দু:সাহসী কিশোর মুক্তিযোদ্ধা শহীদ শেখ জামালের দেশ প্রেমের আদর্শ ছড়িয়ে পড়ুক প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে
প্রকাশ : ২৮ এপ্রিল ২০২১, ২৩:১২
দু:সাহসী কিশোর মুক্তিযোদ্ধা শহীদ শেখ জামালের দেশ প্রেমের আদর্শ ছড়িয়ে পড়ুক প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে
ড. মো. রায়হান সরকার রেজভী
প্রিন্ট অ-অ+

১৯৫৪ সাল বাঙালির রাজনীতির ইতিহাসের একটি স্মরণীয় বছর। এই বছরের মার্চ মাসে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে মুসিলম লীগের ভরাডুবি হয়েছিল আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন যুক্তপ্রন্টের কাছে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তখন বাঙালির উদীয়মান তরুণ নেতা হিসাবে জনপ্রিয় হয়ে উঠিছেলন। বাংলাদেশের মানুষকে শোষণ-বঞ্চনা থেকে মুক্ত আলোয় আনতে দিনের পর দিন কারাগারের অন্ধকার কোষ্ঠে থেকেছেন বঙ্গবন্ধ। এরই মধ্যে ১৯৫৪ সালের ২৮ এপ্রিল গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা দম্পতির ঘরে জন্ম হয় দু:সাহসী কিশোর মুক্তিযোদ্ধা শহীদ লেফেটন্ট শেখ জামালের।


১৯৫৪ সালের ৩০ মে পুনরায় গ্রেফতার হন বঙ্গবন্ধু। তাই শেখ জামালের জীবনের শুরুটা পিতা শেখ মুজিবরের স্নেহ-ভালোবাসায় পূর্ণ হয়ে উঠতে পারেনি।


শিশু শেখ জামালের ছোটেবলা কাটে গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায়। তিনি ঢাকার রেসিডেন্সিয়াল মডেল স্কুল এন্ড কলেজ থেকে এসএসিস এবং ঢাকা কলেজ থেকে এইচএসিস পাস করেন। পরিবারের সাংস্কৃতিক পরিবেশে বেড়ে ওঠা সংস্কৃতিপ্রেমী শেখ জামাল সুর ও গান অনেক পছন্দ করেতন তাই গিটার শেখার জন্য একটি প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হয়েছিলেন তিনি। তিনি একজন ভাল ক্রিকেটার ও একজন সফল টেনিস খেলোয়াড় ছিলেন। শেখ জামালের রক্তে ছিল পিতা বঙ্গবন্ধুর মতই রাজনীতি আর দেশপ্রেম।


১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ দিবাগত রাতে পাকিস্তান সেনাবাহিনী ঝাঁপিয়ে পড়ে এদেশের নিরীহ নিরস্ত্র বাঙালির ওপর আক্রমণ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, রাজারবাগ পুলিশ হেড কোয়ার্টার ও পিলখানা রাইফেল সদর দফতর। বঙ্গবন্ধু ২৫ মার্চ মধ্যরাতে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ প্রথম প্রহরে বঙ্গবন্ধু ধানমন্ডির ৩২ নম্বর বাসা থেকে গ্রেফতার হন ও পাকিস্তান সেনাবাহিনী তাকে গ্রেফতার করে পশ্চিম পাকিস্তান নিয়ে বন্দি করে রাখে। বঙ্গবন্ধুর পরিবারের সবাই পাকিস্তান সেনাবাহিনীর হাতে গ্রেফতার হয়ে ধানমন্ডি ১৮ নম্বর রোডের বাড়িতে গৃহবন্দি অবস্থায় ছিলেন।



মাত্র ১৭ বছর বয়সী বঙ্গবন্ধুর মেজো ছেলে শেখ জামাল ১৯৭১ সালের ৫ আগস্ট সকালে কাউকে না জানিয়ে তারকাঁটার বেড়া দেয়া পাকিস্তান বাহিনীর ধানমন্ডির বন্দিশিবির থেকে পালিয়ে ভারতে চলে যান। পালানোর সময় পাকিস্তান সেনাদের হাতে তিনি যদি ধরা পড়তেন তাহলে তার মৃত্যু ছিল অনিবার্য। প্রথমে তিনি আগরতলা হয়ে কলকাতা থেকে উত্তর প্রদেশের কালশীতে পাড়ি দেন। সেখানে তিনি মুজিব বাহিনীর ৮০ জন নির্বাচিত তরুণের সঙ্গে ২১ দিনের বিশেষ প্রশিক্ষণ নিয়ে ৯ নম্বর সেক্টরের একজন যোদ্ধা হিসাবে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েন। বঙ্গমাতা ও ভাইবোনদের সকল উদ্বেগ উৎকণ্ঠা দূর করে ১৯৭১ সালের ১৮ ডিসেম্বর স্বাধীন বাংলাদেশে ফিরে আসেন দুঃসাহসী মুক্তিযোদ্ধা শেখ জামাল। স্বাধীন বাংলাদেশে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রথম জনসভায়ও যোগ দেন তিনি।


বঙ্গবন্ধু শেখ জামালকে একজন সেনা অফিসার হিসেবে গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন। শেখ জামাল পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও মা বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিবের অনুমতি নিয়ে সদ্য কমিশন পেয়ে তার প্রাণপ্রিয় বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়েছিলেন।


১৯৭৪ সালে যুগোস্লাভিয়ার প্রেসিডেন্ট মার্শাল টিটোর আহ্বানে শেখ জামাল যুগোস্লাভিয়ার মিলিটারি একাডেমির প্রশিক্ষণ ক্যাম্পে অংশগ্রহণ করেন। এরপর মার্শাল টিটোর পরামর্শে ব্রিটেনে বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সামরিক একাডেমি স্যান্ডহার্স্টে ৬ মাসের সামরিক প্রশিক্ষণ সফলতার সঙ্গে সম্পন্ন করেন। স্যান্ডহার্স্টে ১ আগস্ট, ১৯৭৫ থেকে শুরু হতে যাওয়া রেগুলার ক্যারিয়ার সামরিক প্রশিক্ষণ কোর্সে ভর্তির সুবর্ণ সুযোগ পেয়েও শেখ জামাল সেই প্রশিক্ষণে অংশ নেননি। স্যান্ডহার্স্ট একাডেমি থেকে সামরিক প্রশিক্ষণ গ্রহণ শেষে দেশে ফিরে সেকেন্ড লেফটেন্যান্ট শেখ জামালের পোস্টিং হলো ঢাকা সেনানিবাসের দ্বিতীয় ইস্ট বেঙ্গলে। মাত্র দেড় মাস ছিল তার চাকরিকাল। কিন্তু এই দেড় মাস সময়ে একজন চৌকস সেনা কর্মকর্তা হিসাবে তিনি তার কর্মকুশলতা ও চমৎকার পেশাগত দক্ষতার ছাপ রেখেছিলেন। নিজের নিষ্ঠা এবং দক্ষতা দিয়ে কয়েক সপ্তাহেই তিনি অফিসার ও সৈনিকদের মন জয় করতে সক্ষম হয়েছিলেন। ১৯৭৫ সালের ১৭ জুলাই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানের পছন্দে শেখ জামালের বিয়ে হয় পারভীন জামাল রোজীর সাথে। পরম আদরে ছেলে শেখ জামাল আর তার নববধূ পারভীন জামাল রোজীকে আশীর্বাদ করেন বঙ্গবন্ধু।


শেখ জামালের বিয়ের মাত্র ১ মাসের মাথায় ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট নৃশংসভাবে হত্যা করা হলো বাঙালির সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ নেতা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সহ বাড়িতে থাকা পরিবারের সবাইকে। ১৫ আগস্ট নৃশংস এই হত্যাকাণ্ডে আরো শিকার হয়েছিলেন বঙ্গবন্ধুর সহধর্মিণী বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব, বঙ্গবন্ধুর ভাই শেখ আবু নাসের, বঙ্গবন্ধুর জ্যেষ্ঠপুত্র বীর মুক্তিযোদ্ধা শেখ কামাল, দুঃসাহসী মুক্তিযোদ্ধা শেখ জামাল, শিশুপুত্র শেখ রাসেল, পুত্রবধূ সুলতানা কামাল ও পারভীন জামাল রোজী, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভাগ্নে মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক যুবলীগের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান শেখ ফজলুল হক মণি ও তার অন্ত:সত্ত্বা স্ত্রী বেগম আরজু মণি, বঙ্গবন্ধুর ভগ্নিপতি আবদুর রব সেরনিয়াবাত, তার ছোট মেয়ে বেবী সেরনিয়াবাত, শিশুপুত্র আরিফ সেরনিয়াবাত, সুকান্ত আবদুল্লাহ বাবু, ভাইয়ের ছেলে শহীদ সেরনিয়াবাত, আবদুল নঈম খান রিন্টু ও বঙ্গবন্ধুর প্রধান নিরাপত্তা অফিসার কর্নেল জামিল উদ্দিন আহমেদ। দেশের বাইরে থাকায় সেদিন প্রাণে বেঁচে যান জাতির পিতার দুই সুযোগ্য কন্যা শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা।


অস্ত্র হাতে রণাঙ্গনের অকুতোভয় কিশোর মুক্তিযোদ্ধা শেখ জামাল ছিলেন বাবার মতই নির্ভীক, নিরহঙ্কার ও দেশপ্রেমের মূর্ত প্রতীক। মাত্র ২২ বছরের (১৯৫৪ সালের ২৮ এপ্রিল থেকে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগষ্ট) জীবনে দেশপ্রেম আর কর্মদক্ষতার যে ছাঁপ রেখে গেছেন তিনি, আজও তা বাংলাদেশের মানুষ শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করে। ৬৮তম জন্মবার্ষিকীতে শ্রদ্ধা জানাই শহীদ লেফটেন্যান্ট শেখ জামালের প্রতি। আমি বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন বর্তমান সরকার ও বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের কাছে একটাই দাবি করবো যাতে কিশোর মুক্তিযোদ্ধা শেখ জামালের দেশপ্রেম ও সাহসিকতার ইতিহাস নতুন প্রজন্মের কাছে যথাযথ ভাবে তুলে ধরার জন্য সঠিক পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়।


লেখক : সহকারী অধ্যাপক, ওষুধ ও প্রযুক্তি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং কার্যকরী সদস্য, বাংলাদেশ আওয়ামী যুবলীগ।


বিবার্তা/জাই


সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

ময়মনসিংহ রোড, শাহবাগ, ঢাকা-১০০০

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2021 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com