'জন্মপাপ' উপন্যাসের কারিগরের জীবনের গল্প হার মানাবে ট্র‍্যাজেডিকেও!
প্রকাশ : ২৭ জুলাই ২০২২, ১৪:১৬
'জন্মপাপ' উপন্যাসের কারিগরের জীবনের গল্প হার মানাবে ট্র‍্যাজেডিকেও!
মহিউদ্দিন রাসেল
প্রিন্ট অ-অ+

জন্মের পরে মাত্র এক বছরের মধ্যেই বাবাকে হারান। সৌভাগ্য হয়নি বাবা বলে ডাক দেওয়ার। এরপরে একমাত্র অবলম্বন মাকে নিয়ে পাড়ি দিয়ে চলেছেন কষ্টের অথৈই সাগর। ছেলেবেলায় থেকেছেন ১৭ টা বাড়িতে পেটে ভাতে। এর মধ্যে মাকে নিয়েও পেটে ভাতে থেকেছেন বিভিন্ন বাড়িতে। এর মধ্য দিয়েও চালিয়ে গেছেন পড়াশোনা। সব জায়গায় মেধার প্রমাণ রেখে ভর্তি হয়েছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে।


একটানা ১৮ বছর করেছেন টিউশনি। আর এর টাকা দিয়ে নিজের খরচ চালিয়ে বাকিটা পাঠিয়ে দিতেন গ্রামের অসহায় মায়ের জন্য। প্রচণ্ড দারিদ্র্যের মাঝেও কাউকে বুঝতে দিতেন না তার কষ্ট। টাকা থাকলে খেতেন, না থাকলে জল খেয়ে পেট ভরাতেন, তবুও কারো কাছে হাত পাততেন না কিংবা হলের ক্যান্টিনে বাকি খেতেন না।


বলছি, বর্তমান সময়ের আলোচিত উপন্যাস জন্মপাপের লেখক ডাবলু লস্কার এর জীবনের অজানা কথা। তার উপন্যাসের নায়ক ফটিকের জীবনের মতো এ যেন আরেক ট্র‍্যাজেডি তার জীবনে। এ যেন গল্পের পিছনে আরেক গল্প। যে গল্প সংগ্রামের, যে গল্প অদম্যতার।


ডাবলু লস্কর ঝিনাইদহ জেলার সদরথানার ঝিথোড় গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। এরপর মাত্র এক বছরের মাথায় পিতা ভূপেন্দ্রনাথ লস্করকে হারান। পরে একমাত্র অবলম্বন মাকে নিয়ে পাড়ি দিয়েছেন দারিদ্রের সাগর।


পিতৃহীন ডাবলুকে নিয়ে মা সুন্দরী রানী লস্কর পার্শ্ববর্তী বেঙ্গা-বেরুইল গ্রামে বাবার বাড়ি চলে যান। সেখানে দুই বছর থাকার পর আবারও স্বামীর গ্রামে ফিরে এক বাড়িতে গৃহকর্মীর কাজ নেন। ডাবলুকেও ওই বাড়িতে রাখাল হিসেবে রাখেন। রাখালির ফাঁকে ফাঁকে গৃহকর্তার কাছ থেকে সময় চেয়ে নিয়ে ডাবলু পড়ালেখা চালাতে থাকেন। তখন থেকেই কখনো রাখাল, কখনো কামলা হিসেবে পরের বাড়িতে থেকে পড়ালেখা চালিয়ে গেছেন ডাবলু।


এভাবে পঞ্চম শ্রেণী পর্যন্ত পড়ার পর একপর্যায়ে তার স্কুলে যাওয়াও বন্ধ হয়। তবে স্কুলের শিক্ষকেরা ডাবলুর মেধার পরিচয় পেয়ে তাকে বৃত্তি পরীক্ষা দেওয়ার ব্যবস্থা করে দেন। ওদিকে ডাবলু যখন পড়ালেখা ছেড়ে মনিবের বাড়িতে পুরোপুরি কামলার কাজে নেমে গেছেন, তখন বৃত্তি পরীক্ষার ফল বেরোয় এবং তিনি ট্যালেন্টপুলে বৃত্তি পান।


খবর শুনে পার্শ্ববর্তী টিকারী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক নিত্য গোপাল শিকদার ছুটে আসেন। তিনি ডাবলুর পড়ালেখার জন্য গৃহস্বামী বীরেন্দ্রনাথের কাছ থেকে কিছুটা সময় চেয়ে একরকম জোর করেই স্কুলে ভর্তি করিয়ে দেন। ওই বাড়ি থেকে ডাবলু এভাবে অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত পড়েন। এরপর চলে আসেন শিক্ষক সূর্যকান্ত বিশ্বাসের বাড়িতে। সেখানে থেকে ওই বাড়ির কাজকর্ম সেরে বাকি সময় পড়ালেখা করে ডাবলু এসএসসিতে বিজ্ঞান বিভাগ থেকে জিপিএ-৪.৮১ পান। এবার অদম্য এই মেধাবীর ঠাঁই মেলে প্রতিবেশী দাদা সমীরণ লস্করের বাড়িতে।


সেখানে মাঠে গরু-ছাগল দেখাশুনার পাশাপাশি নারিকেল বাড়ীয়া কলেজে ভর্তি হয়ে পড়ালেখা শুরু করেন এবং এইচএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ অর্জন করেন। পরবর্তীতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিত বিভাগে ভর্তির সুযোগ পান। কিন্তু স্কুল-কলেজের মতো এখানেও সংগ্রাম তার পিছু ছাড়েনি। প্রতিদিন ক্লাস শেষে ছুটতে হতো টিউশনিতে। টিউশনি থেকে ফিরতে ফিরতে অনেক রাত হয়ে যেতো। এ ছিল তার নিত্যদিনের রুটিন। তবুও হাল ছাড়েননি। দেশসেরা এই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বি, এস, সি (অনার্স) এবং এম. এস. সি (অনার্স) পাশ করেন কৃতিত্বের সাথে। দেশের শীর্ষস্থানীয় জাতীয় দৈনিকে তার লেখা প্রকাশিত হয়েছে বিভিন্ন সময়ে। বর্তমানে একটি চাকরি করছেন তিনি। পাশাপাশি সাহিত্যচর্চায় নিয়োজিত আছেন। তবে স্বপ্ন দেখছেন, আরো ভালো কিছু করার। সেজন্য চেষ্টাও অব্যাহত রেখেছেন অদম্য এই মেধাবী।



নিজের সংগ্রামী জীবনের কথা জানিয়ে ডাবলু লস্কর বলেন, যে বয়সে বাচ্চারা মা-বাবার কাছ থেকে আদর-ভালোবাসা পায়, সেই বয়সে আমি তার কিছুই পাইনি। আমার ভাগ্যে জুটেছে শুধু গালাগাল ও চোখরাঙানি। পরের বাড়িতে গরু রাখতে রাখতে আমার নাম হয়েছিল রাখাল ডাবলু।



তিনি বলেন, স্কুলের টিফিনে সবাই যখন খাবার খেত, আমি তখন পেটভরে পানি খেতাম। মায়ের কাছে কখনো দু-একটা টাকা চাইতে পারিনি। কারণ আমি জানতাম, আমি আর মা দুজনই পেটে-ভাতে অন্যের বাড়িতে থাকি। একটা জামা, একটা প্যান্ট আর একটা লুঙ্গি ছিল আমার। স্কুল থেকে শিক্ষাভ্রমণে গেলে আমি যেতে পারিনি। কারণ ৪০-৫০ টাকার মূল্য আমার
কাছে ছিল অনেক বেশি। মাঝেমধ্যে লোকজন বলত, 'পড়াশোনা করে তোর কী হবে, তোর মতো গরিবদের জন্য পড়াশোনা নয়। তাদের কথা শুনে খুব কষ্ট লাগত। তার পরও চালিয়ে গেলাম।


বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের এক ঘটনার স্মৃতিচারণ করে ডাবলু বলেন, একবার মাসের ২৫ তারিখে আমার কাছে কোনো টাকা ছিল না। এদিকে টিউশনির বেতন পাবেন ৩০ তারিখে। ফলে কীভাবে চলবে তার বাকি ৫ দিন? খুব চিন্তায় পড়লেন এবং অসুস্থও হয়ে গেলেন। ফলে সেদিন রাতেই অসুস্থতার জন্য তাকে ভর্তি হতে হলো ঢাকা মেডিকেলে। পরের দিন ডাক্তার ছাড়পত্র দিতে চাইলে অনেক অনুরোধ করে ঢাকা মেডিকেলে থেকে গেলেন আরও ৫ দিন। এ সময় মেডিকেলের ফ্লোরে ঘুমিয়েছেন, তিনবেলা খেয়েছেন আর সেখান থেকেই টিউশনি এবং ক্লাস করেছেন।


এ রকম হাজারো কষ্টের মাঝে বেড়ে ওঠা ডাবলু লস্কার লিখেছেন জন্মপাপ নামের একটি ট্র‍্যাজেডি উপন্যাস। উপন্যাসে 'ফটিক' নামের এক বালকের অবর্ণনীয় কষ্টের কথা তুলে ধরেছেন তিনি। ফটিককে তার মা ফেলে যায় টান বাজার নামক এক জায়গায়। পরবর্তীতে পিতৃ- মাতৃ পরিচয়হীন ফটিকের জীবন কাটে বিভিন্ন জায়গায়। মাত্র তিরিশ বছর বয়সেই শেষ হয়ে যায় তার জীবন। জীবনের অন্তিম পর্যায়ে এসে তার হারানো মায়ের দেখা পেলেও পরিচয় জেনে যেতে পারিনি সে। একবুক কষ্ট নিয়ে পাড়ি দিয়েছে অনন্ত অসীমের পথে।


উপন্যাসের চরিত্র ফটিক রাখার বিষয়ে ডাবলু বলেন, বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ট্র্যাজেডিমূলক ছোটগল্প ‘ছুটি’র একটি চরিত্র ছিল ফটিক। এই ফটিক চরিত্রটির প্রতি জন্মেছিল আমার অগাধ মমতা আর ভালোবাসা। সেই ভালোবাসা থেকেই আমার ট্র্যাজেডিমূলক উপন্যাসের মূল চরিত্রটির নাম দিয়েছি ফটিক।



ফটিক জন্মেছিল ভুল সময়ে, ভুল জায়গায় ভুল মানুষের গর্ভে। এটাই ছিল ফটিকের পাপ। জন্মপাপ। লোভ, লালসা,মোহ আর আবেগের কাছে ধ্বংস হয়েছিল ফটিকের জীবন। অনাদর,অবহেলা আর না পাওয়ার যন্ত্রণা নিয়ে সে ছুটে বেড়িয়েছিল সারাক্ষণ। খুঁজে ফিরেছে নিজের পরিচয়। পিতৃ-মাতৃপরিচয়হীন ফটিক কোনো দিন পেট ভরে খেতে পর্যন্ত পারেনি। লাল কষ্ট, নীল কষ্ট হাজার রকমের কষ্ট গ্রাস করেছে ভাগ্যবিড়ম্বিত ফটিককে প্রতিনিয়ত।



উপন্যাস জীবনের কথা বলে, কথা বলে যাপিত সময়ের। ঔপন্যাসিক ডাবলু লস্কার তার জন্মপাপ নামের উপন্যাস গ্রন্থে সময়ের সাথে বয়ে চলা ফটিক নামের এক দুখী এবং তার চারপাশের মানুষের জীবন ও সংগ্রামের মাঝে বেঁচে থাকা, তার মান-অভিমান, তার ভালো লাগা এবং ভালোবাসার কথাগুলো নিপুণভাবে তুলে ধরেছেন।


আজীবন সংগ্রাম করে বড় হওয়া অদম্য মেধাবী এই লেখক নিজের ভবিষ্যত পরিকল্পনা সম্পর্কে বলেন, আমি বর্তমানে বাংলাদেশের সুনামধন্য মেডিসিন প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান রেডিয়েন্ট ফার্মাসিউটিক্যালসের এর কর্মাসিয়াল ডিপার্টমেন্টে কর্মকর্তা হিসেবে কর্মরত আছি। আর আমার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা হলো চাকরির পাশাপাশি নিজেকে সাহিত্য কর্মে নিয়োজিত রাখা এবং বাংলা সাহিত্যে আরও নতুন কিছু যোগ করা।


সংগ্রামী এই যুবক কাউকে স্মরণ করতে চান কি না এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ঝিনাইদহ পৌরসভার সাবেক মেয়র এবং জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সাইদুল করিম মিন্টু আমাকে বিভিন্ন ভাবে সহযোগিতা করেছেন। আমি তাকে কৃতজ্ঞচিত্তে স্মরণ করি।


বিবার্তা/রাসেল/এসবি

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

পদ্মা লাইফ টাওয়ার (লেভেল -১১)

১১৫, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ,

বাংলামোটর, ঢাকা- ১০০০

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2021 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com