কত ত্যাগে পাওয়া স্বাধীনতা
প্রকাশ : ০৪ আগস্ট ২০২২, ১৬:১২
কত ত্যাগে পাওয়া স্বাধীনতা
বাশার খান
প্রিন্ট অ-অ+

‘দাম দিয়ে কিনেছি বাংলা, কারও দানে পাওয়া নয়, দাম দিছি প্রাণ লক্ষকোটি, জানা আছে জগৎময়।’ সুরকার ও গীতিকার আব্দুল লতিফের বিখ্যাত গানের চরণ এটি। হ্যাঁ, কত ত্যাগ আর রক্তের বিনিময়ে স্বাধীনতা অর্জন করে বাঙালি জাতি, সে কথা জগৎময় জানা আছে। তবে সব কথা এখনো লেখা বাকি, ভবিষ্যতে হয়তো লেখা হবে। মাঠপর্যায়ে মুক্তিযুদ্ধের তথ্য সংগ্রহ করতে গেলে এখনো পাওয়া যায় গা শিউরে ওঠার মতো কত-না ঘটনা! ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে বাংলার শহর ও গ্রামে এমন অনেক ঘটনাই ঘটেছিল, যা জানলে যে কারও বুক কেঁপে ওঠে; ঘটনার ভেতরটা এত নির্মম যে পাঠকের মনে হবে, এটা বোধ হয় কোনো গল্প-উপন্যাসের কাহিনি।


এখানে বলছি, কুমিল্লার এক মর্মান্তিক ঘটনার কথা। কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম উপজেলার চিওড়া ইউনিয়নে ভারত সীমান্তের দুই কিলোমিটারে কাছাকাছি একটি গ্রাম‘ছোট সাতবাড়িয়া’। গ্রামের নামের শুরুতে ‘ছোট’ শব্দটি যুক্ত থাকলেও ১৯৭১ সালে এই গ্রামে অনেক বড় এবং নির্মম ঘটনা ঘটে গেছে।



বর্তমান ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কঘেঁষা চৌদ্দগ্রামের জগন্নাথদীঘিতে ছিল পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর ক্যাম্প। ২৩ আগস্ট ১৯৭১। কেউ কিছু বুঝে ওঠার আগেই জগন্নাথদীঘির ক্যাম্পের পাকিস্তানি সৈন্যদের একটি দল স্থানীয় এদেশীয় দোসর-রাজাকারদের সঙ্গে নিয়ে ছুটে যায় সাতবাড়িয়া গ্রামে। এরপর সাধারণ কৃষকের হাঁস-মুরগি ও ছাগল ধরে জগন্নাথদীঘি ক্যাম্পে পাঠাতে শুরু করে। এ সময় ছোট সাতবাড়িয়া গ্রামের রহিম বখশের ছেলে মুক্তিযোদ্ধা এছাক মিয়াদের বাড়িতেও যায় হানাদাররা। এই বাড়ি থেকে হাঁস-মুরগি ও ছাগল ধরে নিয়ে যায়। তখনো হানাদার দল জানত না যে এছাক মিয়া, মোকসেদুর রহমান ও আবুল কাশেমএই তিন সহোদরই মুক্তিযোদ্ধা। হাঁস-মুরগি ধরে নিয়ে পার্শ্ববর্তী জগন্নাথদীঘির ক্যাম্পের দিকে রওনা হয় হানাদার বাহিনী। হাঁফ ছেড়ে বাঁচেন তিন সহোদর মুক্তিযোদ্ধা।




তিন শহীদের স্ত্রীরা : (ডান থেকে) এছাক মিয়ার স্ত্রী আছকিরন্নেসা, আবুল কাশেমের স্ত্রী খায়েরা বেগম ও শহীদ মোকসেদুর রহমানের স্ত্রী ফিরোজা বেগম। ছবি: লেখক।


হানাদার বাহিনীর দলটি যখন স্থানীয় চিওড়া বাজারের কাছাকাছি যায়, প্রতিবেশী কয়েকজন রাজাকার দৌড়ে গিয়ে পাকিস্তানি সৈন্যদের জানায়, ছোট সাতবাড়িয়ার যে বাড়ি থেকে কিছুক্ষণ আগে হাঁস-মুরগি ধরে আনা হয়েছে, সেই বাড়ির আপন তিন ভাই মুক্তিযোদ্ধা। কয়েক দিন হলো ভারত থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে বাড়িতে এসেছে তারা। থাকছে ছদ্মবেশে। তাদের হত্যা না করলে আজ রাতেই আশপাশের রাজাকাররা এই তিন ভাইয়ের আক্রমণের শিকার হবে।


এ কথা শুনে হানাদারদের দলটি আবার হানা দেয় এছাক মিয়াদের বাড়িতে। হানাদার বাহিনী যেহেতু হাঁস-মুরগি নিয়ে চলেই গেছে, বাড়িতে আর আক্রমণ করবে নাএমন ধারণা থেকে তিন ভাই তখনো বাড়িতেই অবস্থান করছিলেন। ফলে, পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে সহজেই ধরা পড়েন তাঁরাএছাক মিয়া, মোকসেদুর রহমান ও আবুল কাশেম।



তিন সহোদরকে ভারত সীমান্তবর্তী জগন্নাথদীঘি ক্যাম্পে নিয়ে যায় পাকিস্তানি সৈন্যরা। সন্ধ্যার আগে তিন ভাইকে দিয়ে ক্যাম্পের পাশে গর্ত করানো হয়। পরদিন ২৪ আগস্ট ১৯৭১, সকালে ওই গর্তে ফেলেই গুলি করা হয় তিন ভাইকে। তারপর ওই গর্তেই মাটিচাপা দেওয়া হয় তাঁদের। এই তিন শহীদের স্ত্রী, ছেলেমেয়ে, চিওড়া এলাকার কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে একাত্তরের এই করুণ অধ্যায়।



শহীদ এছাক মিয়ার ছেলে মীর হোসেনের বয়স ছিল তখন সাত বছর। বাবা ও দুই চাচাকে তাঁর সামনে থেকেই ধরে নিয়ে গিয়েছিল পাকিস্তানি সৈন্যরা। মীর হোসেন বলেন, ‘পরদিন বিবিসি বাংলা থেকে খবর প্রচার হয় যে চৌদ্দগ্রামের জগন্নাথদীঘিতে তিন সহোদর মুক্তিযোদ্ধাকে হত্যা করা হয়েছে। আশপাশের লোকজন রেডিওতে এই খবর শুনে আমাদের জানায়। বাড়িতে সেদিন বুকফাটা কান্না। আমরা সবাই দিশেহারা হয়ে পড়ি।’



২০০৮ সালে সহোদর শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের স্মৃতিস্মরণায় নির্মিত হয় গণপাঠাগার। ছবি : লেখক।


শহীদ মোকসেদুর রহমানের ছেলে আবদুল মান্নান স্মৃতিচারণে জানান, ‘আমি তখন ছোট। স্পষ্ট মনে আছে, বাবার হাত ধরে কাঁদতে কাঁদতে আমি চিওড়া বাজার পর্যন্ত যাই। এরপর রাজাকাররা বাবার হাত থেকে আমাকে জোর করে ছাড়িয়ে দিয়ে বলে, “যা বাড়িতে যা। তোর বাপ-চাচারা পরে আসবে।” কিন্তু বাবা-চাচাদের কেউই আর আসেননি। কোনো দিন আর আসবেনও না।’ এইটুকু বলেই থেমে যান আবদুল মান্নান। ততক্ষণে তাঁর চোখ ভিজে উঠেছে। একপর্যায়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে শুরু করেন।


স্বামী হারিয়ে তিন শহীদের স্ত্রীরা এতই ভেঙে পড়েন যে একাত্তরেই তাঁদের তিনজনেরই মানসিক সমস্যা দেখা দেয়। আজ পর্যন্ত তাঁরা কেউই পুরোপুরি সুস্থ হননি। সাক্ষাৎকার নেওয়া চেষ্টা করা হলে দেখা যায়, শহীদ এছাক মিয়ার স্ত্রী আছকিরন্নেসা দু-এক লাইন কথা বলার পরই খেই হারিয়ে ফেলেন। শহীদ আবুল কাশেমের স্ত্রী খায়েরা বেগম ও মোকসেদুর রহমানের স্ত্রী ফিরোজা বেগমের মনে নেই তেমন কিছুই। কোনো প্রশ্ন করলে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থাকেন। তাঁদের চোখ ভিজে ওঠে। কিন্তু উচ্চ স্বরেও কাঁদেন না। ‘অল্প শোকে কাতর, অধিক শোকে পাথর’ এই প্রবাদের বাস্তব প্রতিফলনই যেন ঘটেছে তাঁদের জীবনে।


এই ঘটনার পর স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধারা প্রতিশোধ নিতে দেরি করেননি। তিন সহোদর মুক্তিযোদ্ধাকে ধরিয়ে দেওয়ার মূল হোতা রাজাকার টুকু মিয়াকে ২৫/২৬ আগস্ট রাতে আটক করতে সক্ষম হন তাঁরা। রাজাকার ধরার অপারেশনে অংশ নেওয়া একজন মুক্তিযোদ্ধা (যিনি নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ছিলেন এবং বর্তমানে প্রয়াত হয়েছেন) লেখককে বলেন, ‘রাজাকার টুকু মিয়াকে ধরেই আমরা প্রচণ্ডমারধর করি। জানতে চাই তার সঙ্গে আর কে কে এই অপকর্মের সঙ্গে যুক্ত ছিল? কিন্তু কিছুতেই সে নাম প্রকাশ করছিল না। পাশেই ছিল পাকিস্তানি সৈন্যদের জগন্নাথদীঘি ক্যাম্প। তাই আমরা খুব বেশি সময় অবস্থান করতে পারিনি সেখানে। তা ছাড়া আমাদের হাতে সময়ও কম ছিল। তাই দ্রæতই রাজাকারটিকে হত্যা করে আমরা গোপন আস্তানায় চলে যাই।’


ভারতের ত্রিপুরা থেকে প্রকাশিত সাপ্তাহিক ‘দেশের ডাক’ পত্রিকার ১৯৭১ সালের ২৪ ডিসেম্বর সংখ্যায় প্রকাশিত প্রতিবেদনে পাওয়া যায় তিন সহোদরের নির্মম হত্যাকাণ্ডের কথা। ‘দেশের ডাক’ ছিল ত্রিপুরার রাজনৈতিক দল সিপিএমের মুখপত্র। কুমিল্লা শত্রুমুক্ত হওয়ার পর ১৪ ডিসেম্বর সিপিএম সভাপতি গৌতম দাস এসেছিলেন ত্রিপুরার পার্শ্ববর্তী জেলা কুমিল্লার পরিস্থিতি দেখতে। পরে ‘বাংলাদেশের কুমিল্লা-মিঞাবাজার-চৌদ্দড়গ্রাম-চিয়ড়া থেকে পাক সামরিক জুন্টার বর্বরতার মর্মন্তুদ চিত্র’ শিরোনামে ‘দেশের ডাক’-এ প্রতিবেদন লেখেন তিনি।



সেখানে চৌদ্দগ্রাম এলাকায় পাকিস্তানি সৈন্যদের দ্বারা হত্যা, গণহত্যা ও ধ্বংসযজ্ঞের নানা চিত্র তুলে ধরেন গৌতম দাস। তিনি লিখেন, ‘...ঘুরেফিরে দেখলাম চিয়ড়ায় (চিওড়া) পাক অত্যাচারের চিত্রগুলো। একজন গ্রামবাসী দেখালেন একটি কবরখানা। সেখানে গ্রামের ছয়টি বলিষ্ঠ যুবককে হত্যা করে কবর দেয়া হয়েছে। এক দুঃখিনী মায়ের ৩টি সন্তানকেই মেরে ফেলেছে ওই নাজীরা, যাদের তিনটি যুবতী বধূর হাহাকারে প্রতিটি যুব-বৃদ্ধের চোখে আগুন জ্বলে।’ (মুনতাসীর মামুন সম্পাদিত, ‘গণমাধ্যমে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ’, দ্বাবিংশ খণ্ড, পৃষ্ঠা ৩১)



১৬ ডিসেম্বর দেশ স্বাধীন হলে জগন্নাথদীঘির ওই গর্ত থেকে তিন সহোদর শহীদের দেহাবশেষ উদ্ধার করা হয়। তখন শহীদের স্বজনেরা দেখতে পান, মোকসেদুর রহমানের কোমরের হাড়ে আটকে আছে ম্যাচলাইট। হাতের আংটি তখনো অক্ষত। এরপর তিন শহীদকে বাড়ির পাশের কবরস্থানে সমাহিত করা হয়।


মোকসেদুর রহমানের ছেলে আবদুল মান্নান বলেন, ‘স্বাধীনতার পর জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান চিঠিসহ আমার মা ও দুই চাচির জন্য (তিন শহীদজায়া) দুই হাজার টাকা করে মোট ছয় হাজার টাকা পাঠান। কিন্তু দুর্ভাগ্য যে আশির দশকে ঘরে আগুন লাগার ঘটনায় বঙ্গবন্ধুর স্বাক্ষরিত চিঠি তিনটি পুড়ে যায়।’ স্বাধীনতার পর কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্টে সরকারি এতিমখানা ও বাতিশা এতিমখানায় বড় হন তিন শহীদের সন্তানেরা। এখানে তাঁরা লেখাপড়াও শেখেন। আর শহীদের স্ত্রীরা বর্তমানে ২০ হাজার টাকা করে সরকারি ভাতা পান।২০০৮ সালে বাড়ির পাশে তিন শহীদের স্মৃতিস্মরণায় কুমিল্লা জেলা পরিষদের অর্থায়নে একটি পাঠাগার নির্মিত হয়। তবে সেখানে সরকারিভাবে কোনো বইপুস্তক দেওয়া হয়নি আজও। পাঠাগারটি পড়ে আছে অযত্ন–অবহেলায়।


তিন সহোদর শহীদের বড়জন এছাক মিয়ার স্ত্রী আছকিরন্নেসা, অন্য দুই শহীদজায়ার তুলনায় শারীরিক ও মানসিকভাবে কিছুটা ভালো। তবে কথা বলার সময় কিছুক্ষণ পরপর খেই হারিয়ে ফেলেন। তিনি হাঁটাচলাও করতে পারেন। বাকি দুজন লাঠিতে ভর করে হাঁটেন।


আছকিরন্নেসার ছেলে হুমায়ুন কবিরের স্ত্রী মমতাজ বেগম বলেন, ‘অনেক বছর ধরে ২৪ আগস্ট এলে আমার শাশুড়িকে ঘরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। যেখানে তিন সহোদরকে হত্যা করে মাটিচাপা দেওয়া হয়েছিল, সেই জগন্নাথদীঘির দূরত্ব আমাদের গ্রাম থেকে বেশি না। প্রতিবছর ২৪ আগস্ট এলে কাউকে কিছু না বলে শাশুড়ি সেখানে চলে যান। দীর্ঘক্ষণ মাটিতে বসে থাকেন। কাউকে কিছু বলেন না। এমনকি কাঁদেনও না। পরে আমরা বুঝিয়ে-শুনিয়ে তাঁকে নিয়ে আসি।’ (সূত্র : প্রথম আলো, ২৪ আগস্ট ২০২০)


লেখক : বাশার খান, গবেষক এবং সাংবাদিক।


বিবার্তা/এসবি


সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

পদ্মা লাইফ টাওয়ার (লেভেল -১১)

১১৫, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ,

বাংলামোটর, ঢাকা- ১০০০

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2021 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com