আফরোজা নাজনীন সুমির সফল রন্ধনশিল্পী হয়ে ওঠার গল্প
প্রকাশ : ১০ মার্চ ২০২২, ১৩:০৪
আফরোজা নাজনীন সুমির সফল রন্ধনশিল্পী হয়ে ওঠার গল্প
উজ্জ্বল এ গমেজ
প্রিন্ট অ-অ+

মা লায়লা জালাল রান্না করতে ভালোবাসতেন। ভীষণ ভালো রান্না করতেন। ছোটবেলায় মায়ের কাছ থেকেই রান্না করা শেখেন তিনি। মায়ের মতো নিজেও রান্না করতে ভালোবাসতেন। নিজের হাতে যত্ন করে রান্না করে মানুষকে খাওয়াতেও পছন্দ করতেন। এভাবে রান্নার প্রতি আলাদা একাটা ভালো লাগা তৈরি হয়ে যায় তার। সে ভালো লাগাই তাকে ধীরে ধরে করে তুলে রন্ধনশিল্পী হিসেবে। আজ তিনি হয়ে ওঠেছেন দেশের একজন জনপ্রিয় এবং সফল রন্ধনশিল্পী।


বলছিলাম সুমি’স কিচেন ক্যাটারিং এবং ট্রেনিং সেন্টারের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ও পরিচালক আফরোজা নাজনীন সুমির কথা। বহুগুণে গুণান্বিতা সুমি শৈশবে অন্য পাঁচটা সাধারণ মেয়ের মতোই স্বপ্ন দেখতেন বড় হয়ে ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার হওয়ার। বড় চাকরি করে নিজের স্বামী সংসার নিয়ে জীবনযাপন করার। সময়ের পালাবদলে সে স্বপ্নের রঙ যায় বদলে। হয়ে ওঠেন রন্ধনশিল্পী।



তিনি একাধারে জনপ্রিয় রন্ধনশিল্পী ও উপস্থাপিকা, রেসিপি ডেভেলপার, ফুড স্টাইলিস্ট, শেফ, উদ্যোক্তা, ট্রেইনার, এসেসর। সেই সাথে খণ্ডকালীন শিক্ষক হিসেবে নিজের দক্ষতার প্রমাণ দিয়েছেন তিনি অসংখ্যবার। তবে এই সব পরিচয়ের মধ্যে একজন জনপ্রিয় রন্ধনশিল্পী হিসেবেই সবার কাছে বেশি পরিচিত সুমি।


ঢাকার ধানমন্ডির মেয়ে আফরোজা নাজনীন সুমি। বাবা জালাল উদ্দিন ছিলেন বিএডিসির একজন উচ্চ পদস্ত কর্মকর্তা। বাবার সরকারি চাকরির সুবাদে তার ছেলেবেলা কেটেছে বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলায়। সুমি বর্তমানে তার ২ সন্তানসহ ঢাকাতেই বসবাস করছেন।


ব্যক্তিগত জীবনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গ্রাজুয়েশন সম্পন্ন করার পর এমবিএ করেছেন একটি প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। অন্টারপ্রেনার্সশিপের ওপর কোর্স করেছেন নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং যুক্তরাষ্ট্রের বেবসন কলেজ থেকে।



প্রাতিষ্ঠানিক পড়ালেখা শেষ করার পর স্বামী, সংসার নিয়ে ব্যস্ত থাকতে চেয়েছিলেন সুমি। বাচ্চারা যখন একটু বড় হয় তখন যমুনা টেলিভিশনের ‘লাইভ কিচেন’ রান্না নামে একটা অনুষ্ঠান শুরু করেন তিনি। সে অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে টেলিভিশন মিডিয়াতে যাত্রা শুরু হয় তার। এরপর ফুড প্রোডাক্ট নিয়ে পর্যটনে পড়াশোনা করেন। রন্ধনশিল্পের প্রতি আগ্রহ দিন দিন বাড়তে থাকে তার।


প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমবিএ শেষ করার পর রান্নার ওপর বিশেষ প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন সুমি। প্রশিক্ষণে রান্নার বিষয়ে ধারণা পাওয়ার পর রন্ধনশিল্পের প্রতি কৌতূহল বেড়ে যায় দ্বিগুন। জানার নেশায় বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশন থেকে ফুড অ্যান্ড বেভারেজ প্রোডাকশানের উপর ন্যাশনাল সার্টিফিকেট এবং ফুড হাইজিন অ্যান্ড স্যানিটেশনের ওপর কোর্স করেন তিনি। এরপর ইন্টার্নি করেন হোটেল রেডিসন ব্লু ওয়াটার গার্ডেন ঢাকা থেকে। সেখান থেকেই তিনি অন কলে কাজ শুরু করেন। কাজের ফাঁকে রন্ধন প্রতিভাকে আরো বিকশিত করার জন্য তিনি মনিন বাংলাদেশ থেকে বারিস্তা ট্রেনিং নেন। বর্তমানে তিনি বাংলাদেশ টেকনিক্যাল এডুকেশন বোর্ডের (বিটিইবি) সার্টিফাইড ট্রেইনার এবং এসেসর।


রান্নার প্রতি নিজের ভালোবাসা এবং এই সেক্টরে নতুন শিখতে আসা ব্যক্তিদের জন্য ‘সুমিস কিচেন’ নামের একটি ক্যাটারিং এবং ট্রেনিং সেন্টার গড়ে তুলেছেন। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী কর্মকার্তা ও পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন পরিশ্রমী এবং নতুন কিছু করার স্বপ্ন দেখা সুমি।



‘সুমিস কিচেন’ ক্যাটারিংয়ে কী ধরনের খাবার পাওয়া যায়? সুমি বলেন, আমার প্রতিষ্ঠানে সব ধরনের কাস্টমাইজ ও হেলদি খাবার পাওয়া যায়। প্রত্যেকটা খাবারের আইটেম অত্যন্ত যত্ন করে স্বাস্থ্যসম্মত ও সুস্বাদু করে তৈরি করা হয়। আমরা খাবারের গুণগতমনের দিকে সব সময় সচেতন থাকি। আমি খাবারের বিভিন্ন আইটেম ওপরে প্রশিক্ষণ নিয়েছি। কীভাবে স্বাস্থ্যসম্মত ও সুস্বাদু খাবার তৈরি করতে হয় সেগুলো আমি শিখেছি। সে শিক্ষা অনুসারে এখন খাবার তৈরি করছি। এখনো পর্যন্ত আমার খাবারের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ আসেনি।


সুমির ট্রেনিং সেন্টারে খাবারের বিভিন্ন আইটেমের বিষয়ে শিক্ষা দেয়া হয়। সুমির ভাষ্য, আমার প্রতিষ্ঠানে ক্লাস সিক্স থেকে টেনের বাচ্চাদের জন্য খাবারের আইটেমের ওপর ট্রেনিং করানো হয়। সেই সাথে বড়দেরও ট্রেনিং করানো হয়। যে যেটা শিখতে চায়। কেউ শিখতে চায় কেক, কেউ ফাস্টফুড, আচার, হালুয়া, আবার কেউ বা চাইনিজ। যে যে বিষয়ে শিখতে চায় সে অনুসারে ট্রেনিংগুলো সাজানো হয়েছে। এটা অনেকটা কাস্টমাইজড। কেউ চাইলে ট্রেনিংটা ঘরে বসে অনলাইনে করতে পারেন। আবার কেউ চাইলে প্রতিষ্ঠানে এসে ফিজিক্যালিও করতে পারেন।



রন্ধনশিল্পের পাশাপাশি ফটোগ্রাফি করতেও ভালোবাসেন সুমি। বাংলাদেশ ফটোগ্রাফিক সোসাইটির এবং শেফ ফেডারেশন বাংলাদেশের আজীবন সদস্য, ওমেন অন্টারপ্রেনার্স অ্যাসোসিয়েশন এবং কুলিনারি অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের বোর্ড মেম্বার, বাংলাদেশ ফেডারেশন অব ওমেন অন্টারপ্রেনার্সের মেম্বার এবং ওয়ার্ল্ড শেফ চয়েস ফেডারেশনের বাংলাদেশের ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে কাজ করছেন তিনি। মেণ্টর হিসেবে কাজ করছেন বাংলাদেশ ইয়ুথ ইন্টারপ্রাইজ অ্যাডভাইস অ্যান্ড হেল্প সেন্টারে।



তিনি শুধু জনপ্রিয় রন্ধনশিল্পীই নয়, রান্না অনুষ্ঠানের একজন সফল উপস্থাপিকাও। যমুনা টেলিভিশনের ‘লাইভ কিচেন’ রান্নার অনুষ্ঠান দিয়ে টেলিভিশন মিডিয়াতে কাজ শুরু করেন সুমি। এরপর ধীরে ধীরে বিভিন্ন টিভি চ্যানেলে রান্নার অনুষ্ঠানে উপস্থাপনা করেন। এগুলো হলো- এটিএন বাংলা, এনটিভি, বিটিভি, এশিয়ান টিভি, বাংলাভিশন, মাছরাঙা, গাজী টিভি, চ্যানেল নাইন, চ্যানেল২৪, ডিবিসি নিউজ, সময় টিভি, চ্যানেল আই, নাগরিক, দেশ টিভি, বাংলাভিশন, এসএ টিভি এবং নেক্সাস টিভি। রান্নার পাশপাশি এটিএন বাংলায় ‘বাহারি রান্না’ অনুষ্ঠানটি নিয়মিত উপস্থাপনাও করে আসছেন সুমি।


প্রশিক্ষক হিসেবেও সুমির রয়েছে বেশ জনপ্রিয়তা। দেশের বিভিন্ন জায়গায় রান্নার ওয়ার্কশপে ট্রেইনার হিসেবে থাকেন। দেশের গণ্ডি পেরিয়ে তিনি কলকাতায় সানন্দা ক্লাবের আমন্ত্রণে বাংলাদেশি খাবারের ওপর একটা ওয়ার্কশপ পরিচালনা করেন। কলকাতার জি বাংলার ‘রান্নাঘর’, ‘কলকাতা লাইভ’, রূপসী বাংলার ‘বিদূষীর হেঁশেল’, আরতাজ নিউজের ‘রান্নাঘার’, অঙ্কার টিভির ‘হেঁশেলে হৈ হৈ’ অনুষ্ঠানেও নিয়মিত অংশগ্রহণ করছেন সুমি।



দেশের বিভিন্ন প্রতিযোগিতামূলক অনুষ্ঠানে বিচারকের দায়িত্বও পালন করেছেন তিনি। ‘বিজিনেস জিনিয়াস বাংলাদেশ ২০২১’, ‘৫ম ইন্টারন্যশনাল বিজনেস জিনিয়াস বাংলাদেশ ২০২০’ এবং ‘১ম এডুকেশন অ্যান্ড কালচারাল কার্নিভাল-২০১৮’ এ বিচারকের দায়িত্ব পালন করেছেন সুমি। ‘রূপচাঁদা-দি ডেইলি স্টার সুপার শেফ ২০১৯ ও ২০১৮’ প্রতিযোগিতার ঢাকা, বগুড়া জোনের বিচারক এবং স্টুডিও পর্বে অতিথি বিচারক হিসেবে কাজ করেছেন। ‘ড্যান কেক ডেজার্ট জিনিয়াস-২০১৮’- এর অন্যতম প্রধান বিচারক তিনি। ‘সেরা রাঁধুনি ১৪২৪’ এ গ্রুমিং ইন্সট্রাকটর এবং ‘নিউট্রিশন অলিম্পিয়াড-২০১৮’ এ ফ্যাসিলিটেটর এবং শেফ ট্রেইনার হিসাবে সিলেটের ‘শেফ কনফারেন্স-২০১৮’-এ অংশগ্রহণ করেন তিনি। অতিথি বিচারক হিসেবে কাজ করেছেন ‘মিস কালচার অ্যান্ড ট্যুরিজম বাংলাদেশ-২০১৮’ তে। কলকাতার হেফেলে অ্যান্ড দ্য ভোজ কোম্পানি আয়োজিত কুকিং কম্পিটিশন ‘দ্যা কিউলিনারী ডিভা-২০১৮’- এর একজন অন্যতম বিচারক।


সুমির লেখালেখিতেও রয়েছে অবাধ বিচরণ। দেশের সবচেয়ে বহুল প্রচলিত ও জনপ্রিয় দৈনিক পত্রিকা দৈনিক প্রথম আলোর নকশাতে নিয়মিত রেসিপি দিয়ে থাকেন। এছাড়াও তিনি রান্না নিয়ে দেশের বিভিন্ন পত্রিকাসহ ভারত ও নেপালের পত্রিকাতে নিয়মিত লেখালেখি করেন।



দেশের একটি প্রতিষ্ঠিত ডিজিটাল মার্কেটিং অ্যাজেন্সিতে বিজনেস মার্কেটিং লিড হিসাবে কর্মরত ছিলেন তিনি। অ্যাকশন এইডের প্রজেক্ট ‘হ্যাপি হোম’- এর রান্নার প্রশিক্ষক হিসেবে এবং ‘প্লেপ্যান’ ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে বেকিং ও কুকিং শিক্ষক হিসাবে দায়িত্বরত আছেন সুমি। এসবের পাশাপাশি প্রথম আলোসহ বেশ কিছু পত্রিকাতে স্থির চিত্রের মডেল হিসেবে এবং বেশ কিছু টিভিসি-ওভিসিতে কাজ করছেন।


রন্ধনশিল্পী হিসেবে দক্ষতার সাথে কাজ করার জন্য বিভিন্ন সম্মাননায় ভূষিত হয়েছেন বহুগুণে গুণান্বিতা সুমি। যার মধ্যে অন্যতম হলো- উই অন্টারপ্রেনার্স অ্যাওয়ার্ড ২০২১, ময়ূরপংখী অন্টারপ্রেনার্স অ্যাওয়ার্ড ২০২১, উই তারা অন্টারপ্রেনার্স অ্যাওয়ার্ড-২০২০ (বেস্ট ইন হেলথ কেয়ার), উইবিডি ওমেন অন্টারপ্রেনার্স অ্যাওয়ার্ড-২০১৯, বাবিসাস অ্যাওয়ার্ড-২০১৮, ডিসিআরইউ অ্যাওয়ার্ড-২০১৮, এজেএফবি স্টার অ্যাওয়ার্ড-২০১৭, রেডিও স্বদেশ সম্মাননা অ্যাওয়ার্ড-২০১৭, গোল্ডেন পেন অ্যাওয়ার্ড-২০১৭, ইনডেক্স মিডিয়া অ্যাওয়ার্ড-২০১৭, চিত্র জগত অ্যাওয়ার্ড-২০১৬, নব প্রজন্মের সেরা রন্ধনশিল্পী অ্যাওয়ার্ড-২০১৬ উল্লেখযোগ্য। সেই সাথে তিনি কলকাতায় ‘সৃজন সম্মান-২০১৮’ এবং ‘ভারত-বাংলাদেশ মৈত্রী উৎসব-২০১৮’ সম্মাননা পেয়েছেন।



ভবিষ্যতে সুবিধা বঞ্চিত শিশুদের নিয়ে কাজ করতে এবং রান্না নিয়ে আরো গবেষণা করার পরিকল্পনা রয়েছে সুমির। ইতোমধ্যেই দৃষ্টি প্রতিবন্ধিদের জন্য স্পর্শ ফাউন্ডেশন থেকে একটা বই প্রকাশ হয়েছে। নাম ‘বেইল বুক’। ২০২০ সালের বইমেলায় বইটি প্রকাশ করা হয়। সুমির ভাষ্য, আমার ইচ্ছে আছে এমন সুবিধা বঞ্চিত, দৃষ্টিপ্রতিবন্ধি, মুখ বধির, যারা কোনো না কোনোভাবে সকল সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত আছেন তাদের নিয়ে কাজ করার। ইতোমধ্যেই এ ধরনের কাজ শুরু করে দিয়েছি। আর ভবিষ্যতে বড় কোনো চেইন রেস্টুরেন্ট দেয়ার ইচ্ছে আছে।


বিবার্তা/গমেজ/আশিক

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

পদ্মা লাইফ টাওয়ার (লেভেল -১১)

১১৫, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ,

বাংলামোটর, ঢাকা- ১০০০

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2021 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com