বঙ্গবন্ধুর বিরোধিতাকারীর নামে ঢাবিতে ট্রাস্ট ফান্ড!
প্রকাশ : ১২ মে ২০২২, ১৯:৩৪
বঙ্গবন্ধুর বিরোধিতাকারীর নামে ঢাবিতে ট্রাস্ট ফান্ড!
মহিউদ্দিন রাসেল
প্রিন্ট অ-অ+

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বিরোধীতাসহ মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের নানা বিভ্রান্তি ছড়ানোর দায়ে অভিযুক্ত প্রয়াত সাংবাদিক এ.জেড.এম. এনায়েতুল্লাহ খানের নামে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ট্রাস্ট ফান্ড গঠন করা হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগে গঠিত এই ফান্ডের নাম 'এনায়েতুল্লাহ খান স্মৃতি ট্রাস্ট ফান্ড'। এদিকে এই ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয়ের সংশ্লিষ্ট মহলে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া শুরু হয়েছে।


১০ মে (মঙ্গলবার) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য লাউঞ্জে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে এই ট্রাস্ট ফান্ড প্রতিষ্ঠার জন্য প্রয়াত এ.জেড.এম. এনায়েতুল্লাহ্ খানের মেয়ে নাসরীন জামান ২৫ লাখ টাকার একটি চেক হস্তান্তর করেন। অনুষ্ঠানে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. আখতারুজ্জামান প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন।


এছাড়াও, এই অনুষ্ঠানে রাশেদ খান মেনন এমপি, বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার প্রবীর কুমার সরকার, সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. জিয়া রহমান, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. আবুল মনসুর আহাম্মদ এবং দাতা পরিবারের সদস্য আবু সালেহ মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ খান উপস্থিত ছিলেন।


এ সময় উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. আখতারুজ্জামান ট্রাস্ট ফান্ড প্রতিষ্ঠার জন্য দাতা নাসরীন জামানকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানান। এই ট্রাস্ট ফান্ডের মাধ্যমে গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষার্থীরা অনুপ্রাণিত ও উপকৃত হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।


এই দিকে এই ট্রাস্ট গঠনের পর পরই শুরু হয়েছে তীব্র সমালোচনা। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও বইছে প্রতিবাদের ঝড়।


এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক ড. কাবেরী গায়েন বিবার্তাকে বলেন, আমাদের বিভাগে এইরকম একটি ট্রাস্ট ফান্ড গঠন করা হয়েছে। আমরা এটা জানতাম না। পরবর্তীতে এক গণমাধ্যমের বরাতে এই বিষয়ে জানতে পারি।


তিনি বলেন, ইতিহাস স্বাক্ষ্য দেয় যে,এনায়েতুল্লাহ্ খান বঙ্গবন্ধুর তীব্র সমালোচক ছিলেন। তিনি বঙ্গবন্ধুর আমলে অনেক অপপ্রচার চালিয়েছেন বলেও আমরা সাক্ষ্য পাই। আমি এটাই বলতে পারি। তবে আমাদের মাননীয় উপাচার্য নিশ্চয় এই বিষয়গুলো সম্পর্কে জানেন। এখন উনারা কি বিবেচনায় নিয়েছেন, সেটা আমি বলতে পারছি না। আর ডিপার্টমেন্টের বিষয়ে যদি বলি, তাহলে বলবো আমরা জানতাম না।


এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের সাবেক ডিন অধ্যাপক ড.সাদেকা হালিম বিবার্তাকে বলেন, আমাদের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বরেণ্য ব্যক্তিদের নামে ট্রাস ফান্ড গঠন করে থাকে। কিন্তু সেখানে এমন ব্যক্তির নামে ট্রাস্ট কেন হবে- যিনি স্বাধীনতার মহান স্থপতি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে নিয়ে আঙুল তুলেছেন, নানা বিভ্রান্তি ছড়িয়েছেন। আমাদের টাকার এতোই অভাব পড়েছে যে, আমরা যাচাই-বাছাই না করে যার তার নামে ট্রাস্ট গঠন করছি।


তিনি বলেন, এনায়েতুল্লাহ্ খান বিভিন্ন সময়ে বঙ্গবন্ধুকে তিরস্কার করেছেন, তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করেছেন। সাংবাদিকতার আড়ালে তিনি সবসময় বঙ্গবন্ধুকে ছোট করতে চেয়েছেন। তার সাপ্তাহিক হলিডে পত্রিকা এদেশের স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে নানা বিভ্রান্তি ছড়িয়েছে৷ পরবর্তীতে এ পত্রিকা বন্ধ করে দেয়া হয়।


তিনি আরো বলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশের স্বাধীনতার সূতিকাগার। আর বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার স্থপতি এবং এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। তাঁর নেতৃত্বে এদেশ স্বাধীন হয়েছে। ঢাবি বঙ্গবন্ধুকে একসময় বহিষ্কার করলেও আমরা তা তুলে নিয়েছি। কারণ, বঙ্গবন্ধু মানে বাংলাদেশ। আর ঢাবির সাথে বঙ্গবন্ধু ওতোপ্রোতো ভাবেই জড়িত। অথচ বঙ্গবন্ধুর বিরোধীতা কারীর নামেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ফান্ড হচ্ছে! এটা ভাববার বিষয়।


সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের বর্তমান ডিন অধ্যাপক ড. জিয়া রহমান বিবার্তাকে বলেন, আমাকে দাওয়াত দেয়া হয়েছে। এজন্য আমি অনুষ্ঠানে গিয়েছি। এর বেশি এই ট্রাস্ট সম্পর্কে আমি জানি না। আপনি সাংবাদিকতা বিভাগসহ সংশ্লিষ্টদের সাথে যোগাযোগ করতে পারেন।


এ বিষয়ে জানতে গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. আবুল মনসুর আহাম্মদকে একাধিকবার ফোন দিলেও তিনি রিসিভ করেননি। এমনকি তার ফোনে ক্ষুদেবার্তা পাঠানো হলেও কোনে সাড়া পাওয়া যায়নি।


এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ উপাচার্য (শিক্ষা) অধ্যাপক ড. এ এস এম মাকসুদ কামাল বিবার্তাকে বলেন, প্রথম কথা হলো, ট্রাস্ট ফান্ড গঠনের সাথে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ উপাচার্য (শিক্ষা) হিসেবে আমাদের কোনো সংশ্লিষ্টতা নাই। তবে এর সাথে সংশ্লিষ্ট বিভাগ কোন বিবেচনায় এই ট্রাস্ট ফান্ড গঠন করেছেন, সেটি তারা বলতে পারবেন। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে বিভ্রান্তি সৃষ্টিকারীর নামে ট্রাস্ট ফান্ড গঠন কোনোভাবে কাম্য নয় বলে মন্তব্য করেন তিনি।


তবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ উপাচার্য (প্রশাসন ) অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ সামাদ বিবার্তাকে বলেন, সপ‌রিবা‌রে বাংলা‌দে‌শের স্বাধীনতার স্থপ‌তি জা‌তির পিতা বঙ্গবন্ধুকে নির্মমভা‌বে হত্যা করার পর এনা‌য়েতুল্লাহ খান সম্পা‌দিত সাপ্তা‌হিক হ‌লি‌ডে প‌ত্রিকায় নিয়াজ জামান কর্তৃক লেখা হ‌য়েছি‌লো: "the Bengali majors...destroyed the serpent and his eggs-- except for two daughters who were out of the country. (বাঙা‌লি মেজররা... সর্পটা এবং তার বাচ্চা‌দের ধ্বংস ক‌রে‌ছে; দে‌শের বাই‌রে অবস্থান করা দুই কন‌্যা ব‌্যতীত)।" সেই সাংবা‌দিকের না‌মে স্বাধীনতার সূ‌তিকাগার ঢাকা বিশ্ব‌বিদ্যালয়ে ট্রাস্ট ফান্ড গ‌ঠিত হওয়ায় আ‌মি বিস্মিত ও মর্মাহত হ‌য়ে‌ছি।


তিনি বলেন, আমার জানা ম‌তে, গণ‌যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ এই বিষ‌য়ে অব‌হিত নয়। অতী‌তে এমন ট্রাস্ট ফান্ড বা‌তিল করা হ‌য়ে‌ছে। এই ট্রাস্ট ফান্ড বা‌তি‌ল করা উ‌চিৎ।


সার্বিক বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. আখতারুজ্জামান বিবার্তাকে বলেন, এ বিষয়ে তো জানতে হবে। উনি জনাব রাশেদ খান মেননের ভাই ছিলেন। অন্য তথ্যগুলো তো আমাদের জানা নেই।


তিনি বলেন, উনি (মেনন) সাংবাদিকতা বিভাগের জন্য এটা দিয়েছে। উনি এটার উদ্যোক্তা। এই রকম হলে ব্যবস্থা নেয়া যাবে। অন্য যে তথ্যগুলো তুমি বলেছো, সেগুলো হলে তো খুবই দুঃখজনক।


উল্লেখ্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন শিক্ষার্থী এ.জেড.এম. এনায়েতুল্লাহ্ খান পেশায় সাংবাদিক হলেও তার বিভিন্ন ভূমিকা নিয়ে রয়েছে প্রশ্ন। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের শাসনামলসহ বিভিন্ন বিষয়ে তিনি নানা ভাবে বিভ্রান্তি ছড়িয়েছেন। এমনকি তার সম্পাদিত পত্রিকা সাপ্তাহিক হলিডেও মুক্তিযুদ্ধ ও বঙ্গবন্ধুর ইতিহাস বিকৃত করেছে। পরবর্তীতে এ পত্রিকা বন্ধ করে দেয়া হয়।


বিবার্তা/রাসেল/জেএইচ

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

পদ্মা লাইফ টাওয়ার (লেভেল -১১)

১১৫, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ,

বাংলামোটর, ঢাকা- ১০০০

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2021 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com