পদ্মা সেতুকে ঘিরে গুজব ও একজন রেনুর অকালে ঝরে যাওয়া
প্রকাশ : ২২ জুন ২০২২, ২২:০৮
পদ্মা সেতুকে ঘিরে গুজব ও একজন রেনুর অকালে ঝরে যাওয়া
ইফতেখার মাহমুদ
প্রিন্ট অ-অ+

২০১৯ সাল। পদ্মা সেতুর পিলারগুলোর পাইলিং চলছে। তখন কারা যেনো গুজব ছড়ায়, পদ্মা সেতুর পাইলিংয়ের জন্য নরমুণ্ড লাগবে, তাই ছেলেধরারা মাঠে নেমেছে। এই গুজবে সারাদেশে ছেলেধরা সন্দেহে ৫ জনকে পিটিয়ে মারা হয়। তারমধ্যে সবচেয়ে নির্দয় ও পৈশাচিক ঘটনাটি ঘটে খোদ ঢাকা শহরের প্রাণকেন্দ্রে, শহরের সবচেয়ে অভিজাত এলাকা গুলশানের অনতিদূরে বাড্ডায়।


এ গল্পের মেয়েটির নাম তাসলিমা বেগম রেনু। বয়স ৪০। দুই সন্তানের জননী। গ্রামের বাড়ি লক্ষীপুরে, যেখানে আমারও গ্রামের বাড়ি। তিনি ব্রাকসহ বিভিন্ন সংস্থায় চাকরি করেছেন। মাত্র বিবাহ বিচ্ছেদ হয়েছে। তাই আপাতত কোথাও কাজ করছিলেন না।


রেনুর চার বছর বয়সী একটা ফুটফুটে কন্যাসন্তান ছিল। মেয়েটি বাড়ন্ত ও চঞ্চল, তাই বাসায় অনেক দুষ্টুমি করে। রেনু অনেকদিন ধরেই ভাবছিল, মেয়েটিকে একটা স্কুলের নার্সারিতে ভর্তি করিয়ে দেবে। ঢাকা শহরে যেকোন প্রাইভেট স্কুলে ভর্তি অতটা সোজা না। ভর্তি পরীক্ষায় উর্ত্তীর্ণ হওয়ার ঝক্কি, ডোনেশন প্রথা, উচ্চ ভর্তি ফি ও বেতন, লবিং ইত্যাদি কারণে রেনুর মতো সিংগেল মাদারের জন্য বাচ্চাকে স্কুলে ভর্তি করা পর্বতমালা অতিক্রম করার মতোই দুঃসাধ্য ছিল। তাই রেনু বেছে নেয় তুলনামূলক কম ঝামেলায় ভর্তি করা যাবে এমন একটি স্কুল, যা তিনি আরেকদিন মর্নিং ওয়াকের সময় গিয়ে বাইরে থেকে দেখে এসেছেন।


২০১৯ সালের ২০ জুলাই, সকালবেলা। প্রতিদিনের মতো রেনু মর্নিং ওয়াকে বেরিয়েছিলেন তার মহাখালী ওয়ারলেস গেটের বাসা থেকে। উদ্দেশ্য, হাঁটাহাটির পাশাপাশি বাচ্চাকে ভর্তি করানোর জন্য আশেপাশে একটা স্কুলের সন্ধান করা। ওয়ারলেস গেট থেকে হেটে গুলশান -১, তারপর লিংক রোড পেরিয়ে বাড্ডা। সেখানেই উত্তর-পূর্ব বাড্ডা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অফিসে রেনু বাচ্চাকে ভর্তি করাতে আলাপের জন্য প্রবেশ করেন। তখন সেখানে উপস্থিত কয়েকজন নারী তাঁকে ‘ছেলেধরা’ সন্দেহ করেন।


বিশেষ করে রিয়া বেগম নামের একজন মহিলা সবাইকে উস্কে দেন। ফলে, এক কান দুই কান হয়ে এই গুজব দ্রুত বাইরে ছড়িয়ে পড়ে। মুহূর্তের মধ্যে ক্ষুধার্ত হায়েনার মতো আশপাশ থেকে বিভিন্ন বয়সী কয়েক শ’ নারী-পুরুষ স্কুল প্রাঙ্গণে ঢুকে পড়েন। তাদের হাত থেকে রক্ষা করতে রেনুকে স্কুলের দোতলায় প্রধান শিক্ষকের কক্ষে নিয়ে রাখা হয়। সেদিন রেনু ভুল করে ফোনটা বাসায় ফেলে গিয়েছিলেন, সাহায্যের জন্য কাউকে জানানোর সুযোগও পাননি। এর মধ্যে কয়েকজন বিদ্যালয়ের কলাপসিবল গেট ভেঙে দোতলায় প্রধান শিক্ষকের কক্ষ থেকে রেনুকে টেনেহিঁচড়ে নিচে নামিয়ে পেটাতে শুরু করেন।


হৃদয় ইসলাম নামের স্কুলের পাশের এক সবজি বিক্রেতা রেনুকে প্রথমে লাঠিপেটা করে। আর জাফর নামের আরেক ব্যক্তি প্রধান শিক্ষকের কক্ষ থেকে চুলের মুঠি ধরে টেনেহিঁচড়ে দেয়ালের সঙ্গে আঘাত করতে থাকে।


প্রত্যক্ষদর্শীরা এই অসহায় নারীকে সাহায্য করতে তো এগিয়ে আসেনি, বরং সবাই নিজ নিজ স্মার্টফোন দিয়ে ঘটনার ভিডিও করতে থাকে। সেরকম একটা ভিডিওতে দেখা যায়, মানুষ যেরকম আক্রোশ ও শক্তি দিয়ে বিষধর সাপকে লাঠিপেটা করে, সেরকম বিভৎস আক্রোশে রেনুকে লাঠিপেটা করা হচ্ছে।


তারপর ধীরে ধীরে নেতিয়ে পড়ে নিরুপায় রেনুর প্রাণহীন দেহ। তারপরও তাদের পিটুনি থামে না। ২০১৯ সালে সভ্যতা ও প্রযুক্তির উৎকর্ষতার এই লগ্নে ঢাকা নগরীর প্রাণকেন্দ্রে এমন একটি মধ্যযুগীয় পৈশাচিক ঘটনা ঘটে পদ্মা সেতুর জন্য নরমুণ্ডের সন্ধানে ছেলেধরারা বেরিয়েছে এই অজুহাতে।


আজ আমাদের স্বপ্নের পদ্মা সেতু বাস্তবে পরিণত হয়েছে। পদ্মা সেতু উদ্বোধনের এই মাহেন্দ্রক্ষণে সশ্রদ্ধচিত্তে স্মরণ করছি রেনুকে। পাশাপাশি ধন্যবাদ জানাতে চাই, যারা পরিবারটিকে আর্থিকভাবে সহযোগিতা করেছে।


রেনুকে নির্যাতন করেছে যে মানুষ নামের প্রাণিগুলো, এই প্রবৃত্তির মানুষ এখনো সমাজে আছে। তাদের প্রতি একটা কথাই বলার আছে, ‘আবার তোরা মানুষ হ।’


শুধু অবয়বে মানুষ হলেই চলবে না, নিজের পশুবৃত্তিকেও দমন করতে হবে।


-ইফতেখার মাহমুদ, হেলথ্ এ্যান্ড সেইফটি প্রফেশনাল,
সিইও, বুরো কোয়ালিটাস সার্টিফিকেশান্স বাংলাদেশ


বিবার্তা/জেএইচ


সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

পদ্মা লাইফ টাওয়ার (লেভেল -১১)

১১৫, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ,

বাংলামোটর, ঢাকা- ১০০০

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2021 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com