সদ্য আ.লীগে যোগ দেয়া রাজাকারপুত্র পেলেন নৌকা প্রতীক
প্রকাশ : ২৪ অক্টোবর ২০২১, ০৮:৩৪
সদ্য আ.লীগে যোগ দেয়া রাজাকারপুত্র পেলেন নৌকা প্রতীক
সোহেল আহমদ
প্রিন্ট অ-অ+

৫৪ বছর ধরে আওয়ামী লীগের রাজনীতি করছেন মো. আব্দুল আজিজ হাওলাদার। পটুয়াখালীর মির্জাগঞ্জ উপজেলার ৪নং দেউলী সুবিদখালী ইউনিয়নের বর্তমান চেয়ারম্যান তিনি। তৃতীয় ধাপের ইউপি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে এই ইউনিয়নে। নৌকা প্রতীকে মনোনয়নের জন্য চারজনের একটি তালিকা কেন্দ্রে পাঠিয়েছিলো উপজেলা আওয়ামী লীগ। সেই তালিকার ১ নম্বরে ছিলো আব্দুল আজিজ হাওলাদারের নাম। তবে তিনি নন, আওয়ামী লীগের নৌকা প্রতীকের মনোনয়ন পেয়েছেন রাজাকার সন্তান এবং সাবেক বিএনপি নেতা আনোয়ার হোসেন খান।


সূত্রে জানা গেছে, মাত্র চার মাস আগে বিএনপি থেকে আওয়ামী লীগে যোগ দিয়েছেন বিএনপি নেতা আনোয়ার হোসেন খান। দলে যোগ দিয়েই পেয়ে গেছেন মির্জাগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতির পদ। গত ২২ অক্টোবর আওয়ামী লীগের দফতর সম্পাদক স্বাক্ষরিত কাগজে তাকে ৪নং দেউলী সুবিদখালী ইউনিয়নে চেয়ারম্যান পদে নৌকা প্রতীকের মনোনয়ন দেয়ার বিষয়টি জানানো হয়।


এদিকে, মুক্তিযুদ্ধের বিরোধীতা করা পরিবারের সদস্যকে মনোনয়ন দেয়ায় এলাকার ত্যাগী ও দুঃসময়ের নেতা-কর্মীদের মনে চরম ক্ষোভ ও হতাশার সৃষ্টি হয়েছে। আনোয়ার হোসেন খান আওয়ামী লীগ করেন এবং নৌকা প্রতীক পেয়েছেন এ খবর শুনে নিজেই হতবাক স্থানীয় সংসদ সদস্য ও সাবেক ধর্ম প্রতিমন্ত্রী শাহজাহান মিয়া।


দলে যোগ দেয়ার চার মাসের মাথায় সহ-সভাপতি পদ দেয়া বিষয়ে স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতারা বলছেন, জেলা আওয়ামী লীগ কমিটির অনুমোদন দিয়েছে। এক্ষেত্রে তাদের কিছুই করার নেই। আর নৌকা প্রতীক পাওয়ার ব্যাপারে স্থানীয় আ.লীগ নেতাদের মন্তব্য কেন্দ্র সিদ্ধান্ত দিয়েছে। তাই তারা অনেকটা বাধ্য হয়েই সিদ্ধান্ত মেনে নিচ্ছেন।



স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, আনোয়ার হোসেন খানের বাংলাদেশ ছাড়াও যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকত্ব রয়েছে। তিনি মির্জাগঞ্জ উপজেলা বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। প্রভাবশালী এক আওয়ামী লাগ নেতার যোগসাজশে দলে যোগ দেয়ার চার মাসের মাথায় ইউপি নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে প্রতিদ্বিন্দ্বিতার জন্য নৌকা প্রতীকের মনোনয়ন পান তিনি। বিএনপি নেতা ও শান্তি কমিটির সদস্যের ছেলেকে মনোনয়ন পাইয়ে দিতে আর্থিক লেনদেনেরও অভিযোগ রয়েছে।


শান্তি কমিটির সদস্যের সন্তান ও বিএনপি নেতার মনোনয়ন বাতিল চেয়ে শনিবার (২৩ অক্টোবর) আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা বরাবরে আবেদন করেছেন ৪নং দেউলী সুবিদখালী ইউনিয়নের বর্তমান চেয়ারম্যান আব্দুল আজিজ হাওলাদার। আবেদনে তিনি জানান, নৌকা মনোনয়ন পাওয়া আনােয়ার হোসেন খানের পিতা মৃত. জেন্নাত আলী খান ১৯৭১ সালে শান্তি কমিটির সদস্য ছিলেন। তাদের সমগ্র পরিবার বিগত সময়ে বিএনপির রাজনীতির সাথে সক্রিয়ভাবে জড়িত ছিলো। যাকে মনোনয়ন দেয়া হয়েছে তিনি কখনো আওয়ামী লীগের রাজনীতির সাথে জড়িত ছিলেন না। তিনি ১৯৯৭ সাল থেকে ২০০২ সাল পর্যন্ত মির্জাগঞ্জ উপজেলা বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্বে ছিলেন। এরপর ২০০৩ সালে থেকে চলতি বছর পর্যন্ত জেলা বিএনপির সম্মানিত সদস্য হিসেবে ছিলেন।


আনোয়ার হোসেন খানের চাচা অন্নাত আলী খান ১৯৭১ সালে শান্তি কমিটির সদস্য ছিলেন। তার চাচাতো ভাই আবুল হাসেম খান ছিলেন মির্জাগঞ্জ উপজেলা জাগো দলের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি। এছাড়া তার বড় বোনের ছেলে খান মো. আবু বকর সিদ্দিকী। যিনি বিগত দুই মেয়াদে উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে নৌকা প্রতীকের বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করেছেন। স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতারা বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।


এ বিষয়ে জানতে চাইলে পটুয়াখালী-১ আসনের সংসদ সদস্য ও সাবেক ধর্ম প্রতিমন্ত্রী শাহজাহান মিয়া বিবার্তাকে বলেন, আমি ২৮ বছর ধরে জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ছিলাম। আনোয়ার হোসেন খান-এর পরিবার আওয়ামী লীগের নয়। এর আগে সে আওয়ামী লীগ করেছে এমন তথ্যও আমার জানা নেই। বর্তমানে কিভাবে আওয়ামী লীগ হয়েছে সেটাও আমি জানি না। সে যদি নৌকা প্রতীক পায় কিছু বলার নাই।


মির্জাগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক জসিম উদ্দিন জুয়েল বিবার্তাকে বলেন, সে (আনোয়ার হোসেন খান) আগে বিএনপি করতো। চার-পাঁচ মাস আগে কমিটি অনুমোদন হয়েছে। জেলা আওয়ামী লীগ সেই কমিটি অনুমোদন দিয়েছে। সেই অনুমোদনে উনি উপজেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি। তার পরিবারের কয়েকজন শান্তি কমিটির সদস্য ছিলেন, এ নিয়ে উপজেলা আওয়ামী লীগের আগের সাধারণ সম্পাদক একটা রেজুলেশন দিয়েছিলেন।


তিনি বলেন, নৌকা প্রতীকে মনোননের জন্য কেন্দ্রে পাঠানো রেজুলেশনের এক নম্বরে নাম ছিলো আব্দুল আজিজ হাওলাদারের। তিনি উপজেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি।


অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে আনোয়ার হোসেন খান বিবার্তাকে বলেন, আমার বাবাকে স্বাধীনতা পরবর্তীতে রিলিফ কমিটির চেয়য়ারম্যান বানানো হয়েছে। বঙ্গবন্ধু আসার পরও আমার বাবা লঙ্গরখানায় নিজ খরচে মানুষকে খাইয়েছেন। ১৯৮৬ সালে ইউনিয়নে তিনি চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছেন। এরপর নব্বইয়ের আন্দোলনের পর আমার ভাইয়ের ছেলে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছে। ১৯৯৭ সালে আমি আওয়ামী লীগের কমিটিতে ছিলাম। এর আগ থেকেই আমি আওয়ামী লীগে ছিলাম। পরে একটা আহ্বায়ক কমিটি হয়েছে সেটাতেও আমি ৯ নম্বর সদস্য ছিলাম। ২০১৯ সালে আমি উপজেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি হয়েছি। আমি আওয়ামী লীগ পরিবারের সদস্য। আমার পরিবারের সদস্যরা ছাত্রলীগে, আওয়ামী লীগে বিভিন্ন সময়ে দায়িত্ব পালন করেছেন।



মির্জাগঞ্জ উপজেলার ৪নং দেউলী সুবিদখালী ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মো. আব্দুল আজিজ হাওলাদার বিবার্তাকে বলেন, আমি ১৯৬৮ সাল থেকে ওয়ার্ড, ইউনিয়ন ও উপজেলা পর্যায়ে দলের বিভিন্ন পদে দায়িত্ব পালন করেছি। ২০১৬ সালে আমাকে নৌকা প্রতীক দেয়া হয়েছে। দল ও চেয়ারম্যানের পদে থেকে আমি সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করেছি। ইউপি নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতার জন্য তৃণমূল থেকে কেন্দ্রে পাঠানো তালিকায় ১ নম্বরে আমারা নাম ছিলো।
তিনি বলেন, আমি ৫৪ বছর ধরে আওয়ামী লীগের রাজনীতি করছি। অথচ চার মাস আগে বিএনপি থেকে আ.লীগে যোগ দেয়া ব্যক্তিকে নৌকা প্রতীকে মনোনয়ন দেয়া হয়েছে। আমার নৌকা প্রতীকের দরকার নেই। নেত্রী নিজে লিখে আমাকে দল থেকে অব্যাহতি দিলেও কিছু বলবো না। তারপরও বিএনপি নেতা, রাজাকার পরিবারের সদস্যকে যাতে নৌকা না দেয়া হয়।


এ বিষয়ে জানতে চাইলে মির্জাগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক ইউনুছ আলী সর্দার বিবার্তাকে বলেন, আমি ১৬ বছর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ছিলাম। উনি এর আগে কোনোদিনই আ.লীগ করেন নাই। কিছুদিন হলো আমাদের প্রোগ্রামে জড়িত হয়েছে। কিভাবে দলে পদ দিয়েছে তা জানি না। কাউকে পদ দেয়া হলে তার রাজনৈতিক ক্যারিয়ার থাকা দরকার। এর আগে উনি বিএনপি, জাতীয় পার্টি এগুলোর সাথে জড়িত ছিলেন। এইবার আওয়ামী লীগের সাথে জড়িত হয়েছেন। কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের এক নেতার কারণে উপজেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতির পদ পেয়েছেন।


বিবার্তা/সোহেল/গমেজ/শাহিন/এমবি

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

পদ্মা লাইফ টাওয়ার (লেভেল -১১)

১১৫, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ,

বাংলামোটর, ঢাকা- ১০০০

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2021 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com