কমল খোন্দকারের গল্প
প্রকাশ : ১৮ মে ২০২২, ০৯:৩২
কমল খোন্দকারের গল্প
কমল খোন্দকার
প্রিন্ট অ-অ+

তেরো ছিরখাল্লিতে জননী



(১)


"মা, বলছিলাম কী— তুমি না হয় গ্রামেই ফিরে যাও।'


'ওমা! তুই'ই তো ডাইকে আনলি। তোর ছাওয়ালেক পাহারা দিতি হবি— পাহারা দেয়ার মতো কাউরে পাচ্চিস নে। তোর এত কষ্ট শুইনে থাকতি পারলাম না। ঘর সংসার ফেইলে রাইখে ছুইটে আসছি খালি তোর আর তোর ছাওয়ালের মুখের দিকে তাকায়ে। আমার চিকিচ্চা করার কথা কয়েচিলি— সিডাও তো করালিনে। আবার এখন কচ্চিস চইলে যাও! হাঁটুর ব্যথায় নড়তি চড়তি বড় কষ্ট হয় রে বাপ! পিসারডাও বাড়িচে মনে কয়। ক্যাম্মা যেন উপড়ি ফাঁপড়ি করে বুকির মদি। ঘামে সিদ্দ হয়া যাই। বড়িও শ্যাষ। আইজ এক ফাতা ব্যথা আর পিসারের বড়ি আনিস তো বাপ। '


"আচ্ছা, আচ্ছা, সে হবে খন। যা বলছি এখন, মনোযোগ দিয়ে সেটা শোনো আগে। সবসময়ই দেখি, পান খেয়ে পিকভর্তি মুখ নিয়েই বাবুকে আদর করো তুমি— বাবুর জন্য ভীষণ আনহাইজেনিক বিষয়টা। আজকাল মাঝেমধ্যেই দেখছি পেট খারাপ হচ্ছে বাবুর। তাছাড়া যেখানে সেখানে থুথু, কফ ফ্যালো— এটা তোমার বউমার তো বটেই আমারও দারুণ অপছন্দ। বুয়ারা রুম পরিষ্কার করতে গিয়ে বিরক্ত হয়ে কাজ ছেড়ে দিতে চায় শুধু তোমার এই বদ অভ্যাসের কারণে। বেটার, গ্রামেই ফিরে যাও তুমি। "


"ও বাপ, গিরামে আমাক খাতিই বা কিডা দিবি আর চিকিচ্ছেই বা করাবি কিডা? জানিসিই তো,শ্যাষকালে প্যাটে ধরিচিলাম যারে— অমানুষির ঝাড় সে? একটা পয়সাও রাকতি দ্যায় না ঘরে। বউডা দিনরাইত যা মুকি আসে তাই কয়ে গাইল পাড়ে আমাক।


বড়ো কষ্টে মানুষ করিচিলাম তোরে। লেখাপড়ায় ভালো ছিলি বইলে ছানি পানি যা ছিলো, সব্বশ্ব ঢাইলে তাই দিয়ে লেখাপড়া শিকায়েচিলাম তোরে। বড় চাকরি পালি। আল্লার কাছে হাত তুইলে কলাম,"খুদা গো! এ্যাতদিনি দুক্কির দিনির শ্যাষ কইরলা তুমি! কিন্তু, দুক্কু যে আমার শ্যাষ হইলো না রে বাপ! খিদের জ্বালায় ছুইটে ছুইটে আসি তোর কাছে। ভাল কইরে একটা কথাও কোনদিন কয় না তোর বউ। আমি মলাম কি বাঁচলাম সে খোঁজটাও কখনো নিসনে তুই। তারপরও বারবার ঘুইরে ফিরে তোর কাছেই আসি-ডাকলিও আসি, না ডাকলিও আসি— কীসের জইন্যি জানিস?


দুইটা খিদে তিষ্টাতে দেয় না আমারে। সেই খিদের জ্বালা সহ্য করতি না পাইরে এতো অপমান করিস তারপরেও বারবার ছুইটে আসি তোগের কাছে। প্যাটের খিদে তো আচেই, সেই সাথে আচে তোর ছাওয়ালডাক দ্যাখার খিদে! হুবহু দেকতি তোর মতো হয়েচে ছাওয়ালডা। ওর মুখের পানে যখন তাকাই, মনে হয় যেন ছোট ব্যালাকার তোর মুখটা তুইলে কেউ আইনে বসায়ে দিছে ওর মুখের ওপর। খালি ওর মুখের দিকে তাকালেই প্যাট ভইরে যায় আমার!


এ্যাতো যে দেখি, তারপরেও তোগের দেইখে দেইখে আমার পরান ভরে না ক্যা, ক' তো বাপ?
এই জন্ম খিদে রোগের ওষুধ কোনে পাওয়া যায়— ঠিকানাডা একটু কয়ে দিতি পারিস আমারে?



(২)


'বউ মা! কফিটাও কী আজকাল বুয়ার হাতে খেতে হবে আমাকে? সারাদিন বসে শুয়ে ফ্যাশন ম্যাগাজিন দেখে দেখে রূপচর্চা ছাড়া আর কোনদিকেই তো নজর দেখি না তোমার। 'মটকু' ঘুম থেকে উঠেছে কি না একটু দেখো তো!'


ড্রেসিং আয়নার সামনে চিৎ কাত, পাশ ফিরে ঘাড় কাঁধ থেকে ব্লাউজের পিছনে ঘিয়া রংয়ের উদোম পিঠ পর্যন্ত উল্টে পাল্টে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখে নিয়ে তৃপ্তির হাসি খেলে যায় আখতারা জামানের ঠোঁটে!


নাহ্! বয়স এখনো ছুঁতে পারেনি তাকে। পার্সোনাকে থ্যাংকস জানাতে ইচ্ছা করে তার। স্পা, মাসাজিং, ফেসিয়াল, পেডিকিওর মেনিকিওর হেয়ার কালার— সবকিছুই এতো যত্নের সাথে করে যে, নিজেকেই নিজের কাছে অচেনা লাগে মাঝেমাঝে আখতারা জামানের।


নিজের এই চেহারার সাথে তার মায়ের রাখা তারা বানু নামটা মেলাতে গিয়ে প্রতিবারই মায়ের প্রতি রাগে উত্তেজিত হয়ে পড়েন তিনি। তারা বানু কোন নাম হলো? কী অখাদ্য রুচি রে বাপ ! বিয়ের পরে শিল্পপতির বউ হিসাবে তারা বানু নামটা অসহ্য লাগায় তারার আগে 'আখ' টুকু নিজেই যোগ করে নিয়ে কোনরকমে নিজের নামটাকে হজমযোগ্য করে নিয়েছেন তিনি।


মা দিবস আজ। নারীর অধিকার আদায় বিষয়ক বিভিন্ন কর্মকান্ডের সাথে জড়িত থাকায় প্রায় সময়ই ব্যস্ততায় কাটে তার।


ছিন্নমূল নারীদের নিয়ে কোনো না কোনো সেমিনারে প্রায় প্রতিদিনই বক্তৃতা দিতে হয় তাকে। মা-ও যেহেতু নারীদের অন্তর্ভুক্ত এবং খাতা কলমে পৃথিবীর সবচেয়ে ভালোবাসা আর আবেগের জায়গা, তাই 'মা' দিবসে আবেগের তীব্রতা আর ঘনত্ব আরো গভীর বিষাদি কন্ঠে গদগদ অবস্থায় বক্তৃতার মাধ্যমে তুলে ধরতে হবে। অভিব্যক্তিটা ফুটিয়ে তুলতে হবে আবার অভিনয়ের মাধ্যমে।


কেমন যেন একটু নার্ভাস নার্ভাস লাগে তার। আবেগে হিসাব কষে প্রতি সেকেন্ড গুনে গুনে তাকে কান্না করতে হবে আজ। প্রতি সেকেন্ডে আবার মুছতে হবে সেই চোখের পানি। আর ভয়টা মূলত তার এই জায়গাতেই! এতবার চোখ মুছতে যাওয়া মানে চোখের ফলস পাপড়ির বারোটা বাজানো! স্টেজের ওপর না আবার উপড়ে পড়ে ফলস পাপড়িগুলো! পাপড়িগুলো তাই এমনভাবে আটকাতে চাচ্ছেন তিনি যেনো হাজার টানা হ্যাঁচড়াতেও ঝরে না পড়ে সেগুলো স্টেজের ওপর!


সত্যিটা হলো, চোখের পাপড়ি আটকাতেই আজ এতটা সময় ব্যয় করতে হচ্ছে তাকে। আটকানোর পরেও পুনঃপুন যাচাই বাছাই শেষে শেষ পর্যন্ত নিশ্চিত হয়ে তারপরে বউ মাকে ডেকে কফির অর্ডার দেন মিসেস আখতারা জামান।
এমনিতেই সেদিন মি. ফারুকীর কথাটা কাঁটার মতো বিঁধে আছে তার হৃদয়ের গোপন সংবেদনশীল জায়গাটায়। নিজের অজান্তেই যখন তখন খচ্ করে হুল হানিয়ে দ্যায় কাঁটাটা!


সেদিনের সেই সেমিনার শেষে আয়েশ করে রিভলভিং চেয়ারটায় গা এলিয়ে দিতে না দিতেই তার প্রায় উলঙ্গ পিঠে হাত রেখে রসিকতা করছিলো মাতালটা—


'চির তরুণীদের ত্বকেও আজকাল ভাঁজ পড়তে দেখছি মনে হয়! ভিটামিনে কমতি পড়লে বান্দাকে স্মরণ করবেন। ত্বককে মুহূর্তেই মহানন্দে মাক্ষোন বানিয়ে দেবো দেখবেন!'


নিজের রসিকতায় নিজেই খ্যাকখ্যাক করে হাসলেও কথাটা সেই যে বিঁধল— তারপর থেকে কিছুতেই হৃদয়টাকে কন্টকমুক্ত করতে পারছেন না মিসেস জামান।


শুধু বিয়ারে কোনোদিনই নেশাটা ঠিক জমে না তার। ইদানীং তো রাম ভোদকাতেও কাজের কাজ কিছু হচ্ছিলো বলে মনে হতো না জনাব আখতারা জামানের। নেশা হিসাবে তাই র' হুইস্কিটাকেই এখন প্রেফারেবল হিসেবে বেছে নিয়েছেন তিনি।


আখতারা জামানের নামকা ওয়াস্তে পতিধন জামান সাহেব আলাদা রুমে ঘুমান আজকাল। মাঝরাতে অবশ্য নেশাগ্রস্ত অবস্থায় পিঠে বুকে হাত বোলাতে তার রুমে ঢুকে পড়েন কখনো কখনো। সে সময় অসহ্য লাগে তার জামানের ঘিনঘিনে স্পর্শ। নাঈমের আদরের নেশার চটকাটা বারবার ভেঙে যেতে চায় জামানের আবিল স্পর্শে। লাঠি সোটা হাতের কাছে যা পান তাই দিয়েই তখন কুকুর খেদানো করে জামানকে ঘরছাড়া করেন তিনি।


সকালের রাঙা সূর্য আকৃতির বিশাল একটা লাল টিপে কপাল ঢেকে সাজ শেষ করেন আখতারা জামান। 'মটকু' টাকে হাই করতে হবে এবার। এত পুষ্টিতেও ক্যানো যে ল্যাকপেকেই রয়ে গ্যালো ছেলেটা, মাথায় ঢোকে না তার। 'মটকু' নামে ইচ্ছা করেই ছেলেকে ডাকেন তিনি। যদি নামটার গুনেও একটু মোটা তাজা হতো ছেলেটা!


বেরোনোর সময় ভেজা সুগন্ধী টিস্যু বক্সটা নিতে ভোলেন না তিনি কোনদিনই। জীবন যায় যাক— তবু আই ল্যাশ, ফলস পাপড়ি, আই শ্যাডো মুছতে দেয়া যাবে না কিছুতেই!


বের হতে গিয়ে দরজার মুখে হঠাৎ'ই থমকে দাঁড়ান আখতারা জামান। কতদিন আগে য্যানো গ্রাম থেকে ফোন করেছিলেন তার মা? দুর্দশাগ্রস্ত নারীদের নিয়ে জম্পেস একটা পেপারস তৈরিতে ব্যস্ত আখতারা জামান সেদিন বেশ বিরক্তির সাথেই রিসিভ করেছিলেন তার মায়ের কল—


"মা রে! কতদিন দেখিনি তোকে! বিছানা থেকে কলতলা পর্যন্তও হেঁটে যেতে পারি না আজকাল। এই শেষ সময়টায় এসে বড্ড দেখতে ইচ্ছা করে তোকে। একবার আয় না সোনা যাদু তারা মনি মা আমার! শেষ বারের মতো তোর তারার আলোয় উজ্জ্বল মুখটা দেখি একবার!'


(৩)


খুব দ্রুততার সাথে গলদা চিংড়ি'র ভুনা করছেন শান্তি দেবী। মনে মনে হাসেন তিনি। এখনও ছেলেমানুষই রয়ে গ্যালো প্রদীপটা! হুটহাট আব্দার!" মা,গরুর মাংসের চপ খেতে ইচ্ছা করছে। বানিয়ে দাও এক্ষুনি। "


"তুই যে গরু পাগল— জানাজানি হলে সমাজ আস্ত রাখবে আমাদের ? 'একঘরে' করে দেবে না? তুই কী জানিস, গরুর মাংস কেনার সময় অপরিচিত কসাইয়ের দোকানে গিয়ে 'দাদা' না ডেকে কসাইকে 'ভাই' বলে ডাকতে হয় তোর বাবাকে?"


"গরুর মাংস ভালো লাগলে আমি কী করবো বলো? ওই মিলনটাই তো যত নষ্টের গোড়া! জোর করে বিফ খাইয়ে গো-ভক্ত বানিয়েছে আমাকে। পারলে য্যানো ওকে 'একঘরে 'করে সমাজ। সমাজের পরোয়া করি না আমি। তাছাড়া কত হিন্দু গরুর মাংস খেয়ে বহাল তবিয়তে ঘুরে বেড়াচ্ছে আজকাল ! ওসব নিয়ে না ভাবলেও চলবে তোমার! "


আবারও আপন মনে হাসেন শান্তি দেবী।
পাগল একটা!


"ও দিদি, লগ্ন তো যায় যায়! ছেলেকে বের করতে হবে না? লোকজন তো এসে গ্যাছে সব! "


সতী'র ডাকে ধ্যান ভাঙে শান্তি দেবীর। সতী তার দূর সম্পর্কের মাসীর মেয়ে। বাল বিধবা। সমাজের ভয়ে প্রেমে পড়েও শেষ অবধি বিয়ে করতে পারেনি মেয়েটা। পাড়া গাঁয়ের লাফাঙ্গা ছেলেদের অত্যাচার নির্যাতনের হাত থেকে অসহায় মেয়েটাকে বাঁচাতেই তাই সতীকে নিজের কাছে এনে রেখেছেন শান্তি দেবী।


সতী'র ডাকে ওর মুখের দিকে ফ্যালফেলিয়ে চেয়ে থাকেন শান্তি দেবী।


প্রদীপের বিয়ে আজ! কবে কবে অ্যাত্ত বড় হয়ে গ্যালো তাঁর ভুবন আলো করা সেদিনের সেই এক রত্তি নাড়ু গোপাল আকাশ প্রদীপ? গতকাল, হ্যাঁ— গতকালই তো হাতের কাছে শার্ট রেখে ঘরবাড়ি তছনছ করে ফেলছিলো তাঁর ভুলো মনা পাগল ছেলেটা! শান্তি দেবী যখন সামনে থেকে শার্টটা তুলে পরম মমতায় পরিয়ে দিলেন তাঁর নন্দ দুলালকে, তখন সে যে কী উচ্ছ্বাস তার ! মাকে জড়িয়ে চুমুতে চুমুতে ভিজিয়ে দিয়েছিল পুরো মুখ!


আজ তো চিংড়ি'র ভুনা খেতে চায়নি প্রদীপ ! তবে ক্যানো প্রদীপের প্রিয় গলদা চিংড়ি নিয়ে পড়ে ছিলেন তিনি এতক্ষণ?


ঘর অন্ধকার করে সেই বিকেল থেকেই আজ শুয়ে আছেন শান্তি দেবী। লেখালেখি তাঁর প্রিয় অভ্যাস। শত ব্যস্ততার ফাঁকে ফাঁকেও তাই লেখালেখির অভ্যাসটা জিইয়ে রাখেন শান্তি দেবী। যেদিন লিখতে পারেন না, অকারণ বিষাদে সেদিন ছেয়ে যায় তাঁর সারা দেহ মন।


শুয়ে থাকতে থাকতে একসময় বিছানায় উঠে বসেন তিনি। লেখালেখি করলে ক্যামন হয়! মনে হতেই অবসাদ এসে ঘিরে ধরে তাঁর চতুর্পাশ! নাহ্! ক্যানো যে এতটা নিঃসাড় হ'য়ে আছে ভেতরটা, বুঝেও কারণটা ঠিক ধরতে পারেন না শান্তি দেবী।



বউমাকে দেখেছেন তিনি। প্রতিমার মতো খোদাই করা রূপ মেয়েটার।


ওদের নতুন জীবনের 'কালরাত্রি' আজ। আগামীকাল ফুলশয্যা। আজকাল আর 'কালরাত' ফাত তেমন একটা মানে না কেউ।


নিজের 'কালরাত্রি'র কথা মনে পড়ে যায় শান্তি দেবীর। প্রেমের বিয়ে তাঁদের। 'কালরাত্রি'র আলোমোড়া ঘরে সে রাতে নিশিকান্তকে ভীষণভাবে জড়িয়ে ধরতে ইচ্ছা করছিলো তাঁর। কিন্তু মাসতুতো পিসতুতো ভাই বোন, দিদা দাদু সম্পর্কিত সবাই মিলে এ্যাত্ত তামাশা করছিলো ওদের নিয়ে, শুধু সেই লজ্জাতেই জড়িয়ে ধরা তো দূরের কথা -নিশিকান্তর দিকে ভালোভাবে চোখ মেলে তাকাতে পর্যন্ত পারেন নি তিনি!


টোপর মাথায়, বেলী ফুলের মালা গলায় কী যে দেবদূতের মতো পবিত্র সুন্দর লাগছিলো আজ ছেলেটাকে! বেরোনোর সময় প্রদীপ কী আজ চুমু খেয়েছিলো তাঁকে? মনে পড়ছে না কেন!


কোন একটা পার্বণের উছিলা দরকার শুধু! নিশিকান্তকে সেদিন আর পায় কে! পুরোপুরি কান্ডজ্ঞান হারা নিশিকান্ত যেনো সেই পুরোনো তারুণ্যে ফিরে যায় মুহূর্তেই । বন্ধুদের নিয়ে গাঁজা, ভাং, সিদ্ধিতে সেদিন তার উন্মাতাল দশা!


ছেলের বিয়েটাও আজ যেনো তার সেরকমই একটা পার্বন ! রাতে ফিরবে কিনা, সেটাও অনিশ্চিত!
সারাদিনের কাজের পরিশ্রমে পরিশ্রান্ত শরীরের ক্লান্তিতে সতীটাও ঘুমের অতলে নিমজ্জিত। শব্দহীন স্তব্ধতায় শান্তি দেবীর কাছে বোবা কালার মতো মনে হয় বাড়িটাকে!


"মা! মা! মা! কই গো আমার তুলতুলে খরগোশ ছানাটা?"
চমকে ওঠেন শান্তি দেবী!
প্রদীপের কণ্ঠ, না?
বিমূঢ় ঘোরের ভ্রম থেকে জেগে উঠতে কিছুটা সময় লাগে তাঁর! নিজের কাছেই যেনো ধরা পড়ে যান শান্তি দেবী। ভ্রমের লজ্জায় নিজেকেই ধিক্কার দেন মনে মনে -
'ধ্যাৎ! প্রদীপ এখন আসবে কোত্থেকে?'


আবারও অবসাদে বুঁজে আসে শান্তি দেবীর চোখের পাতা। বন্ধ চোখের অভ্যন্তরে খেলা করে ভ্রুণ থেকে বেড়ে ওঠা আজকের বরবেশী প্রদীপের মুখ!


প্রথম যেদিন প্রদীপের অস্তিত্ব টের পেলেন নিজের গভীরে, সেদিনের অনুভূতি কী ব্যাখ্যা যোগ্য হতে পারে কোনকালে? কোন উপন্যাস গল্প কবিতা কী আদৌ ধারণ করতে সক্ষম ব্যাখ্যাতীত সেই অলৌকিক অনুভূতি ?


কী করছে প্রদীপ এখন? 'কালরাত্রি'র ঘর ভর্তি আলোর মাঝে অপূর্ব প্রতিমা প্রতিম মায়াবতী মুখের দিকে তাকিয়ে ভুলে যায়নি তো, একা ঘরে কী ভীষণভাবে শিশু প্রদীপকে খেলনা বানিয়ে একা একাই বিভোর খেলায় জগৎ ভুলে নেশাতুর পড়ে আছেন তার মা?


আজ কি একবারও তাঁকে ফোন করেছে প্রদীপ? খোঁজ নিয়েছে, অ্যাসিডিটির ওষুধটা খেয়েছেন কিনা?


মনে পড়ছে না! কিচ্ছু মনে পড়ছে না তাঁর। কেন এরকম অচেনা অস্থিরতা চঞ্চল করে রেখেছে আজ তাঁকে?


একবার দীর্ঘ দিন জ্বরে ভুগেছিল ছেলেটা। নাওয়া খাওয়ার কথা সেসময় ভুলেই গিয়েছিলেন তিনি। চুলোয় গিয়েছিল লেখালেখির চিন্তা। এক সেকেন্ডের জন্যও প্রদীপকে তাঁর কোল থেকে নামানোর সাধ্য ছিলো না কারো।


বুকের মধ্যিখানে প্রদীপকে জড়িয়ে সে সময় শুধু ভগবানকেই যেনো পরিচিত মনে হতো তাঁর। অবিশ্রান্ত গভীর ধ্যানে ভগবানকে ডাকতে ডাকতে গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে যেতো তবু জলের কথা মনে করতে পারতেন না তিনি।


সকাল কখন বিকেলে নামত, বিকেল কখন রাত বেয়ে সকালে গড়াত— রোগাক্রান্ত প্রদীপের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে জগৎ সংসার গুলিয়ে হারিয়ে একাকার হয়ে যেতো তাঁর চোখের সামনে থেকে! কিছুতেই কোন ফল পেলেন না যখন, তখন নিশিকান্তর এক বন্ধুর ঠিকানা ধরে সোমনাথ পুরের জঙ্গলের ভেতর জাগ্রত দেবীর মন্দিরে তিন দিন তিন রাত উপোশী দেহে হত্যে দিয়ে প'ড়ে থেকে বুকের তাজা রক্ত দেবী চরণে উৎসর্গ ক'রে যমের হাত থেকে শেষ পর্যন্ত সেবার ফিরিয়ে আনতে পেরেছিলেন তাঁর জগতের আলোকে!


আজকের এই মায়াবতী মুখটা কী কেড়ে নেবে তাঁকে ঘিরে প্রদীপের মনের সব স্মৃতি?


নাহ্! প্রদীপ কখনই পারবে না তা!


এ্যাতো— এ্যাতো— এ্যাত্তগুলো মধুর স্মৃতি, অপার্থিব অপত্য ভালোবাসা দিয়ে জয় করা ভালোবাসাকে ভুলে যাওয়া যায় না কখনো! সেই স্মৃতি ভুলিয়ে দেওয়ার মতো শক্তি, সাধ্য বা সাহস দেয়া হয়নি এ জগতের কাউকেই! কখনোই এ বিশ্বাস থেকে বিচ্যুত হওয়া সম্ভব না তাঁর পক্ষে!


সদ্য যুবতী মাতা শান্তি দেবী তাঁর অলৌকিক পুতুল প্রদীপের সাথে খেলতে খেলতে পরম প্রশান্তিতে ঘুমের দেশে হারিয়ে যান একসময়।


শরৎ সকালে নিকানো উঠোনের এক কোণে শিউলী তলায় বিছিয়ে থাকা অজস্র শুভ্র ফুলের চাদর ধরে দুষ্টুমিতে, ধুন্ধুমার কাড়াকাড়িতে মেতে ওঠে দুই ঐশ্বরিক শিশু!


ঘুমের ঘোরে স্বপ্নলোকে ঝর্ণা হাসিতে মায়াময় শান্তিতে প্রদীপকে বুকে জড়িয়ে হাসতে হাসতে গড়িয়ে পড়েন শান্তি দেবী!


বিবার্তা/এসবি

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

পদ্মা লাইফ টাওয়ার (লেভেল -১১)

১১৫, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ,

বাংলামোটর, ঢাকা- ১০০০

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2021 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com