‘কাঁদো বাঙালি কাঁদো’
প্রকাশ : ১৫ আগস্ট ২০২২, ১১:৪২
‘কাঁদো বাঙালি কাঁদো’
কোহেলী কুদ্দুস মুক্তি
প্রিন্ট অ-অ+

১৭৫৭ সালের ২৩ জুন পলাশীর প্রান্তরে যে স্বাধীনতার সূর্য স্তমিত হয়েছিলো, তা কাটতে সময় লেগেছিলো প্রায় ২০০ বছর। কিন্তু বাঙালিদের বুঝতে বেশি সময় লাগেনি যে ব্রিটিশদের থেকে স্বাধীনতা পাওয়ায় প্রকৃত কোনো লাভ হয়নি। পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকেরা শোষণ নীতিই গ্রহণ করেছে। পাকিস্তানি শাসকদের এই নীতির বিরুদ্ধে যে মানুষটি চিরকাল লড়াই সংগ্রাম করেছেন তিনি আর কেউ নন, হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতা শেখ মুজিবুর রহমান। বাঙালিরা যাকে ভালোবেসে ‘বঙ্গবন্ধু’ বলে ডাকতেন।


জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্ম ১৯২০ সালের ১৭ মার্চ পূণ্যভূমি গোপালগঞ্জ মহকুমার টুঙ্গিপাড়ায়। সাত ভাই-বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন তৃতীয়। বঙ্গবন্ধুর পিতার নাম শেখ লুৎফর রহমান ও মায়ের নাম সায়েরা খাতুন। ছোট বেলায় তাকে সবাই ‘খোকা’ বলে ডাকতেন। কে জানতো টুঙ্গিপাড়ার ছোট্টখোকা একদিন বাঙালিদের স্বাধীনতার সূর্য ছিনিয়ে আনবে! ছোট থেকেই অধিকার সচেতন ছিলেন বঙ্গবন্ধু। হাইস্কুলে থাকতেই ছাত্ররাজনীতিতে যোগ দেন তিনি। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে তিনি ছিলেন সক্রিয় কর্মী। ১৯৪৮ সালের ৪ঠা জানুয়ারি তিনি পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ গঠন করেন যা আজকে বাংলাদেশ ছাত্রলীগ হিসাবে পরিচিত। ছাত্রলীগ গঠন করার ফলে তিনি পূর্ব পাকিস্তানের সবচেয়ে জনপ্রিয় ছাত্রনেতায় পরিণত হন।


ভারত বিভাজনের পর পাকিস্তানিরা প্রথম আঘাত হানে আমাদের সংস্কৃতিতে। তারা সব জায়গা থেকে আমাদের মুখের ভাষা বাংলাকে মুছে দিতে চায়। পাকিস্তানি শাসকেরা দম্ভভরে ঘোষণা করে ‘উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্র ভাষা’। বাঙালিরা আন্দোলনে ঝাপিয়ে পড়ে। গ্রেফতার হন বঙ্গবন্ধুসহ অনেক ছাত্রনেতা। জেল থেকেই তিনি নিয়মিত আন্দোলনের খোঁজ রাখতেন তিনি। প্রয়োজনীয় দিক নির্দেশনা দিতেন। অবশেষে আন্দোলন সফল হলো। তিনি মুক্তি পেলেন।


১৯৫৩ সালের ৯ জুলাই পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের কাউন্সিল শেষে তিনি সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। ১৯৫৪ সালে আওয়ামী লীগ ও অন্য তিন দল নিয়ে যুক্তফ্রন্ট গঠন করা হয়। নির্বাচনে যুক্তফ্রন্ট নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠ্যতা লাভ করে। বঙ্গবন্ধু কৃষি, বন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পান। কিন্তু কিছুদিন পরেই কেন্দ্রীয় সরকার যুক্তফ্রন্ট ভেঙে দেয়। পরবর্তীতে স্বৈরাচার শাসকদের বিরুদ্ধে তিনি আন্দোলন জারি রাখেন। বারবার তাকে গ্রেফতার করা হয়। কিন্তু তিনি হাল ছাড়েননি। জেল থেকে বের হয়ে বাঙালিদের স্বাধীনতার আশায় তিনি আন্দোলন চালিয়ে যান। তার সবচেয়ে যুগান্তকারী চিন্তাভাবনার ফসল হচ্ছে বাঙালির মুক্তির সনদ ‘৬ দফা’। ৬ দফাতেই মূলত বাঙালিদের মুক্তি লুকায়িত ছিলো। পাকিস্তানি শাসকেরা তা বুঝতে পেরে ৬ দফা দাবি নাকচ করে দেয়। আন্দোলন শুরু করেন বঙ্গবন্ধু। ৬ দফা দাবির পক্ষে জনগণকে উদ্বুগ্ধ করেন। গ্রেফতার হন তিনি। কিন্তু জেল থেকেই দিক নির্দেশনা পৌছে দিতে থাকেন কর্মীদের কাছে। তার বিরুদ্ধে আনা হয় দেশদ্রোহীতার অভিযোগ। দেয়া হয় মামলা। যা আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা হিসাবে পরিচিত। তার মুক্তির দাবিতে বাঙালিরা রাস্তায় নেমে আসেন। শুরু হয় '৬৯ এর গণঅভ্যুত্থান। পাকিস্তানি শাসকেরা বাধ্য হয় বঙ্গবন্ধুর বিরুদ্ধে দেয়া মামলা তুলে নিতে এবং তাকে মুক্তি দিতে।


এরপর আসে সেই ঐতিহাসিক '৭০ এর নির্বাচন। নির্বাচনে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশভাবে জয় লাভ করে। কিন্তু পাকিস্তানিরা ক্ষমতা হস্তান্তরে গড়িমসি শুরু করে। ১৯৭১ এর ৭ মার্চ ঢাকার তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানে তিনি দেন তার ঐতিহাসিক ভাষণ। বাঙালি জাতিকে তিনি স্বাধীনতার প্রস্তুতি নিতে বলেন। তার প্রতিটি কথায় পাকিস্তানি শাসকদের ভিত নড়ে যায়। সেখানে দাঁড়িয়ে তিনি বলেন -


‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম
এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’।


তিনি আরো বলেন-‘রক্ত যখন দিয়েছি, রক্ত আরো দেবো। তবুও এই দেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়বো ইনশাল্লাহ্’।


দেশের মানুষ স্বাধীনতার প্রস্তুতি নিতে শুরু করে। তখনই আসে সেই ভয়াল রাত। ২৫ মার্চ কালোরাতে অতর্কিতভাবে হামলা চালায় পাকিস্তানি বাহিনী। গ্রেফতার হন বঙ্গবন্ধু। গ্রেফতার হবার আগেই তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করে যান। যা দেশের বিভিন্ন ব্যক্তি দ্বারা পঠিত হয়। দেশের মানুষ যুদ্ধে ঝাপিয়ে পড়ে। বাঙলিদের কাছে ছিলো না পাকিস্তানিদের মতো ভারী ভারী অস্ত্র। কিন্তু ছিলো বুক ভরা সাহস ও শক্তি। যার জোরেই ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ ও বহু ত্যাগের বিনিময়ে আমরা লাভ করি স্বাধীনতা। ১৯৭২ সালের ৮ জানুয়ারি পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্তি পেয়ে ১০ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু দেশে ফিরে আসেন।


এবার শুরু হয় আরো বড় যুদ্ধ। দুর্নীতি-অব্যবস্থাপনার বিরুদ্ধে যুদ্ধ। তিনি চিরকাল ছিলেন শোষিত মানুষের পক্ষে। তাদের জন্যই তিনি তার জীবনের ১৪টি বছর জেলে কাটিয়েছেন। কিন্তু তখন তার শত্রু ছিলো পরিচিত। দেশ স্বাধীন হবার পর তার শত্রু ছিলো অচেনা। দেশীয় ও আন্তর্জাতিক শক্তি বঙ্গবন্ধুকে বারবার তার আদর্শ থেকে সরে আসতে বলছিলো। বাংলাদেশ নামের আগে ইসলামিক রিপাবলিক অব বাংলাদেশ নামের প্রস্তাব করে সৌদি সরকার। বঙ্গবন্ধু সেই প্রস্তাব নাকচ করে দেন। যে অসাম্প্রদায়িক আদর্শ নিয়ে বাংলার মানুষ যুদ্ধ করেছে এটা তার পরিপন্থী। তিনি কখনো আদর্শের ব্যাপারে আপস করেননি। তিনি ক্ষমতায় থাকলে এদেশকে লুটে খাওয়া যাবে না বলে দেশের ভেতরেও অনেক শত্রু তৈরি হয় তাঁর। তারা হাত মেলায় আন্তর্জাতিক শক্তির সাথে।


এরপর আসে সেই কালোরাত। বাঙালির জীবনের কলঙ্কের রাত। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট প্রথম প্রহরে একদিকে সূর্য উদয় হচ্ছিল অন্যদিকে স্তমিত হচ্ছিলো সেই সূর্য যার আলোয় আজ বাংলাদেশ স্বাধীন। আন্তর্জাতিক ও দেশীয় ষড়যন্ত্রের শিকার হয়ে কতিপয় পাকিস্তানি মনোভাবপূর্ণ সামরিক অফিসারের হাতে নিহত হন বঙ্গবন্ধু। সেদিনের লাল সূর্য উদিত হয়েছিলো পিতার রক্তে রেঙে।


সেদিন শুধু বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করাই ওদের লক্ষ্য ছিলো না। ওদের লক্ষ্য ছিলো বঙ্গবন্ধুর আদর্শকে হত্যা করা। সেদিন আরো নিহত হন বঙ্গবন্ধুর স্ত্রী বেগম ফজিলাতুন্নেসা মুজিব, বঙ্গবন্ধুর তিন সন্তান শেখ কামাল, শেখ জামাল ও ছোট্ট শেখ রাসেল। এছাড়া জাতির পিতার ছোটভাই পঙ্গু মুক্তিযোদ্ধা শেখ আবু নাসের, ভগ্নিপতি আবদুর রব সেরনিয়াবাত, তার ছেলে আরিফ সেরনিয়াবাত, মেয়ে বেবী সেরনিয়াবাত, শিশু পৌত্র সুকান্ত বাবু, বঙ্গবন্ধুর ভাগ্নে শেখ ফজলুল হক মণি, তার অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী আরজু মণি, নিকটাত্মীয় শহীদ সেরনিয়াবাত, আবদুল নঈম খান রিন্টু এবং বঙ্গবন্ধুর জীবন বাঁচাতে ছুটে আসা রাষ্ট্রপতির ব্যক্তিগত নিরাপত্তা কর্মকর্তা কর্নেল জামিল উদ্দিন আহমেদসহ কয়েকজন নিরাপত্তা কর্মকর্তা ও কর্মচারী।


বঙ্গবন্ধুকে স্বপরিবারে হত্যা করা হয় এবং আইন পাশ করে তার বিচার বন্ধ করে রাখা হয়। ইনডেমিনিটি আইন পাশ করে বাঙালির শ্রেষ্ঠ সন্তানের হত্যার বিচারটা পর্যন্ত করতে দেয়া হয়নি। সেই কলঙ্ক বয়ে বেড়াচ্ছি আমরা।


বঙ্গবন্ধুকে হত্যার ২১ বছর পরে সেদিন ভাগ্যক্রমে বেঁচে যাওয়া তাঁর কন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসে জাতির পিতা হত্যার বিচারকার্য শুরু করেন। বাঙালি জাতি যে কলঙ্ক বয়ে চলেছে সেখান থেকে কিছুটা মুক্তি আসে খুনিদের বিচারের মাধ্যমে।


যে মানুষটি তার জীবনের প্রতিটি সময় কাটালেন এদেশের মানুষের মুক্তির আশায়। তাকে হত্যা করলেই এদেশের মানুষের মন থেকে তাকে মুছে দেয়া যাবে না। তিনি মৃত্যুঞ্জয়ী। এদেশের জনগণের অস্তিত্বের সাথে তিনি মিশে আছেন। এদেশের বুকে যতদিন সূর্য উদিত হবে ততোদিন তিনি থাকবেন চির উজ্জ্বল হয়ে। বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশ একে অন্যের অস্তিত্বের সাথে মিশে আছে। তিনি আছেন আমাদের মাঝে, আমাদের অস্তিত্বের মাঝে, আমাদের আদর্শের মাঝে।


‘যে মুজিব জনতার, সে মুজিব মরে নাই’। জনতার মুজিবের মৃত্যু নাই। জনতার মুজিব মৃত্যুঞ্জয়ী।


১৫ আগস্ট আমাদের হৃদয়কে ভারী করে তোলে। আমাদের অন্তরে রক্তক্ষরণ ঘটায়। বিশাল হৃদয়ের, হিমালয়সম যার ব্যক্তিত্ব তাকে এমন নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়। যে তাঁর জীবনের পুরোটা সময় দিয়ে গেছেন এদেশের মানুষের জীবনমান পরিবর্তনের লক্ষ্যে। তাকে হত্যার মাধ্যমে একটি দেশকে পিছিয়ে দেয়া হয় শত বছর। তবে তার নাম মুছে ফেলা যায়নি। আমাদের হৃদয়ে তিনি চির ভাস্বর।


‘যতদিন রবে পদ্মা যমুনা গৌরী মেঘনা বহমান ততদিন রবে কীর্তি তোমার, শেখ মুজিবুর রহমান.... "


পদ্মা মেঘনার মতো তিনিও আমাদের দেশের মানুষের মাঝে চিরকাল বহমান থাকবেন। তাঁকে হারিয়ে ৪৭ বছর ধরে আমরা কাঁদছি। আজ আমাদের কাঁদার দিন। কাঁদো বাঙালি কাঁদো....।


লেখক: সহ-সভাপতি, বাংলাদেশ যুব মহিলালীগ


বিবার্তা/কেআর

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

পদ্মা লাইফ টাওয়ার (লেভেল -১১)

১১৫, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ,

বাংলামোটর, ঢাকা- ১০০০

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2021 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com