চুরি
প্রকাশ : ১১ আগস্ট ২০২২, ০৯:০৭
চুরি
বিপ্লব সাইফুল
প্রিন্ট অ-অ+

মধু চোরের পাঁজরে টেটার শেষ ঘাঁইটা মারে মজনু। ততোক্ষণে মধু বাকশক্তি হারিয়ে ফেলেছে। ইছামতীর পানিতে গিয়ে মিশেছে মধু চোরের ক্ষতবিক্ষত দেহের রক্তধারা।


ইছামতীর জলের মতোই থই থই করছে রাত্রির অন্ধকার। সেই অন্ধকারে মধুকে ফেলে ওরা মেয়েটাকে নিয়ে হাঁটা দেয় নিঃসন্তান জালু মাতব্বরের বাড়িমুখি। যার কাছে দশ হাজার টাকায় মেয়েটাকে বিক্রি করেছিলো মধু।


বাকশক্তি হারানো মধু চোরা কিম্ভুতকিমাকার দেহটা নিয়ে সমস্ত প্রচেষ্টায় এগিয়ে যেতে চায় নদীর জলের কাছে। তার হাত তিneক দূরেই অসীম জলরাশি। কিন্তু এইটুকু দূরত্ব সে কিছুতেই অতিক্রম করতে পারে না। কিছুতেই না! তার কণ্ঠনালি ছিঁড়ে যেতে চায় তৃষ্ণায়। মধু বোঝতে পারে বৃথাই তার চেষ্টা। সে অপার তৃষ্ণা নিয়ে স্থির হয়ে যায়।


ঘোর অমাবস্যা রাত। মধু চিত হয়ে আকাশে তাকিয়ে থাকে। ওর ক্ষতবিক্ষত দেহটা যন্ত্রণায় কেঁপে কেঁপে ওঠে। কিন্তু মধু সে যন্ত্রণাকে অতিক্রম করে যেতে চায় স্মৃতিরোমন্থনে। বোঝতে পারে মাত্র আর কিছুক্ষণেই সেও চলে যাবে, যেখানে চলে গেছে আছিরন।


মধুর বাবাও ছিলো চোর। ওর বছর দশেক বয়সে এক দূরের গাঁয়ে চুরি করতে গিয়ে লাশ হয়ে যায় মধুর বাবা।



ওর মা বলত, মানুষ মরে গেলে নাকি তারা হয়ে যায় আকাশে। মধুর দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে আসে ক্রমশ। সে সেই ঝাপসা হওয়া দৃষ্টিতে আকাশে তারা খোঁজে। একটা তারাও তার চোখে ধরা দেয় না। তারার বদলে অসখ্য মুখ শূন্যে ঝুলে থাকে!



ওই অসখ্য মুখের ভেতর সে আছিরনের মুখটা খুঁজে ফিরে। সহাসা আছিরন ধরা দেয় তার চোখে। আছিরন শূন্যের ওপর ঝুলে থেকে হাসছে। মধুও হাসার চেষ্টায় ঠোঁট বাকায়। কিন্তু তার হাসিটা ঠিক ফোটে ওঠে না।


তারপরই হঠাৎ সবগুলি মুখ অদৃশ্য হয়ে যায়। মধুর নিজেকে বড় অসহায় মনে হয়। সে নিজের অজান্তেই ডুঁকরে ওঠে, আছিরন!
মধু পুনরায় বাকশক্তি ফিরে পায় এক মুহূর্তের জন্য।


সেই রাতে খুব ঝড়- বৃষ্টি ছিলো। বিকেল থেকেই শুরু হলো আছিরনের প্রসববেদনা। শেষরাতের দিকে আছিরন জন্ম দিলো একটা মেয়েশিশু। শিশুটাকে জন্ম দিতে গিয়ে আছিরন চলে গেলো। যাওয়ার আগে সে যন্ত্রণানীল কণ্ঠে মধুকে বলে গিয়েছিলো চুরির পেশা ছাড়তে। মধু কথা রেখেছিলো স্ত্রীর। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সে হেরে গেলে পিতার স্নেহের কাছে।



আছিরনকে হারিয়ে শিশুকন্যাটাকে নিয়ে মধু পরে গেলো অকুল পাথারে। তার তিনকুল শূন্য। মধু ছাড়া কেউ নেই মধুর। তখন গ্রামের মাতব্বর জালু মিয়া তাকে ডেকে নিয়ে মেয়েটাকে দিয়ে দিতে বলে। লোকটা নিঃসন্তান। প্রথমে মধু রাজি হয় না। পরে সাতপাঁচ ভেবে রাজি হয়ে যায়। মাতব্বর তাকে দশ হাজার টাকা দিয়ে গ্রাম ছেড়ে চলে যেতে বলে। কঠিন স্বরে বলে দেয়, যাতে মধু মেয়ের ধারে কাছে কোনদিন না আসে।



তারপর মধু চলে যায় ঢাকা। কিন্তু সে এক দুর্বহ যন্ত্রণায় নীল হয়ে যায় প্রতিনিয়ত। কখনো একা একা গোক্ষুরের মতো ফুঁসে, হাঁউমাঁউ করে! শূন্য বুক চাপড়ায়। সে একি করলো?


সন্তানের পিপাসায় মধুর বুক পুড়ে যাই দাউদাউ দাবানলে!


শেষ পর্যন্ত মধু আর পারে না। নিজের সন্তানকেই চুরি করার সিদ্ধান্ত নেয়। সে চেঁপে বসে গাঁয়ে ফেরার গাড়িতে। সদ্ধ্যায় সে এসে পৌঁছে। কিন্তু মধু তখনই ইছামতী পাড়ি দেয় না। বসে থাকে ধু ধু প্রান্তে। একটা পর একটা বিড়ি ফুঁকে। বারবার, বারংবার বুকটা হাতায়। বড় তৃষ্ণা! বড় তৃষ্ণা!



রাত্রি নীরব হলে মধু ইছামতী পাড়ি দেয় সাঁতরিয়ে। নিঃশব্দে হাঁটা দেয় জালু মাতব্বরের বাড়ির দিকে। জালু মাতব্বরের বউ তখন বেঘোরে ঘুমায় মেয়েটাকে বুকের কাছে নিয়ে। জালু মিয়া থাকে পাশের ঘরে। মাতব্বরের বিরাট গেরস্থালি।



রাখাল- কামলা জনা সাতেক। এই বাড়িতেই থাকে। মধু মেয়েটাকে আলগোছে বুকে তুলে নিয়ে বেরিয়ে এসেছিল। ঠিক তখন, তখনই মেয়ে তার চিৎকার করে ওঠে। আর তাতে ঘটে বিপত্তি।


মাতব্বরের বউ মেয়ের মতো চিৎকারে রাত্রির নীরবতা খানখান করে দেয়। জেগে ওঠে জালু মিয়া। জেগে ওঠে রাখাল- কামলা। একসাথে জ্বলে ওঠে কয়েকটা টর্চলাইট। সে আলোয় জালু মাতব্বর চিনতে পারে মধু চোরকে। তার কামলা মজনুকে সে বলে, চোরারে শেষ কইরা দে মজনু।


মধু মেয়েটাকে বুকে চেঁপে দৌঁড়াতে থাকে, দৌঁড়াতেই থাকে। ওর পেছনে পেছনে ছুটে কয়েকজোড়া পা। টর্চলাইটের আলো ফালাফালা করে অমাবস্যার আঁধার। মধু এইমধ্যেই মেয়ের বুকের তাপ নেয়। দৌঁড়াতে দৌঁড়াতে রাত্রির মৌনতা ভেঙে হা হা হাসিতে ফেটে পরে। সেই হাসির মাঝেই মধুর পোড়া চোখ সজল হয়ে যায়!



মধু বেশি দূর যেতে পারে না। এক সময় ইছামতীর তীরে এসে সে থেমে যায়। মধু একবার ভাবে মেয়েটাকে রেখে নদীতে ঝাঁপিয়ে পরে। কিন্তু সে তার তৃষিত বুকটাকে শূন্য করতে চায় না। মেয়েকে আরো প্রবলভাবে জড়িয়ে ধরে। তার মধ্যেই মধু চোরার ওপর ঝাঁপিয়ে পরে অনেকগুলি হাত। প্রথমে ওরা মেয়েটাকে ছিনিয়ে নেয়। তারপর একটার পর একটা টেটার ঘাঁই মারে মধুর দেহে। মধু একবারের জন্যও চিৎকার করে না। শরীরের যন্ত্রণার চেয়ে তার মনের যন্ত্রণাটা বেশি তীব্র হয়ে ওঠে!



মধুর চোখজোড়া ক্রমশই আরো ঝাপসা হতে থাকে। দূরে কোথাও একটা শিয়াল ডাকে। মধু শেষবারের মতো অদৃশ্য হয়ে যাওয়া মুখগুলি খোঁজে। কিন্তু ঘোর শূন্যতা ছাড়া তার চোখে আর কিছুই ধরা দেয় না। মধু তার অচল হয়ে যাওয়া হাতদুটিকে বহু চেষ্টায় নিজের বুকে চেঁপে ধরে। তার দুইহাতের চাপে মধুর মেয়েটা পিষে যায় পৃথিবীর আশ্চর্য স্নেহে!


বিবার্তা/এসবি

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

পদ্মা লাইফ টাওয়ার (লেভেল -১১)

১১৫, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ,

বাংলামোটর, ঢাকা- ১০০০

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2021 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com