রবিবারের ধারাবাহিক
বাঙালি জাগরণের মহাজাদুকর শেখ মুজিব (পর্ব ৮)
প্রকাশ : ২৯ মে ২০২২, ০৮:১৫
বাঙালি জাগরণের মহাজাদুকর শেখ মুজিব (পর্ব ৮)
এফ এম শাহীন
প্রিন্ট অ-অ+

একজন সফল মানুষের পেছনের গল্পে অনেকের আত্মত্যাগ, অনেকের নিবেদন, অনেকের অবদান থাকে। অবদান যদি বাবা কিংবা মায়ের হয় তাহলে সাফল্যেরও সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছানো যায়। শেখ মুজিবুর রহমানের পিতা শেখ লুৎফর রহমান মানুষ হিসেবে ছিলেন অসাধারণ আর পিতা হিসেবে এককথায় অনন্যসাধারণ। তাঁর স্নেহ-সাহচর্য শেখ মুজিবুর রহমান প্রজ্ঞা আর মেধায় যেমন অনন্য করেছিলেন তেমনি জ্ঞানে-গুণে সমৃদ্ধ করে সর্বকালের শ্রেষ্ঠ বাঙালির সম্মানে অধিষ্ঠিত করেছেন।



পিতা-পুত্রের যর্থাথ মধুর সম্পর্ক বলতে যা বোঝায় তা ছিল শেখ লুৎফর রহমান আর শেখ মুজিবুর রহমানের। বদলির চাকরিতে বাবার সাথে সাথেই ঘুরতেন তিনি। বাবার সাথেই খাওয়া-ঘুম। বাবার গলা না ধরে ঘুমাতেন না। আবার, খেলার মাঠে তাদের পরস্পরকে ছাড় নেই, তারা প্রতিদ্বন্দ্বী, অফিসার্স ক্লাব আর স্কুলের ছাত্রদের ম্যাচ, একে অপরকে খেলায় হারিয়ে দেওয়ার কৌশল আটতেন। খেলায় উৎসাহ দিলেও হার্টের সমস্যায় আক্রান্ত ছেলে খেলুক সেটাও মন মানতো না শেখ লুৎফর রহমানের। এদিকে তিনি সবসময়ই ছেলের পড়াশোনার ব্যাপারে খুব আন্তরিক ছিলেন। ছেলের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড, পরোপকারী আচরণ, উদ্যোগী সমাজসেবা নিয়ে বাড়িতে অভিযোগ গেলে তিনি কখনো ছেলেকে থামিয়ে দিতেন না, শুধু বলতেন, পড়ালেখা ছেড়ো না। মিথ্যে মামলায় ছেলেকে জেল খাটতে হলেও তিনি কখনো ছেলেকে দেশের জন্য লড়াইয়ের ময়দান থেকে সরে আসতে বলেননি।



শেখ মুজিবুর রহমানকে লেখা তাঁর পিতার একটা চিঠি এবার পড়বো আমরা,


“বাবা খোকা,


শুরুতেই দোয়া জানিবা। তোমাকে আটক করিয়া রাখার অর্থ হইতেছে আমাদের মতন বৃদ্ধ পিতা মাতা, ও নাবালক ছেলে মেয়েদের এবং স্ত্রীর উপর নানারূপ অত্যাচার করা। আমরা উপায়হীন সহ্য করিতে বাধ্য কিন্তু খোদাতায়ালা নিশ্চয়ই সহ্য করিবেন না। চিন্তা করিবা না, সব কিছু খোদাতায়ালার উপর নির্ভর। তিনি যাহা করেন মানুষের মঙ্গলের জন্যই করেন। সত্যের জয় হইবেই। সব সময় দোয়া করিতেছি এবং খোদার দরগায় প্রার্থনা যে তিনি যেন তোমাদের মঙ্গল করুক। ৮০ বৎসর বয়সের বৃদ্ধ ব্যক্তির পক্ষে এমন লেখা খুব কঠিন। তাই খুব ধীরে লিখিতে হয় এবং লিখিতে একটু দেরী হয়।


তোমার আব্বা।”



শেখ লুৎফর রহমান ৩১ মার্চ ১৯৬২ খ্রিষ্টাব্দে তার পুত্র শেখ মুজিবুর রহমান অর্থাৎ আমাদের বঙ্গবন্ধুকে এই চিঠিটি লিখেন। চিঠিটি পড়ার পর প্রথমত পুত্রের জন্য পিতার আকুতিতে বুক হাহাকার করে ওঠে, চিঠির ভাষায় অন্তর কেঁপে ওঠে, অজান্তেই চোখে জল এসে পড়ে! এই চিঠি একসাথে অনেক কথা বলে। শেখ মুজিবুর রহমানের রাজনৈতিক জীবন যে কতোটা দুঃসহ ছিল, কতো ত্যাগ যে তিনি করেছেন বাংলার মানুষের জন্য, তার দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে স্বজনদের যে কতোটা বেদনাভার নিতে হয়েছে তা এই চিঠিটি পড়লে সহজেই বোঝা যায়।



চিঠিটি একই সাথে তুলে ধরে সেই সাক্ষ্যও- বঙ্গবন্ধু তাঁর পিতার কাছ থেকে কী ধরনের ধৈর্যের তালিম পেয়েছেন এবং সেটির চর্চায় নিজেকে ব্যাপৃত রেখেছেন, একজন অশীতিপর বৃদ্ধ পিতা তাঁর সন্তানের ন্যায্য আন্দোলনের প্রতি কীভাবে দৃঢ় সমর্থন দিয়ে গেছেন এবং দেশের জন্য নিজের প্রিয় খোকাকে উৎসর্গ করে আবার সেই খোকাকেই ধৈর্য ধারণ করার শিক্ষা দিয়েছেন!


এইরকম আর্দশবান, নিষ্ঠাবান, ধৈর্যশীল পিতার পুত্রটিও আদর্শ ও নীতির দীক্ষায় দীক্ষিত, সাহস ও ধৈর্যশক্তিতে বলীয়ান এবং অত্যন্ত উদারচিন্তার ও সহানুভূতিশীল ছিলেন।


আরেকটি চিঠি আমরা পড়তে পারি যেটি ঢাকা জেলে বসে বাবা লুৎফর রহমানকে বঙ্গবন্ধু লিখেছিলেন।


আব্বা,


আমার ভক্তিপূর্ণ ছালাম গ্রহণ করবেন ও মাকে দিবেন। মা এবার খুব কষ্ট পেয়েছিল, কারণ এবার তাঁর সামনেই আমাকে গ্রেপ্তার করেছিল। দোয়া করবেন মিথ্যা মামলায় আমার কিছুই করতে পারবে না। আমাকে ডাকাতি মামলার আসামীও একবার করেছিল। আল্লা আছে, সত্যের জয় হবেই। আপনি জানেন বাসায় কিছুই নাই। দয়া করে ছেলেমেয়েদের দিকে খেয়াল রাখবেন। বাড়ি যেতে বলে দিতাম। কিন্তু ওদের লেখাপড়া নষ্ট হয়ে যাবে। আমাকে আবার রাজবন্দী করেছে, দরকার ছিল না। কারণ রাজনীতি আর নাই, এবং রাজনীতি আর করবো না। সরকার অনুমতি দিলেও আর করবো না।


যে দেশের মানুষ বিশ্বাস করতে পারে যে আমি ঘুষ খেতে পারি সে দেশে কোনো কাজই করা উচিত না। এ দেশে ত্যাগ ও সাধনার কোন দামই নাই। যদি কোন দিন জেল হতে বের হতে পারি তবে কোন কিছু একটা করে ছেলেমেয়ে ও আপনাদের নিয়ে ভালভাবে সংসার করব। নিজেও কষ্ট করেছি, আপনাদেরও দিয়েছি। বাড়ির সকলকে আমার ছালাম দিবেন। দোয়া করতে বলবেন। আপনার ও মায়ের শরীরের প্রতি যত্ন নিবেন। চিন্তা করে মন খারাপ করবেন না। মাকে কাঁদতে নিষেধ করবেন। আমি ভাল আছি।


আপনার স্নেহের
মুজিব


গোপালগঞ্জের বাসাটা ভাড়া দিয়া দেবেন। বাসার আর দরকার হবে না। মুজিব।


সূত্র : পূর্ব পাকিস্তান সরকার, হোম পোল, এফ/এন, ৬০৬-৪৮ পিএফ, খ ৯


উপরের চিঠিটি যা বঙ্গবন্ধু তাঁর পিতাকে লিখেছিলেন সেটি পড়ে বোঝা যায় দেশের জন্য সংগ্রামী জীবন যাপন করতে গিয়ে তিনি নিজের কতোটা দিয়েছেন বিনিময়ে কতোটা অবহেলা-অপবাদ-অবিচার সয়েছেন!


আন্দোলন সংগ্রামে নিজ স্বার্থ কখনো দেখেননি তিনি, স্বার্থ দেখেছেন বাঙালির-বাংলার। অথচ যাদের জন্য লড়েছেন তারাই অভিযুক্ত করে, অন্যায় অপবাদ দিয়ে শেখ মুজিবুর রহমানকে ক্লান্তি-গ্লানির দুঃসহ বেদনা দিয়েছিল। পিতার সাথে একান্ত অভিমানী কথা বলেছেন। যাদের জন্য লড়াই করেছেন তারাই সবসময় তাকে বিশ্বাস-ভরসা করেনি। কিন্তু সংগ্রামের পথ তিনি ছাড়েননি এক মুহূর্তের জন্য। কারণ, তার সারাজীবনের শপথ ছিল,


‘আমার বাংলার মাটি
তোমায় আমি রাখব পরিপাটি।’
শৈশব থেকেই এই কবিতার লাইন দুটি তিনি গুনগুন করতেন সব সময়—


পিতা-পুত্র ক্ষণিকের আবেগে রাজনীতির কণ্টকাকীর্ণ পথ নিয়ে ব্যথিত হয়েছেন, কারণ দেশের জন্য অকাতরে আত্মনিবেদন করেও তো তিনি পাননি যোগ্য সম্মান। তবুও কিন্তু বঙ্গবন্ধু সারাজীবন এই দেশ, মাটি ও মানুষের কল্যাণে যাবতীয় রাজনৈতিক, সামাজিক, মানবিক কাজে নিজেকে নিয়োজিত রেখেছেন। আর তাঁর পিতাও তাকে কোনদিন না বলেননি, বরং প্রেরণা আর সাহসই দিয়েছেন। এমন অসাধারণ পিতার এমন সোনার ছেলেই হয়, যার স্পর্শে সোনার বাংলার জন্ম নেয়৷


বিবার্তা/এসবি

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

পদ্মা লাইফ টাওয়ার (লেভেল -১১)

১১৫, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ,

বাংলামোটর, ঢাকা- ১০০০

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2021 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com