খাঁটি ও দেশি পণ্য নিয়ে চার বন্ধুর ‘টুকরি’
প্রকাশ : ০২ মার্চ ২০২২, ১২:০৭
খাঁটি ও দেশি পণ্য নিয়ে চার বন্ধুর ‘টুকরি’
উজ্জ্বল এ গমেজ
প্রিন্ট অ-অ+

প্রতিটি মানুষের মনের ভেতরে একটা স্বপ্ন থাকে। আর সে স্বপ্নকে মনে লালন করে স্বপ্ন পূরণের পথে এগিয়ে যায়। লক্ষ্য ঠিক রেখে এগিয়ে যাওয়ার পর একটা নির্দিষ্ট সময়ে সে স্বপ্ন বাস্তবে রূপ লাভ করে। আবার কেউবা সে স্বপ্ন মনে নিয়ে জীবনকে এগিয়ে নিয়ে যায় আপন গতিতে। সময় সুযোগ মতো শৈশবের লালিত স্বপ্ন পূরণ করে। সেরকম এক স্বপ্নের নামই ‘টুকরি’। আর স্বপ্নটা দেখেছিলেন চার বন্ধু। স্বপ্ন পূরণে সঙ্গীও হয়েছেন চারজন।


অনলাইনে দেশি, নির্ভেজাল ও খাঁটি পণ্যে বর্তমানে নির্ভরতার এক নাম টুকরি। দেশি সব ধরণের টাটকা মাছ, মাংস, মধু, নিজেদের তৈরি করা মসলাগুড়ো, সরিষার তেল, নারিকেল তেল, ঘিসহ বিভিন্ন আইটেম নিয়ে টুকরির পসরা সাজানো। শূন্য থেকে তাদের উদ্যোক্তা হয়ে ওঠার গল্পটা একটু ভিন্ন ধরনের। নানান চড়াই-উৎরাই পেরোনোর।


টুকরি নিয়ে বলতে গেলে চার বন্ধুর একজন জাকিয়া আহমেদ বলেন, উদ্যোগটা চার বন্ধুর চিন্তার ফসল এবং চারজনই পেশায় সাংবাদিক। তাদেরই একজন জেসমিন পাপড়ি। জেসমিন পাপড়ির গ্রামের বাড়ি সাতক্ষীরা জেলায়। চাকরির সুবাদে থাকেন ঢাকায়। তার দুই জমজ মেয়ে রয়েছে। ঢাকার সব খাদ্যে ফরমালিন ও ভেজাল থাকায় সাতক্ষীরা থেকে জেসমিন পাপড়ির বাবা তার প্রিয় নাতনীদের জন্য নিয়মিত রকমারি টাটকা মাছ পাঠাতেন। যার মধ্যে অন্যতম খুলনা ও সাতক্ষীরার গলদা চিংড়ি, বাগদা চিংড়ি, হরিণা চিংড়ি, কোরাল। আর অত্যন্ত স্বাদের পারসেসহ এ এলাকার নানা মাছ। আর সাতক্ষীরা থেকে মাছ আসার এ পথটাই টুকরি তৈরি হবার পেছনে প্রেরণা হিসেবে কাজ করেছে।


জেসমিন পাপড়িই প্রথম বাকি তিনবন্ধুকে জানান, টাটকা ও ফরমালিনমুক্ত মাছ তো ঢাকায় পাওয়া যায় না। সাতক্ষীরা থেকে যদি ঢাকায় মাছ আসতে পারে, তাহলে এসব সরাসরি সাতক্ষীরা থেকে ঢাকায় এনে একটু বড় পরিসরে কিছু করা যায় কিনা? তার সে কথায় সায় দেন বাকি বন্ধুরা। সবাই মিলে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেন খুলনা, সাতক্ষীরা থেকে টাটকা মাছ এনে অনলাইনে বিক্রি করার। আর তখন থেকেই টুকরির পথচলার অদৃশ্য যাত্রা শুরু।


পেজের নাম, সে অনুযায়ী লোগো, লোগোর রং, সাতক্ষীরা টু ঢাকা মাছ কিভাবে আসবে, কোথায় এসে পৌঁছাবে, সেখান থেকে কিভাবে ডেলিভারি হবে কিংবা কতটুকু সাড়া আসলে পাওয়া যাবে-এ সবকিছু নিয়েই ছিল অদৃশ্য সে যাত্রার পথচলা।


শুরুতেই নাম কী হবে সে নিয়ে সবার নির্ঘুম রাত। অনেক নামের ভেতর থেকে বেছে নেওয়া হয় ‘টুকরি’। এরপর সামাজিক যোগাযাগমাধ্যম ফেসবুকে ‘টুকরি’ নামে একটা বিজনেস পেজ খোলা হয়। সেখানে উদ্যোগের লক্ষ্য, উদ্দেশ্য, কার্যক্রম সম্পর্কে নিয়মিত পোস্ট করা হয়। শুরুতে সাতক্ষীরা থেকে আসা মাছ নিয়ে টুকরির যাত্রা শুরু হয়।


জেসমিন পাপড়ি বলেন, শুরু থেকেই আমরা ভালো সাড়া পেয়েছি। আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-সহকর্মীরা ছিলেন পাশে। তারাই প্রথমে নিজের পছন্দ ও চাহিদা মতো মাছ নিয়েছেন।


একবার নিয়ে আরেকবার নিয়েছেন, তার পরিচিতজনদের টুকরির কথা বলেছেন। অনেকটা কিশোর বেলায় পড়া ‘তিন গোয়েন্দা’য় পড়া ‘ভুত থেকে ভুতে’ মতো করে ছড়াতে থাকে টুকরির কথা। অর্ডার আসে, মাছ আসে, অর্ডার পৌঁছে দেয়া হয়। কিন্তু সেইসঙ্গে প্রত্যাশা বাড়ে টুকরির কাছে।


আমরা শুনতে থাকি, ‘যারা ঢাকায় থেকে ভেজালমুক্ত মাছ খেতে চাইবে তারা আপনাদের খুঁজবেই। তাই আপনারা কেন শুধু খুলনা আর সাতক্ষীরার মাছেই সীমাবদ্ধ থাকবেন? নদীর বড় মাছ, খাল-বিলের দেশি ছোট মাছ কেন নয়? এগুলো সাধারণত ঢাকায় কম পাওয়া যায়’, বলেন জেসমিন পাপড়ি।


টুকরির মাছের চাহিদা বাড়ে, যারা মাছ নেন তাদের প্রত্যাশা বাড়ে, আর তাদের ওপর বেড়ে যায় প্রত্যাশার চাপ। এরপরই টুকরি যোগাযোগ করে সিরাজগঞ্জ ও টাঙ্গাইলের জেলেদের সাথে। যমুনা নদী থেকে ১৮-১৯ কেজি ওজনের চিতল, কাতল, রুই, আইড় আনা শুরু হয়।


যারা উদ্যোগ সম্পর্কে ভালোভাবে জানতেন তারা একটার পর একটা অর্ডার করতে থাকেন। অল্প দিনের মধ্যে যমুনার তাজা মাছ সবার কাছে বেশ জনপ্রিয়তা লাভ করে। তখন ক্রেতাদের চাহিদা অনুসারে সারাদেশের নদ-নদী, খাল-বিলের দেশি ছোট মাছ সংগ্রহ করার পরিকল্পনা করেন তারা। এভাবে ধীরে ধীরে তাদের স্বপ্ন ডানা মেলতে শুরু করে। ছড়িয়ে পড়ে বিভিন্ন জেলায়। বিভিন্ন জেলার মাছ নিয়মিত আসতে থাকে ঢাকায়। হাঁটি হাঁটি, পা পা করে টুকরির ব্যবসা যখন বেশ ভালোই জমে ওঠে, তখন ক্রেতারা আবদার করেন গ্রামের দেশি মুরগি, হাস খাওয়ার। টুকরিতে গ্রাম থেকে সেগুলোও আনা হয়।


প্রত্যাশার পারদ যখন আরও বড় হয় তখন চাহিদার খাতায় যোগ হয় প্রোডাক্ট আরও বাড়ানোর জন্য। তারা খাঁটি মশলা, খাঁটি সরিষার তেল, নারিকেল তেল, ঘি-এর আবদার করেন। নতুন মিশনে এবার যোগ হয় গ্রামে থাকা আত্মীয়-স্বজন। তারাই বাজার থেকে হলুদ, মরিচ, সরিষা কিনে, ধুয়ে, শুকিয়ে নিজেরা মেশিনে ভাঙিয়ে তাদের পাঠাতেন। সেসাথে যোগ হয় গ্রামের গরুর দুধের ঘি। আর সেগুলো ক্রেতাদের চাহিদা মতো বিক্রি করা শুরু করে।


এরপর এগিয়ে চলছে টুকরি, চলছে তার আপন গতিতে। ১২ মাসে ৬ ঋতু। ষড় ঋতুর পালা বদলের সাথে ক্রেতাদের রুচির রঙও যায় বদলে। ক্রেতাদের পছন্দ ও রুচিকে গুরুত্ব দিয়ে টুকরি সারা বছরে পণ্য সরবারহ করে থাকে। টুকরিতে এখন মিলছে দেশি পুঁটি, কৈ, শিং, মাগুর, টেংরা, ফলি, শোল, মিশালি, কাজলি, বাগদা, কালিবাউশ, পাবদা, গুলশা, কাকিলা, পাবদা, বাইলা, গলদা চিংড়ি, নদীর বোয়াল, তাজা রূপচাঁদা, পদ্মার তাজা ইলিশ, কাকড়া, মুরগির গিলা কলিজাসহ হরেক রকমের আইটেমের মাছ ও মাংস।


টুকরিতে কেবল মাছই পাওয়া যায় না। এতে রয়েছে টুকরির নিজস্ব তত্ত্ববধানে করা হলুদ, মরিচ, জিরা এবং ধনিয়া গুড়া। টুকরির কর্মীরা মশলা ধুয়ে বেছে এরপর নিজেরা ভাঙ্গিয়ে ভেজালমুক্ত এবং আসল স্বাদের পণ্য বিক্রি করছে। এছাড়াও রয়েছে মানিকগঞ্জের কেমিক্যাল মুক্ত বিখ্যাত হাজারি গুড়, চুয়াডাঙ্গার বিখ্যাত পাটালি আর ঝোলা গুড়।


প্রযুক্তির যুগে অনলাইনে এখন এধরনের অনেকেই মাছের বিজনেস করছেন। গ্রাম থেকে বা প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে মাছ এনে ঢাকায় বিক্রি করছেন। অন্যদেরটা রেখে আপনার কাছ থেকে ক্রেতারা মাছ কিনবেন কেন প্রশ্নে টুকরির আরেক সত্বাধিকারী জাকিয়া আহমেদ বলেন, আমাদের লক্ষ্যই ছিল দেশি মাছ ঢাকার ক্রেতার হাতে তুলে দেয়া। আমরা যাকে দেশি বলি, সেটা দেশিই। যদি কাউকে বলি আপনাকে দেশি কৈ মাছ দেব, সেটা দেশিই হবে, বলেন তিনি।


‘কোয়ালিটির সঙ্গে টুকরি কম্প্রোমাইজ করবে না, বেচাবিক্রি কম হোক। তবুও দেশির সাথে কোনো চাষের কই মাছ মেশাবো না। এ জায়গাটা ঠিক রেখে টুকরির জেলেরা সারাদেশের নদ-নদী, খাল-বিলের দেশি ছোট মাছ ধরে সেটা ঢাকায় পাঠান’।


যারা আমাদের নিয়মিত ক্রেতা তারা জানেন আমাদের মাছের স্বাদ, সার্ভিস কোয়ালিটি আর কমিটমেন্টের বিষয়ে। আজ পর্যন্ত মাছ নিয়ে কোনো অভিযোগ আসেনি। আর এর জন্যই ক্রেতারা আমাদের কাছ থেকে মাছ কিনবেন, বলেন তিনি।


অনেকের কাছেই টুকরির মাছের দাম বেশি মনে হয়। এ নিয়ে নিয়মিত প্রশ্নের মুখোমুখি হই আমরা জানিয়ে জাকিয়া আহমেদ বলেন, আমরা কখনো মাছ ফ্রিজে রাখি না। হিমায়িত মাছের স্বাদ আর সরাসরি খাল-বিল, পুকুর, হাওড়-বাঁওর, নদ-নদী থেকে সংগ্রহ করা টাটকা মাছের স্বাদ এক না। এটা সবাই মানবেন। আর ক্রেতাদের এই তরতাজা, টাটকা মাছের স্বাদটা দিতে আমাদের বেশ কিছু টাকা খরচ হয়ে থাকে। সংগত কারণে আমাদের মাছের দামটা একটু বেশি হয়ে থাকে। আর এটা সত্যি যে ভালো জিনিসের দামটা বেশিই হবে।


তিনি বলেন, আমরা অনলাইন যে সেবাটা দিয়ে থাকি, এখানে প্রতিনিয়ত বিভিন্ন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হয়। অনেকে দেশি মাছ দেখে মাছের অর্ডার করতে যান। কিন্তু মাছের দাম শুনে অর্ডার ক্যান্সেল করে দেন। আবারও আমাদের সেবার বিশেষত্বের কথা জোর দিয়ে বলতে চাই। আমি যদি আপনাকে বলি যে, এক কেজি দেশি শিং দেবো। তাহলে শিংটা একদম দেশিই হবে। একদম বিল থেকে আসা হবে। আপনি সে এক কেজি শিংয়ের মধ্যে একটাও পাবেন না যেটা আমি চাষের দিয়েছি। এই কোয়ালিটির বিষয়টাকে ধরে রেখেছি বলে আমাদের ব্যবসায় বেচাবিক্রি কম হয়। কেননা ক্রেতারা দাম শুনে পিছিয়ে যান। কম দামেরটা খোঁজেন। আমাদের কমিটমেন্ট হলো, এতে যদি আমরা ব্যবসায় টিকতে না পারি, তাহলে আমরা ব্যবসা করবো না। শুরু থেকে মানুষ টুকরির ওপর যে আস্থাটা স্থাপন করেছে, সেটাকে আমরা বিফলে যেতে দেবো না।


বৈশ্বিক মহামারি করোনার সময় টুকরি ক্রেতাদের বিশেষ সেবা চালু করেছে। সব ধরনের সুরক্ষা মেনে টুকরির কর্মীরা বাসায় গিয়ে মাছ পৌঁছে দিয়েছেন। যেসব ক্রেতা মাছ কেটে, বেছে ধুয়ে নিতে চেয়েছেন তাদের জন্য ‘রেডি টু কুক’ সার্ভিস চালু করা হয়। সে সার্ভিস এখনো চালু রয়েছে। ব্যস্ত শহুরে জীবনে যারা ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও ছোট মাছ খেতে পারেন না। তাদের জন্য ‘রেডি টু কুক’ সার্ভিস দেয়া হয়। ক্রেতারা পছন্দের ছোট বা বড় মাছ অর্ডার করলে কেটে ধুয়ে প্যাক করে দেয়া হয়। রাজধানীবাসীর জন্য টুকরির সেবা চালু থাকে সকাল ৮টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত। সপ্তাহের সাত দিনই সার্ভিস দেয়া হয়।