বাঙালি জাগরণের মহাজাদুকর শেখ মুজিব (পর্ব ১৭)
প্রকাশ : ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২২, ১০:১২
বাঙালি জাগরণের মহাজাদুকর শেখ মুজিব (পর্ব ১৭)
এফ এম শাহীন
প্রিন্ট অ-অ+

১৯৪৬ সালের শেষের দিকে ভারতের রাজনীতিতে এক জটিল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। ব্রিটিশ সরকার ক্ষমতা হস্তান্তর করতে আগ্রহী হয়ে ওঠে। কিন্তু তৎকালীন বড়লাট লর্ড ওয়েভেল মুসলিম লীগের সাথে ভালো ব্যবহার না করায়, মুসলিম লীগ অন্তর্বতীকালীন সরকারে যোগদান করতে অস্বীকৃত জানায়। লর্ড ওয়েভেল কংগ্রেসকে নিয়ে অন্তর্বতীকালীন সরকার গঠনের ঘোষণা দেন। কংগ্রেস পণ্ডিত জওহরলাল নেহেরুর নেতৃত্বে সরকারে যোগদান করে। এদিকে লর্ড ওয়েভেল ঘোষণা করেছিলেন, মুসলিম লীগের জন্য পাঁচটা মন্ত্রিত্বের পদ খালি রইলো, ইচ্ছা করিলে তারা যেকোন মুহূর্তে যোগদান করতে পারবে। প্রথমদিকে নাকচ করে দিলেও পরে মুসলিম লীগ কেন্দ্রীয় সরকারে যোগদান করে। যদি তা না করতো তবে কংগ্রেস কিছুতেই পাকিস্তান দাবি মানতে চাইতো না।


১৯৪৭ সালের জুন মাসে ঘোষণা হয় যে, ভারতবর্ষ ভাগ হবে। কারণ, চারিদিকে তখন শুধু দাঙ্গা আর দাঙ্গা। হিন্দু-মুসলিমের রেষারেষি তখন তুঙ্গে। শেখ মুজিবুর রহমান আর তাঁর এক ফটোগ্রাফার বন্ধু বিহার থেকে দাঙ্গার ছবি তুলেছিলেন যেসব ছবিগুলো ছিল এমন যে, মেয়েদের স্তন কাটা, ছোট শিশুদের মাথা নাই- শুধু শরীর আছে, রাস্তায় লাশ পড়ে আছে, এখানে সেখানে আগুন জ্বলছে। এইসব ছবিগুলো তাঁরা উপহার হিসেবে মহাত্মা গান্ধীজি পর্যন্ত পৌঁছেছেন। সেসময় মহাত্মা গান্ধী দাঙ্গা-হাঙ্গামা বন্ধ করে শান্তি কায়েমের জন্য কাজ করছিলেন।


১৯৪৪-৪৫ সালের সময়কালে ট্রেনে-স্টিমারে সর্বত্র হিন্দু মুসলমানদের মধ্যে পারস্পরিক মতবিনিময় সাম্প্রদায়িক আলোচনায় রূপ নিতো যার শেষটা গিয়ে ঠেকতো মারামারি হাতাহাতিতে। পাকিস্তানের মুসলমানরা যেমন হিন্দুদের ভাই হিসেবে গ্রহণ করবে, ভারতবর্ষের হিন্দুরাও মুসলমানদের ভাই হিসেবে গ্রহণ করবে। এই সত্যকে অধিকাংশ লোকই হৃদয়ে ধারণ করতে পারছিল না। কারণ, সাম্প্রদায়িক চিন্তার নিগড় থেকে নিজেকে ছিন্ন করা কর্মটি সহজ নয়। এর জন্য উদারচিন্তার সর্বোচ্চ অবস্থানে নিজেকে অধিষ্ঠিত করতে হয়। আর এই কাজটিই নির্লিপ্ত এবং স্বাভাবিক সহজাত উপায়ে করে ফেলতেন শেখ মুজিবুর রহমান। কারণ, তিনি তো সেই মানুষ যিনি ভাবতেন, পাকিস্তান না হলে দশ কোটি মুসলমানের কী হবে? আবার তিনিই তো ভাবতেন পাকিস্তানের হিন্দুদেরও স্বাধীন নাগরিক হিসেবে বসবাসের সুযোগ চাই। তাঁর কাছে ধর্মের উর্ধ্বে ছিল মানবতা। হিন্দু-মুসলিম নয় তিনি মানুষের কল্যাণের কথা ভাবতেন। তাঁর একান্ত মনস্কামনা ছিল, চেষ্টা করব, সমস্ত লীগ কর্মীদের নিয়ে যাতে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গাহাঙ্গামা রোধ করা যায়।


পাকিস্তান কায়েম হওয়ার পর অর্থাৎ ভারতবর্ষ ভাগ হওয়ার পর তিনি সুবিধাবাদীদের হস্তক্ষেপে দেশের সার্বিক পরিস্থিতিতে অন্যরকম চালচিত্র দেখতে পান এবং আশাহত হন। শেখ মুজিবুর রহমান বলেন, আস্তে আস্তে সকল কিছুতেই ভাটি লাগল, শুধু সরকারের নীতির জন্য। তারা জানত না৷ কী করে একটা জাগ্রত জাতিকে দেশের কাজে ব্যবহার করতে হয় এবং জাতিকে গঠনমূলক কাজে লাগাতে হয়। হাজার হাজার নেতাকর্মী এদিক ওদিক ছিটকে পড়লো। কাজও ছিল এবং কর্মীও ছিল কিন্তু তাদের ব্যবহার করা হলো না। এর একটা বিশেষ কারণ হলো, যাদের কাছে ক্ষমতা এলো তারা জনসাধারণের উপর আস্থা রাখতে পারে নাই। কারণ, জনসাধারণের সাথে তাদের কোন সম্পর্ক ছিল না।


যে কয়েকজন লোক প্রদেশের শাসন ক্ষমতা হাতে পেলেন, তারা সকলেই প্রায় ইংরেজ ঘেষা নেতা ছিলেন। ইংরেজকে তেল দিয়ে স্যার, খান বাহাদুর, খান সাহেব উপাধি নিয়েছেন৷ এরা সম্পূর্ণভাবে নির্ভর করতে শুরু করলেন ইংরেজ আমলের আমলাতন্ত্রের উপর। আমলাতন্ত্রের কর্ণধাররা যা বলতেন তাই শুনতেন। এই সকল কর্মচারীরা অনেকেই ইংরেজকে খুশি করার জন্য গায়ে পড়ে প্রমোশনের লোভে স্বাধীনতার জন্য যে সমস্ত কর্মী সংগ্রাম করছে তাদের উপর অকথ্য অত্যাচার করেছেন, যার ভুরি ভুরি প্রমাণ আজও আছে।


স্বাধীনতা পাওয়ার সাথে সাথে এরা অনেকেই দুই তিন ধাপ প্রমোশন পেলেন এবং এতে অনেকের মাথা খারাপ হয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছিল। আর স্যার ও খান বাহাদুরের দল এদের হাতের পুতুলে পরিণত হলো। স্বাধীন দেশের স্বাধীন জনগণকে গড়তে হলে এবং তাদের আস্থা অর্জন করতে হলে যে নতুন মনোভাবের প্রয়োজন ছিল তা এই নেতৃবৃন্দ গ্রহণ করতে পারলেন না। এদিকে ক্ষমতা কুক্ষিগত করার জন্য রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান মুসলিম লীগকে তাদের হাতের মুঠোয় নেওয়ার জন্য এক নতুন পন্থা অবলম্বন করলেন। পাকিস্তান কায়েম হওয়ার পরে মুসলিম লীগও দুই ভাগ হলো। এক ভাগ রইলো ভারতবর্ষে নাম হল নিখিল ভারত মুসলিম লীগ, আরেক ভাগ হলো পাকিস্তান মুসলিম লীগ। মুসলিম লীগকে নিয়ে এই নোংরা রাজনীতির কারণটাই ছিল তাঁদের সুসংগঠিত হতে না দেওয়া। সুবিধাবাদীরা তো দেশের-মানুষের মঙ্গলে নয়, স্বার্থোদ্বারেই উন্মত্ত ছিল।


http://www.bbarta24.net/literature/200356


বিবার্তা/এসবি

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

পদ্মা লাইফ টাওয়ার (লেভেল -১১)

১১৫, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ,

বাংলামোটর, ঢাকা- ১০০০

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2021 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com