প্রচ্ছদ ‘শিল্প' হয়ে উঠুক
প্রকাশ : ০৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ১৬:৫৬
প্রচ্ছদ ‘শিল্প' হয়ে উঠুক
বিবার্তা ডেস্ক
প্রিন্ট অ-অ+

যখন পড়তে শিখিনি, তখন বই হাতে নেওয়ার প্রধান কারণ ছিল প্রচ্ছদ বা বইয়ের মলাট আর ভেতরের ছবি৷ যেসব আঁকিয়েরা বইয়ের প্রচ্ছদে অনেক দূরের গ্রাম আঁকতেন, তাঁদের প্রতি অন্যরকম ভালোবাসা ছিল৷


আর যাঁরা কয়েকটা শব্দ বা সংখ্যা বা কোনো অবয়ব দিয়ে প্রচ্ছদ আঁকতেন, তাঁদের প্রতি নিদারুণ ক্ষোভ ছিল৷


বেশ বড় হওয়ার পর নীল জমিনে লাল ছাতার নীচে দাঁড়ানো এক মেয়েকে দেখেছিলাম হুমায়ুন আহমেদের ‘বৃষ্টি বিলাস' বইয়ের প্রচ্ছদে, প্রচ্ছদ করেছিলেন ধ্রুব এষ৷ কতবার সেই মেয়েটির মুখ দেখতে ইচ্ছে হয়েছে! ছোটছোট কিছু স্মৃতি সবারই বইয়ের মলাট নিয়ে আছে৷


এই মলাট-শিল্প চাঙা হয়ে ওঠে বই মেলা এলে৷ যেহেতু আমাদের প্রকাশক, লেখক ও বই-সংশ্লিষ্ট সবার ঠিক বইমেলার আগেই সব কাজ শুরু হয়, বছর জুড়ে কাজ গুছিয়ে রাখার রীতি নেই, তাই মেলার সময় আর সবার মতো প্রচ্ছদশিল্পীরা ভীষণ ব্যস্ত হয়ে ওঠেন৷ ফলাফল – প্রচ্ছদের মানে ঘাটতি৷


একজন শিল্পী কখনোই পুরো বই পড়ে প্রচ্ছদ করার সুযোগ পান না৷ এমনকি অনেকে জানারই সুযোগ পান না বইটি কী নিয়ে৷ নাম ও লেখকের ফরমায়েশমতো বইয়ের প্রচ্ছদ করার রীতি চলছে এখন৷ অথচ এই দেশের প্রচ্ছদশিল্পের ইতিহাস বেশ সমৃদ্ধই বলা যায়৷


বাংলাদেশের বইয়ের জগতে প্রচ্ছদশিল্পী হিসেবে এক অবিসংবাদিত পুরুষ কাইয়ুম চৌধুরী৷ প্রচ্ছদশিল্পের ইতিহাসের অনেকটা জুড়ে রয়েছে তাঁর নাম৷ এমন একটি সময় ছিল, তাঁকে বাদ দিয়ে বাংলা বইয়ের প্রচ্ছদের কথা ভাবাই যেতো না৷ পঞ্চাশের দশক থেকে তিনি প্রচ্ছদশিল্পী হিসেবে কাজ শুরু করেন৷ তিনি এক সাক্ষাৎকারে বলেন, ১৯৫২ সালে সৈয়দ শামসুল হকের লেখা ‘বুনোবৃষ্টির গান' বইটির প্রচ্ছদ দিয়েই তিনি প্রচ্ছদ-জীবন শুরু করেছিলেন৷ তবে সেই সময় বইটি প্রকাশ হয়নি৷


শামসুর রাহমানের ‘প্রথম গান, দ্বিতীয় মৃত্যুর আগে' বইয়ের প্রচ্ছদ তাঁর করা৷ জসীম উদ্দীনের সাড়াজাগানো বই ‘বাঙ্গালীর হাসির গল্প'-এর প্রচ্ছদও তিনি করেছিলেন৷ হুমায়ুন আহমেদের ‘নন্দিত নরক'-এর প্রচ্ছদও করেছেন তিনি৷ অসংখ্য তরুণ লেখকের বইয়ের প্রচ্ছদ করে দিয়েছেন এই প্রতিথযশা শিল্পী৷ একটা নির্দিষ্ট ঘরানায় আটকে থাকেননি প্রচ্ছদ নিয়ে৷ শিল্পবোদ্ধারা বলেন, একজন প্রচ্ছদকার হিসেবে বারবার ফরম্যাট ভেঙেছেন তিনি৷ নিজেই একটা ধারা তৈরি করে আরেক ধারায় কাজ করেছেন৷


কাইয়ুম চৌধুরীর প্রচ্ছদ বা ইলাস্ট্রেশনের কাজ নিয়ে ব্যক্তিগত একটি অভিজ্ঞতা বলার লোভ সামলাতে পারছি না৷ ২০১৪ সালে জননন্দিত লেখক গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজের মৃত্যুর পর দেশের একটি দৈনিক আমাকে একটি গল্প অনুবাদ করে দিতে বলেছিল৷ গল্প অনুবাদ করার সময়ই জানতে পারলাম, এই গল্পের ইলাস্ট্রেশন করবেন কাইয়ুম চৌধুরী৷


তিনি পত্রিকার একজনের মাধ্যমে আমার কাছে অনুদিত গল্প চেয়ে পাঠালেন৷ গল্পটি পড়ে ইলাস্ট্রেশন করে পাঠালেন৷ এবং সেই ইলাস্ট্রেশনের একটি জায়গা চিহ্নিত করে লিখলেন, ‘‘এখানে লেখক নাম টাইপ করে বসবে৷'' কোন মাপে টাইপ হবে সেটিও তিনি জানিয়ে দিয়েছিলেন৷ ২২০০ শব্দের গল্পের প্রতিটা মুহূর্ত তিনি আধপাতা ইলাস্ট্রেশনে তুলে ধরেছিলেন৷ তাঁর কাছেই শুনেছিলাম– প্রচ্ছদ কখনো বই না পড়ে করা যাবে না, বই পড়তে হবে৷


এখন লেখকরা যখন জানুয়ারির ২০ তারিখে পাণ্ডুলিপি দেন, প্রকাশকের প্রুফরিডার ২ ঘণ্টায় বই পড়ে এডিটের দায়িত্ব শেষ করেন, তখন শিল্পীকে বই প্রকাশের আগেই প্রচ্ছদ তৈরি করে ফেলতে হয়৷ আর এর ফলাফল– শিল্পমানহীন বইয়ের প্রচ্ছদ, কিংবা বইয়ের সঙ্গে সম্পর্কহীন প্রচ্ছদ৷


অনেক শিল্পী দাবি করেন, লেখক ও প্রকাশকদের নানা আবদার প্রচ্ছদের মান নষ্টের জন্য দায়ী৷ বইয়ের প্রচ্ছদকে সমৃদ্ধ করতে সবাই চান৷ কারণ, এতে শিল্পীর নামযুক্ত থাকে৷ কিন্তু হালের দৌরাত্ম্য পাড়ি দিয়ে শিল্পমান রক্ষা আর হয় না৷ লেখক-প্রকাশক এবং শিল্পীরা সবাই যদি বইমেলার আগ মুহূর্তের দৌঁড় বন্ধ করে বছরজুড়ে কাজটি করেন, তবে মনে হয় প্রচ্ছদশিল্প সেই কাইয়ুম চৌধুরী, সমর মজুমদারদের দাঁড় করানো স্ট্যান্ডার্ডে ফিরবে৷


তবে আশার কথা এই যে, এত অভিযোগের মধ্যে সব্যসাচী হাজরা, মাসুক হেলাল, তৌহিন হাসান, মোস্তাফিজ কারিগর, চারুপিন্টু, সব্যসাচী মিস্ত্রিসহ আরো অনেক প্রচ্ছদশিল্পীর প্রচ্ছদ দেখে থমকে যেতে হয় ভালো লাগায়৷ এরা নাম উল্লেখ করার মতো ভালো কাজ করছেন বলেই দাবি করেন শিল্পবোদ্ধারা৷


ভালো প্রচ্ছদ প্রসঙ্গে শিল্পীরা দাবি করেন, বই পড়ে, সময় নিয়ে ভেবে-চিন্তে প্রচ্ছদ করার সুযোগ থাকলে সেটি ভালো হবে নিশ্চিত৷ নতুবা ফোনে লেখকের সঙ্গে কথা বলে আগাম বা তড়িৎ প্রচ্ছদের মান খারাপ হবেই৷


তবে একজন প্রচ্ছদপ্রেমী হিসেবে ব্যক্তিগত চাওয়া এই যে, সব প্রচ্ছদ শিল্পীর মলাট ‘শিল্প' হয়ে উঠুক৷ ছবি বা কারুশিল্পের মতো প্রদর্শিত হোক দেয়ালে দেয়ালে৷ সূত্র : ডয়চে ভেলে


ফাতেমা আবেদীন নাজলার ব্লগ থেকে


বিবার্তা/মৌসুমী


সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

ময়মনসিংহ রোড, শাহবাগ, ঢাকা-১০০০

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2016 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com