধারিত সংখ্যক পাবলিকেশন্স বা রিসার্চ-এর বিকল্প হতে পারে না। সুতরাং আরেফিন স্যারের বিষয়ে ‘যার কোনো পাবলিকেশন্স ছিলো না, রিসার্চও ছিলোনা’ এমন মন্তব্য সমীচিন নয়। অপর মন্তব্যটি আরো নির্দয়, অমানবিক; সেটি হলো― ‘ডক্টরেট ডিগ্রি নাই, কিচ্ছু নাই মাননীয় স্পীকার!’ অথচ আরেফিন স্যার পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেছেন এবং এছাড়াও তাঁর ব্যক্তি ও কর্মজীবনের সাথে মিশে আছে বিরল বৈশিষ্ট্যাবলি; তাঁর ঘনিষ্ঠ সহকর্মী হিসেবে আমরা সেসব বিষয়ে অবহিত।


(৫)
বিশ্ববিদ্যালয়ে অনেক গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রের মধ্যে ৩টি বিশেষ প্রনিধানযোগ্য। প্রথমত, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন; দ্বিতীয়ত, শিক্ষক সমিতি এবং তৃতীয়ত, আদর্শিক অবস্থান বা দল। আরেফিন স্যার আওয়ামী লীগ পন্থী শিক্ষকদের বিশ্ববিদ্যালয়ে আদর্শিক যে দল রয়েছে, সেই নীল দলের কেন্দ্রিয় আহ্বায়ক ছিলেন; শিক্ষক সমিতির শীর্ষ পদ তথা সভাপতি ছিলেন এবং বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সর্বোচ্চ কর্তাব্যক্তি অর্থাৎ ভাইস-চ্যান্সেলর হিসেবে সবচেয়ে বেশি সময় দায়িত্ব পালনের রেকর্ড গড়েছেন। আমরা দেখতে পাচ্ছি, নীল দল, শিক্ষক সমিতি এবং বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন― এই ৩টি অবস্থানেই আরেফিন স্যার সমহিমায় শীর্ষ পদে দায়িত্ব পালন করে গেছেন। ব্যক্তি আরেফিন স্যারকে আপনি পছন্দ-অপছন্দ করতেই পারেন, তাঁর অনেক দোষও আপনি ধরতে পারেন, সমালোচনাও করতে পারেন; আবার কেউ স্যারের অনেক গুণ নিয়েও তাঁর প্রশংসায় পঞ্চমুখ থাকতে পারেন, তাঁকে ঘিরে নিত্যদিনের কদমবুচির মহড়াগুলো আবারো মঞ্চায়ন হতে পারে― এসব নিতান্তই ভিন্ন আলোচনার বিষয়। তবে জাতীয় সংসদে তাঁকে নিয়ে যেসব উদ্ভট ও অসত্য তথ্য ছড়িয়ে বিষোদগার করা হয়েছে তার প্রতিবাদে আমাদের অবস্থান ও ভূমিকা নেহায়েত অদূরদর্শী ও সংকীর্ণ মানসিকতার পরিচায়ক। ব্যক্তি ও সংগঠন পর্যায়ে কিছু প্রতিবাদ হলেও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমকে এ নিয়ে খুবই প্রতিবাদমুখর দেখেছি; সেই প্রতিবাদ দেশে ও দেশের বাইরে থেকেও ব্যাপকভাবে হয়েছে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলো, আরেফিন স্যারকে যারা হরহামেশা তোষামোদ করতেন, নিজেদের স্বার্থসিদ্ধির জন্য দিবানিশি অন্যদের বিরুদ্ধে কুমন্ত্রণা দিতেন এবং স্যারকে নানা কায়দা-কৌশলে ম্যানেজ করে অনেক অন্যায্য সুবিধা, পদ ও মর্যাদা হাতিয়ে নিয়েছিলেন, তাদের একটি বড় অংশকে আজ খুবই কৌশলী পন্থা অবলম্বন করতে দেখলাম; সময়, পরিবেশ ও অবস্থান পাল্টে গেলে এরাই আবার বিবেকবান শিক্ষকের জার্সি পরিধান করে পূর্বের চাইতেও অধিক হারে স্যারের পদচুম্বনে অমৃতের স্বাদ নিতে বিন্দুমাত্র দেরি করবে না। আমাদের শিক্ষক সমিতি নানা বিষয়েই বিবৃতি দিয়ে থাকে, আমি নিজে বিগত দেড় দশকে শিক্ষক সমিতির কতো বিবৃতির খসড়া যে করে দিয়েছি তার সঠিক সংখ্যা হিসেব করে বলা মুশকিল; আরেফিন স্যারকে উপলক্ষ্য করে একটি বিবৃতির খসড়া প্রণয়নের আদেশ পেলে কী পরিমাণ যে খুশি হতাম তা বলার অপেক্ষা রাখে না। আরেফিন স্যারের বিষয় ছাড়াও জাতীয় সংসদে প্রদত্ত এ বক্তব্যে আরো এমন বিষয় রয়েছে যার তীব্র প্রতিবাদ করা শিক্ষক সমিতির দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। আদর্শিক, সাংগঠনিক বা প্রাতিষ্ঠানিক মর্যাদা সমুন্নত রাখার স্বার্থে অনেক সময় ব্যক্তির প্রতি পোষণ করা আচার-অনুভূতি বা বিদ্বেষ-দুশমনি ভুলে গিয়ে সঠিক ও কার্যকর ভূমিকাটি পালন করতে হয়; এতে আদর্শ সুদৃঢ় হয়, সংগঠনের ভিত্তি শক্তিশালী হয়, প্রতিষ্ঠানের সম্মান বৃদ্ধি পায় এবং ভবিষ্যতের জন্য অনুপম দৃষ্টান্ত স্থাপিত হয়।


(৬)
প্রিয় আরেফিন স্যার, আমরা আপনার কাছে ক্ষমা চাই। আপনার ব্যক্তিত্ব ও কৃতিত্বে ঈর্ষান্বিত হয়ে এবং আগামীদিনে সঠিক মূল্যায়নপূর্বক আপনার সম্ভাব্য গন্তব্যের পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টির হীন উদ্দেশ্যেই বিশেষ কোনো মহলের প্ররোচনায় এসব ঘটে থাকে। জাতীয় সংসদের বক্তব্য বস্তুনিষ্ঠ ও সঠিক তথ্যের আলোকে হওয়া উচিত; কারো ব্যক্তিস্বার্থ চরিতার্থ করা বা কারো ভাবমূর্তি নষ্ট করার জন্য উদ্দেশ্য-প্রণোদিত হয়ে সবৈব অসত্য তথ্যের যোগানে বিষোদগার করার স্থান পবিত্র সংসদ কখনোই হতে পারে না। তাই সংসদের অভিভাবক মাননীয় স্পীকারের নিকট আমাদের সনির্বন্ধ আবেদন থাকবে, আরেফিন স্যারের ব্যাপারে যে বক্তব্য উপস্থাপিত হয়েছে তা যেন সংসদের রেকর্ড তথা কার্যবিবরণী থেকে বাদ দেয়া হয়; সেই অনাকাঙ্ক্ষিত বক্তব্য যেন এক্সপাঞ্জ করা হয়।


প্রফেসর ড. মোহাম্মদ বাহাউদ্দিন
চেয়ারম্যান
ফারসি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগ
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।


বিবার্তা/বিএম

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

পদ্মা লাইফ টাওয়ার (লেভেল -১১)

১১৫, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ,

বাংলামোটর, ঢাকা- ১০০০

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2021 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com