বাংলাদেশের স্বাধীনতার সচিত্র সাক্ষী স্বাধীনতা জাদুঘর
প্রকাশ : ২৬ মার্চ ২০২২, ১৫:৪৪
বাংলাদেশের স্বাধীনতার সচিত্র সাক্ষী স্বাধীনতা জাদুঘর
সামিনা বিপাশা ও মহিউদ্দিন রাসেল
প্রিন্ট অ-অ+

১৯৭১ সালের স্বাধীনতা সংগ্রামের রক্তাক্ত ইতিহাস বাংলা ও বাঙালির জীবনের অবিচ্ছেদ্য এক অধ্যায়। যদিও অবিচ্ছেদ্য তবু কোমল বাংলার হৃদয়ে তাঁর লাখো শহিদ সন্তানের ব্যথার দাগ লুকিয়ে থাকে সন্তর্পণে। বাংলাদেশের হৃদয় খুঁড়ে যেমন আবিষ্কার করতে হয় মুক্তিযুদ্ধের অবর্ণনীয় অত্যাচার নির্যাতনে নিমজ্জিত দিনগুলো, তেমনি সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের ভূগর্ভে মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতার রক্তাক্ত ইতিহাস নিয়ে সঙ্গোপনে আছে বাংলাদেশের স্বাধীনতার সচিত্র সাক্ষী স্বাধীনতা জাদুঘর।


স্বাধীনতা জাদুঘর ঢাকার ঐতিহাসিক সোহ্‌রাওয়ার্দী উদ্যানে অবস্থিত। মুঘল শাসনামল থেকে শুরু করে ১৯৭১-এর স্বাধীনতার সংগ্রাম থেকে বাংলাদেশের বিজয় অর্জন পর্যন্ত দীর্ঘ সংগ্রাম-ইতিহাসের সচিত্র বর্ণনা রয়েছে জাদুঘরটিতে। স্বাধীনতা জাদুঘর বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরের এখতিয়ারে একটি শাখা জাদুঘর হিসাবে পরিচালিত হয়ে থাকে।



স্বাধীনতা জাদুঘরটি সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে নির্মিত একটি বৃহৎ পরিকল্পিত নকশার অংশ। এই নকশায় রয়েছে একটি অ্যাম্ফিথিয়েটার, তিনটি জলাধার, শিখা চিরন্তন, স্বাধীনতা সংগ্রামের চিত্রবিশিষ্ট একটি ম্যুরাল এবং ১৫৫ আসন বিশিষ্ট একটি অডিটোরিয়াম। তবে পুরো নকশাটির প্রধান বিষয় হল একটি ৫০ মিটার বিশিষ্ট আলোক স্তম্ভ, যা স্বাধীনতা স্তম্ভ নামে পরিচিত। স্তম্ভটি কাচের প্যানেল দ্বারা নির্মিত। জাদুঘরটি এই স্তম্ভের নিচে অবস্থিত। পুরো জাদুঘরটি ভূগর্ভস্থ। এটিই বাংলাদেশের প্রথম এবং একমাত্র ভূগর্ভস্থ জাদুঘর।


প্রশ্ন আসতেই পারে, স্বাধীনতা জাদুঘরটি ভূগর্ভে কেন। মূলত স্বাধীনতা জাদুঘরে যেসব নিদর্শন প্রদর্শিত হচ্ছে তা বাংলা, বাঙালি ও বাংলাদেশের অতীত ইতিহাস ও ঐতিহ্যের সাক্ষ্য দিচ্ছে। বাংলার অতীত ইতিহাস ও ঐতিহ্যে যেমন আছে সংগ্রাম-আন্দোলনে আত্মত্যাগী বাঙালির করুণগাথা, তেমনি আছে স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব অর্জনের গৌরবজ্জ্বল দিন। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের এই স্বাধীনতা জাদুঘরে বাংলাদেশের ইতিহাস ও ঐতিহ্য সংশ্লিষ্ট আলোকচিত্র, নিদর্শন, প্রত্নতত্ত্ব, স্থাপনা রয়েছে।



স্বাধীনতা জাদুঘরে ১৪৪টি কাচের প্যানেলে তিনশরও বেশি ঐতিহাসিক আলোকচিত্র প্রদর্শিত হয়। এই জাদুঘরের গ্যালারিতে প্রদর্শিত আলোকচিত্র সম্বলিত ১৪৪টি প্যানেলে রয়েছে: স্বাধীনতা জাদুঘরের উদ্দেশ্য ও সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের ইতিহাস, বাংলাদেশের প্রাচীন, মধ্যযুগ ও সমকালীন ইতিহাস, উপমহাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম, ভাষা আন্দোলন, স্বাধিকার আন্দোলন, ১৯৭০ সালের নির্বাচন, ২৫ মার্চ কালরাত্রের গণগত্যা, মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীনতা ঘোষণা ও স্বাধীনতা সংগ্রাম, প্রত্যক্ষ প্রতিরোধ, শরণার্থী শিবির, স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র, অস্থায়ী সরকারের শপথ গ্রহণ, মুক্তিবাহিনী গঠন, প্রশিক্ষণ ও মুক্তিযুদ্ধ, বাংলাদেশের স্বাধীনতার স্বপক্ষে প্রবাসী বাঙালিদের তৎপরতা, বিদেশি পত্র-পত্রিকার প্রতিক্রিয়া, চূড়ান্ত বিজয় ও পাকিস্তানিদের আত্মসমর্পণ, বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন, স্বাধীনতা অর্জনের দ্যুতিময় প্রকাশ।


স্বাধীনতা জাদুঘরের প্লাজাটি ৫৬৬৯ বর্গমিটার বিশিষ্ট টাইল দ্বারা আবৃত স্থান, মাঝখানে রয়েছে একটি ঝর্ণা। টেরাকোটা, ঐতিহাসিক আলোকচিত্র, যুদ্ধের ঘটনা সংবলিত সংবাদপত্রের প্রতিবেদনও প্রদর্শিত হয়। এছাড়া মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে বিভিন্ন বিদেশি পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদের প্রতিলিপি এবং মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে বিদেশে প্রচারণা সৃষ্টিতে তৈরিকৃত বিভিন্ন পোস্টারও জাদুঘরটির প্রদর্শনীতে রয়েছে। বাংলাদেশের বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রত্নতাত্ত্বিক স্থান এবং স্থাপনার চিত্রও রয়েছে এখানে।



স্বাধীনতা জাদুঘর ঘুরে আসতে চাইলে দর্শনার্থীরা সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের ৫টি ফটক দিয়ে প্রবেশ করতে পারবে। ইঞ্জিনিয়ারিং ইন্সটিটিউটের নিকটবর্তী ফটক এবং বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরের বিপরীতে অবস্থিত ফটক দিয়ে সহজে প্রবেশ করা যায় ভূগর্ভস্থ এই জাদুঘরে।


বৃহস্পতিবার বাদে সপ্তাহের যে-কোনো দিন চলে আসতে পারেন স্বাধীনতা জাদুঘরে। বৃহস্পতিবার সাপ্তাহিক ছুটির দিন। করোনা পরবর্তী সময়ে গ্যালারি পরিদর্শনের সময়সূচি নির্ধারণ করা হয়েছে, প্রতি শনিবার থেকে বুধবার সকাল সাড়ে ১০টা থেকে বিকাল সাড়ে ৫টা পর্যন্ত, প্রতি শুক্রবার বিকেল তিনটা থেকে রাত আটটা পর্যন্ত স্বাধীনতা জাদুঘর দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত করা হয়।



স্বাধীনতা জাদুঘরে প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য প্রবেশমূল্য ২০ টাকা ও ১২ বছরের নিচের শিশুদের জন্য ১০ টাকা। বিদেশি নাগরিকদের জন্য প্রবেশ মূল্য ৫০০ টাকা; তবে সার্কভুক্ত দেশের দর্শনার্থীদের জন্য প্রবেশ মূল্য ৩০০ টাকা। স্বাধীনতা জাদুঘরে প্রবেশ করতে প্রতিবন্ধীদের জন্য কোনো প্রবেশমূল্য লাগবে না।


চারিদিকে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের মনোরম পরিবেশ, স্নিগ্ধ লেকের মৃদুমন্দ বাতাস, সুরম্য স্থাপত্যের ভেতরে ঢুকে পড়লেই খুলে যাবে বিস্ময়ের দুয়ার, স্বাধীনতা জাদুঘর। চোখের সামনে ভেসে উঠবে বাঙালির সুদীর্ঘকালের আন্দোলন সংগ্রামের প্রতিটি ইতিহাস। সুবিন্যস্ত ও সুশৃঙ্খল উপায়ে সাজানো এই জাদুঘর ঘুরে এসে বাংলাদেশকে পুঙ্খানুপুঙ্খ জানা খুব সহজ হয়ে যাবে।


বিবার্তা/রাসেল/সামিনা/জেএইচ


সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

পদ্মা লাইফ টাওয়ার (লেভেল -১১)

১১৫, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ,

বাংলামোটর, ঢাকা- ১০০০

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2021 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com