কালজয়ী পাবলো নেরুদা
প্রকাশ : ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২২, ১০:২৪
কালজয়ী পাবলো নেরুদা
শিল্প-সাহিত্য ডেস্ক
প্রিন্ট অ-অ+

কালজয়ী কবি পাবলো নেরুদার মৃত্যুদিন আজ শুক্রবার, ২৩ সেপ্টেম্বর।


রিকার্দো এলিসের নেফতালি রেইয়েস বাসোয়ালতো (১২ জুলাই ১৯০৪ - ২৩ সেপ্টেম্বর ১৯৭৩), যিনি পাবলো নেরুদা নামে অধিক পরিচিত, চিলিরকবি-কূটনীতিক ও রাজনীতিবিদ ছিলেন। নেরুদা মাত্র তেরো বছর বয়েসে কবি হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন এবং বিভিন্ন ধরনের কবিতা লিখতে শুরু করেন, তন্মধ্যে ছিল পরাবাস্তববাদী কবিতা, ঐতিহাসিক মহাকাব্য, প্রকাশ্য রাজনৈতিক ইশতেহার, গদ্য আত্মজীবনী এবং ভালোবাসার কবিতা, তন্মধ্যে একটি হল ১৯২৪ সালে প্রকাশিত বিশটি কবিতা ভালোবাসার একটি গান হতাশার শীর্ষক কাব্যগ্রন্থ।তিনি ১৯৭১ সালে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার অর্জন করেন।


“আমি কোন সমালোচক বা প্রবন্ধকার নই । আমি সাধারণ কবি মাত্র । কবিতা ভিন্ন অন্য ভাষায় কথা বলা আমার পক্ষে অত্যন্ত কষ্টসাধ্য ব্যাপার । যদি আমাকে জিজ্ঞাসা কর আমার কবিতা কি ? তাহলে বলতে হয় আমি জানি না । কিন্তু যদি আমার কবিতাকে প্রশ্ন কর সে জবাব দেবে, আমি কে ?” যথার্থ অর্থেই তাঁর কবিতার মধ্যেই তাঁর জীবনের প্রকাশ । তাঁর কবিতার মধ্যে ফুটে উঠেছে তাঁর ভালবাসা, তাঁর আশা-আকাঙ্ক্ষা, স্বপ্ন-আবেগ, তাঁর আনন্দ, বেদনা, ক্রোধ, হতাশা আর সকলকে ছাপিয়ে তাঁর তীব্র প্রতিবাদ । এই প্রতিবাদের কবি, ভালবাসার কবির নাম পাবলো নেরুদা ।


নেরুদা তার জীবদ্দশায় বিভিন্ন দেশের বহু কূটনীতিক পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন এবং চিলীয় কমিউনিস্ট পার্টির সেনেটর হিসেবে এক মেয়াদ দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৪৮ সালে রাষ্ট্রপতি গাব্রিয়েল গোন্সালেস ভিদেলা চিলিতে কমিউনিজম বাতিল করলে নেরুদার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি হয়। তার বন্ধুরা তাকে বন্দর নগরী বালপারাইসোর একটি বাড়ির বেজমেন্টে মাস খানেক লুকিয়ে রাখে এবং ১৯৪৯ সালে তিনি মাইহু হ্রদের নিকটবর্তী এক গিরিপথ দিয়ে পালিয়ে আর্জেন্টিনা চলে যান। তিনি তিন বছরের আগে আর চিলিতে ফিরে আসেননি। তিনি চিলির সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রপতি সালভাদোর আইয়েন্দের ঘনিষ্ঠ পরামর্শদাতা ছিলেন এবং স্টকহোম থেকে নোবেল পুরস্কার নিয়ে চিলিতে ফিরে আসার পর আলেন্দে এস্তাদিও নাসিওনালে ৭০,০০০ লোকের সম্মুখে তাকে বই পড়ে শুনাতে আমন্ত্রণ জানান।


নেরুদাকে প্রায়ই চিলির জাতীয় কবি বলে বিবেচনা করা হয়। তার সৃষ্টিকর্মগুলো বিশ্বব্যাপী জনপ্রিয় এবং প্রভাব বিস্তারকারী। কলম্বীয় ঔপন্যাসিক গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস একদা তাকে "২০শ শতাব্দীর যে কোন ভাষার সেরা কবি" বলে অভিহিত করেন এবং সমালোচক হ্যারল্ড ব্লুম তার দ্য ওয়েস্টার্ন ক্যানন বইতে নেরুদাকে পশ্চিমা রীতির কেন্দ্রীয় লেখক হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করেন।


রিকার্দো এলিয়েসের নেফতালি রেইয়েস বাসোয়ালতো ১৯০৪ সালের ১২ই জুলাই চিলির সান্তিয়াগোর ৩৫০ কিমি দক্ষিণের লিনারেস প্রদেশের (বর্তমান বৃহত্তর মাউলে অঞ্চল) পাররাল শহরে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা হোসে দেল কারমেন রেইয়েস মোরেলস একজন রেলওয়ের কর্মকর্তা এবং মাতা রোসা নেফতালি বাসোয়ালতো ওপাজো একজন বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা ছিলেন। তার মাতা তার জন্মের দুমাস পর মৃত্যুবরণ করেন। তার মৃত্যুর পর পরই রেইয়েস তেমুকোতে পাড়ি জমান। তিনি সেখানে ত্রিনিদাদ কানদিয়া মালভারদে নামক একটি মহিলাকে বিয়ে করেন, যার পূর্বে নয় বছর বয়সী রোদোলফো দে লা রোসা নামক একজন পুত্রসন্তান ছিল।নেরুদা তেমুকোতে তার সৎভাই রোদোলফো এবং আউরেইয়া তোলরা নামক একজন কাতালান মহিলার সাথে তার পিতার বিবাহ-বহির্ভূত সম্পর্কের ফলে জন্ম নেওয়া সৎবোন লরা হেরমিনিয়া "লরিতা"র সাথে বেড়ে ওঠেন।তিনি তার প্রথম দিকের কবিতাগুলো ১৯১৪ সালের শীতকালে রচনা করেছিলেন।


নেরুদার বাবা তার লেখালেখি ও সাহিত্য নিয়ে আগ্রহের বিরোধিতা করলেও স্থানীয় বিদ্যালয়ের প্রধান ও ভবিষ্যৎ নোবেল পুরস্কার বিজয়ী গ্যাব্রিয়েলা মিস্ত্রালদের মতো আরও অনেকজন থেকে উৎসাহ লাভ করেন। ১৯১৭ সালের ১৮ই জুলাই মাত্র তেরো বছর বয়েসে দৈনিক সংবাদপত্র লা মানানা-তে নেফতালি রেইয়েস নামে স্বাক্ষরিত তার প্রথম লেখা প্রবন্ধ আন্তরিকতা ও অধ্যবসায় প্রকাশিত হয়। ১৯১৮ থেকে ১৯২০ সালের মাঝামাঝি পর্যন্ত স্থানীয় পত্রিকায় নেফতালি রেইয়েস নামে স্বাক্ষরিত মিস অজোস (আমার চোখ)-সহ তার বহু কবিতা এবং প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়। ১৯১৯ সালে তিনি ইয়েগোস ফ্লোরালেস দেল মাউলে সাহিত্য প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করেন আর সেখানে তিনি তার কবিতা কমুনিওঁ আইডিয়াল বা নকচুর্নো আইডিয়াল-এর জন্য তৃতীয় স্থান অধিকার করেন। ১৯২০ সালের মাঝামাঝি থেকে তিনি পাবলো নেরুদা ছদ্মনাম গ্রহণ করে তিনি কবিতা ও গদ্য প্রকাশ এবং সাংবাদিকতা শুরু করেন। তিনি চেক কবি ইয়ান নেরুদা নামানুসারে তার ছদ্মনাম গ্রহণ করেছিলেন বলে ধারণা করা হয়,তবে কিছু সূত্রে উল্লেখ করা হয় স্যার আর্থার কোনান ডয়েলের আ স্টাডি ইন স্কারলেট উপন্যাসের মোরাভীয় বেহালাবাদক উইলমা নেরুদা থেকে তিনি এই নামের অনুপ্রেরণা লাভ করেন। ছদ্মনামে লেখা প্রকাশের ক্ষেত্রে তরুণ এই কবির উদ্দেশ্য ছিল তার কবিতার ব্যাপারে তার পিতার অসম্মতিকে উপেক্ষা করা।


১৯২১ সালে ১৬ বছর বয়সে নেরুদা শিক্ষক হওয়ার অভিপ্রায়ে সান্তিয়াগোতেচিলি বিশ্ববিদ্যালয়ে ফরাসি পড়তে যান। তবে তিনি অল্পদিনের মধ্যেই দিন-রাত এক করে তিনি সাহিত্য ও কবিতা লেখায় মন দেন এবং প্রখ্যাত লেখক এদুয়ার্দো বারিয়োসের সহায়তায় সে সময়ে চিলির অন্যতম প্রধান প্রকাশক ডন কার্লোস জর্জ নাসিমেন্তোর সাথে সাক্ষাৎ করেন। ১৯২৩ সালে নাসিমেন্তোর সম্পাদনায় তার কবিতার প্রথম খণ্ড ক্রেপুস্কুলারিও প্রকাশিত হয় এবং এরপর বিশটি কবিতা ভালোবাসার একটি গান হতাশার প্রকাশিত হয়। দ্বিতীয় বইটি ছিল ভালোবাসার কবিতার সংকলন যা এতে উল্লিখিত যৌনউদ্দীপনা নিয়ে সমালোচিত হয়, বিশেষ করে লেখকের তরুণ বয়স বিবেচনায়। দুটি সৃষ্টিকর্মই সমাদৃত হয় এবং বহু ভাষায় অনূদিত হয়। এই দশকে বিশটি কবিতার মিলিয়নের অধিক কপি বিক্রি হয় এবং নেরুদার শ্রেষ্ঠকর্ম হয়ে ওঠে। তবে ১৯৩২ সালের পূর্ব পর্যন্ত এর দ্বিতীয় সংস্করণ প্রকাশিত হয়নি। ১০০ বছর পরের বিশটি কবিতা বইটি স্পেনীয় ভাষার সর্বোচ্চ বিক্রীত কবিতার বই হিসেবে তার স্থান ধরে রেখেছে।২০ বছর বয়সে নেরুদা একজন সফল আন্তর্জাতিক কবি হওয়ার খ্যাতি অর্জন করেন।


১৯২৬ সালে নেরুদা তেন্তাতিভা দেল ওম্ব্রে ইনফিনিতো সংকলন এবং এল হাবিতান্তে ই সু এস্পেরাঞ্জা উপন্যাস প্রকাশ করেন। ১৯২৭ সালে আর্থিক হতাশার কারণে তিনি ব্রিটিশ ভারতের প্রদেশ হিসেবে দিল্লি থেকে পরিচালিত ব্রিটিশ উপনিবেশ বার্মার রাজধানী রাঙ্গুনে সম্মানসূচক কনসুলার পদ গ্রহণ করেন। তিনি তখন পর্যন্ত রাঙ্গুন নামক স্থানটির নামই শোনেননি।পরবর্তীকালে তিনি কলম্বো (সিলন), বাটাভিয়া (জাভা) এবং সিঙ্গাপুরে কর্মরত ছিলেন।বাটাভিয়াতে থাকাকালীন তিনি ওলন্দাজ ব্যাংকের কর্মকর্তা মারিইকে আন্তোনিয়েতা হাগেনার ভোগেলসাঙ্গের (মারুকা নামে পরিচিত) সাথে পরিচিত হনএবং ১৯৩০ সালের ৬ ডিসেম্বর বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। কূটনৈতিক দায়িত্ব পালনকালে নেরুদা প্রচুর কবিতা পড়তেন, বিভিন্ন কবিতার ধরনের সাথে পরিচিত হন এবং রেসিদেন্সিয়া এন লা তিয়েরা-এর প্রথম দুই খণ্ড লিখেন, যাতে অনেক পরাবাস্তব কবিতা অন্তর্ভুক্ত ছিল।


নেরুদার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি হয়। বন্ধুরা তাঁকে ভালপারাইসোর বন্ধর শহরে একটি ঘরের ভিতর লুকিয়ে রাখেন। সেখান থেকে নেরুদা পাহাড়ের উপর দিয়ে মাইহু হ্রদ অতিক্রম করে আর্জেন্টিনায় পালিয়ে যান। বছর কয়েক পর নেরুদা চিলির সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রপতি সালভাদোর আইয়েন্দের সাহচর্যে আসেন। নেরুদা নোবেল পুরস্কার গ্রহণের পর যখন তিনি চিলিতে ফেরত আসেন, তখন আলেন্দে তাঁকে এস্তাদিও নাসিওনালে সত্তর হাজার লোকের সম্মুখে বক্তব্য রাখার আমন্ত্রণ জানান।


অগাস্তো পিনোচের শাসনামলে নেরুদা ১৯৭৩ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ক্যান্সারে আক্রান্ত হন। তাঁর মনে হয়েছিল কোনো এক ডাক্তার পিনোচের আদেশে তাঁকে ইঞ্জেকশনের মাধ্যমে হত্যা করার পরিকল্পনা করেছেন। নেরুদা ১৯৭৩ সালের ২৩সেপ্টেম্বর তাঁর নিজ বাড়িতে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেন। অনেকে মনে করেন, তাঁকে স্পষ্টত হত্যা করা হয়েছে। কিংবদন্তি নেরুদার মৃত্যুতে স্বাভাবিকভাবেই সারা বিশ্বে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে। পিনোচেট তাঁর অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া জনসমক্ষে করার অনুমতি দেননি। কিন্তু হাজারও শোকার্ত চিলিয়রা তাঁর আদেশ অমান্য করে পথে ভিড় জমান। নেরুদাকে প্রায়ই চিলির জাতীয় কবি হিসেবে ধরা হয় এবং তাঁর সাহিত্যকর্মগুলি বিশ্বজুড়ে বেশ জনপ্রিয়তা পায়। কলম্বিয়ার ঔপন্যাসিক গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস একদা তাঁকে "বিংশ শতাব্দীর সকল ভাষার মহান কবি" হিসেবে আখ্যায়িত করেন।


১৯৭০ সালে নেরুদা চিলির রাষ্ট্রপতি পদের জন্য মনোনীত ছিলেন, কিন্তু তিনি সালভাদোর আইয়েন্দেকে সমর্থন দিয়ে মনোনয়ন প্রত্যাহার করেন। আইয়েন্দে পরবর্তীকালে নির্বাচনে জয় লাভ করেন এবং ১৯৭০ সাএর চিলির প্রথম গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে অভিষিক্ত হন। এর কিছুদিন পর আইয়েন্দে নেরুদাকে ফ্রান্সে চিলির রাষ্ট্রদূত করেন, যার মেয়াদকাল ছিল ১৯৭০ থেকে ১৯৭২। এটি তার সর্বশেষ কূটনৈতিক পদায়ন। প্যারিসে থাকাকালীন নেরুদা চিলির বহিঃঋণ নিয়ে ঐকমত্যে আসার জন্য পুনরায় আলোচনা করায় সাহায্য করেন। সে সময়ে ইউরোপীয় ও মার্কিন ব্যাংকগুলোতে চিলির বিলিয়ন ডলার অর্থ ঋণ ছিল। কিন্তু প্যারিসে যাওয়ার কয়েকমাস পর তার স্বাস্থ্যের অবনতি ঘটতে থাকে। নেরুদা ভগ্ন স্বাস্থ্য নিয়ে আড়াই বছর পর চিলিতে ফিরে আসেন।


নেরুদা ১৯৭৩ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর তাঁর নিজ বাড়িতে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেন।


বিবার্তা/এসবি

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

পদ্মা লাইফ টাওয়ার (লেভেল -১১)

১১৫, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ,

বাংলামোটর, ঢাকা- ১০০০

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2021 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com