সাক্ষাতকার
বক্সিং এ ওয়ার্ল্ড চ্যাম্পিয়ন হতে চাই: সুরো কৃষ্ণ চাকমা
প্রকাশ : ২৯ মে ২০২২, ২১:০৫
বক্সিং এ ওয়ার্ল্ড চ্যাম্পিয়ন হতে চাই: সুরো কৃষ্ণ চাকমা
মহিউদ্দিন রাসেল
প্রিন্ট অ-অ+

সুরো কৃষ্ণ চাকমা। সাম্প্রতিক সময়ে দেশের সবচেয়ে আলোচিত নাম। তার নামটি এখন শুধু নাম নয়, এটি বাংলাদেশের এক নতুন ইতিহাস। কেননা, তার হাত ধরেই আন্তর্জাতিক পেশাদার বক্সিং সাউথ এশিয়ান প্রফেশনাল বক্সিং ফাইট নাইট—দ্য আল্টিমেট গ্লোরি প্রতিযোগিতায় চ্যাম্পিয়ন হয়েছে বাংলাদেশ। প্রথমবারের মতো আন্তর্জাতিক পেশাদার বক্সিংয়ে বাংলাদেশের হয়ে স্বর্ণপদক জয় করেছেন সুরো কৃষ্ণ চাকমা। তার এ অর্জনে গর্বিত বাংলাদেশের মানুষ।


ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগ থেকে স্নাতকোত্তর এই বক্সার চার রাউন্ডের খেলায় নেপালের শক্তিশালী প্রতিপক্ষ মহেন্দ্র বাহাদুর চাঁদকে পরাজিত করে চ্যাম্পিয়ন হয়েছেন। রাঙামাটির জুরাছড়ি উপজেলায় জন্ম নেয়া সুরো কৃষ্ণ চাকমা এরআগে বক্সিংয়ে সাফল্য পেলেও এটাই তার আন্তর্জাতিক শ্রেষ্ঠ স্বীকৃতি।


২০১৩ সালে বাংলাদেশ গেমসে গোল্ড মেডেল অর্জন করেন। ২০১৪ সালে ন্যাশনাল চ্যাম্পিয়ন হন। ‘সাউথ এশিয়ান গেমস ২০১৯’- এ এমেচার বক্সিংয়ে ব্রোঞ্জ পদক জেতেন। ২০১৮ সালে ভারতের হরিয়ানা রাজ্যে দুটি খেলায় জয়লাভ করেন। তার প্রথম আন্তর্জাতিক ইভেন্ট ২০১৪ সালের স্কটল্যান্ডের গ্লাসগো কমনওয়েলথ গেমস। এছাড়া ২০১৫ সালে দেশসেরা বক্সার নির্বাচিত হয়ে লন্ডনে ছয় মাস ট্রেনিং করার সুযোগ পান।


সম্প্রতি দেশবরেণ্য এই বক্সার একান্ত কথা বলেছেন বিবার্তা২৪ডটনেটের সাথে। জানিয়েছেন বক্সিং নিয়ে তার এ পর্যন্ত আসার গল্পসহ ভবিষ্যত পরিকল্পনা। সাক্ষাতকারটি নিয়েছেন বিবার্তার নিজস্ব প্রতিবেদক মহিউদ্দিন রাসেল।



বিবার্তা: সাউথ এশিয়ান প্রফেশনাল বক্সিং ফাইট নাইট—দ্য আল্টিমেট গ্লোরি প্রতিযোগিতায় আপনার হাত ধরেই প্রথম বারের মতো চ্যাম্পিয়ন হয়েছে বাংলাদেশ। এ বিষয়ে আপনার অনুভূতি কেমন?


সুরো কৃষ্ণ চাকমা: বাংলাদেশের ইতিহাসে এই রকম ইভেন্ট কখনো হয় নাই। আমি চ্যাম্পিয়ান হয়ে যখন লাল-সবুজ পতাকাটা তুলে ধরি, তখন নিজের মধ্যে অন্যরকম ভালোলাগা এবং গর্ববোধ কাজ করেছে। আমার অনেক দিনের স্বপ্ন ছিল, জীবনে একটা আনন্দঘন মুহূর্ত আসবে। আমি এর আগে বিভিন্ন দেশের বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করলেও এইরকম সৌভাগ্য আর কখনো হয়নি। তাই অনুভূতির কথা বলে বোঝানো যাবে না।


বিবার্তা: আপনার এ সফলতার পেছনে রহস্য কী?


সুরো কৃষ্ণ চাকমা: কঠোর পরিশ্রম, সাধনা, দৃঢ় মনোবল আর আত্মবিশ্বাস আমাকে এই পর্যন্ত নিয়ে এসেছে।


বিবার্তা: কাদের অবদানকে স্বীকার করতে চান?


সুরো কৃষ্ণ চাকমা: সফলতার কথা বলতে গেলে প্রথমেই পারিবারিক সাপোর্টের কথা বলতে হবে। এছাড়া পারিপার্শ্বিক অবস্থা, আমার বিকেএসপি ক্লাবের অবদান, বিভিন্ন কোচের আন্ডারে আমি ছিলাম তাদের অবদানের কথা আমি স্বীকার করি। তাছাড়া এই শিরোপার কথা যার মাধ্যমে জানতে পারি, তাকেও আমি স্মরণ করি।



বিবার্তা: আপনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ছিলেন। এ পর্যন্ত আসার পিছনে আপনার বিশ্ববিদ্যালয়ের সহায়তা ছিল কিনা?


সুরো কৃষ্ণ চাকমা: হ্যাঁ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অবদান অবশ্যই আছে। আমি যদি এখানে না থাকতাম হয়তো এই পর্যন্ত আসতেই পারতাম না। আমার ক্যাম্পাসের পাশে ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যান, যেখানে আমি হাঁটতে কিংবা দৌঁড়াতে যেতাম। এছাড়া বিভিন্ন বক্সিং প্রতিযোগিতা আসলে অনুশীলনের বিভিন্ন ধাপও এখানে করতাম। আজকে আমি যদি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তাম, হয়তো এই প্রতিযোগিতাগুলোতে অংশগ্রহণ করা আমার পক্ষে সম্ভব হতো না। ঢাকায় আমি ক্যাম্পে থাকা অবস্থায় বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাস না করেও আমরা শিক্ষকদের সহযোগিতায় পরীক্ষাগুলো দিতে পেরেছি। অর্থাৎ একইসাথে পড়াশোনা এবং খেলাধূলা দুটোই সমানতালে চলমান ছিল। দেখা যাচ্ছে, বনানীতে আমার ক্যাম্প- আমি ফাঁকে ফাঁকে বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষাসহ যাবতীয় কাজ সম্পাদন করতাম। একই কাজ আমি চট্টগ্রাম কিংবা রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়লে হয়তো কোনোভাবেই সম্ভব ছিল না। এছাড়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় খেলার মাঠ, জিমনেশিয়াম রয়েছে। এখানে ফুটবল খেলতাম, অনুশীলন করতাম। এগুলো আমার অনেক কাজে দিয়েছে। অর্থাৎ ঢাবির এমন পরিবেশ না থাকলে আমার ফিটনেস ধরে রাখা সম্ভব হতো না।


বিবার্তা: বক্সিং নিয়ে আপনার স্বপ্ন কী?


সুরো কৃষ্ণ চাকমা: আমার স্বপ্ন হচ্ছে বক্সিংয়ে ওয়ার্ল্ড চ্যাম্পিয়ন হওয়া। ২০১৫ সালে লন্ডনে গিয়েছিলাম। সেখানে আমি ট্রেনিং করি। একইসাথে ওখনকার স্থানীয় বেস্ট বেস্ট ফাইটারদের সাথে ফাইট করি। সেখান থেকে বক্সিং এর প্রতি আরো অনুপ্রাণিত হই। লন্ডনে বক্সারদের লাইফ স্টাইল, সামাজিক অবস্থান হাই লেভেলের। এইসব দেখে আমি ভাবলাম, আমি যেহেতু বক্সিং করি, সেহেতু এর মাধ্যমে দেশের প্রতিনিধিত্ব করে দেশের জন্য সুনাম কুড়িয়ে আনা সম্ভব। এরপর থেকে বক্সিং নিয়ে আমার স্বপ্ন হলো বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হওয়া। আর সেই লক্ষ্যে কাজ করছি।



বিবার্তা: বক্সিংয়ে দেশের প্রতিনিধিত্ব করে দেশকে গর্বিত করেছেন। কাজেই দেশের সরকারকে বিশেষ কোনো মেসেজ দিতে চান কিনা?


সুরো কৃষ্ণ চাকমা: সরকারের উদ্দেশ্যে অবশ্যই মেসেজ দিতে চাই। আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে এই রকম সংখ্যা খুবই কম যে, যারা পড়াশোনায় উচ্চ শিক্ষা নেয়ার পাশাপাশি বক্সিংয়েও দেশের জন্য খেলে এগিয়েছে। আমাদের এখানে যারা বক্সিং খেলেন, তাদের অধিকাংশই জব হোল্ডার। কেউ আর্মির সৈনিক আবার কেউবা আনসারের সৈনিক। আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগ থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেছি। উচ্চ শিক্ষার পরে আমাকে জবের বিষয়ে সেভাবে সুযোগও দেওয়া হচ্ছে না। চাকরির বাজারে আমাকে সাধারণদের সাথে প্রতিযোগিতা করতে হচ্ছে। আমি ন্যাশনাল টিমে থাকার কারণে সেইভাবে পড়াশোনা করতে পারি না। কাজেই বিসিএসসহ জবের ভালো প্রিপারেশন নেয়া আমার পক্ষে সম্ভব না। তাছাড়া ওইদিকে আমার ইচ্ছেও নেই। তাই সরকার যদি মনে করে দেশের প্রতিনিধিত্ব করার জন্য আমাকে ইফোর্ট দেয়া দরকার, তাহলে আমার শিক্ষাগত যোগ্যতা বিবেচনা করে জাতির পিতার কন্যা প্রধানমন্ত্রী যদি আমার জন্য কিছু একটা করেন-তাহলে আমি খেলায় আরো বেশি মনোযোগি হতে পারবো। আমাকে সেনাবাহিনী, আনসারসহ অনেকে অফার দিয়েছে। কিন্তু তারা অফার দিয়েছে সৈনিক হিসেবে। কিন্তু এই উচ্চ শিক্ষা নেওয়ার পরে আমি তো এটা নিতে পারি না। এজন্য আমি এখনো জবলেস। তবে আমি কিছু ভাতা পাই। আর এটা দিয়েই চলি।


বিবার্তা: বিবার্তাকে সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।


সুরো কৃষ্ণ চাকমা: আপনাকেও ধন্যবাদ।


বিবার্তা/রাসেল/রোমেল/এসএফ


সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

পদ্মা লাইফ টাওয়ার (লেভেল -১১)

১১৫, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ,

বাংলামোটর, ঢাকা- ১০০০

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2021 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com