সারা বিশ্বে ক্যালিগ্রাফিতে আলো ছড়াচ্ছেন ঢাবির উসামা
প্রকাশ : ২১ জানুয়ারি ২০২২, ১২:০৫
সারা বিশ্বে ক্যালিগ্রাফিতে আলো ছড়াচ্ছেন ঢাবির উসামা
উজ্জ্বল এ গমেজ
প্রিন্ট অ-অ+

প্রত্যেকজন বাবা-মাই সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে ভেবে থাকেন। সন্তান বড় হয়ে কী হবে, কী করে একটা সুন্দর জীবন গড়ে তুলবে ইত্যাদি। আর পাঁচজনের মতো তার বাবা-মাও ভাবতেন ছেলে বড় হয়ে সরকারি চাকরি করবে। অনেক বড় সরকারি অফিসার হবে। কিন্তু তার আগ্রহ ছিল ভিন্ন কিছুতে। ছোটবেলায় সময় পেলেই ছবি আঁকতেন। ছবি আঁকা ছিল তার নেশার মতো। সে আগ্রই আজ তাকে তৈরি করেছে বিখ্যাত ক্যালিগ্রাফার হিসেবে। তিনি এখন দেশের ক্যালিগ্রাফি জগতে এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। আলোচিত নাম। এখন প্রতিদিন শব্দে শব্দে ছবি আঁকেন তিনি।


বলছিলাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আরবি ভাষা সাহিত্য বিভাগের কৃতি ছাত্র এবং সফল ক্যালিগ্রাফার ও উদ্যোক্তা উসামা হকের কথা। ঢাবি থেকে মাস্টার্স পাস করে অন্য সবার মতো চাকরির পেছনে না ঘুরে নিজের মনের লালিত স্বপ্ন বাস্তবায়নে মনোযোগী হন। নানান চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে আজ তিনি সফল ক্যালিগ্রাফার। দেশ-বিদেশে ছড়িয়ে পড়ছে তার ক্যালিগ্রাফির মুগ্ধতা।


উসামা হকের জন্ম গাজীপুরে এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে। শৈশব ও কৈশোরের স্বর্ণালী দিনগুলি কাটে নিজের জন্মস্থানেই। বাবা পেশায় ছিলন চাকরিজীবী। মা গৃহিণী। তিন ভাই ও এক বোনের মধ্যে উসামাই সবার বড়।



ক্যালিগ্রাফির প্রতি আগ্রহের শুরুটা কীভাবে? উসামা বলেন, আমি তখন তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ি। ছবি আঁকার প্রতি ভীষণ ঝোঁক ছিল। সময় পেলেই বসে যেতাম ছবি আঁকতে। ছবি আঁকা ছিল আমার নেশার মতো। রঙ তুলিতে কল্পনার ক্যানভ্যাসে নতুন কিছু সৃষ্টির মাঝে খুঁজে পেতাম নির্মল আনন্দ। ৭ বছর বয়স থেকে তাহফিজুল কোরআন ফাযিল মাদ্রাসায় পড়া শুরু করি। সেখানেই দাখিল ও আলিম পাস করি। সেখানে হাফেজও হই। মাদ্রাসায় পড়া অবস্থাতেই শখের বশে শেখা শুরু করি ক্যালিগ্রাফি। রঙিন তুলির ছোঁয়ায় বিভিন্ন ফন্টের সুন্দর লেখাই হলো ক্যালিগ্রাফি। আমার শিক্ষাগুরু ছিলেন আহমদ রেজা ফারুকী। স্যার আমাকে অক্ষর গড়া, শব্দ তৈরি, বাক্যবিন্যাস আর রঙের ব্যবহার শেখাতেন।


এরপর ক্যালিগ্রাফি বিষয়ে তার জানার আগ্রহ বেড়ে যায়। যখন যেখানে যা পেয়েছেন শুধু পড়া ও জানার চেষ্টা করেছেন। সাথে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাটাও চালিয়ে যান। এ বিষয়ে তাকে প্রয়োজনীয় পরামর্শ এবং দিক-নির্দেশনা দিয়েছেন নিসার উদ্দিন জামিল ও আব্দুর রহিম। সেসাথে তার ক্যালিগ্রাফি বিষয়ে শেখার সুযোগ হয়েছে দেশের নামকরা বিখ্যাত ক্যালিগ্রাফার মাহবুব মুর্শিদের কাছেও।


মাহবুব মুর্শিদ বিভিন্ন সময়ে কর্মশালার আয়োজন করেন। অংশগ্রহণকারীদের ক্যালিগ্রাফির কলাকৌশল শেখান। উসামাও একটি কর্মশালায় অংশ নিয়েছিলেন। সেটি তার চোখ খুলে দেয়। উসামা বলেন, কর্মশালায় অংশ নেয়ার পর আমার কাজে পরিবর্তন আসে। ক্যালিগ্রাফি পেইন্টিং নতুন করে বুঝতে শুরু করি। ক্যালিগ্রাফি নিয়ে স্বপ্ন দেখার শুরুও সেই থেকে।



উসামা গাজীপুর থেকে মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পাস করে উচ্চশিক্ষা এবং নিজের মনে লালিত স্বপ্ন বাস্তবায়নের উদ্দেশ্যে আসেন রাজধানী ঢাকায়। ভর্তি হন ঢাকার সর্বোচ্চ বিদ্যাপিঠ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। ঢাবির আরবি বিভাগ থেকে অনার্স এবং মাস্টার্স করেন। ঢাবিতে পড়াকালীন সিদ্ধান্ত নেন ক্যালিগ্রাফিকে প্রফেশনালি এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার।


মাস্টার্স পাস করা উসামার দুচোখ ভরা স্বপ্ন। ক্যালিগ্রাফিকে প্রফেশন হিসেবে নেয়ার বিষয়ে তার ভাষ্য, ছোট থাকতে আমাদের অনেককিছু ভালোলাগে কিন্তু বড় হওয়া পর্যন্ত বা বড় হওয়ার পর সেটা আর টিকে থাকে না। কিন্তু ক্যালিগ্রাফির প্রতি ছোট থাকতে আমার ভালোলাগা কাজ করতো। বড় হওয়ার পরেও সেই ভালোলাগা বরং আরো বেড়েছে। আমি মনে করি, যেই কাজ আমাদের করতে ভালোলাগে এবং যেটাতে আমি দক্ষ সেটাই প্রফেশন হিসেবে নেয়া উচিত। সেই ভাবনা থেকেই ক্যালিগ্রাফিকে প্রফেশন হিসেবে নিয়েছি।


উদ্যোক্তা উসামা আরবি বিভাগে পড়াশুনা করলেও ক্যালিগ্রাফির বিষয়বস্তু শুধু আরবিতে সীমাবদ্ধ রাখেননি। আরবির পাশাপাশি বাংলা, ইংরেজিতেও কাজ করেন তিনি। উসামা ক্যালিগ্রাফি করছেন দীর্ঘ ১৭ বছর। ৩/৪ বছর ধরে এটাকে তিনি পেশা হিসেবে নিয়েছেন। জলরং এবং এক্রেলিক রং মূলত এই দুই মাধ্যমে তিনি পেইন্ট করেন। ক্যালিগ্রাফির যতোগুলো ধরন আছে সবগুলো নিয়েই তিনি নিয়মিত কাজ করে যাচ্ছেন।



ক্যালিগ্রাফি যেকোনো ভাষায়ই হতে পারে। তবে কোরআনের আয়াতগুলোর ক্যালিগ্রাফি খুবই সুন্দর হয়। উসামা বাংলা ক্যালিগ্রাফিও করেন। অনেকে বিয়েতে নবদম্পতির নাম ক্যালিগ্রাফি করে উপহার দিতে চান। উসামা সে কাজও করে থাকেন। তিনি বিজনেস কার্ডের কাজও করে থাকেন।


উসামার অনেক কাজ জনপ্রিয় হয়েছে। আরবি ক্যালিগ্রাফির মধ্যে ‘রাব্বির হামহুমা কামা রাব্বায়ানি সাগিরা’ লেখাটি খুবই জনপ্রিয় হয় তার। এটি টিউন অব আর্ট নামের আন্তর্জাতিক শিল্প উৎসবে প্রদর্শিত হয়েছে ২০১৯ সালে। ‘আমি বাংলায় কথা কই’ তার আরেকটি সাড়া জাগানো কাজ। এই লেখার ফন্টস্টাইল (লিখনশৈলী) তার নিজের তৈরি। এতে বিশেষত্ব থাকায় মাহবুব মুর্শিদ স্যার তার অনেক প্রশংসা করেছেন।


অনলাইন প্লাটফর্ম উসামা’স ক্যালিগ্রাফির মাধ্যমেই মূলত কাজগুলো সেল করেন। দেশের প্রায় প্রতিটি জেলাতেই তার কাজ পৌঁছে গেছে। এমনকি দেশের গণ্ডি পেরিয়ে সৌদি, মালয়েশিয়া, অস্ট্রেলিয়া, আমেরিকা, কানাডা, ইতালিসহ বিভিন্ন দেশে পৌঁছে গেছে উদ্যোক্তা উসামার ক্যালিগ্রাফি।



উসামাকে ফেসবুকে কাজের অর্ডার দেয়া যায়। যেকোনো কাজের অর্ডার দিতে যেতে হবে এই লিংকে। উসামার কাজ দেখারও সুযোগ মিলবে এখানে। আদেশপত্র পেলে তিনি অর্ধেক টাকা অগ্রিম নেন।


দেশে ক্যারিয়ার হিসেবে ক্যালিগ্রাফির সম্ভাবনা কতটুকু? উসামা বলেন, দেশে এই ক্যারিয়ারের উজ্জ্বল সম্ভাবনা রয়েছে। এটা যে কেউ পরিপূর্ণ পেশা হিসেবে নিলে সুন্দর ভাবে জীবনযাপন করতে পারবেন। ক্যালিগ্রাফি রফতানি করে বিপুল বৈদেশিক মুদ্রাও অর্জন করা সম্ভব। ক্যালিগ্রাফিতে তুরস্ক, ইরান, মিসর এগিয়ে। আমাদের এখানেও ভালো কাজ হচ্ছে। অন্য অনেক দেশের শিল্পীরা আমাদের কাজ থেকে প্রেরণা নেন। বিদেশের বাজার ধরতে পারলে এ কাজ দিয়ে ভালোভাবে জীবন নির্বাহ সম্ভব।


নিজের অর্জিত জ্ঞান, দক্ষতা আর প্রতিভা শুধু নিজের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখতে নারাজ তরুণ আত্মপ্রত্যয়ী এই ক্যালিগ্রাফার। জ্ঞানের এই আলোকে তিনি সবার মাঝে ছড়িয়ে দিতে চান। এ উদ্দেশ্যে তিনি ক্যালিগ্রাফি পেইন্টিংয়ে যারা আগ্রহী এমন তরুণ-তরুণীদের ক্যালিগ্রাফি শেখাচ্ছেন। ২০২১ সালে ভার্চুয়ালিভাবে ৫০০ জনের বেশি শিক্ষার্থীকে ক্যালিগ্রাফি প্রশিক্ষণ দেন তিনি।



মহামারি করোনার কারণে দেশের অফিস আদালত, শিক্ষা, ট্রেনিং, সেমিনার, মিটিং সবকিছু যখন ভার্চুয়ালি করা হচ্ছে। সেখানে উসামাও তার প্রশিক্ষণ দেন অনলাইনে।


ভার্চুয়ালি প্লাটফর্মে ক্যালিগ্রাফি শেখার বিষয়ে উসামা বলেন, অনেকেই কনফিউশানে থাকেন অনলাইনে ক্যালিগ্রাফি কতটুকু শেখা যাবে বা বুঝতে পারবে কিনা। আবার অনেকেই বলে থাকেন জেনারেল ব্যাকগ্রাউন্ডের হয়ে ক্যালিগ্রাফি শিখতে পারবো কিনা। মূলত ক্যালিগ্রাফি শেখাটা নির্ভর করে নিজের অদম্য ইচ্ছে, আগ্রহ, আন্তরিকতা, ভালোবাসা এবং ট্রেইনারের সঠিক দিক-নির্দেশনা, শেখানো কৌশলের উপর। শুধু প্রশিক্ষণ নিলেই হবে না। প্রচুর অনুশীলনও করতে হবে। আমি আমার কোর্সে একদম বেসিক থেকে শুরু করি। বেসিক মজবুত হলে যেকোনো ধরনের কাজ সম্পূর্ণ নিজ থেকে সহজেই করা যাবে। ক্যালিগ্রাফি নিয়ে এগিয়ে যাওয়াটা সহজ হবে।


সব ক্যারিয়ারের শুরুতে অনেক চ্যালেঞ্জ থাকে। এই ক্যারিয়ারেও কিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে। তার ভাষ্য, গতানুগতিক ধারার বাইরে গিয়ে কাজ করতে গেলে অনেক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হয়। আমাকেও তাই হতে হয়েছে। ক্যালিগ্রাফি বিষয়ে শেখার প্রতিষ্ঠান নেই। যারা প্রফেশনাল তাদের কাছে গিয়ে আমাকে শিখতে হয়েছে। নিজের চেষ্টা, অধ্যবসায় ও কঠোর পরিশ্রমের ফলে একটু একটু করে শিখতে হয়েছে। যখন যেখানে প্রশিক্ষণ কোর্স করার সুযোগ পেয়েছি। সেখানেই অংশগ্রহণ করেছি। আমার মতে, ক্যালিগ্রাফি বিষয়ে শেখার প্রতি সচেতনতা বাড়াতে হবে। ট্রেনিং ইনস্টিটিউট বা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে হবে। এবিষয়ে অনেক গবেষণার দরকার আছে। তাহলে পরের প্রজন্ম এ বিষয়ে সুন্দর পরিবেশে শিক্ষা নিতে পারবে।



নিউ ইয়র্কে এক মসজিদের জন্য উসামার চারটি ক্যালিগ্রাফি পেইন্টিং নেয়া হয়েছে। সোনালী ব্যাংকের ২০২০ সালের ক্যালেন্ডারটি তার ক্যালিগ্রাফি দিয়ে করা হয়েছে। ২০১৯ সালে বাংলাদেশ চারুশিল্পী আয়োজিত প্রথম জাতীয় ক্যালিগ্রাফি প্রতিযোগিতায় বিশেষ পুরস্কার পেয়েছেন তিনি। একই বছর মইনিয়া ফাউন্ডেশন আয়োজিত দশম জাতীয় ক্যালিগ্রাফি প্রতিযোগিতায়ও প্রথম হয়েছেন। দোহায় অনুষ্ঠিত ওআইসি ইয়ুথ ক্যাপিটাল ইনোভেশন অ্যাওয়ার্ড শীর্ষক প্রতিযোগিতার চূড়ান্ত পর্বে জায়গা করে নেন অধ্যবসায়ী এই ক্যালিগ্রাফার।


ক্যারিয়ার নিয়ে অনেক দূর যেতে চান স্বপ্নবাজ এই উদ্যোক্তা। অনেক কাজ করতে চান তিনি। কাজের মাধ্যমে মানুষের কাছে পৌঁছাতে চান। কাজের মধ্যেই মানুষের মনে জায়গা করে নিতে চান তিনি। উসামা বলেন, একদিন আমি হয় তো এ পৃথিবীতে থাকবো না। কিন্তু আমার কাজ বেঁচে থাকবে। মানুষের মনকে অভিভূত করবে। আর একটা বিষয় দেশে ক্যালিগ্রাফি শেখার কোনো ইনস্টিটিউট নেই। সবাই ব্যাক্তিগত পর্যায় থেকেই শিখছেন। বিশেষ করে জেনারেল ব্যাকগ্রাউন্ডের ছাত্ররা ক্যালিগ্রাফির প্রতি আগ্রহ থাকলেও নানান জটিলতার কারণে ক্যালিগ্রাফি শিখতে পারছেন না। সবাই যেনো সহজভাবে ক্যালিগ্রাফি শিখতে পারেন সেই ক্ষেত্রটি আমি তৈরি করতে চাই। আমার ইচ্ছে আছে একটা ট্রেনিং ইনস্টিটিউট গড়ে তোলার।


বিবার্ত/গমেজ/জহির

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

পদ্মা লাইফ টাওয়ার (লেভেল -১১)

১১৫, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ,

বাংলামোটর, ঢাকা- ১০০০

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2021 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com