পদ্মা সেতু: খুশি হকার-যাত্রীরা,শঙ্কিত লঞ্চ ব্যবসায়ীরা
প্রকাশ : ২৬ জুন ২০২২, ১৬:৫৭
পদ্মা সেতু: খুশি হকার-যাত্রীরা,শঙ্কিত লঞ্চ ব্যবসায়ীরা
মো. তাওহিদুল ইসলাম
প্রিন্ট অ-অ+

স্বপ্নের পদ্মা সেতু উদ্বোধন হয়েছে। শনিবার (২৫ জুন) বহুল প্রত্যাশিত এই সেতু উদ্বোধন করেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। যার মধ্য দিয়ে দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের দীর্ঘদিনের লঞ্চ ও ফেরিঘাটে সীমাহীন ভোগান্তির অবসান ঘটেছে। স্বপ্নের এই সেতুকে ঘিরে যেখানে দেশজুড়ে উচ্ছ্বাস বইছে, সেখানে এক ভিন্ন দৃশ্যের সন্ধান মিলেছে। যেই দৃশ্যে ফুটে উঠেছে উচ্ছ্বাস-উদ্দীপনার সাথে আক্ষেপের কথাও।


স্বপ্নের পদ্মা সেতু চালুর আগে দেশের দক্ষিণাঞ্চলের বেশিরভাগ মানুষ চলাচল করতো ঢাকার সদরঘাট থেকে লঞ্চে। ফলে এই নৌ-পথকে কেন্দ্র করে এখানে লঞ্চ মালিক, শ্রমিক ও হকারসহ নানান পেশার মানুষের কর্মস্থান গড়ে উঠেছে। কিন্তু স্বপ্নের সেতু চালু হওয়া কমবে লঞ্চের যাত্রী। তাই হকার-শ্রমিকদের পেশা বদল করতে হবে। তবে দেশের মানুষের বৃহৎ স্বার্থের কথা বিবেচনা করে মহাখুশি হকার ও শ্রমিকরা। কিন্তু শঙ্কা প্রকাশ করে আক্ষেপ করেছেন লঞ্চ ব্যবসায়ীরা।


হকার ও ব্যবসায়ীরা জানান, স্বপ্নের এই সেতুর মাধ্যমে রাজধানীর সাথে দক্ষিণাঞ্চলের ২১ জেলার যোগাযোগের এক নতুন দ্বার উন্মোচিত হয়েছে। কাজেই আমাদের সামান্য অসুবিধা হলেও পদ্মা সেতু হওয়ায় আমরা খুশি। যাত্রীরা বলছেন, আমাদের সময় বাঁচবে। ভোগান্তি কমবে।


সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনালে ফতুয়া বিক্রি করেন মো.মামুন খান (৩৫)। তিনি বিবার্তাকে বলেন, পদ্মা সেতু চালু হওয়ায় আমাদের ব্যবসা খারাপ হবে। কিন্তু তারপরেও পদ্মা সেতু হওয়ায় খুশি। সেতু উদ্বোধনের পরে আমাগো বিভিন্ন বাস স্ট্যান্ডে গিয়ে ব্যবসা করতে হবে। কিছু তো একটা করে খেতে হবে।


সদরঘাটে ফল বিক্রেতা শাজাহান দেওয়ান বিবার্তাকে বলেন, সেতুতে খুশি আমরা কিন্তু ব্যবসার কী হয় জানি না। দরকার হলে ব্যবসা পাল্টাইয়া ফেলবো।


সদরঘাটে হকারি করেন আব্দুস সামাদ। তিনি বিবার্তাকে বলেন, দেশের উন্নতি হইছে এতে আমরা খুশি। সেতু চালু হওয়ায় সদরঘাটের ব্যবসার ক্ষতি হলেও দেশের অনেক মানুষের তো উপকার হয়েছে। আমাদের কয়েকজন মানুষের ক্ষতির কথা ভাবলে তো হবে না।



লঞ্চ যাত্রী মাহবুব সৈকত বিবার্তাকে বলেন, আমার ব্যবসা আছে দক্ষিণাঞ্চলের কয়েকটা জেলার সাথে। সপ্তাহে কয়েকবার যেতে হয় সেখানে। এতোদিন লঞ্চে যাতায়াত করতাম। এতে বেশির ভাগ সময় পথেই কেটে যেত। লঞ্চে যেতে হলে সদরঘাটে ৫টার দিকে আসতে হয়। লঞ্চ ছাড়ার অপেক্ষায় বসে থাকতে হয় কয়েক ঘণ্টা। যা খুবই বিরক্তিকর। পদ্মা সেতু চালু হওয়াতে সময় বেঁচে যাবে, কষ্টটাও কমবে।


দুই ঈদের ভোগান্তির কথা স্মরণ করে তিনি বলেন, পরিবার নিয়ে ঈদে বাড়িতে যাওয়ার সময় একবার মৃত্যু থেকে ফিরে আসছি। এরপর থেকে ঈদের আগেই ফ্যামিলির সবাইকে বাড়িতে পাঠাইয়া দেই। আর আমি একা পড়ে যাই। পদ্মা সেতু চালু হওয়ায় এই মরণ ভোগান্তিতে আর পড়তে হবে না।


পদ্মা সেতু বিষয়ে জানতে চাইলে আশিক নামে আরেক যাত্রী বিবার্তকে বলেন, ভাই আর কইয়েন না। খুশি মানে, পদ্মা সেতু হওয়ায় মহা খুশি। এখন বাড়িতে যাচ্ছি একটা জরুরি কাজে। পদ্মা সেতু উদ্বোধন হওয়ায় সেতুতে ঘুরতে আসমু। আমার মনে হয় লঞ্চে বাড়ি যাওয়া এইবারই শেষ।


পারাবাত লঞ্চের মালিক শহিদ ভূঁইয়া বিবার্তাকে বলেন, আমি কোনো ব্যাংক লোন নিয়ে লঞ্চের ব্যবসা করি না। নিজস্ব টাকায় আমার জাহাজ বানানো। আমার কোনো চিন্তা নাই পদ্মা সেতু চালু হওয়াতে। আর সেতু চালু হওয়াতে শুরুতে যাত্রী শংকট দেখা দিতে পারে। তবে আমরা এখনই কোনো সিদ্ধান্ত নেইনি। কয়েকদিন পর্যবেক্ষণ করে তারপর সিদ্ধান্ত নিবো। আমরা একটা শঙ্কার মধ্যে আছি।



তিনি বলেন, লঞ্চ তো আর লস দিয়ে চালানো সম্ভব হবে না। তাই দরকার হলে লঞ্চ দিয়ে হোটেল বানাব। লঞ্চের কেবিন আছে সব কিছুই আছে হোটেল বানানোর মতো। এই সেতু সরকার বানাইছে। আমাদের মত তুচ্ছ লোকের ক্ষতি হলে কী যায় আসে?


এই লঞ্চ মালিক বলেন, গাড়ির যা ভাড়া হবে তা আামাদের দেশের গরিব মানুষ গাড়িতে যেতে পারবে না। পদ্মা সেতুতে আমি খুশিও না, আবার বেজারও না।


নতুন লঞ্চ নামানোর বিষয় তিনি বলেন, আমরা বুঝিনি সরকার নিজস্ব অর্থায়নে এতো দ্রুত সেতুর কাজ শেষ করে ফেলবে। নতুন লঞ্চ বানাইয়া বোকা হয়ে গেছি।


নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আরেক লঞ্চ মালিক বিবার্তাকে বলেন, আমরা যারা দক্ষিণাঞ্চল রুটে লঞ্চ চালাই, তারা সবাই একটা শঙ্কার মধ্যে আছি। কী হবে এই মুহূর্তে কিছুই বলতে পারছি না। পদ্মা সেতু চালু হওয়াতে ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ যাত্রী কমে যাওয়ার শঙ্কা করতেছি। আমাদের লঞ্চ ভাড়া কমিয়ে দিতে হবে। ভাড়া কমানোর পরেও যাত্রী নিয়ে টিকে থাকতে পারব কিনা ,তা জানি না।


বাংলাদেশ অভ্যন্তরীন নৌ চলাচল (যাত্রী পরিবহন) সংস্থার সিনিয়ির সহ-সভাপতি আলহাজ্ব মো. বদিউজ্জামান বাদল বিবার্তাকে বলেন, খুশি-অখুশির কি আছে? এটা দেশের সম্পদ। সারা দেশের মানুষ খুশি, আমরাও খুশি। আামদের সব কিছু নির্ভর করে যাত্রীর উপরে। যদি যাত্রী কমে যায়, তাহলে অটোমেটিকলি লঞ্চের সার্ভিসও কমে যাবে।


তিনি বলেন, কম হলেও ৪০ শতাংশ যাত্রী কমে যাবে। তাদের তো আমরা জোর করে আনতে পারব না। যাত্রী কমলে আমাদের জাহাজ চলাচলের সংখ্যাও কমে যাবে।


উল্লেখ্য, ১৯৯৮ সালে পদ্মা সেতুর প্রাক-সম্ভাব্যতা যাচাই শুরু হয়ে চলে ২০০০ সাল পর্যন্ত। ২০০১ সালে জাপানিদের সহায়তায় সম্ভাব্যতা যাচাই হয় এবং সে বছরই ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।


এরপর ২০০৪ সালে আন্তর্জাতিক সহায়তা সংস্থা জাইকার সুপারিশ মেনে মাওয়া-জাজিরার মধ্যে পদ্মা সেতু নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। ২০০৮ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্মা সেতুর নকশা প্রণয়নে পরামর্শক প্রতিষ্ঠান চূড়ান্ত করে। মহাজোট সরকার শপথ নিয়েই তাদের নিয়োগ দেয়। ৬ দশমিক ১৫ কিলোমিটার সেতু করার চূড়ান্ত নকশা করা হয়।


২০০৭ সালে পদ্মা বহুমুখী সেতু প্রকল্প একনেক সভায় অনুমোদন পায়। এতে ব্যয়ে ধরা হয়, ১০ হাজার ১৬১ কোটি ৭৫ লাখ টাকা। পরে নকশা পরিবর্তন হওয়ায় নির্মাণ ব্যয়ও বেড়ে যায়। ২০১১ সালে সংশোধিত এ প্রকল্প একনেকে অনুমোদন পায়। এতে ব্যয় বেড়ে দাঁড়ায় ২০ হাজার ৫০৭ কোটি ২০ লাখ টাকা। ২০১৬ সালে আবারো ব্যয় বাড়ানো হয় এই প্রকল্পের।


সর্বশেষ প্রকল্পের মোট ব্যয় ৩০ হাজার ১৯৩ কোটি ৩৮ লাখ ৭৬ হাজার টাকায় দাঁড়িয়েছে। এর পুরো টাকাই সরকারের কাছ থেকে ঋণ হিসেবে নিয়েছে সেতু বিভাগ।


সম্প্রতি সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের জানিয়েছেন, সেতু নির্মাণে বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষ সরকারের কাছ থেকে ঋণ নিয়েছে। আগামী ৩৫ বছরে সরকারকে সুদে আসলে ৩৬ হাজার কোটি টাকা পরিশোধ করতে হবে।


ঋণ পরিশোধ, সেতুর পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয়, নদীশাসন এবং আদায়কৃত টোলের ট্যাক্স ও ভ্যাট বাবদ অর্থ পরিশোধ করার জন্য টাকা প্রয়োজন। এসব টাকা সেতুতে চলাচলকারী যানবাহনের উপর টোল আরোপ করে উঠানো হবে বলে জানান তিনি।


দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের পিছিয়ে পড়া ২১টি জেলা খুলনা বিভাগের খুলনা, বাগেরহাট, যশোর, সাতক্ষীরা, নড়াইল, কুষ্টিয়া, মেহেরপুর, চুয়াডাঙ্গা, ঝিনাইদহ ও মাগুরা; বরিশাল বিভাগের বরিশাল, পিরোজপুর, ভোলা, পটুয়াখালী, বরগুনা ও ঝালকাঠি এবং ঢাকা বিভাগের গোপালগঞ্জ, ফরিদপুর, মাদারীপুর, শরীয়তপুর ও রাজবাড়ীর মানুষসহ পুরো দেশের ভাগ্য বদলে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে পদ্মা সেতু। এই সেতু ঘিরেই দেখা যাচ্ছে দেশের সোনালী ভবিষ্যত। পদ্মা সেতু রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশের সঙ্গে এ অঞ্চলের যোগাযোগ ব্যবস্থা সহজ ও সুগম করে সড়ক পরিবহন ব্যবস্থায় হয়ে থাকবে মাইলফলক।


বিবার্তা/তাওহিদ/রোমেল/এমবি


সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

পদ্মা লাইফ টাওয়ার (লেভেল -১১)

১১৫, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ,

বাংলামোটর, ঢাকা- ১০০০

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2021 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com