‘আপন ভুবন’ বৃদ্ধাশ্রমে ঠাঁই পাচ্ছে ঠিকানাহীন মায়েরা
প্রকাশ : ২৫ এপ্রিল ২০২২, ১০:৩৯
‘আপন ভুবন’ বৃদ্ধাশ্রমে ঠাঁই পাচ্ছে ঠিকানাহীন মায়েরা
উজ্জ্বল এ গমেজ
প্রিন্ট অ-অ+

মধ্য রাত। চারদিকে সুনসান নীরবতা, নিস্তব্ধ শহর। ঘুমন্ত রাজধানীর নির্জন পথে পথে ঘুরে বেড়ায় একদল স্বেচ্ছাসেবক। উদ্দেশ্য ফুটপাথে পড়ে থাকা অসহায়, অসুস্থ, ঠিকানাহীন বৃদ্ধ মায়েদের খুঁজে বের করা। এই শহরে আক্ষরিক অর্থেই যারা অসহায়, আশ্রয়হীন, পরিবার থেকে বিতাড়িত এবং সুবিধাবঞ্চিত- এমন মাকে খুঁজে পেলেই সম্মানের সাথে কথা বলেন তারা। সবকিছু জানার পর ওই মা আগ্রহী হলে যত্নসহকারে নিয়ে যান ‘আপন ভুবনে’। পরম শ্রদ্ধা, আদর আর ভালোবাসায় বরণ করে নেন ‘আপন ভুবন’ পরিবারে।


এটা কোনো সিনেমা নয়। নয় নাটকের দৃশ্য। এটা জাদুর শহর ঢাকার অতিবিরল বাস্তব ঘটনা। বলছিলাম ‘আপন ভুবন’ বৃদ্ধাশ্রমের স্বেচ্ছাসেবক ভাইদের মানবসেবার উজ্জ্বল দৃষ্টান্তের কথা।


এভাবে গত এক বছরে দিনে রাতে বিরামহীন রাজধানীর পথে পথে ঘুরে বিভিন্ন এলাকা থেকে অসহায়, দুস্থ, মায়েদের আশ্রয়ের ব্যবস্থা করেছেন এই স্বেচ্ছাসেবক দল। এইসব মায়েদের ঠিকানা এখন ‘আপন ভুবন’। বৃদ্ধাশ্রামটা এখন তাদের নিজের বাড়ি। এখানে সবার দিন কাটছে সুখে-শান্তিতে।



রাজধানীর উত্তরার ১৩ নম্বর সেক্টরের প্রাকৃতিক মনোরম পরিবেশের ২০ নম্বর রোডস্থ ৩৬ নম্বর হাউজে ‘আপন ভুবন’ বৃদ্ধাশ্রমে কথাগুলো বলেছেন একটা বেসরকারি কলেজের অবসরপ্রাপ্ত ভাইস প্রিন্সিপাল এবং ‘আপন ভুবন ট্রাস্ট’-এর সাধারণ সম্পাদক রুমি রহমান।


জীবনসায়াহ্নে আসা এই অসহায় বৃদ্ধ মায়েদের মুখে হাসি ফোটাতে ও নিশ্চিন্ত আনন্দময় নবজীবন দিতে ‘আপন ভুবন’- এর মতো বৃদ্ধাশ্রম প্রতিষ্ঠার মহতি উদ্যোগের কথা চিন্তা করেছেন, তাদের মধ্যে প্রধান উদ্যোক্তা হলেন রুমি রহমান। কথায় কথায় তিনি জানালেন বৃদ্ধাশ্রমের শুরুর গল্প।


২০১৬ সাল। মানুষের জন্য কল্যাণমূলক কিছু করার ইচ্ছে জাগে মনে। নিজের ইচ্ছের কথা কয়েকজন শুভাকাঙ্ক্ষীর সাথে শেয়ার করলাম, আমার সাথে যুক্ত হন মানবহিতৈষী আরো চারজন।



তিনি বলেন, আমরা সবাই বিভিন্ন পেশার মানুষ। মূলত, মনের প্রশান্তির জন্য নিজেদের টাকায় এ সেবামূলক কাজ করার উদ্যোগ নেই। শুরুতে রাজধানীর উত্তরাসহ কয়েকটা বস্তিতে অভুক্ত অসহায়দের খাবার ও চিকিৎসাসেবা দেয়া শুরু করি। সবাই চাকুরে হওয়াতে ছুটির দিনে বা অফিস শেষে এসব করতাম। কখনো নিজেরা রান্না করে নিয়ে যেতাম। কখনোবা হোটেল থেকে প্যাকেট খাবার কিনে দিতাম। নিজেদের পরিচিত, আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধবদের মধ্যে যারা চিকিৎসক ছিলেন, তাদেরকে চুক্তি করে নিয়ে যেতাম বস্তিবাসীর চিকিৎসা সেবা দিতে। এভাবে কয়েক বছর চলতে থাকে আমাদের সেবা কার্যক্রম। কিন্তু এতে খুব শান্তি পাচ্ছিলাম না।



কী করলে মিলবে প্রশান্তি? রুমি চিন্তা করতে থাকেন। তার মা মারা গেছেন অনেক আগে। হঠাৎ মনে হলো, দয়া-মায়াহীন ইট-পাথরের এই শহরে যে সকল মায়েদের পৃথিবীতে কেউ নেই, অসহায়, বয়সের ভারে ন্যুব্জ, যাওয়ার কোনো জায়গা নেই, যারা পরিবারের আপনজনদের কাছে থেকে নানাভাবে অত্যাচারিত ও বিতাড়িত হয়ে পথে পথে আশ্রয়হীন অসহায় মানবেতর জীবনযাপন করছেন, তাদের জন্য কিছু করলে কেমন হয়? নিজের ভাবনাটা শেয়ার করেন বাকিদের কাছে। সবাই একমত পোষণ করেন। তখন তারা পরিকল্পনা করেন মায়েদের জন্য বৃদ্ধাশ্রমের। সবাই মিলে নাম দেন ‘আপন ভুবন’ বৃদ্ধাশ্রম।



রুমি বলেন, পরিকল্পনা অনুসারে সবাই স্বপ্ন বাস্তবায়নে নেমে পড়ি। যেহেতু শূন্য থেকে শুরু তাই একেকজন একেক দায়িত্ব ভাগ করে নেই। মায়েদের ভালোভাবে থাকার জন্য সুন্দর, মনোরম পরিবেশে ফ্লাট ভাড়া নেই। ফ্লাটের বারান্দা, ব্যালকনি আছে। সব রুমে এসির ব্যবস্থা করা হয়েছে।


পাশে হাঁটাহাঁটির জন্য পার্ক। টিম করে রাতের রাজধানীতে বৃদ্ধা মায়েদের খোঁজা শুরু করি। প্রথম মাসে তিনজন মাকে নিয়ে আমরা এই স্বপ্নের যাত্রা শুরু করি। আস্তে আস্তে মায়েদের সংখ্যা বাড়তে থাকে। তখন তাদের জন্য সব ব্যবস্থা ও জায়গাও বড় করতে থাকি। এক বছরে সব মিলে এখানে ১৭ জন মা আছেন। মায়েদের খুঁজতে গিয়ে পথে দুজন কিশোরীরও দেখা মেলে। একজন বুদ্ধি ও অন্যজন শারীরিক প্রতিবন্ধী। তাদের কোনো ঠিকানা না থাকায় এখানে মায়েদের সাথে রাখা হয়েছে। সুস্থ করে তোলার জন্য তাদেরকে দীর্ঘমেয়াদী চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে বর্তমানে।



আপন ভুবনে যারা থাকেন তাদের একজন মিলন বেগম। বয়স ৭০ বছর। তাকে শিকল দিয়ে বেঁধে রেখে নির্যাতন করা হতো। ৫৭ বছর বয়সী তিতলী মা। তাকে পরিবার থেকে বের করে দেয়া হয়েছে। ৬০ বছর বয়সী বিবি আছিয়া। মানসিকভাবে অপ্রকৃতস্থ। কিছুই মনে করতে পারেন না। জন্মগত বুদ্ধি প্রতিবন্ধী বরগুনার বৃদ্ধা আনোয়ারা বেগম। তারও একই অবস্থা। সিরাজগঞ্জের রাবেয়া বেগম। জন্মের সময়ই যাকে সবার চোখের আড়ালে ঘরের পিছনে মাটিতে পুঁতে ফেলার চেষ্টা করা হয়েছিলো। ময়মনসিংহের মুক্তাগাছার পাগলী মাসহ বিভিন্ন দুর্ঘটনার শিকার হয়ে অন্যান্য মায়েরাও রয়েছেন এখানে। এরা সবাই এখন ‘আপন ভুবন’ বৃদ্ধাশ্রমের বাসিন্দা। এখানে ৭০ থেকে ১০৫ বছরের বয়স্ক মাও আছেন।



কথায় কথায় জানা গেলো অসহায় মায়েদের জীবনের গল্প। এখানে কেউ আছেন যিনি অকালে সন্তান হারিয়েছেন। কেউবা স্বামীর ভিটা বাড়ি, আশ্রয় সব হারিয়ে পথে পথে ভিক্ষা করে মানবেতর জীবনযাপন করতেন। কেউ শুয়ে থাকতেন রাস্তার ধারে, ফুটপাতে অথবা কোনো নর্দমার পাশে। কেউ আবার ফুটপাথে অসুস্থ শরীর নিয়ে নির্বাক চোখে দীর্ঘশ্বাস নিয়ে অপেক্ষায় করতেন জীবনের শেষ মুহূর্তের।কোনো দিন হয়তো একবেলাও খাবার পর্যন্ত জুটতো না কারো কপালে। তাদের কারো কারো শারীরিক সামর্থ্য নেই। সমাজের এই সুবিধাবঞ্চিত, নিপীড়িত, অবহেলিত মায়েদের সম্পূর্ণ ভরণপোষণ, চিকিৎসা এবং নিরাপদ আশ্রয় দিচ্ছে ‘আপন ভুবন’।



রুমি বলেন, ‘আপন ভুবন’ শতভাগ সেবামূলক ও অলাভজনক প্রতিষ্ঠান। এখানে বিনামূল্যে অসহায় বৃদ্ধ মায়েদের বাসস্থান, খাবার এবং চিকিৎসা, বিনোদনসহ অন্যান্য সুযোগ-সুবিধার ব্যবস্থা করা হয়েছে। এক বছর ধরে নিরলসভাবে পরিশ্রম করে যাচ্ছে প্রতিষ্ঠানটির সদস্যরা। এটি পরিচালিত হয় একদল অবৈতনিক স্বেচ্ছাসেবক দিয়ে। মানবিক মূল্যবোধ ও সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকে এখানে তারা বিনা পারিশ্রমিকে শ্রম দিয়ে যাচ্ছেন।


আপন ভুবনে তিনবেলা সুষম ও পুষ্টিকর খাবার এবং দুইবেলার নাস্তার ব্যবস্থা আছে। বৃদ্ধা মায়েদের বয়সানুসারে প্রতিদিনকার খাবারের মেনু ঠিক করা হয়। যারা শারীরিকভাবে অসুস্থ তাদেরকে সপ্তাহে একদিন ডাক্তার এসে চিকিৎসাসেবা দিয়ে যাচ্ছেন। বৃদ্ধাদের নাজুক শারীরিক অবস্থা বিবেচনায় স্বেচ্ছাসেবক হিসাবে একজন ফিজিওথেরাপিস্ট নিয়মিত সেবা দিচ্ছেন। সন্তান তার বাবা-মাকে যেভাবে আগলে রাখেন, এই প্রতিষ্ঠানটিও সাধ্যমত চেষ্টা করে যাচ্ছে আপনজনের মতো তাদেরকে আগলে রাখতে।



এতোগুলো মা একসাথে থাকেন কোনো সমস্যা হয় না? রুমি বলেন, সবাই ভিন্ন পরিবার, পরিবেশ থেকে এসেছেন। সবার আচরণই ভিন্ন। যারা পুরানো তারা নতুন কেউ আসলে সহজে গ্রহণ করতে চান না। পুরানোদের ধারণা বাড়িটা তাদের নিজের। অন্য কেউ এখানে আসতে পারবে না। তাই পরিস্থিতির সাথে খাপ খাওয়াতে অনেক সময় লাগে। আবার যারা মানসিক ভাবে অসুস্থ। তারা প্রায়ই টিভির রিমোট নিয়ে, লুডু খেলতে গিয়ে, খাবারের টেবিলে নানান অশোভন আচরণ করেন। একজন মা আছেন। তার স্মৃতি মুছে গেছে। কিছুই মনে করতে পারেন না। রাতে বা সকালে যখন সবাই ঘুমায়, তার বাথরুম পেলে বিছানায় পায়খানা করে দেন। আর সেগুলা ঘুমন্ত মানুষের বিছানায় ছুড়ে মারেন। এমন পরিস্থিতির জন্য কেউ কিন্তু প্রস্তুত থাকেন না। তখন অস্বস্তিকর পরিস্থিতি তৈরি হয়। তাই ওই মাকে একজন স্বেচ্ছাসেবকের বাসায় রেখেছি।



এমন মায়েদের দেখাভাল করার জন্য সবসময় একজনকে রাখলেই তো সমাধান। রুমি বলেন, দেখেন আমরা চেয়েছিলাম মাত্র কয়েকজনকে এই ‘আপন ভুবনে’ রেখে নিজের মায়ের মতো করে সেবা দিবো। কোনরকমে তিনবেলা ডাল ভাত খাইয়ে তাদের রাখবো এমনটা কখনো ভাবিনি। আমাদের সামর্থ্য অনুসারে মায়েদের সর্বোচ্চ ভালো মানের থাকা ও খাওয়ার ব্যবস্থা করেছি। এখানে একেকজন মা একেক রকম। কেউ শারীরিকভাবে অসুস্থ। কেউ মানসিক প্রতিবন্ধী। এখন এসব মায়েদের দেখভাল করার জন্য স্বেচ্ছাসেবীরা আছেন। এর বাইরেও ২৪ ঘণ্টা দেখাশোনার জন্য সহযোগী নারীদের রেখেছি। অন্যদিকে, বাজারে সবকিছুর দাম ঊর্ধ্বমুখী। প্রতিদিনের খাবার, এসব ব্যবস্থাপনা, সেবাদানকারী সহযোগী, বাবুর্চির বেতন, চিকিৎসাসেবা, ফ্লাট ভাড়াসহ সব মিলে প্রতিমাসে সোয়া ৪ লাখ থেকে সাড়ে ৪ লাখ টাকা খরচ হয়ে যায়। এটা আমাদের পক্ষে কুলিয়ে ওঠা সম্ভব হচ্ছে না। তাই আমরা দাতা খুঁজছি।


এছাড়াও সামনে পবিত্র ঈদুল ফিতর। যারা এই অসহায় মায়েদেরকে সহযোগিতা করতে যাকাত, সদকা, মানত ইত্যাদি দিয়ে তাদের ঈদকে আনন্দময় করে তুলতে চান, তারা আপন ভুবনের সাথে সরাসরি যোগাযোগ করতে পারেন। বললেন রুমি।



সমাজের সামর্থ্যবান ও বিত্তবানদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে রুমি বলেন, অসহায় মায়েদের সহযোগিতা করার জন্য সমাজের বিত্তবানদের এগিয়ে আসার সবিনয় অনুরোধ করছি। আপনার এককালীন অনুদান এই অসহায় বৃদ্ধ মায়েদের সেবা করার সুযোগ করে দিবে। আপনার আন্তরিক অংশগ্রহণ একজন পরিবার, স্বামী, সন্তানহীন মায়ের ব্যথিত মনে প্রশান্তি এনে দিতে পারে। আপনাদের সামর্থ্য অনুযায়ী খাবার পাঠাতে পারেন, পোশাক দিতে পারেন, প্রয়োজনীয় ঔষধপত্র দান করেও এই অসহায় মায়েদের পাশে দাঁড়াতে পারেন। এই রমজানে আপনার আন্তরিক সহযোগিতা কামনা করছি। আগ্রহীরা সাহায্য পাঠাতে চাইলে www.AponBhubon.com এই ওয়েবসাইটে অথবা ফেসবুকের Apon Bhubon (Oldhomebd) এই পেইজে ভিজিট করতে পারেন। অথবা সরাসরি যোগাযোগের জন্য কল করতে পারেন এই- 01886107109, 01838641917 নম্বরে।



এক বছরে চারজন মাকে এই আশ্রমে রেখে চিকিৎসাসেবা দিয়ে সুস্থ করে প্রিয়জনদের কাছে পৌঁছে দিয়েছেন। অর্জন নিয়ে রুমির ভাষ্য, যখনই কোনো মা এখানে আসেন, আমরা তাদের সাথে খোলামেলা আলাপ করি। তখন কেউ যদি তার আত্মীয়-স্বজনের কাছে ফিরে যেতে চান, আমরা তার কথা মতো সেই ঠিকানায় যোগাযোগ করার চেষ্টা করি। আমাদের স্বেচ্ছাসেবক টিমের সদস্যরা তাদের সাথে যোগাযোগ করে সঠিক ঠিকানায় পৌঁছে দিয়ে আসেন।



ভবিষ্যতে এটাকে নিয়ে অনেক বড় স্বপ্ন দেখেন আপন ভুবন পরিবারের উদ্যোক্তারা। এখন ভাড়া বাসায় মায়েদের সেবা দিচ্ছেন। ভবিষ্যতে নিজেদের জায়গায় একটা বাংলো বাড়ি করে প্রাকৃতিক নিরিবিলি পরিবেশে মায়েদের ঠিকানা করতে চান আপন ভুবন ট্রাস্ট-এর স্বপ্নবাজ উদ্যোক্তারা। এতো বড় কাজ তাদের একার পক্ষে করা সম্ভব না। তাই সমাজের বিত্তবানদের সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিতে আহ্বান জানিয়েছেন তারা।


বিবার্তা/গমেজ/রোমেল/আশিক

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

পদ্মা লাইফ টাওয়ার (লেভেল -১১)

১১৫, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ,

বাংলামোটর, ঢাকা- ১০০০

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2021 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com