আপন আলোয় উদ্ভাসিত (পর্ব ১)
সাবাশ বাংলাদেশ, এ পৃথিবী অবাক তাকিয়ে রয়...
প্রকাশ : ২৫ জুন ২০২২, ০২:০৬
সাবাশ বাংলাদেশ, এ পৃথিবী অবাক তাকিয়ে রয়...
সামিনা বিপাশা
প্রিন্ট অ-অ+

"হিমালয় থেকে সুন্দরবন, হঠাৎ বাংলাদেশ


কেঁপে কেঁপে ওঠে পদ্মার উচ্ছাসে,


সে কোলাহলের রুদ্ধস্বরের আমি পাই উদ্দেশ


জলে ও মাটিতে ভাঙ্গনের বেগ আসে।


সাবাশ বাংলাদেশ, এ পৃথিবী


অবাক তাকিয়ে রয়,


জ্বলে-পুড়ে-মরে ছারখার


তবু মাথা নোয়াবার নয়!"


— সুকান্ত ভট্টাচার্য


তারুণ্যের কবি সুকান্ত পদ্মার উচ্ছাসের প্রসঙ্গ টেনে বাংলাদেশের সাহস, শক্তি-সামর্থ্য, অর্জন, কৃতিত্বের কথা বলে গেছেন সেই কবেই। বাংলাদেশ— এর মাটি ও মানুষের নির্ভীক প্রতিচ্ছবি যুগে যুগে পৃথিবী দেখেছে। এবার আবারও নতুন করে বাংলাদেশকে দেখছে বিশ্ব। কারণ, আজ স্বপ্নের পদ্মা সেতুর উদ্বোধন। প্রমত্তা পদ্মার বুকে নিজস্ব অর্থায়নে নির্মাণ হয়েছে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় স্থাপনা পদ্মা সেতু।


পানিপ্রবাহে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম নদী পদ্মা। সেই প্রমত্তা পদ্মার ওপর নির্মিত পদ্মা বহুমুখী সেতু। রাজধানী ঢাকা থেকে প্রায় ৪০ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে এর অবস্থান। সেতুর উত্তর প্রান্তে মুন্সীগঞ্জের মাওয়া এবং দক্ষিণ প্রান্তে জাজিরা, শরীয়তপুর, শিবচর ও মাদারীপুর।
সেতুটির দৈর্ঘ্য ৬.১৫ কিলোমিটার। দ্বিতল এই সেতুতে একই সঙ্গে ট্রেন ও গাড়ি চলাচলের ব্যবস্থা রয়েছে। চার লেন বিশিষ্ট ৭২ ফুট প্রস্থের এ সেতুর নিচতলায় রয়েছে রেল লাইন। এর মাধ্যমে দক্ষিণাঞ্চলের সঙ্গে সারা দেশের রেল যোগাযোগ স্থাপিত হবে। পদ্মা সেতু নির্মাণে মোট ব্যয় হয়েছে ৩০ হাজার ১৯৩ কোটি ৩৮ লাখ ৭৬ হাজার টাকা। ২০১৫ সালের ১২ ডিসেম্বর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মূল সেতুর পাইলিং ও নদীশাসনের কাজ উদ্বোধন করেন। এরপর পদ্মার বুকে ৪২টি পিলারের ওপর ৪১টি স্পেনে দৃশ্যমান হয়েছে স্বপ্নের সেতু। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ সেতু চালু হলে বাংলাদেশের জিডিপি ১.২ থেকে ১.৫ শতাংশ বৃদ্ধি পাবে। আজ ২৫ জুন বহুল কাঙ্ক্ষিত পদ্মা সেতুর উদ্বোধন করবেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কন্যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা।



জন্মকথা: আলোর পথে প্রথম পদক্ষেপ


১৯৯৮-১৯৯৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সর্বপ্রথম পদ্মা সেতু নির্মাণের প্রাক সম্ভাব্যতা যাচাই করা হয়। ১৯৯৮ থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত প্রাক-সম্ভাব্যতা যাচাই করা হয়। এরপর ২০০১ সালে জাপানিদের সহায়তায় সম্ভাব্যতা যাচাই হয়। ২০০১ সালের ৪ জুলাই মাওয়া প্রান্তে পদ্মা সেতুর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।


২০০৪ সালের জুলাইয়ে জাইকার সুপারিশ মেনে মাওয়া-জাজিরা প্রান্তে পদ্মা সেতু নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। ২০০৮ সালে পদ্মা সেতুর নকশা প্রণয়নে পরামর্শক প্রতিষ্ঠান চূড়ান্ত হয়। ক্ষমতাগ্রহণের ১৩ দিনের মাথায় ২০০৯ সালের ১৯ জানুয়ারি সেতুর নকশা প্রণয়নে পরামর্শক নিয়োগ প্রস্তাব অনুমোদন এবং ফেব্রুয়ারি মাসে পদ্মা সেতুর জন্য নকশা প্রণয়নে পরামর্শক নিয়োগ দেয় আওয়ামী লীগ সরকার। ২০১০ সালে পরামর্শক সেতুর প্রাথমিক নকশা সম্পন্ন করে। ৬ দশমিক ১৫ কিলোমিটার সেতু নির্মাণের চূড়ান্ত নকশা করা হয়।


২০০৭ সালে ১০ হাজার ১৬১ কোটি ৭৫ লাখ টাকা ব্যয়ে পদ্মা বহুমুখী সেতু প্রকল্প একনেক-এ অনুমোদন পায়। পরে নকশা পরিবর্তন হয়ে দৈর্ঘ্য বেড়ে যাওয়ায় নির্মাণ ব্যয়ও বাড়ে। ২০১১ সালে ২০ হাজার ৫০৭ কোটি ২০ লাখ টাকার সংশোধিত প্রকল্প একনেক-এ অনুমোদিত পায়। একই বছরের ২৪ ফেব্রুয়ারি বিশ্বব্যাংক পদ্মা সেতু প্রকল্পে ১২০ কোটি মার্কিন ডলারের ঋণসহায়তার অনুমোদন দেয়। ২৮ এপ্রিল বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে বাংলাদেশ সরকারের ঋণচুক্তি হয়। একই প্রকল্পে ২০১১ সালের ১৮ ও ২৪ মে যথাক্রমে জাইকা ও আইডিবির সঙ্গে এবং ৬ জুন এডিবির সঙ্গে বাংলাদেশ সরকারের ঋণচুক্তি স্বাক্ষর হয়। ২০১৬ সালে আবারও আট হাজার ২৮৬ কোটি টাকা ব্যয় বাড়ালে মোট ব্যয় দাঁড়ায় ২৮ হাজার ৭৯৩ কোটি ৩৯ লাখ টাকা। সবশেষ প্রকল্পের মোট ব্যয় ৩০ হাজার ১৯৩ কোটি ৩৮ লাখ ৭৬ হাজার টাকায় দাঁড়িয়েছে।



স্বপ্নে ছেদ: বিশ্বব্যাংকের ঋণচুক্তি বাতিল


পদ্মা সেতু নির্মাণে ১২০ কোটি ডলারের ঋণ অঙ্গীকার করেছিল বিশ্বব্যাংক। কিন্ত দুর্নীতির অভিযোগ তুলে এই অঙ্গীকার থেকে সংস্থাটি সরে যায়। এ ধরনের কাজের শর্ত অনুযায়ী মূল ঋণদাতা চলে গেলে চলে যায় অন্যরাও। কাজেই একে একে এডিবি, জাইকা ও আইডিবিও চলে যায়।


২০১০ সালের সেপ্টেম্বরে সেতুর প্রাথমিক নকশা সম্পন্ন হওয়ার পর দেশবাসীর স্বপ্ন যখন কুঁড়ি হয়ে কেবল মেলতে শুরু করেছে, ঠিক তখনই অর্থায়নের অনিশ্চয়তা। ঠিক সেই সংকটময় মুহূর্তে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণের যুগান্তকারী ও বলিষ্ঠ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। শুরু হয়ে যায় পদ্মা সেতু নির্মাণের বিশাল প্রকল্পমালা। সেতু বিভাগের সার্বিক তত্ত্বাবধানে শুরু হয় পদ্মা সেতু নির্মাণ ও আনুষঙ্গিক কার্যাবলি।


পদ্মা সেতু: এ যেন এক মহাযজ্ঞ


পদ্মার মাওয়া থেকে জাজিরা প্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে ৪২ পিলার তার ওপরে বসেছে ৪১ ইস্পাতের স্প্যান। এভাবেই পদ্মার বুকে মাথা তুলে দাঁড়াল ৬.১৫ কিলোমিটারের স্বপ্নের বহুমুখী পদ্মা সেতু। দুই প্রান্তের উড়ালপথ ৩ দশমিক ৬৮ কিলোমিটার। সব মিলিয়ে সেতুর দৈর্ঘ্য ৯ দশমিক ৮৩ কিলোমিটার।


সেতু বিভাগের সূত্র মতে, পদ্মায় সেতু নির্মাণে ১৩টি চ্যালেঞ্জ ছিল। তাদের মতে সবচেয়ে বড় চাপ ছিল, অর্থায়ন ও বৈদেশিক মুদ্রার জোগান। নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণের কারণে বৈদেশিক মুদ্রার সরবরাহ ঠিক রাখা ছিল বিশাল চাপ। এ কারণেই মনে করা হয়েছিল নিজের টাকায় সেতু নির্মাণ সম্ভব নয়।


এছাড়াও, নকশা সংশোধন ও নদীশাসনের বিলম্বের কারণে পদ্মা সেতু প্রকল্পের কাজ পিছিয়েছিল। স্প্যানের অংশগুলো চীন থেকে বাংলাদেশে আনার পর মুন্সীগঞ্জের মাওয়া কনস্ট্রাকশন ইয়ার্ডে স্প্যানের অংশগুলোকে জোড়া লাগিয়ে স্প্যানের অবয়ব তৈরি করা হয়। স্প্যানগুলো বহন করে পৃথিবীর সবচয়ে বড় ভাসমান ক্রেন তিয়ানই। পুরো প্রক্রিয়াটি ছিল একটা মহাযজ্ঞ।



পদ্মা সেতু: আপন আলোয় উদ্ভাসিত


দ্বিতল পদ্মা সেতু౼ তৈরিতে অনেক বাধাবিপত্তি ও চ্যালেঞ্জ পেরুতে হয়েছে। যেসব কারণে পদ্মা সেতু পৃথিবীর অন্য সেতুর তুলনায় বিশেষ, অতুলনীয় ও সেরা। আবার পদ্মা সেতু সংশিষ্ট বিষয়গুলোও অনন্য। পদ্মা সেতু আপন আলোয় উদ্ভাস্তিত কেন জেনে নেয়া যাক সেই কারণগুলো౼


★ বিশ্বের সবচেয়ে বড় পেন্ডুলাম বিয়ারিং ব্যবহার


পদ্মা সেতুতে ‘ফ্রিকশন পেন্ডুলাম বিয়ারিং’-এর সক্ষমতা ১০ হাজার টন। এখন পর্যন্ত কোনো সেতুতে এমন সক্ষমতার বিয়ারিং লাগানো হয়নি। রিখটার স্কেল ৯ মাত্রার ভূমিকম্পে টিকে থাকার মতো করে পদ্মা সেতু নির্মাণ করা হয়েছে।


ভূমিকম্প, মাটির ক্ষয়সহ সব ঘাত-প্রতিঘাত মোকাবিলা করে টিকে থাকতে সক্ষম এই সেতু। আর সেই সক্ষমতা গড়ে তোলার উপযোগী করেই নির্মাণ করা হয়েছে পদ্মা সেতুর অবকাঠামো।


এ ছাড়া পিলার এবং স্প্যানের মধ্যে ১০ হাজার ৫০০ মেট্রিক টন ওজনের বিয়ারিং ব্যবহার করা হয়েছে। পৃথিবীতে এর আগে কোনো সেতুতে এমন বড় বিয়ারিং ব্যবহার করা হয়নি। ফলে এই ফ্রিকশন পেন্ডুলাম বিয়ারিং পদ্মা সেতুকে অন্য সেতুর তুলনায় অসাধারণ করে তুলেছে।


★ পাইলের গভীরতায় রেকর্ড


পৃথিবীর অন্যতম খরস্রোতা পদ্মার মাটির ১২০-১২৭ মিটার গভীরে গিয়ে বসানো হয়েছে সেতুর পাইল। এর আগে পৃথিবীর অন্য কোনো সেতুর জন্য এত গভীরে গিয়ে পাইল বসাতে হয়নি, যা বিশ্ব রেকর্ড।


মূল সেতুতে পাইল রয়েছে ২৬৪টি। নদীর ভেতরে ও দুই প্রান্তে সেতুর ৪০টি পিলারের নিচে পাইপের মতো দেখতে পাইলগুলো বসানো হয়েছে। নদীর পাইলগুলো ভেতরে ফাঁকা, ইস্পাতের তৈরি। প্রতিটি পাইলের ব্যাসার্ধ তিন মিটার। পুরুত্ব ৬২ মিলিমিটার। একেকটি পিলারের নিচে ছয় থেকে সাতটি পাইল বসানো হয়েছে। এই পাইল নদীর তলদেশের মাটি থেকে সর্বোচ্চ ১২৫ দশমিক ৪৬ মিটার (প্রায় ৪১২ ফুট) গভীরে বসানো হয়েছে।


★ সেতু নির্মাণে সবচেয়ে বড় ক্রেন ব্যবহার


সেতু নির্মাণে বিশ্বের সবচেয়ে বড় ক্রেন ব্যবহার করে রেকর্ড সৃষ্টি করেছে পদ্মা সেতু। পিলারের ওপর স্প্যান বসাতে যে ক্রেনটি ব্যবহৃত হয়েছে সেটি আনা হয়েছে চীন থেকে। ‘তিয়ান ই’ নামের ক্রেনটি ব্যবহৃত হয়েছে। এটি বিশ্বের সর্ববৃহৎ ভাসমান ক্রেনবাহী জাহাজ।


২০১৭ সালে বাংলাদেশে আসে ‘তিয়ান ই’। এই ক্রেন দিয়ে ৩ বছর ৯ মাসে ৪১টি স্প্যান বসানো হয়েছে ৪২টি পিলারের ওপর। প্রতি মাসে এর ভাড়া বাবদ গুনতে হয়েছে ৩০ লাখ টাকা। সাড়ে তিন বছরে মোট খরচ হয়েছে ১২ কোটি ৬০ লাখ টাকা। বিশ্বে প্রথম কোনো সেতু তৈরিতে এত দীর্ঘদিন ক্রেনটি ভাড়ায় থেকেছে। এই ক্রেনটির দাম ২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা।


★ পদ্মা সেতুতে পদ্মা নদী নিজেই চ্যালেঞ্জ


নিজস্ব অর্থায়নে সেতু নির্মাণের দুঃসাহসিক চ্যালেঞ্জ বাংলাদেশ নিলেও বড় বাধা ছিল পদ্মা নদী নিজেই। পদ্মাকে বশ মানিয়ে সেতু বানাতে প্রায় সাত বছর লেগেছে। কখনও তীব্র স্রোত, কখনও ভাঙনের মতো খামখেয়ালিপনা বারবার বাধা হয়ে দাঁড়ায়। এককভাবে এত বড় প্রকল্প নির্মাণের অভিজ্ঞতাই ছিল না বাংলাদেশের প্রকৌশলীদের। বিশ্বব্যাংক সরে যাওয়ার পর মালয়েশিয়ার বিনিয়োগকারীরা আগ্রহ দেখিয়েছিল পদ্মা সেতু নির্মাণে। কিন্তু পদ্মার উত্তাল রূপ দেখে এখানে সেতু নির্মাণ অসম্ভব মত দিয়ে চলে যায় তারা। বাংলাদেশের বিশেষজ্ঞরাও আশঙ্কা করেছিলেন, পদ্মা সেতু হবে না। কিন্তু বিদেশি পরামর্শকদের সঙ্গে মিলে বাংলাদেশের প্রকৌশলীরা সেই চ্যালেঞ্জ নিয়েছেন।


★ প্রচণ্ড আঘাত সহ্য করার সক্ষমতা


পদ্মা সেতুর পিলারগুলোর নিচে অনেক গভীর পাইলিং করা হয়েছে। তা করতে গিয়েও নতুন নতুন সমস্যা ইঞ্জিনিয়ারদের মোকাবিলা করতে হয়েছে। সেতুর ওপর দিয়ে চলাচলকারী রেলগাড়ি বা যানবাহনের ওজন, সেসবের গতির প্রতিক্রিয়া কিংবা সেতুর নিজের ওজনই শুধু হিসাব কষতে হয়নি, মানে শুধু ভার্টিক্যাল লোড, স্থির ওজন, চলন্ত ওজন, তারই হিসাব রাখতে হয়নি, অবশ্যই পানির লোড, বাতাসের ধাক্কাও হিসাবে রাখতে হয়েছে, সবচেয়ে বড় কথা, ভূমিকম্পের কথাও মাথায় রাখতে হয়েছে। আবার দুর্ঘটনাবশত কোনো জাহাজ এসে পিলারে ধাক্কা দিলেও যাতে সেতুর ক্ষতি না হয়, তা–ও হিসাবে আছে। ভূমিকম্পের আঘাতকে ইঞ্জিনিয়াররা বলেন হরাইজন্টাল লোড বা অনুভূমিক ওজন। সেটা সামলানোর জন্য বিয়ারিং বসানো হয়েছে পিলারে।


★ কংক্রিট ও স্টিলের ব্যবহার


পদ্মা সেতু নির্মাণে কংক্রিট এবং স্টিল উভয়ই ব্যবহার করা হয়েছে। বিশ্বে আর কোনো সেতু নির্মাণে কংক্রিট এবং স্টিল একসঙ্গে ব্যবহার করা হয়নি। অর্থাৎ, সেতুগুলো হয় কংক্রিটে নির্মিত, না হয় স্টিলের। পদ্মা নদীর গতিপ্রকৃতি ও বাংলাদেশের ভূতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য বিবেচনায় এখানে সেতু নির্মাণ অনেক বেশি চ্যালেঞ্জিং ছিল।


★ বিশ্বের সবচেয়ে চ্যালেঞ্জিং নদীশাসন ব্যবস্থা


পদ্মা সেতুর অন্য রেকর্ডটি হলো নদীশাসন সংক্রান্ত। ১৪ কিলোমিটার (১.৬ কিলোমিটার মাওয়া প্রান্তে ও ১২.৪ কিলোমিটার জাজিরা প্রান্তে) এলাকা নদীশাসনের আওতায় আনা হয়েছে। এই নদীশাসনে খরচ হয়েছে ৯ হাজার ৪০০ কোটি টাকারও বেশি।


পদ্মা সেতু প্রকল্প তিন জেলায় বিস্তৃত। মুন্সীগঞ্জের মাওয়া, শরীয়তপুরের জাজিরা এবং মাদারীপুরের শিবচর। ভাঙনসহ নানা কারণে পদ্মা সেতু যাতে করে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সে জন্যই নদীশাসন করা হচ্ছে। ৮ হাজার ৭০৭ কোটি ৮১ লাখ টাকা ব্যয়ে সিনোহাইড্রো করপোরেশন লিমিটেড চায়না এটি বাস্তবায়ন করেছে।ভূমি অধিগ্রহণের পরিমাণ ২ হাজার ৬৯৩ দশমিক ২১ হেক্টর।


★ দেশীয় রড, সিমেন্ট ও বালু ব্যবহার


দেশের সবচেয়ে বড় প্রকল্প পদ্মা সেতুতে রড, সিমেন্ট ও বালু ব্যবহৃত হয়েছে বাংলাদেশের। বিশাল এ প্রকল্পে পণ্য সরবরাহ করতে পেরে নিজেদের সক্ষমতার পরিচয় দিয়েছে দেশের রড ও সিমেন্ট উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো। তারা বলছে, এসব পণ্য সরবরাহের মাধ্যমে একটি বড় ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে থাকবে দেশীয় নির্মাণসামগ্রী উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো।


সাধারণত সেতু স্টিল অথবা কংক্রিটের হয়। কিন্তু পদ্মা সেতু হয়েছে স্টিল ও কংক্রিটের মিশ্রণে। সেতুর মূল কাঠামো বা স্প্যান স্টিলের। সেতু বিভাগের হিসাব অনুযায়ী, সেতুতে রড লেগেছে ৯২ হাজার টনের বেশি।


পদ্মা সেতুর পুরো অবকাঠামোতে ছয় লাখ ৮৫ হাজার ৮১৯ টন সিমেন্ট ব্যবহার করা হয়েছে। এর মধ্যে মূল সেতুতে লেগেছে দুই লাখ ৫২ হাজার ৫৯৬ টন।


★ নদীশাসনে ব্যবহৃত বালু সম্পর্কে আশ্চর্যজনক তথ্য


পদ্মা সেতুর নদীশাসনে প্রায় ২ কোটি ১৭ লাখ জিও ব্যাগ ব্যবহার হয়েছে। এর কোনো কোনোটির ওজন ৮০০ কেজি। কিছু আবার ১২৫ কেজির। এসব জিও ব্যাগে বালু ভরে নদীর তলদেশে ফেলা হয়েছে। নদীতে পাথর ফেলা হয়েছে প্রায় সোয়া ১০ লাখ ঘনমিটার। এই পরিমাণ পাথরকে ১৩ হাজার বর্গফুট জুড়ে স্তূপ করে রাখলে দেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ পর্বত কেওক্রাডংয়ের থেকেও উঁচু দেখাবে।


পদ্মায় মূল সেতু, নদীশাসন ও সংযোগ সড়কের নির্মাণকাজে মোট বালু ব্যবহার করা হয়েছে প্রায় ৬৫ লাখ ঘনমিটার, যা দিয়ে ১৯ কোটি ১২ লাখ ৮৭ হাজার বর্গফুট আয়তনের ভবন তৈরি করা যাবে। এই আয়তন প্রায় ৫৭টি বুর্জ খলিফার সমান। বিশ্বের অন্যতম উঁচু ভবন দুবাইয়ের বুর্জ খলিফার সব তলা মিলিয়ে আয়তন ৩৩ লাখ ৩১ হাজার বর্গফুট। পদ্মা সেতুতে ব্যবহৃত বালুর সবই দেশীয়।


★ রডের অবিস্মরণীয় ব্যবহার


মূল সেতু ও সংযোগ সড়ক নির্মাণে রডের ব্যবহার হয়েছে ১ লাখ ৮ হাজার টন। এসব রডের সবই দেশীয়। এক টন করে এই রড যদি লম্বালম্বি রাখা হয়, তাহলে পদ্মা সেতুতে ব্যবহৃত রডের মোট দৈর্ঘ্য দাঁড়াবে ১ হাজার ২৯৬ কিলোমিটার। দেশের সর্ব উত্তরের স্থান তেঁতুলিয়া থেকে দক্ষিণের আরেক প্রান্ত টেকনাফের দূরত্ব ৯৩১ কিলোমিটার। অর্থাৎ পদ্মা সেতুতে ব্যবহৃত রডের দৈর্ঘ্য টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়ার দূরত্বের চেয়েও বেশি।


★ পদ্মা সেতু সোজা নয় বাঁকা


পদ্মা সেতু অনেক দীর্ঘ। ৬.১৫ কিলোমিটার। এত লম্বা পথ যদি সরলরেখার মতো সোজা হয়, তাহলে গাড়ির চালকেরা অনেক সময় অমনোযোগী হয়ে পড়েন। চালকদের হাত স্টিয়ারিংয়ে না–ও থাকতে পারে। একটু বাঁকা সেতুতে চালকদের হাত স্টিয়ারিংয়ের ওপরে থাকবে, মনোযোগও থাকবে গাড়ি চালানোর দিকে। ফলে দুর্ঘটনা ঘটার শঙ্কা অনেক কমে যাবে।


একটা স্থলসড়কে দুর্ঘটনা আর একটা সেতুর ওপরে দুর্ঘটনার মধ্যে পার্থক্য আছে। কোনো দুর্ঘটনাই কাম্য নয়; কিন্তু সেতুর ওপরে দুর্ঘটনা ঘটলে তা সমস্যার সৃষ্টি করবে অনেক বেশি।


আরেকটা কারণ আছে দীর্ঘ সেতু অনুভূমিকভাবে একটু বাঁকা করে তৈরি করার। তা হলো বিপরীত দিক থেকে আসা গাড়ির হেডলাইট সরাসরি চালকের চোখে পড়বে না। তাতেও দুর্ঘটনার শঙ্কা কমে যাবে।



★ পদ্মা সেতু কেন্দ্র করে জাদুঘর স্থাপন


মুন্সীগঞ্জের শ্রীনগর উপজেলার দোগাছি বাসস্ট্যান্ড এলাকায় পদ্মা সেতু সার্ভিস এরিয়া ১-এ স্থাপিত ওই সংগ্রহশালাটির নাম পদ্মা সেতু প্রাণী জাদুঘর। এটি পদ্মা সেতু প্রকল্পেরই অংশ। বাস্তবায়ন করছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগ। এই মুহূর্তে জাদুঘরটিতে জনসাধারণের প্রবেশের কোনো সুযোগ না থাকলেও ইতোমধ্যে সেখানে দুই হাজারের বেশি নমুনা সংরক্ষণ করা হয়েছে। এখানে সম্পূর্ণ বৈজ্ঞানিক উপায়ে প্রাণিদেহের নমুনা সংরক্ষণ করা হয়েছে। ফলে নমুনাগুলো দৃষ্টিনন্দন ও দীর্ঘস্থায়ীও।


★ পদ্মা সেতু উপলক্ষে স্মারক নোট


পদ্মা সেতু উদ্বোধন উপলক্ষে ১০০ টাকা মূল্যমান স্মারক নোট ছাড়ছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ২৬ জুন, রোববার থেকে নোটটি বাংলাদেশ ব্যাংকের মতিঝিল অফিস এবং পরে অন্যান্য শাখা অফিসে পাওয়া যাবে।


বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ফজলে কবির স্বাক্ষরিত ১৪৬ মিলিমিটার গুণক ৬৩ মিলিমিটার পরিমাপের এ স্মারক নোটের সম্মুখভাগের বামপাশে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতিকৃতি রয়েছে। ব্যাকগ্রাউন্ডে পদ্মা সেতুর ছবি মুদ্রিত। নোটের উপরিভাগে সামান্য ডানে নোটের শিরোনাম ‘জাতির গৌরবের প্রতীক পদ্মা সেতু’ লেখা রয়েছে।



পদ্মা সেতু বিলাসিতা না সফলতা?


গত ৯ বছরের বাজেটে প্রতিবছর পদ্মা সেতুর জন্য তিন থেকে ছয় হাজার কোটি টাকা পর্যন্ত বরাদ্দ রাখা হলেও সেই টাকায় শুধু বেতন-ভাতা ও দেশীয় বাজার থেকে কেনাকাটার ব্যয় মেটানো হয়েছে। একটি মাত্র প্রকল্পে প্রতিবছর বাজেটে এত টাকা বরাদ্দ রাখাকে অসম্ভব ও অন্যান্য উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য বাধা বলা হয়েছিল।


২৫০ কোটি টাকা ব্যয়ে বিস্তারিত নকশাসহ পদ্মা সেতু প্রকল্পের মোট খরচ ৩০ হাজার ৪৪৩ কোটি টাকা। নকশার জন্য এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের কাছ থেকে পৌনে দুই কোটি ডলার ঋণ নিয়েছে সেতু বিভাগ। সেতু নির্মাণে ২৯ হাজার ৮৯৩ কোটি টাকা ঋণ দিয়েছে অর্থ বিভাগ।


এত ব্যয়ে সেতু নির্মাণের সমালোচনা ছিল। একে বিলাসী প্রকল্পও বলা হচ্ছিল। তবে সম্ভাব্যতা যাচাই সমীক্ষা অনুযায়ী, ২০২৫ সালে প্রতিদিন ৪১ হাজার ৫৫০টি যানবাহন পদ্মা সেতু পারাপার হবে। সেতু কর্তৃপক্ষের (বিবিএ) প্রক্ষেপণ অনুযায়ী, ১৮ বছরেই যানবাহনের টোল থেকে উঠে আসবে পদ্মা সেতুর সমুদয় নির্মাণ ব্যয়। ৩৫ বছরে ১ লাখ কোটি টাকার বেশি আসবে টোল থেকে। ফলে পদ্মা সেতু একটি লাভজনক প্রকল্প দেশের জন্য।


সমীক্ষা অনুযায়ী, পদ্মা সেতুর কারণে বছরে ৬৮০ কোটি টাকা পরিবহনে সাশ্রয় হবে। দেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি বাড়বে ১ দশমিক ২৩ শতাংশ। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জিডিপির প্রবৃদ্ধি ২ দশমিক ৩ শতাংশ বৃদ্ধি করবে এ সেতু।


অপেক্ষার শেষ প্রহর ও স্বপ্নপূরণ


স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশের সবচেয়ে চ্যালেঞ্জিং নির্মাণকাজ হচ্ছে পদ্মা বহুমুখী সেতু প্রকল্প। পুরো বিশ্ব অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে দেখেছে একটি একটি করে পিলার ও স্প্যান উন্মত্ত পদ্মার বুক চিরে তৈরি হচ্ছে। আজ পদ্মা সেতু ও সেতু-সংলগ্ন অন্যান্য অবকাঠামো গর্বের সঙ্গে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে।


দেশি, বিদেশি ও নদীর নিজস্ব হাজারো প্রতিকূলতা ডিঙিয়ে নিজস্ব অর্থায়নে দেশের সবচেয়ে দীর্ঘতম এই পদ্মা সেতু উদ্বোধনের সঙ্গে সঙ্গে দক্ষিণবঙ্গের মানুষের যোগাযোগ জন্য উন্মোচিত হবে নবদিগন্তের দুয়ার। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাহসী সিদ্ধান্তে এখন সেই অপেক্ষায় প্রহর গুনছে দেশের মানুষ। আর মাত্র কয়েক ঘণ্টা, আপন আলোয় উদ্ভাসিত হবে পদ্মা সেতু ।


বিবার্তা/রোমেল/এসবি

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

পদ্মা লাইফ টাওয়ার (লেভেল -১১)

১১৫, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ,

বাংলামোটর, ঢাকা- ১০০০

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2021 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com