মুক্তিকামী মানুষের দুর্বার প্রতিরোধ, ৩ ডিসেম্বর হানাদারমুক্ত ঠাকুরগাঁও
প্রকাশ : ০৩ ডিসেম্বর ২০২২, ০৮:০৩
মুক্তিকামী মানুষের দুর্বার প্রতিরোধ, ৩ ডিসেম্বর হানাদারমুক্ত ঠাকুরগাঁও
বিধান দাস, ঠাকুরগাঁও
প্রিন্ট অ-অ+

আজ ৩ ডিসেম্বর। ঠাকুরগাঁও পাকহানাদার মুক্ত দিবস। ১৯৭১ সালের এইদিনে ঠাকুরগাঁও মহকুমায় বীর মুক্তিযোদ্ধাদের মরণপণ লড়াই আর মুক্তিকামী জনতার দুর্বার প্রতিরোধে পরাজিত হয় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী। মুক্তিযোদ্ধা ও সর্বস্তরের জনগণ ওই দিন ভোরে ঠাকুরগাঁও শহরে প্রবেশ করে বাংলাদেশের পতাকা উড়িয়ে দেন। হানাদারদের পরাজয়ের পর এই এলাকার সর্বত্রই ছড়িয়ে পড়ে মুক্তির উল্লাস। আনন্দে উদ্বেলিত কণ্ঠে,জয়বাংলা ধ্বনি আর হাতে প্রিয় স্বদেশের লাল-সবুজ পতাকা নিয়ে ছুটোছুটি করতে থাকেন সবাই।



১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের কাল রাতে পাক হায়েনারা নিরপরাধ বাঙালির উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে নির্বিচারে হত্যা, ধর্ষণ, লুণ্ঠন ও অগ্নিসংযোগের মাধ্যমে সৃষ্টি করেছিল নারকীয় তাণ্ডব। ওই সময় বর্বর পাকবাহিনীর বিরুদ্ধে দেশের অন্যান্য অঞ্চলের মতো গর্জে ওঠে ঠাকুরগাঁও। পাকহানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে ঠাকুরগাঁওবাসী গড়ে তুলেছিল দুর্বার প্রতিরোধ। ওই প্রতিরোধের কারণেই ১৪ এপ্রিল পর্যন্ত হানাদার বাহিনী প্রবেশ করতে পারেনি ঠাকুরগাঁওয়ের মাটিতে। পরে ১৫ এপ্রিল আধুনিক অস্ত্রশস্ত্র সজ্জিত পাকবাহিনী দখল নিয়ে নেয় ঠাকুরগাঁও।



ওরা ১০টি ট্রাক ও ৮টি জিপে করে মুহুর্মুহু গোলা বর্ষণ করতে করতে ঠাকুরগাঁও শহরে ঢুকে পড়ে। তবে এ মহকুমার অন্যতম থানা তেঁতুলিয়া সবসময়ই ছিল হানাদারমুক্ত। তেঁতুলিয়াকে কেন্দ্র করে ১৫০ বর্গমাইলের ১টি মুক্তাঞ্চল গড়ে ওঠে, যেখানে পাকবাহিনী কখনো ঢুকতেও পারেনি। সেখানে থেকেই পরিচালিত হয় চূড়ান্ত লড়াই। এ কারণে ঠাকুরগাঁওয়ের মুক্তিযুদ্ধ নতুন শক্তিতে উজ্জীবিত হয়ে ওঠে। নানা কৌশলে আক্রমণ করা হয় শত্রুর ওপর।



ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার জাটিভাঙ্গা ও রানীশংকৈল উপজেলার খুনিয়াদীঘি পাড়ে মুক্তিকামী লোকজনকে নির্বিচারে হত্যা করা হয়। ১৭ এপ্রিল জগন্নাথপুর, গড়েয়া, শুখাপনপুকুরী এলাকার হিন্দু সম্প্রদায়ের কয়েক হাজার মুক্তিকামী মানুষ ভারত অভিমুখে যাওয়ার সময় স্থানীয় রাজাকাররা তাদেরকে জড়ো করে মিছিলের কথা বলে পুরুষদের লাইন করে পাথরাজ নদীর তীরে ব্রাশ ফায়ার করে হত্যা করে।



একইভাবে রানীশংকৈল উপজেলার খুনিয়াদিঘীর পাড়ে গণহত্যা চালানো হয়। হরিপুর ও রানীশংকৈল উপজেলার নিরীহ মানুষজনকে পাকবাহিনী ধরে এনে লাইন করে দাঁড় করিয়ে গুলি করে হত্যা করে। মানুষের রক্তে এক সময় লাল হয়ে ওঠে ওই পুকুরের পানি। পরবর্তিতে এ পুকুর খুনিয়াদিঘি নামে পরিচিতি পায়।


ঠাকুরগাঁওয়ে মুক্তি বাহিনীর সাথে পাকিস্থানি বাহিনীর সম্মুখ যুদ্ধ শুরু হয় জুলাই মাসের প্রথম দিকে। প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত গেরিলারা হানাদার বাহিনীর ঘাঁটির উপর আক্রমণ চালিয়ে ব্যাপক ক্ষতি করে। বেশ কিছু ব্রিজ ও কালভার্ট উড়িয়ে দেয় তারা। দালাল রাজাকারদের বাড়ি ও ঘাটিতে হামলা চালায়। নভেম্বর মাসের তৃতীয় সপ্তাহ থেকে মুক্তিযোদ্ধারা ব্যাপক অভিযান চালায়। মুক্তি বাহিনীর যৌথ অভিযানে পঞ্চগড় মুক্তিবাহিনীর দখলে আসলে পাকবাহিনীর মনোবল ভেঙ্গে যায়।



এরপর ভারতীয় মিত্রবাহিনী ও মুক্তিবাহিনীর যৌথ আক্রমণ শুরু হয় ঠাকুরগাঁও অঞ্চলে। মিত্রবাহিনী যাতে ঠাকুরগাঁও দখল করতে না পারে সেজন্য পাকসেনারা ৩০ নভেম্বর ভূল্লী ব্রিজ উড়িয়ে দেয়। তারা সালন্দর এলাকায় সর্বত্র বিশেষ করে ইক্ষু খামারে মাইন পুতে রাখে। মিত্রবাহিনী ভূল্লী ব্রিজ সংস্কার করে ট্যাংক পারাপারের ব্যবস্থা করে।


১ ডিসেম্বর ভূল্লী ব্রিজ পার হলেও মিত্রবাহিনী যত্রতত্র মাইন থাকার কারণে ঠাকুরগাঁও শহরে ঢুকতে পারেনি। ওই সময় শত্রুদের মাইনে দুটি ট্যাংক ধ্বংস হয়ে যায়। এরপর এফ এফ বাহিনীর কমান্ডার মাহাবুব আলমের নেতৃত্বে মাইন অপসারণ করে মিত্রবাহিনী ঠাকুরগাঁওয়ের দিকে অগ্রসর হয়। ২ ডিসেম্বর সারারাত প্রচণ্ড গোলাগুলির পর শত্রুবাহিনী ঠাকুরগাঁও থেকে পিছু হটে সৈয়দপুরে আশ্রয় নেয়। ৩ ডিসেম্বর ভোর রাতে শত্রুমুক্ত হয় ঠাকুরগাঁও।



৩ ডিসেম্বর সকালে মিত্র বাহিনী বিজয়ের বেশে ঠাকুরগাঁও প্রবেশ করে। আর সেদিনই এই ঠাকুরগাঁও পাক হানাদার মুক্ত হয়। বীর মুক্তিযোদ্ধাদের মরণপণ লড়াই আর মুক্তিকামী জনতার দুর্বার প্রতিরোধে এখানে পতন হয় পাকবাহিনীর। তাই, একাত্তরের এই দিনে এখানকার গ্রাম-গঞ্জ-শহরে সর্বত্রই ছড়িয়ে পড়ে মুক্তির উল্লাস।



আনন্দ উদ্বেলিত কণ্ঠে ‘জয় বাংলা জয় বঙ্গবন্ধু’ ধ্বনি আর হাতে প্রিয় স্বদেশের পতাকা নিয়ে ছুটোছুটি করতে থাকে সকলেই। সকাল থেকেই দারুণ উত্তেজনা নিয়ে ঠাকুরগাঁও শহরসহ জনপদ ও লোকালয়ে মানুষ জড়ো হতে থাকে। শহরের বিভিন্ন রাস্তায় বেরিয়ে পড়ে মিছিল। স্বাধীন বাংলাদেশের জয় ধ্বনিতে মুখরিত হয়ে ওঠে ঠাকুরগাঁও শহর। পতাকা উত্তোলিত হয় মোড়ে মোড়ে।


বিবার্তার ক্যামেরায় উঠে এসেছে মুক্তিযুদ্ধের দুঃসহ স্মৃতিবহনকারী ঠাকুরগাঁও-এর বিভিন্ন বধ্যভূমি, স্মৃতিস্তম্ভ, শহিদের রক্তভেজার মাটির ছবি।


এখানে, ছবি-১ সাত শহিদের কবর, ছবি-২ জাতিভাঙ্গা বধ্যভূমি, ছবি-৩ খুনিয়াদিঘী স্মৃতিস্তম্ভ, ছবি-৪ কমরপুকুর বধ্যভূমি, ছবি-৫ আঙ্গারহাট বধ্যভূমি, ছবি-৬ রাইস মিলের বধ্যভূমি, ছবি-৭ ভাতারমারি বধ্যভূমি।


ঠাকুরগাঁও জেলায় বিজয় ছিনিয়ে আনতে ১০ হাজার নারী-পুরুষকে প্রাণ দিতে হয়। পাশবিক নির্যাতনের শিকার হন দুই হাজার মা-বোন। এই আত্মোৎসর্গকারী বাংলার মায়ের সন্তানদের প্রতিদানেই স্বাধীন বাংলাদেশ।


প্রতিবেদনের সাথে সংযুক্ত ছবি ঠাকুরগাঁও-এর বধ্যভূমি, গণকবর ও স্মৃতিস্তম্ভের বর্তমান চিত্র। এসব পরিচ্ছন্নতা বা চিহ্নিতকরণের প্রশ্নে প্রশ্নবিদ্ধ নয়। কারণ যথোপযুক্ত মর্যাদা না পেলেও টিকে আছে ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে। শোক নয়, ঘৃণা নয়, মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত এই সমাধিসৌধ ও বধ্যভূমি প্রজন্মের জন্য শক্তি ও সাহস সঞ্চারী।


বিবার্তা/বিধান/রোমেল/এসবি

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

পদ্মা লাইফ টাওয়ার (লেভেল -১১)

১১৫, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ,

বাংলামোটর, ঢাকা- ১০০০

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2021 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com