সংসার যখন ধর্ম
প্রকাশ : ১২ জানুয়ারি ২০২২, ১০:৩৮
সংসার যখন ধর্ম
আরিফা জেসমিন কনিকা
প্রিন্ট অ-অ+

জীবনসঙ্গী এমনই হওয়া উচিত যে তোমাকে সম্মান দেবে। যার সাথে সব পরিস্থিতি শেয়ার করা যাবে। সব ধরনের কথা বলা যাবে। কোনো কথা বলার আগে দ্বিধা-দ্বন্দ্বে পড়তে হবে না৷ যে তোমার ভুলগুলো নিয়ে খোঁটা দেবে না, ঠাট্টা করবে না। জীবন চলার পথে যে তোমার সহযোগী, সহযোদ্ধা হবে। নির্দ্বিধায় সারাজীবনের জন্য যার হাতটি শক্ত করে ধরে রাখা যাবে।


বাস্তবতা হলো এরকম জীবনসঙ্গী প্রত্যেকের কল্পনাতেই থাকে। বাস্তবে এমনটা দেখতে পাওয়া যায় না। যে যতটা বেশি ভালোবাসে কল্পনায় তার সঙ্গী সম্পর্কে ততটাই উচ্চ ধারণা পোষণ করে। এইসব ধারণা বিয়ের পরের কয়েকদিনের আবেগ মাত্র। আসল কথা হলো নিয়ন্ত্রণ। প্রথম ধাপটা শুরু হয় মেয়েটির স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করার মধ্যে দিয়ে। চাকরিজীবী মেয়ে হলে তার চাকরি ছাড়তে হবে। কারণ সংসার ঠিকমতো হচ্ছে না, বাচ্চাদের দেখাশোনা হচ্ছে না, স্বামীর একার আয়ে সংসার ভালোভাবে চলবে, কী দরকার পুরুষ মানুষের মধ্যে গিয়ে কাজ করার! রোজ রোজ কি নিজের চেহারা দেখাতে যাও, ঘরে মন বসে না, নিশ্চয়ই অন্য কারো সাথে কোনো সম্পর্ক আছে। তা না হলে বাইরে যাবার জন্য এতো অস্থিরতা কেন ইত্যাদি ইত্যাদি।


এইভাবে প্রতিনিয়ত অশান্তি করে চাকরি ছাড়তে বাধ্য করে। মেয়েটির আর্থিক এবং মানসিক স্বাধীনতার নিয়ন্ত্রণ তখন স্বামীটির হাতে। মেয়েটি হয়ত তার সঙ্গীর ১০০টি দোষের কথা জানে; কিন্তু সে অন্যের কাছে তা প্রকাশ করে স্বামীকে ছোট করতে চায় না। কিন্তু তার স্বামী যদি তার একটি দোষের কথাও জানে, তবে তা রসিয়ে রসিয়ে সবার কাছে বলে বেড়িয়ে স্ত্রীকে অপমান করার চেষ্টা করে। সন্তানদের সামনেও স্ত্রীকে এমনভাবে উপস্থাপন করে যেন সন্তানরা শুধু বাবাকেই আদর্শ হিসেবে মনে করে। মাকে মাথামোটা, অকর্মন্য, নির্বোধ, দায়িত্ব জ্ঞানহীন মানুষ হিসেবে তুলে ধরে। তার দুনিয়াটাকে একেবারেই ছোট করে ফেলে যেন তাকে সহজেই নিজের আয়ত্তে রাখা যায়। এমনকি আত্মীয় স্বজন, বন্ধু বান্ধব, বাড়ির হেল্পিং হ্যান্ডদের সামনেও কথায় কথায় তাকে অপমান করতে পিছপা হয় না। ব্যাপারটা এমন দাঁড়ায় যে শুধুমাত্র সে ছাড়া এমন বিরক্তিকর মানুষকে দুনিয়ার আর কেউ সহ্যই করবে না।


প্রতিনিয়ত অপমান আর খোঁটা শুনতে শুনতে মেয়েটি একসময় বিশ্বাস করতে শুরু করে যে আসলে সমস্যাটা তারই। অনেকটা গোয়েবলস এর সেই মিথ্যা প্রচারণার মত। দিনশেষে দেখা যায় প্রত্যেকেই কোনো না কোনোভাবে মানসিক নির্যাতনের শিকার হয়। সংসারে ব্যক্তিগত স্বাধীনতা কখন বিলীন হয়ে যায় মেয়েটি তা টেরও পায় না। স্বামী এবং তার পরিবারের চাওয়া-পাওয়া কখন যে তার একমাত্র দায়িত্ব, কর্তব্য হয়ে যায় সে বুঝতেও পারে না। যখন বুঝতে পারে তখন সে দেখে অনেকটা পথ পেছনে ফেলে এসেছে। ফিরে যাবার আর কোনো উপায় নেই। সামনে এগোবার পথও বন্ধ। তখন কেবল আত্মমর্যাদাহীন হয়ে বেঁচে থেকে অন্যের দ্বারা ব্যবহৃত হওয়া ছাড়া আর কোনো উপায় থাকে না।


স্বামীর কাছে নিজেকে সারাজীবনের অকর্মন্য একজন হিসেবেআবিষ্কার করে। সন্তানরা যার যার মত ব্যস্ত হয়ে পড়ে। মায়ের ব্যথা উপলব্ধি করার মত সময় তাদের থাকে না। বাবার ঘরের রাজকন্যাটির শৈশব, কৈশোর, তারুণ্য সবই কেবল তার কাছে স্মৃতি হয়ে ধরা দেয়। এই স্মৃতি নিয়ে, অভিমান বুকে চাপা দিয়ে, সারাজীবনের রক্ত, ঘাম, শ্রম দিয়ে গড়া সংসারে নিজেকে অপ্র‌য়োজনীয়, অপ্রত্যাশিত মানুষ হিসেবে আবিষ্কার করে নির্বাক হয়ে মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা করা ছাড়া আর কোনো কাজ থাকে না।


বিবার্তা/কেআর

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

পদ্মা লাইফ টাওয়ার (লেভেল -১১)

১১৫, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ,

বাংলামোটর, ঢাকা- ১০০০

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2021 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com