৪ বছর ধরে গণরুমে জাবির ফয়জুন্নেসা ও ফজিলাতুন্নেছা হলের শিক্ষার্থীরা
প্রকাশ : ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২২, ১৮:০৮
৪ বছর ধরে গণরুমে জাবির ফয়জুন্নেসা ও ফজিলাতুন্নেছা হলের শিক্ষার্থীরা
জাবি প্রতিনিধি
প্রিন্ট অ-অ+

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) নওয়াব ফয়জুন্নেসা হলের এবং ফজিলাতুন্নেছা হলের শিক্ষার্থীরা ভুগছেন তীব্র আবাসন সংকটে। তৃতীয় বর্ষের ছাত্রীরা ৪ বছর ধরে অবস্থান করছে গণরুমে।


দেশের একমাত্র আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয় হওয়ায় প্রত্যেক শিক্ষার্থীর বিপরীতে হলে একটি সিট থাকার কথা। ভর্তির দিনেই নির্দিষ্ট সিট বরাদ্দের কথা থাকলেও তা দিতে দীর্ঘদিন ধরে ব্যর্থ হচ্ছে হল কর্তৃপক্ষ। নওয়াব ফয়জুন্নেসা হলের রিডিং রুমকে রূপান্তর করা হয়েছে গণরুমে। সংসদ কক্ষকে বানানো হয়েছে রিডিং রুম যেখানে কেবলমাত্র ১১ জন শিক্ষার্থী একত্রে বসে পড়াশোনা করতে পারে। রিডিং রুমকে যৌথভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে নামাজরুম হিসেবে। এখানে একত্রে কেবল ৬ জন নামাজ পড়তে পারে। ডাইনিং রুমকে যৌথভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে টিভি রুম ও পেপার রুম হিসেবে। তীব্র আবাসন সংকটে গণরুমে গাদাগাদি করে থাকতে হচ্ছে শিক্ষার্থীদের। ফলে পড়াশোনার ক্ষতির পাশাপাশি বাড়ছে স্বাস্থ্যঝুঁকি।


সরজমিনে ঘুরে দেখা যায়, কেবল চতুর্থ বর্ষ (৪৭ ব্যাচ) পর্যন্ত শিক্ষার্থীরা তাদের নামে সিট পেয়েছে। মিনি গণরুমে অবস্থান করছেন তৃতীয় বর্ষের (৪৮ ব্যাচ) ও দ্বিতীয় বর্ষের (৪৯ ব্যাচ) শিক্ষার্থীরা। নওয়াব ফয়জুন্নেসা হলের সুপারিনটেনডেন্ট শাহানাজ আক্তার দীর্ঘদিনের ছুটিতে থাকায় ও মিনি গনরুমের সংকটের কারণে শেষ পর্যন্ত ৫০ ব্যাচের শিক্ষার্থীদের ঠাই হয়েছে হল সুপারিনটেনডেন্টের রুমে। বিশ্ববিদ্যালয় আইনে প্রত্যেক শিক্ষার্থীর হলে ওঠার অধিকার থাকলেও আবাসন সংকটের জন্য ঢাকায় বাসা এমন ছাত্রীদের হলে উঠতে দেওয়া হয় না।


অপরদিকে ফজিলাতুন্নেছা হলে তৃতীয় বর্ষের (৪৮ ব্যাচ) শিক্ষার্থীদের ঠাই মিলেছে গণরুমে। রিডিং রুম ও টিভি রুমকে বানানো হয়েছে গণরুম। কমন রুমের অর্ধেক অংশ ব্যবহার করা হচ্ছে গণরুম হিসেবে আর বাকি অর্ধেক অংশ ব্যবহার করা হচ্ছে টিভি রুম ও রিডিং রুম হিসেবে। উচ্চশব্দে টিভি ব্যবহার করায় পড়াশোনা ও ঘুমের ব্যাঘাত ঘটছে। দ্বিতীয় (৪৯ ব্যাচ) ও প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থীরা অবস্থান করছে টিচার্স কোয়াটারে। সেখানে নেই কোন ডাইনিং বা ক্যান্টিনের ব্যবস্থা। খাওয়ার জন্য তাদের ছুটতে হচ্ছে অন্য হলে বা বট তলায়।


খোঁজ নিয়ে জানা যায়, এর আগে ফজিলাতুন্নেছা হলে লটারির মাধ্যমে তৃতীয় বর্ষের প্রায় ৫০ জন শিক্ষার্থীকে সিট দেওয়া হয়েছে। কিন্তু নওয়াব ফয়জুন্নেসা হলের তৃতীয় বর্ষের কেবলমাত্র ৫ জন শিক্ষার্থী রুম পেয়েছে। বাকিদের কবে নাগাদ রুম দেওয়া হবে তা নিয়েও রয়েছে অনিশ্চয়তা।


তাছাড়া অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে থাকায় মেয়েরা প্রতিনিয়ত বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। ব্যাঘাত ঘটছে পড়াশোনাতেও। নওয়াব ফয়জুন্নেসা হলে গ্যাসের সংযোগ না থাকায় বাহিরের অস্বাস্থ্যকর খাবার খেয়েও অসুস্থ হচ্ছে শিক্ষার্থীরা।


মাস্টার্স পরীক্ষা শেষ হওয়ার ৭ দিনের মধ্যে শিক্ষার্থীদের হল ছাড়ার নির্দেশনা রয়েছে। কিন্তু বাস্তবিক অর্থে হল কর্তৃপক্ষের সুষ্ঠু মনিটরিংয়ের অভাবে মাস্টার্স শেষ হওয়ার দীর্ঘদিন পরেও হলে অবস্থান করছে অধিকাংশ শিক্ষার্থী। এর মধ্যে অনেকের ফলাফল প্রকাশিত হওয়ার পরেও হলে অবস্থান করার অভিযোগ রয়েছে।


নওয়াব ফয়জুন্নেসা হলের সাংবাদিকতা ও গণমাধ্যম বিভাগের তৃতীয় বর্ষের (৪৮ ব্যাচ) এক শিক্ষার্থী বলেন, 'দেশের একমাত্র আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েও থার্ড ইয়ার ফাইনাল পরীক্ষার দিচ্ছি মিনি গণরুমে থেকে। এখন পর্যন্ত আমার নামে বরাদ্দকৃত কোন রুম আমি পাইনি। হলে সিট সংকট এর পাশাপাশি নতুন সৃষ্টি হয়েছে হল মেরামতের কাজ। এতে প্রচুর পরিমাণে শব্দ দূষণ হচ্ছে। হলে গ্যাস এর ব্যবস্থা নেই, ক্যান্টিন নেই প্রায় দেড় মাস ধরে। সব কিছুর মাঝে কিভাবে যেনো বেঁচে আছি। মনে হয় পড়াশোনা না, প্রতিকূল পরিবেশে টিকে থাকা শিখতে এসেছি।'


ফজিলাতুন্নেছা হলের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের তৃতীয় বর্ষের (৪৮ ব্যাচ) শিক্ষার্থী আয়েশা আক্তার ইতি বলেন, ' অন্যান্য হলের প্রথম বর্ষের (৫০ ব্যাচ) শিক্ষার্থীরাও রুম পেয়েছে। আর এই দিকে আমরা তৃতীয় বর্ষে পড়েও এখনো গণরুমে থাকছি। মানুষের কাছে হাসি ঠাট্টার স্বীকার হতে হয় আমাদের। এখানে কোন পড়ার বা ঘুমানোর পরিবেশ নেই। আমি মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে যাচ্ছি। বাংলাদেশের একমাত্র আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয়ের এই অবস্থা ভাবতেও অবাক লাগে।'


এ বিষয়ে নওয়াব ফয়জুন্নেসা হলের প্রাধ্যাক্ষ অধ্যাপক ড. নাহিদ হক জানান, 'আমরা প্রশাসনকে আমাদের সংকটের কথা জানালেও তারা বরাবরই নতুন শিক্ষার্থীদের হলে এলোট প্রদান করছে। নতুন হলগুলো চালু হলেই এই আবাসন সংকটের সমাধান ঘটবে।'


৫১ ব্যাচ আসার পূর্বে নতুন হলের কাজ শেষ না হলে কী ব্যবস্থা গ্রহণ করবে এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, 'যদি এমন পরিস্থিতি তৈরি হয় তাহলে আমরা তাদেরকে টিচার্স কোয়ার্টারে রাখার ব্যবস্থা করবো।'


ফজিলাতুন্নেছা হলের প্রাধ্যাক্ষ অধ্যাপক ড. এ টি এম আতিকুর রহমান বলেন, 'আমরা নতুন ৩টি হলের মধ্যে একটি সম্পূর্ণভাবে পাবো। নতুন হল হস্তান্তর করলেই এই আবাসন সংকট দূর হবে। এই মাসে আমাদেরকে আসবাবপত্র দেওয়ার কথা। আসবাবপত্র পেলেই আমরা নতুন হলে উঠে যাবো। ৫১ ব্যাচ আসার পূর্বেই আমরা অবশ্যই নতুন হল পেয়ে যাবো।'


বিবার্তা/আয়েশা সিদ্দিকা/জেএইচ

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

পদ্মা লাইফ টাওয়ার (লেভেল -১১)

১১৫, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ,

বাংলামোটর, ঢাকা- ১০০০

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2021 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com