ধারাবাহিক পর্ব - ১
পদ্মা সেতু: স্থল বন্দরের ভোগান্তি দূর; আমদানি-রপ্তানির তড়িৎগতি
প্রকাশ : ২০ জুন ২০২২, ০৮:১২
পদ্মা সেতু: স্থল বন্দরের ভোগান্তি দূর; আমদানি-রপ্তানির তড়িৎগতি
মো. নয়ন হোসেন, শার্শা উপজেলা প্রতিনিধি, যশোর
প্রিন্ট অ-অ+

সব কাজ প্রায় শেষ, এখন শুধু অপেক্ষায় বাংলাদেশের প্রতিটি মানুষ বহু প্রতীক্ষিত স্বপ্ন পূরণের। আগামী ২৫ জুন চালু হচ্ছে দেশের সর্ববৃহৎ সেতু "পদ্মা সেতু"। স্বপ্নের এই সেতু চালু হলেই দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষের ভাগ্য বদলে নতুন দিগন্ত উন্মোচন হবে। এই সেতু ঘিরেই সোনালী ভবিষ্যত দেখতে পাচ্ছেন এই অঞ্চলের ২১ জেলার মানুষ। পদ্মা সেতু চালু হলে রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশের সঙ্গে এ অঞ্চলের যোগাযোগ ব্যবস্থা সহজ হবে।


পদ্মা সেতু চালু হলে দেশের সর্ববৃহৎ স্থল বন্দরের চালকরা পাঁচ-ছয় ঘণ্টায় ঢাকা থেকে বেনাপোল স্থলবন্দরে পৌঁছানোর আশায় করছেন। এর ফলে আমদানি-রপ্তানির পরিমাণও বাড়তে পারে বলে ধারণা করছেন সংশ্লিষ্টরা। এছাড়া পদ্মা সেতু এশিয়ান হাইওয়েতে যুক্ত থাকায় বিবিআইএন চুক্তির আওতায় বাংলাদেশ, ভুটান, ভারত ও নেপালের মধ্যে যাত্রী, ব্যক্তিগত এবং পণ্যবাহী যান চালু হলে বেনাপোল বন্দরের গুরুত্ব আরও বেড়ে যাবে।


সরেজমিনে পরিদর্শন করে জানা যায়, বেনাপোল স্থল বন্দর থেকে ঢাকার দূরত্ব প্রায় দুইশত পঞ্চাশ কিলোমিটার। কিন্তু পদ্মা পাড়ের বিড়ম্বনায় এক রাত তো লাগেই, প্রায়ই দুই দিনের বেশি লেগে যায়। আবার অনেক চালকের দাবি, দুই-তিনদিন তাদের ঘাটের ( পৌঁছাতে পারে না) ঐ পাশে পৌঁছাতে সময় লেগে যায় মাঝে মধ্যে। এদিকে ঢাকা শহরের কেন্দ্রে দিনের বেলায় ট্রাক চলা নিষিদ্ধ হওয়ায় বিপাকে পড়েন চালকরা। দীর্ঘ সময় ব্যয় করে পদ্মার এপাড়ে এসে আবার ঢাকায় প্রবেশ করার জন্য রাতের অপেক্ষায় সারাদিন বসে এবং অযথা সময় নষ্ট করতে হয়। পদ্মার এপাড়-ওপাড় কোথাও-ই যেন ভোগান্তির শেষ নাই।



পদ্মা সেতুর মাধ্যমে যোগাযোগ ব্যবস্থা কতটুকু পরিবর্তন আসবে এই বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে, যশোর-১ (শার্শা) আসনের সংসদ সদস্য শেখ আফিল উদ্দিন পদ্মা সেতু দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চলের জীবনযাত্রা, পর্যটন, পরিবহন, অর্থনীতি, চিকিৎসা সর্বোপরি সামগ্রিক উন্নয়নে বিশেষ অবদান রাখবে বলে আশা প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, যশোর অঞ্চলের মানুষের স্বপ্ন ছিল পদ্মা সেতুর ওপর দিয়ে ঢাকায় যাবে। তাছাড়া দেশের সর্ববৃহৎ স্থলবন্দর বেনাপোলের গুরুত্ব আরও বাড়বে।


বেনাপোল স্থল বন্দরের উপ-পরিচালক (ট্রাফিক) মামুন কবীর তরফদার বিবার্তাকে মুঠোফোনে বলেন, পদ্মা সেতু চালু হলে সেতুর কারণে যোগাযোগ ব্যবস্থা সহজ হবে। বন্দরে কয়েকগুণ কাজের গতি বাড়বে। সেতু চালু হলে অনেক ব্যবসায়ী জলপথে চট্রগ্রাম ও মংলা বন্দর ব্যবহারের বদলে বেনাপোল বন্দর ব্যবহার করতে পারবেন।


পদ্মা সেতুর হলে সুযোগ সুবিধা জানতে বেনাপোলের স্থল বন্দরের কয়েকজন ট্রাকচালকের সাথে কথা হয় বিবার্তার।


এই বিষয়ে ট্রাক চালক আশিকুর রহমান বলেন, আসলেই পদ্মা সেতু দিয়ে যাতায়াত করবো এটা আমাদের ( ট্রাকচালক) স্বপ্ন। আমাদের ভোগান্তি কমবে সেতু চালু হলে বেঁচে যাই। অল্প সময়ের মধ্যে বেনাপোল থেকে ঢাকা পৌঁছাতে পারবো।


ট্রাক চালক মুজিবর রহমান বলেন, বেনাপোল বন্দর থেকে গত সাত বছর বিভিন্ন ধরনের পণ্যদ্রব্য নিয়ে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত প্রতিনিয়ত যাই এবং ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে নানা ধরনের পণ্য বেনাপোল-যশোর-সাতক্ষীরা নিয়ে আসি। কিন্তু এই চালক জীবনে দুর্ভোগ এতদিন পর কমবে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যে বিশাল পদ্মা সেতু নির্মাণ করেছেন তা সত্যিই আমাদের গর্বের বিষয়। এখন আমাদের আর ফেরির অপেক্ষায় রাতের পর রাত, দিনের পর দিন অপেক্ষা করা লাগবে না। আগে আমাদের ফেরি পার হওয়ার সময় কখনও নাব্য সংকট, কখনও বেশি স্রোত, কখনও ঘাটে যানজট। সারা বছর একটা না একটা বিপদ লেগেই থাকে। সেটার সমাধান হচ্ছে। তিনি আরো বলে , পদ্মা সেতু চালু হলে বেনাপোল বন্দর থেকে ঢাকা বা নারায়ণগঞ্জের কারখানায় একটি পণ্যচালান পাঁচ ঘণ্টায় পৌঁছে দেওয়া যাবে। এতে পরিবহন শ্রমিক, মালিক, কারখানা মালিক বা আমদানিকারক সবারই কষ্ট লাঘব হবে বলে জানায়।



বেনাপোলের ট্রাকচালক জাহিদ হাসান বলেন , বেনাপোলসহ শার্শা উপজেলা থেকে অনেক সময় বিভিন্ন ধরনের কাঁচামাল নিয়ে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে যাতায়াত করে। যা ঢাকা যেতে ফেরি পারের রাস্তায় এ জাতীয় মালামাল বহনে খুব রিস্ক নিয়ে পারাপার হতে হয় । আবার অন্যদিকে ট্রাকে কাঁচামাল তুললে দিনের দিন পৌঁছে দিতে হয়। তাই যমুনা সেতু হয়ে যেতে হয়। এতে পরিবহন খরচ বাড়ে। আমাদেরও খুব কষ্ট হয়। পদ্মা সেতু চালুর পর কাঁচামাল নিয়ে গিয়ে আবার রপ্তানির মাল নিয়ে দিনে দিনে বেনাপোল ফিরতে পারব।


এদিকে পদ্মা সেতুর উদ্বোধন ঘিরে ট্রাক চালকদের মধ্যে বাড়তি আনন্দের সৃষ্টি হচ্ছে। উন্নয়নের অগ্রগতি এভাবেই এগিয়ে নিয়ে যাওয়ায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতি কৃতজ্ঞতা ও ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেছেন অনেকে। অনেকে বলছেন, সেতু উদ্বোধনের পরপরই সেতুর উপর দিয়ে প্রথম যাতায়াতটা আমাদের জীবনের স্মৃতি হয়ে থাকবে এবং গর্ব করে বলবো আমাদের নিজের অর্থে এই (পদ্মা) সেতু।



বিশাল ট্রান্সপোর্ট এজেন্সির মালিক সাইদুল ইসলাম বলেন, অনেক সময় বেনাপোল বন্দর থেকে জরুরি আমদানি পণ্য ঢাকায় এবং চট্রগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন বিভাগ ও জেলায় পাঠাতে হয়। যা পূর্বে ফেরি সংকট ও যানজটের কারণে পণ্যবাহী ট্রাকগুলো দীর্ঘ সময় ঘন্টার পর ঘন্টা অপেক্ষায় থাকতে হয়। যার কারণে বাড়তি টাকা গুনতে হয়।


বেনাপোল চেকপোস্টের মানি এক্সচেঞ্জ ব্যবসায়ী আবুল বাশার বলেন, আমরা শতভাগ বিশ্বাস করি পদ্মা সেতু তৈরির ফলে বেনাপোল বন্দর দিয়ে ভারতগামী যাত্রী চলাচল বাড়বে। যার ফলে আগের চেয়ে পর্যটক যাতায়াত ও আমদানি-রপ্তানি ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের আসা-যাওয়া বাড়বে। মানি এক্সচেঞ্জ ব্যবসারও প্রসার ঘটবে।


সর্বোপরি, বেনাপোল স্থলবন্দরের সাথে সংশ্লিষ্ট সকলেই মনে করছেন পদ্মা সেতু বদলে দেবে স্থলবন্দরের চিত্র, সহজ ও তড়িৎ আমদানি-রপ্তানিতে দেশের অর্থনীতি শক্তিশালী তো হবেই, সেই সাথে স্বস্তিতে থাকবে চালক, ব্যবসায়ীসহ সংশ্লিষ্ট সকলেই।


বিবার্তা/রোমেল/এসবি

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

পদ্মা লাইফ টাওয়ার (লেভেল -১১)

১১৫, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ,

বাংলামোটর, ঢাকা- ১০০০

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2021 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com