বর্তমান সময়ে ওয়াজ মাহফিলের উদ্দেশ্য কি?
প্রকাশ : ১৫ মার্চ ২০২১, ১৭:১৩
বর্তমান সময়ে ওয়াজ মাহফিলের উদ্দেশ্য কি?
শেখ নকিবুল ইসলাম সুমন
প্রিন্ট অ-অ+

আল্লামা শাহ্ সালাহ উদ্দীন: ইমাম গাজালী (রহ) রচিত স্বীয় গ্রন্থ 'আইয়্যুহাল ওয়ালাদ'-এ উল্লেখ করেছেন- 'ওয়াজকারীদের ওয়াজ দ্বারা যেন উদ্দেশ্য হয় মানুষকে দুনিয়া হতে আখেরাতের প্রতি, গোনাহ থেকে নেকীর প্রতি, লোভ থেকে পরিতুষ্টির প্রতি আহ্বান করা।


যদিও বাংলাদেশ ছাড়া পৃথিবীর আর কোন দেশে এভাবে টাকার বিনিময়ে ওয়াজ মাহফিল রেওয়াজ আছে কি না আমার জানা নাই। বর্তমানে মামুনুল হক, রফিকুল ইসলাম মাদানি'রা ওয়াজের নামে যে রাজনৈতিক বয়ান কিংবা সমাজের ভিতরে সুকৌশলে ঘৃণা ছড়িয়ে যাচ্ছেন এটা কি তৌহিদী জনতারা খেয়াল করেছেন? হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) এরশাদ করেন, "যে ভাষার প্রাঞ্জলতা শিখে মানুষের অন্তরকে তার প্রতি আকৃষ্ট করার উদ্দেশ্যে, কেয়ামতের দিন আল্লাহ তার কোনো ফরজ ও নফল ইবাদত কবুল করবেন না।" (মেশকাত : ৪১০)


আল্লামা ইবনুল জওযী (রহ.) ‘তালবীসে ইবলীস’ কিতাবে ইসিলামিক বক্তাদের হালহকিকত বর্ণনার অধ্যায়ে লিখেছেন, আগেকার যুগে বক্তারা আমলওয়ালা আলেম ছিলেন। এখনকার সময়ে আমলওয়ালা আলেমের খুবই অভাব। এখনকার সময়ে এ কাজটিকে জাহিলরা তাদের পেশা হিসেবে গ্রহণ করে নিয়েছে। তারা জরুরতে দ্বীন ও আমলের আলোচনা বাদ দিয়ে মূর্খ আওয়ামের পছন্দসই বিভিন্ন কিচ্ছা-কাহিনী, উগ্রবাদ বর্ণনায় প্রবৃত্ত হয়েছে। (তালবিসুল ইবলীস : ১৬৮)।


অথচ একটা সময় দেশ-বিদেশের খ্যাতিসম্পন্ন ওলামায়ে কেরাম তাতে উপস্থিত থেকে কুরআন হাদিসের আলোকে সারগর্ভ নসিহত পেশ করতেন। মুসলমানদের ইমান-আকাইদ ও আমলী সংশোধন, আত্মিক পরিশুদ্ধি এবং যুগসচেতন হওয়ার আহ্বান করতেন। তৎকালীন ওলামা ও বুজুর্গানে দ্বীনদের কাছে ইখলাস ও লিল্লাহিয়াতের কোন ঘাটতি ছিল না। আর বর্তমানে শুধু সুন্দর সুর-কণ্ঠ, মাঠ কাঁপানো ও কন্টাক্টওয়ালা বক্তাদের দিয়ে ওয়াজ যা একজন মানুষের হিদায়াতের জন্য যথেষ্ট নয়। অযথা টাকা খরচ ও সময় নষ্ট এবং বিনোদন বৈকি।


আজকে দুনিয়াজোড়া ধর্মীয় আফিমে বুদ করে মাথামোটা লোকজনকে কাজে লাগিয়ে ইসলামিক স্টেট (আইএস), আল-কায়েদা, বোকো হারাম, লস্কারে তৈইয়িবা, হিজবুল্লা, হামাস, আল-সাবাব, কুর্দিস, ইসলামিক রেভ্যুলেশনারি গার্ড নামে অসংখ্য ধর্মীয় উগ্র মতবাদী সংগঠনের জন্ম দিয়েছে। কাজের কাজ হয়েছে সারাবিশ্বের লোকজন এখন মুসলিমদের দেখে টেরোরিস্ট হিসাবে। শাহরুখ খানের মত সেলেব্রিটিদেরও আমেরিকার বিমানবন্দরে আটকে রাখা হয় কারণ সে মুসলিম। অথচ হবার কথা ছিল উল্টো। আজকে বেশিরভাগ হুজুরদের মনোভাব হচ্ছে জোর করে ইসলামকে চাপিয়ে দিতে হবে, গায়ের জোরে ধর্ম প্রচার করতে হবে।


অথচ আল্লাহ্‌ রসুল (সঃ) ও তার সাহবা কেরাম'রা ধর্ম প্রচার করেছেন তাদের উত্তম আখলাক ও সুন্দর কথাবার্তার মাধ্যমে। দুনিয়াতে মুখের কথা হচ্ছে এমন এক জিনিস যার মাধ্যমে যেমন যুদ্ধ লাগানো যায় তেমনি শান্তির বারতা নিয়ে আসা যায়। আপনি আগে নিজের ভিতর উত্তম আখলাক আনেন, আপনি সুন্দর ব্যবহার করেন, ইসলামের সুন্দর দিক গুলো মানব জাতির সামনে তুলে ধরেন, আল্লাহ্‌ রসুল (সঃ) যেভাবে নিজে সুন্দর ব্যবহারে করেছেন সাহবা কেরামদের শিক্ষা দিয়েছেন সেরকম ব্যবহার করে মানুষের মণিকোঠায় স্থান করে নেন। দেখবেন আপনাকে জোর করে মানুষকে ইসলামের ছায়াতলে আনতে হবে না, ভিন্নধর্মী অনেক লোকজন আপনার আমার উত্তম আখলাক দেখে মুগ্ধ হয়ে ইসলামের ছায়াতলে চলে আসবে।


আজকে যারা তথাকথিত ইসলামিক বক্তা, যারা আল্লাহ্‌'র তালার দ্বীনের ঝাণ্ডা উঁচিয়ে ধরার দায়িত্ব নিজের কাঁধে নিয়ে নিয়েছেন এদের ভিতর বেশিরভাগের বয়ানের ধরণ হচ্ছে এরে ধর, এরে মার, ছিঁড়াল্লা, ফাইরাল্লা, আগুন জ্বালা, পালানোর পথ পাবেন না। তাদের এই জঘন্য ধরণের বক্তব্য যদি ভিন্ন ধর্মালম্বী লোকজন শুনে তাদের ইসলাম ধর্ম সম্পর্কে আমূল ধারণাটা কি হবে! অথচ স্বয়ং আল্লাহ্‌তালা সুরা হিজরে বলেন, (আয়াত:০৯) "আমিই (আল্লাহ) কোরআন অবতীর্ণ করেছি। আর অবশ্যই আমি এর সংরক্ষক।" অর্থাৎ পবিত্র কোরআন শরীফ এবং ইসলামের রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব আল্লাহ্‌তালা নিজেই নিয়েছেন কোন ইসলামিক বক্তা কিংবা চিন্তাবিদের হাতে ছেড়ে দেন নাই!


মনে রাখা দরকার ইসলামের ক্ষতি কোন ইহুদি নাছাড়া কিংবা আমজনতা করে নাই, ক্ষতি যা করার এইসব আলেম ওলামারাই করেছে। বিভিন্ন সময় ভ্রান্ত ফতোয়া, উগ্রবাদী মতবাদ দিয়ে ধর্মকে হাতিয়ার করে নিজেদের স্বার্থসিদ্ধি হাসিল করেছে।


প্রাইম গ্রুপ জামে মসজিদের খতিব ও বিশিষ্ট ইসলামি চিন্তাবিদ মাওলানা মির্জা ইয়াসিন আরাফাত বলেন- বর্তমানে ওয়াজ মাহফিলের নামে কিছু লোক ইসলাম-মুসলমান ও আলেম-ওলামা, রাজনীতিবিধের নামে প্রতিনিয়ত দুর্নাম করে চলছেন। ওয়াজ মাহফিলকে হীন রাজনৈতিক স্বার্থ উদ্ধারের জন্য যারা ব্যবহার করতে চান তাদের বিষয়ে রাষ্ট্র ও জনগণ সবাইকে সোচ্চার থাকার পরামর্শ দেন এ আলেম।


তিনি বলেন, ওলামায় কেরাম সম্মানের আসনে বসে বেফাঁস কথা বললে ধর্মের ব্যাপারে মানুষের মনে ভুল ধারণা তৈরি হয়। সুতরাং যারাই ওয়াজ করেন তাদের লক্ষ রাখতে হবে, এটা স্বাভাবিক গতানুগতিক কোনো জনসভা, বিক্ষোভ সমাবেশ নয়।


আরেক বিশিষ্ট আলেম ও ইসলামী চিন্তাবিদ জামিয়া কাসিমুল উলূম বাহুবল, হবিগঞ্জ-এর সফল নায়েবে মোহতামিম মাওলানা আজিজুর রহমান মানিক বলেন, দাওয়াতের সার্বজনীন পদ্ধতি হচ্ছে মানুষকে কৌশল ও সদোপদেশ দ্বারা দ্বীনের পথে আহ্বান করা।


আজকালের ওয়াজের মধ্যে কৌশল ও সদোপদেশ কমে যাওয়ার কারণে মানুষ ওয়াজ শুনে ঠিকই কিন্তু হেদায়েতের পথে আসে না। ওয়াজ মাহফিলে যারা উসকানিমূলক কথা বলেন, তিনি তাদের উদ্দেশ্যে সূরা ত্বাহার ৪৩ নম্বর আয়াত তিলাওয়াত করেন। যার অর্থ হল- ‘তোমরা উভয়েই ফেরাউনের কাছে যাও, সে সীমা ছাড়িয়ে গেছে।'


ইসলাম শান্তির ধর্ম, উগ্রবাদী আচরণ কিংবা রাজনৈতিক বক্তব্যর মধ্যে দিয়ে সমাজ এবং রাষ্ট্রের মধ্যে বিভাজন সৃষ্টি না করে মানুষকে হিদায়তের পথে ডাকুন। আল্লাহর পথে আহ্বানকারীদের নিজেকে জাতির সামনে আদর্শ হিসেবে উপস্থাপন করে মানুষজনকে আল্লাহ ও আল্লাহ্‌'র রসুল (সঃ) এর দেখানো পথে ফিরাতে হবে। অন্যথায় সমাজ ও রাষ্ট্রে ফিতনা ফাসাদ বাড়বে দ্বীনী ইলম কায়েম হবে না।


লেখক: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী


বিবার্তা/আবদাল

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

ময়মনসিংহ রোড, শাহবাগ, ঢাকা-১০০০

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2021 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com