মাদক কারবারি, দিনমজুর থেকে কোটিপতি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার জালাল
প্রকাশ : ১৮ আগস্ট ২০২২, ১৬:০৮
মাদক কারবারি, দিনমজুর থেকে কোটিপতি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার জালাল
ব্রাহ্মণবাড়িয়া প্রতিনিধি
প্রিন্ট অ-অ+

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বিজয়নগর উপজেলার শীর্ষ এক মাদক কারবারি ও তার আরো চার অংশীদারকে গত ৩০ জুলাই রাতে ৪৫ লাখ টাকা মূল্যের মাদকসহ আটক করেছে ব্রাহ্মণবাড়িয়া মাদক বিরোধী টাস্কফোর্সের সদস্যরা।


সেই মাদক সম্রাট ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বিজয়নগর উপজেলার বিষ্ণপুর গ্রামের জালাল মিয়া (৫২) মাদকসহ আটকের পর এখন রয়েছেন কারাগারে, যিনি মাদক কারবারির মাধ্যমে গড়ে তুলেছেন অঢেল সম্পদ-আলিশান বাড়ি। গ্রেফতারের পর তদন্তে এ তথ্য উঠে আছে।


জেলা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের সহকারী পরিচালক মো. মিজানুর রহমান জানান, মাদকের ব্যবসা করে বাড়ি-গাড়ি ও বিশাল সম্পত্তির মালিক হওয়া জালাল এক সময় দিনমজুর ছিল। তার প্রকৃত বাড়ি বিজয়নগরের পার্শ্ববর্তী হবিগঞ্জের‌ মাধবপুর উপজেলার মনতলা গ্রামে। আনুমানিক আট বছর বয়সে জালালের মা মারা যাওয়ার পর তার বাবা দ্বিতীয় বিয়ে করেন। এরপর রাগ করে বাড়ি থেকে বেরিয়ে বিজয়নগরের কালাছড়া গ্রামে আশ্রয় নেয় জালাল। সেখানে মানুষের বাড়িতে কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করত সে। এভাবে প্রায় তিন বছর যাওয়ার পর কালো পেশার সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে জালাল।


জালালের বরাত দিয়ে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের এই কর্মকর্তা জানান, একেবারে ভারত সীমান্ত ঘেঁষা গ্রাম কালাছড়ার অনেকেই বহু বছর আগে থেকে সীমান্ত এপার-ওপার ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। আশির দশকে ওই গ্রামের এক চোরাচালানি চিনি ও শাড়ি পাচার করতে শ্রমিক হিসেবে জালালকে বেছে নেয়। এভাবে কয়েক বছর যাওয়ার পর অধিক মুনাফার লোভে জালাল নিজেই মাদক পাচারের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে। এরই মধ্যে যুবক হয়ে ওঠা জালাল ওই এলাকার প্রভাবশালী ইউপি সদস্য ও চোরাকারবারি হানিফ মিয়ার শ্যালিকাকে বিয়ে করেন। এরপর থেকে আর পিছন ফিরে তাকাতে হয়নি জালালকে।


এই কর্মকর্তা আরো জানান, সেই টোকাই জালাল এখন কালাছড়ার পার্শ্ববর্তী বিষ্ণুপুর রানওয়ে বাজার সংলগ্ন এলাকায় জমি কিনে দৃষ্টিনন্দন দ্বিতল ভবন গড়ে তুলেছেন। এছাড়া কালাছড়া গ্রামে তিনি পাকা ভবন তৈরি করেছেন। বিষ্ণুপুরের বাড়ি সংলগ্ন বাজারে কয়েকটি দোকানও রয়েছে তার। ইতোমধ্যে চারটি বিয়ে করেছেন তিনি। প্রথম স্ত্রী মারা যাওয়ার পর আখাউড়ায় দ্বিতীয় বিয়ে করেন। একই উপজেলার আজমপুর গ্রামে তৃতীয় বিয়ে করেন। বিষ্ণুপুর গ্রামে চতুর্থ বিয়ে করে সেখানকার দোতলা ভবনে সেই স্ত্রীকে নিয়ে বসবাস করেন তিনি। এর মধ্যে দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্ত্রী'র সঙ্গে বিবাহ বিচ্ছেদ ঘটে তার। চার মেয়ে ও দুই ছেলে সন্তানের জনক জালাল।


মাদকবিরোধী টাস্কফোর্সের অভিযানে জালালের সঙ্গে গ্রেফতার হওয়া পাঁচজনসহ পলাতক আরো পাঁচজনের নামে বিজয়নগর থানায় মামলা দায়ের করা হয়। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের উপ-পরিদর্শক (এসআই) মো. রেজাউল করিম বাদী হয়ে মামলাটি দায়ের করেন। মামলায় উল্লেখ করা হয়, কালাছড়া গ্রামের হান্নান মিয়ার দোকানের পশ্চিম পাশের কাঁচা রাস্তার উপর থেকে ১০০ কেজি গাঁজা, ১ হাজার ৬৯৭ পিস ইয়াবা এবং ৭১০ বোতল ফেন্সিডিল ও স্কফ উদ্ধার করা হয়।


একই উপজেলার সিঙ্গারবিল ইউনিয়নের কাশিনগর গ্রামের আরেক মাদক কারবারি জাহাঙ্গীর আলম (৫৫) এর বাড়িতেও রয়েছে আলিশান দোতলা ভবন। প্রায় ২০ বছর আগে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণের আগে ত্রিপুরা রাজ্য থেকে মাদক পাচারকালে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর সদস্যরা তাকে লক্ষ্য করে গুলি করেন। সেই গুলি তার বাম হাতে বিদ্ধ হওয়ার পর তিনি এলাকা থেকে পালিয়ে অন্যত্র গিয়ে চিকিৎসা নিয়ে বিদেশে পাড়ি জমালেও ফের দেশে এসে তার বড় ছেলে জুয়েলকে নিয়ে পুরোদমে আগের পেশায় জড়িয়ে পড়েন। গ্রামের বাড়িতে খুচরা মাদকের স্পট পরিচালনা করে এবং রাজধানীসহ সারাদেশে বড় বড় মাদকের চালান পাঠিয়ে কয়েক বছরের মধ্যেই কোটিপতি বনে যান তিনি।


কুখ্যাত এই মাদক ব্যবসায়ীকে ধরতে গত ১১ আগস্ট বৃহস্পতিবার তার বাড়িতে অভিযান চালায় র‌্যাবের ভৈরব ক্যাম্পের সদস্যরা। অভিযানে মাটিতে পুঁতে রাখা অবস্থায় ২১৩ বোতল স্কফ উদ্ধারসহ তার তিন সহযোগী আমজাদ হোসেন, মাসুম মিয়া ও মো. আকিবকে আটক করেন। এসময় জাহাঙ্গীর ও তার ছেলে জুয়েল দৌড়ে পালিয়ে যায়। পরদিন ১২ আগস্ট র‌্যাবের কর্মকর্তা মো. আনোয়ার হোসেন বাদী হয়ে বিজয়নগর থানায় জাহাঙ্গীরসহ চারজনের নামে মামলা দায়ের করেন।


মামলা দায়েরের দু'দিন পর বিজয়নগর থানার উপপরিদর্শক শরিফুল ইসলাম কাশিনগর গ্রামে বাড়ির সামনে থেকে জাহাঙ্গীরকে আটক করে ওই মামলায় গ্রেফতার দেখিয়ে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠান। এর আগেও পার্শ্ববর্তী আখাউড়া থানায় তার নামে মাদক পাচারের একাধিক মামলা রয়েছে।


বিজয়নগর উপজেলায় মাদক পাচারের বিষয়ে জানতে চাইলে থানার ওসি রাজু আহমেদ বলেন, মাদকের বিরুদ্ধে বিজয়নগর থানার পুলিশ নিয়মিত অভিযান চালাচ্ছে। গত কয়েকদিনে পুলিশের চারটি পৃথক অভিযানে প্রায় ১১৪ কেজি গাঁজা ও একটি প্রাইভেটকার উদ্ধার এবং জাহাঙ্গীরসহ তিনজনকে আটক করা হয়েছে।


তিনি সবেমাত্র এই থানায় যোগদান করেছেন জানিয়ে বলেন, পুরো উপজেলার মাদক ব্যবসায়ীদের তালিকা প্রস্তুত করা হচ্ছে এবং সেই তালিকা অনুযায়ী নিয়মিত অভিযান চলবে।


বিবার্তা/নিয়ামুল/জামাল

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

পদ্মা লাইফ টাওয়ার (লেভেল -১১)

১১৫, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ,

বাংলামোটর, ঢাকা- ১০০০

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2021 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com